বাইতুল্লাহ: আল্লাহর ঘর, ঈমানের প্রাণ

হারামের চত্বরে বসে নিজেকে বারবার বলুন আমি এমন এক ঘরের সামনে বসে আছি যাকে আল্লাহ নিজের ঘর বলেছেন। যার দিকে মুখ করে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ দাঁড়ায়। যার জন্য নবীরা কেঁদেছেন। যার জন্য রাসূল ﷺ আকুল হয়েছেন। যার দিকে তাকিয়ে সাহাবিরা অশ্রু ঝরিয়েছেন।

১. কাবা মানবজাতির অস্তিত্বের কেন্দ্র

﴿جَعَلَ اللّٰهُ الْكَعْبَةَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ قِيَامًا لِلنَّاسِ﴾

আল্লাহ কাবা, সম্মানিত ঘরকে মানুষের (জীবন ও দ্বীনের) প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র বানিয়েছেন। (সূরা মায়িদা: ৯৭)

এই আয়াতের তাফসিরে মুফাসসিরগণ বলেছেন—

قياما للناس অর্থ—

মানুষের দ্বীন, ঈমান, ঐক্য, নিরাপত্তা, আধ্যাত্মিক জীবন ও সভ্যতার কেন্দ্র।

হারামের সামনে বসে ভাবুন পৃথিবীতে কত রাজধানী আছে। কত রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ আছে। কত পার্লামেন্ট আছে। কিন্তু আল্লাহ বলেননি এসব মানুষের কেন্দ্র। বলেছেন—কাবা মানুষের কেন্দ্র।

২. পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্রয়দায়ক ঘর

﴿وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا﴾

আমি এই ঘরকে মানুষের বারবার ফিরে আসার স্থান ও নিরাপত্তার কেন্দ্র বানিয়েছি। (বাকারা ১২৫)

مثابة للناس

অসাধারণ শব্দ। আরবরা বলে—

ثاب অর্থ ফিরে আসা।

অর্থাৎ মানুষ বারবার এখানে ফিরে আসবে। একবার এসে তৃপ্ত হবে না। এ কারণেই দেখা যায় কেউ প্রথম উমরা করেই বলে‌ আবার কবে আসব?

কেউ দেশে ফিরেও হারামের ভিডিও দেখে কাঁদে। কেউ বৃদ্ধ বয়সে লাঠি নিয়ে আবার আসে। কেউ সারা জীবন টাকা জমায়, আবার আসার জন্য। কারণ আল্লাহ নিজেই বলেছেন আমি এই ঘরকে এমন বানিয়েছি, মানুষ বারবার ফিরে আসবে।

৩. কাবা পৃথিবীর প্রথম ঘর

﴿إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ﴾

(আলে ইমরান ৯৬) এটি মানব ইতিহাসের সূচনা।

৪. বরকতময় ঘর

﴿مُبَارَكًا﴾

(আলে ইমরান ৯৬) যেখানে আল্লাহ নিজে বরকত রেখেছেন।

৫. সমগ্র বিশ্বের হিদায়াত

﴿وَهُدًى لِلْعَالَمِينَ﴾

(আলে ইমরান ৯৬)

৬. সুস্পষ্ট নিদর্শনের ঘর

﴿فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ﴾

(আলে ইমরান ৯৭)

৭. মাকামে ইবরাহিম

﴿مَقَامُ إِبْرَاهِيمَ﴾

(আলে ইমরান ৯৭)

৮. নিরাপত্তার ঘোষণা

﴿وَمَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا﴾

(আলে ইমরান ৯৭)

৯. আল্লাহর শপথ

﴿وَهَذَا الْبَلَدِ الْأَمِينِ﴾

(তীন ৩)

﴿لَا أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ﴾

(বালাদ ১)‌আল্লাহ মক্কার শপথ করেছেন।

১০. ইবরাহিম (আ.)-এর হৃদয়ের দোয়া

﴿رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا﴾

(বাকারা ১২৬)

﴿رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا﴾

(ইবরাহিম ৩৫)

দুটি দোয়া। দুটি যুগ।‌একই আবেদন। নিরাপত্তা।

১১. কাবা নির্মাণের সময়ের কান্না

﴿رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا﴾

(বাকারা ১২৭) খলিলুল্লাহর চোখে তখন অশ্রু।

১২. কিবলার আয়াত

﴿فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ﴾

(বাকারা ১৪৪) এটি উম্মাহর স্বতন্ত্র পরিচয়ের ঘোষণা।

১৩. আল্লাহর ঘর

﴿وَطَهِّرْ بَيْتِيَ﴾

(হজ্জ ২৬)

﴿طَهِّرَا بَيْتِيَ﴾

(বাকারা ১২৫)

এই “بَيْتِي” শব্দটি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করা যায়।

আমার ঘর এটি ভালোবাসার সম্পর্ক।

১৪. বাইতুল আতীক

﴿وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ﴾

(হজ্জ ২৯)

﴿هَدْيًا بَالِغَ الْكَعْبَةِ﴾

(মায়িদা ৯৫)

১৫. হজের ঘোষণা

﴿وَأَذِّنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ﴾

(হজ্জ ২৭)

এখনো সেই ডাক চলছে।‌ আপনার উপস্থিতি সেই দাওয়াতের জবাব। এখন নিজেকে প্রশ্ন করুন‌ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে আল্লাহ আমাকে কেন এখানে ডেকেছেন?‌ কেন আজ আমি এই ঘরের সামনে বসে আছি? আমি কি শুধু একটি উমরা সম্পন্ন করতে এসেছি?‌ আমি কি শুধু কয়েকটি ছবি নিয়ে ফিরে যাব? আমি কি শুধু একটি সফরের স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরব?

হাজার হাজার মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু এই ঘর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি।‌ কত ধনী মানুষ আছে, আসতে পারেনি। কত শক্তিশালী মানুষ আছে, আসতে পারেনি। কত মানুষ আকুল হয়ে কেঁদেছে, কিন্তু ডাক পায়নি।

আর আজ আল্লাহ আমাকে তাঁর ঘরের সামনে বসিয়েছেন।‌এখন কল্পনা করুন চৌদ্দশ বছর আগে রাসূলুল্লাহ ﷺ এই ঘরের দিকে তাকিয়ে আছেন।

ফাতহে মক্কার দিন তিনি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

বিদায় হজের দিন তিনি এই ঘরকে কেন্দ্র করে উম্মাহকে বিদায়ী উপদেশ দিচ্ছেন। আবু বকর (রা.) এখানে দাঁড়িয়েছেন। উমর (রা.) এখানে কেঁদেছেন। উসমান (রা.) এখানে তাওয়াফ করেছেন।‌ আলী (রা.) এখানে সিজদা করেছেন। ইবনে উমর (রা.) এখানে দোয়া করেছেন। অসংখ্য মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুজাহিদ, ওলি ও সালেহীন মানুষ এখানে চোখের পানি ফেলেছেন।

আজ আমি সেই একই ঘরের সামনে বসে আছি।

তখন হৃদয়কে বলুন হে হৃদয়! যদি আজও তুই না জাগিস, তবে আর কবে জাগবি? যদি এই ঘরের সামনে বসেও তোর চোখে পানি না আসে, তবে আর কোথায় আসবে? যদি এখানে বসেও আল্লাহর ভালোবাসা জন্ম না নেয়, তবে আর কোথায় জন্ম নেবে?

কাবার দিকে তাকিয়ে মনে করুন একদিন আমি পৃথিবীতে ছিলাম না। একদিন আমি পৃথিবী থেকেও চলে যাব। একদিন আমার ঘর থাকবে, আমার পরিবার থাকবে, আমার সম্পদ থাকবে, আমার পরিচয় থাকবে, কিন্তু আমি থাকব না।

সেদিন আমার সাথে থাকবে না কোনো পদবি, কোনো সম্মান, কোনো সম্পদ। সাথে থাকবে শুধু একটি জিনিস আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্ক। তাই আজ কাবার সামনে বসে বলুন يا الله! আপনি আমাকে আপনার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। এখন আমাকে আপনার সন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছে দিন।

আপনি আমাকে কাবা দেখিয়েছেন। এখন কাবার রবের মারিফাত দান করুন।‌‌ আপনি আমাকে আপনার ঘরের সামনে বসিয়েছেন। এখন কিয়ামতের দিন আপনার আরশের ছায়ায় স্থান দিন।‌ তারপর শেষবারের মতো কাবার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলুন হে কাবা! তুমি পাথরের ঘর, কিন্তু তোমার দিকে তাকিয়ে কোটি কোটি হৃদয় কেঁদেছে। কারণ তোমার মালিক আমার রব। তোমাকে ভালোবাসি বলে নয়,

তোমার রবকে ভালোবাসি বলে তোমাকে ভালোবাসি।

আর আজ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়, আমি সেই রবের বান্দা,

যিনি তোমাকে “بَيْتِي” — আমার ঘর বলে সম্মানিত করেছেন।

কাবার সামনে বসে কাবার দিকে তাকিয়ে থাকুন

*****************************************

তাওয়াফ শেষ হয়েছে। উমরা শেষ হয়েছে। অনেক দোয়া করেছেন। অনেক আমল করেছেন। কিন্তু এখন কিছুক্ষণ সবকিছু ছেড়ে শুধু কাবার দিকে তাকিয়ে থাকুন। কারণ পৃথিবীতে এমন মুহূর্ত বারবার আসে না।

আপনি এখন এমন এক ঘরের সামনে বসে আছেন যাকে আল্লাহ নিজের ঘর বলেছেন।‌ যার দিকে মুখ করে আপনি শৈশব থেকে নামাজ পড়ছেন। যার দিকে ফিরে আপনি জানাজা পড়বেন। যার দিকে মুখ করেই আপনাকে কবরেও শুইয়ে দেওয়া হবে।

তাই আজ কাবার দিকে তাকিয়ে শুধু একটি দোয়া

করুন হে আল্লাহ!‌ এই ঘরের প্রতি আমার অন্তরে সত্যিকারের মুহাব্বত দান করুন। কারণ মুহাব্বত ছাড়া কোনো সম্পর্ক বেঁচে থাকে না।

জ্ঞান মানুষকে পথ দেখায়। কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে পথের উপর টিকিয়ে রাখে। আজ কাবাকে ভালোবাসুন। কাবার পাথরকে নয়। কাবার কাপড়কে নয়। কাবার রবকে ভালোবাসার কারণে কাবাকে ভালোবাসুন। যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কাকে ভালোবাসতেন। যেমন সাহাবায়ে কেরাম ভালোবাসতেন। যেমন বিলাল (রা.) মদিনায় শুয়ে থেকেও মক্কার কথা স্মরণ করে কেঁদে উঠতেন।

কাবার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলুন‌‌ হে আল্লাহ!

আমি জানি না আবার কখন এখানে আসতে পারব।

আবার আদৌ আসতে পারব কি না। কিন্তু আজ আমি আমার হৃদয়ের একটি অংশ এখানে রেখে যাচ্ছি।

আমার শরীর দেশে ফিরে যাবে, কিন্তু আমার হৃদয় যেন বারবার এই ঘরের দিকে ফিরে আসে।”

কিছুক্ষণ কোনো দোয়া নয়। কোনো কথা নয়। শুধু তাকিয়ে থাকুন। হয়তো এই তাকিয়ে থাকাই আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ইবাদত হয়ে যাবে।‌ হয়তো বহু বছর পরে, কোনো এক রাতে আপনি নিজের ঘরে বসে থাকবেন।‌ হঠাৎ কাবার কথা মনে পড়বে। হারামের মেঝের কথা মনে পড়বে।‌তাওয়াফরত মানুষের ঢেউ মনে পড়বে। আর আপনার চোখ ভিজে উঠবে।

সেদিন বুঝবেন আল্লাহ আপনার হৃদয়ে তাঁর ঘরের মুহাব্বত লিখে দিয়েছেন। তাই আজ বিদায়ের আগে কাবার দিকে তাকিয়ে এই অঙ্গীকার করুন হে আল্লাহ!

পৃথিবীর অনেক কিছুকে আমি ভালোবেসেছি। অনেক কিছুর পেছনে আমি ছুটেছি।

কিন্তু আজ আমি চাই, আপনার ঘরের মুহাব্বত,‌ আপনার রাসূলের মুহাব্বত, আপনার দ্বীনের মুহাব্বত, এবং সর্বোপরি আপনার মুহাব্বত আমার হৃদয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে যাক।আর তখন কাবার দিকে তাকিয়ে আপনার হৃদয় থেকে একটি কথাই বের হবে হে আল্লাহ! যদি এটাই আমার শেষ সফর হয়,

তাহলে আমাকে এমন হৃদয় দিয়ে ফিরিয়ে দিন,

যে হৃদয় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনার ঘরকে ভুলতে না পারে।

Scroll to Top