নিজের পায়ে দাঁড়াও- আল্লাহর সাহায্য নিকটে

আজকের তরুণদের একটি বড় সংকট নিজের ব্যর্থতার দায় অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা। কেউ বলে‌ আমার চাচা চাইলে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে পারতেন। কেউ আক্ষেপ করে অমুক বড় ভাই আমার জন্য কিছু করলেন না।

কেউ মনে করে, আত্মীয়রা সহযোগিতা করলে আজ আমি অনেক দূর এগিয়ে যেতাম। আবার কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমি আমার ওস্তাদের জন্য এত কিছু করলাম, অথচ তিনি আমাকে এগিয়ে দিলেন না।

কিন্তু একজন মুমিনের ভাষা কি এমন হতে পারে?

মুমিন জানে, মানুষের সাহায্য অনুগ্রহ; অধিকার নয়।

মানুষ পাশে দাঁড়ালে আলহামদুলিল্লাহ, না দাঁড়ালে জীবন থেমে থাকে না। কারণ সে জানে, তার রিযিক মানুষের হাতে নয়, তার ভবিষ্যৎও মানুষের ইচ্ছার বন্দী নয়।

◾সত্য কথা হলো তোমার জীবন, তোমার স্বপ্ন, তোমার সংগ্রাম এবং তোমার ভবিষ্যতের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তোমাকেই বহন করতে হবে। সাহাবায়ে কেরামের জীবনের দিকে তাকাও। তারা ঘর ছেড়েছেন, দেশ ছেড়েছেন, পরিবার ছেড়েছেন।‌অনেকে ব্যবসা হারিয়েছেন, সম্পদ হারিয়েছেন, সামাজিক মর্যাদা হারিয়েছেন। ইসলামের জন্য নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা তাদের মাঝে কম ছিল না।

কিন্তু তারা কখনো বসে হিসাব করেননি আমরা কী পেলাম? আমাদের জন্য কে কী করল?‌আমাদের প্রতিষ্ঠিত করবে কে?‌তারা জানতেন, আল্লাহর জন্য যে ত্যাগ করা হয়, তার প্রতিদান মানুষের কাছে চাওয়া হয় না। এর বিনিময় আজ হোক কাল হোক অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসবে।

হিজরতের পর প্রিয় রাসূলের সানহাবীরা মদিনায় এসে অপেক্ষা করেননি। কেউ তাদের হাতে সফলতার চাবি তুলে দেবে এ আশায় বসে থাকেননি। তারা উঠে দাঁড়িয়েছেন। বাজারে নেমেছেন। পরিশ্রম করেছেন।‌ঘাম ঝরিয়েছেন। ক্ষুধা সহ্য করেছেন।‌ আর সর্বোপরি আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন।

◾আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর ঘটনাটি আজও ইতিহাসের বুকে আত্মমর্যাদার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।‌ মদিনায় পৌঁছে যখন তিনি প্রায় নিঃস্ব, তখন একজন আনসার সাহাবী ভালোবাসা থেকে বললেন, আমার সম্পদের অর্ধেক নিয়ে নিন।‌ প্রিয় রাসূলের সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আঊফ চাইলে তা গ্রহণ করতে পারতেন।

কিন্তু তাঁর উত্তর ছিল আমাকে শুধু বাজারের পথ দেখিয়ে দিন।‌ কত সংক্ষিপ্ত একটি বাক্য!‌ কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা, তাওয়াক্কুল এবং কর্মস্পৃহায় ভরা একটি বিশ্ব।

◾আজ আমরা সুযোগ খুঁজি।‌ তিনি পথ খুঁজেছিলেন।

আজ আমরা সহায়তার অপেক্ষা করি। তিনি কাজের সুযোগ খুঁজেছিলেন। আজ আমরা অভিযোগ করি।

তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

জীবনের একটি কঠিন সত্য হলো—যারা সারাক্ষণ অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারা খুব কমই বড় হতে পারে।‌ কারণ তারা নিজেদের শক্তিকে চিনতে শেখে না।

আল্লাহ তাদের যে মেধা, সামর্থ্য ও সম্ভাবনা দিয়েছেন, তা কাজে লাগাতে পারে না।

তারা শুধু অপেক্ষা করে‌ কে আমাকে সাহায্য করবে? কে আমাকে তুলে দেবে? কে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করবে? আর অপেক্ষা করতে করতে জীবনের বহু মূল্যবান বছর হারিয়ে ফেলে।

◾ইতিহাসের পাতা খুলে দেখুন।‌ বড় বড় পরিবর্তন এনেছেন তারাই, যাদের পেছনে কোনো ক্ষমতাবান মানুষ ছিল না; ছিল শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং আল্লাহর উপর অটল ভরসা।

মনে রাখবেন, আল্লাহর সাহায্য অভিযোগকারীদের জন্য নয়। আল্লাহর সাহায্য তাদের জন্য, যারা চেষ্টা করে। যারা পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। যারা ব্যর্থতার ধুলো ঝেড়ে নতুন করে পথচলা শুরু করে।

যারা শত বাধার মাঝেও আশা হারায় না।‌ যারা মানুষের দরজার চেয়ে আল্লাহর দরজায় বেশি কড়া নাড়ে।

তোমার চাচা তোমাকে সাহায্য করতে পারেন।‌ তোমার বাবা তোমার জন্য পথ সহজ করতে পারেন।‌ তোমার ওস্তাদ তোমাকে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।‌ তোমার বড় ভাই তোমার হাত ধরতে পারেন।

কিন্তু তোমার হয়ে কেউ স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না।তোমার হয়ে কেউ সংগ্রাম করবে না।‌ তোমার হয়ে কেউ ঘাম ঝরাবে না।‌ একদিন তোমাকেই উঠে দাঁড়াতে হবে।তাই অভিযোগের খাতা বন্ধ করো। অভিমানের বোঝা নামিয়ে রাখো। মানুষের দিকে তাকানো কমাও, আল্লাহর দিকে তাকানো বাড়াও।

নিজের ভেতরের শক্তিকে আবিষ্কার করো। ছোট থেকে শুরু করো। হালাল পথে শুরু করো। কিন্তু শুরু করো।কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে যারা স্মরণীয় হয়ে আছে, তারা অন্যের অপেক্ষায় বসে থাকেনি।

সাহাবায়ে কেরামের জীবন আজও সাক্ষ্য দেয়‌ যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে উঠে দাঁড়ায়, আল্লাহ তাকে এমন মর্যাদা দান করেন, যা মানুষের হৃদয়ে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে।

অন্যের কাঁধে ভর করে নয়, নিজের পায়ে দাঁড়াও

*****************************************

◾যে ব্যক্তি সব সময় অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, সে কখনো দূর পর্যন্ত এগোতে পারে না। কারণ তার দৃষ্টি লক্ষ্যপানে নয়, মানুষের পানে নিবদ্ধ থাকে। সে সুযোগ সৃষ্টি করতে শেখে না; বরং সাহায্যের অপেক্ষায় থাকে। সে নিজের জন্য পথ নির্মাণ করে না; বরং আশা করে কেউ এসে তার জন্য পথ তৈরি করে দেবে।

সে স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যে ত্যাগ, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় দরকার, তার মূল্য দিতে চায় না। ফলে স্বপ্নগুলো স্বপ্নই থেকে যায়; বাস্তবতার মাটিতে তাদের কোনো ভিত্তি তৈরি হয় না।

কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। পৃথিবীর সফল মানুষেরা অপেক্ষা করে বড় হয়নি। তারা প্রতিকূলতার সামনে মাথা নত করেনি। তারা হোঁচট খেয়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে, আবার নতুন উদ্যমে চেষ্টা করেছে। দরজা বন্ধ হয়েছে, তারা নতুন দরজা খুঁজে নিয়েছে। পথ না পেলে তারা নিজেরাই পথ তৈরি করেছে।

◾জীবনের বাস্তবতা হলো—কেউ তোমার ভাগ্য গড়ে দিতে পারবে না। মানুষ সহযোগিতা করতে পারে, পরামর্শ দিতে পারে, উৎসাহ দিতে পারে; কিন্তু তোমার হয়ে পরিশ্রম করতে পারবে না। তোমার স্বপ্নের বোঝা শেষ পর্যন্ত তোমাকেই বহন করতে হবে।

তাই অভিযোগ নয়, উদ্যোগ নাও। অজুহাত নয়, কর্মে নেমে পড়ো। অন্যের কাঁধে ভর করে চলার মানসিকতা ত্যাগ করো। নিজের সামর্থ্যের উপর আস্থা রাখো, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করো, এবং দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলো। মনে রেখো, যারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে, তারাই একদিন অন্যদের দাঁড়ানোর শক্তি হয়ে ওঠে।

আল্লাহর উপর ভরসা মানে উদ্যোগ গ্রহণ

*********************************”

◾অনেকে তাওয়াক্কুলকে ভুলভাবে বোঝে। তারা মনে করে আল্লাহ চাইলে হবে। কথাটি সত্য, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মানুষ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে। আল্লাহ অবশ্যই চাইলে সবকিছু করতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ চান তুমি চেষ্টা করো। তিনি চান তুমি ঘর থেকে বের হয়ে জীবনের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করো। তিনি চান তুমি পরিশ্রম করো, ঘাম ঝরাও, সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করো। তারপর ফলাফল তাঁর হাতে সোপর্দ করে দাও। এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

রাসূল ﷺ তাওয়াক্কুলের একটি অসাধারণ উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথার্থ তাওয়াক্কুল করতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে এমনভাবে রিযিক দিতেন যেমন পাখিকে রিযিক দেন। পাখি সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেট ভরে ফিরে আসে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো—পাখি সারাদিন বাসায় বসে থাকে না। সে খাদ্যের সন্ধানে উড়ে বেড়ায়, চেষ্টা করে, তারপর আল্লাহ তাকে রিযিক দান করেন।

জীবনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। যারা উঠে দাঁড়ায়, আল্লাহ তাদের জন্য পথ সহজ করেন। যারা চলতে শুরু করে, আল্লাহ তাদের সামনে নতুন দরজা খুলে দেন। কারণ আল্লাহর একটি অটল সুন্নাহ হলো—মানুষ নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করলে আল্লাহ তার অবস্থার পরিবর্তনের ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ﴾

“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।”

— (সূরা আর-রা‘দ: ১১)

তাই অপেক্ষা নয়, উদ্যোগ গ্রহণ করো। অজুহাত নয়, কর্মে নেমে পড়ো। যে যুবক আজ একটি ছোট কাজকে তুচ্ছ মনে করে বসে আছে, সে হয়তো আরও দশ বছর সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে। আর যে যুবক আজ ছোট একটি কাজ দিয়ে শুরু করছে, অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, দক্ষতা তৈরি করছে, সে হয়তো আগামী দশ বছরে দশজন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।

মনে রেখো, বড় অর্জনের শুরুটা প্রায়ই ছোট পদক্ষেপ থেকেই হয়। যারা ছোট কাজকে সম্মান করতে শেখে, তারাই একদিন বড় দায়িত্ব বহন করার যোগ্যতা অর্জন করে।

প্রতিষ্ঠা উপহার নয়, অর্জন

*************************

◾আজ সমাজে একটি বিপজ্জনক মানসিকতা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে কেউ আমাকে প্রতিষ্ঠিত করে দিক।কেউ চায় পরিবারের কেউ তাকে প্রতিষ্ঠিত করে দিক, কেউ চায় কোনো আত্মীয়, কোনো বড় ভাই বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি তার ভাগ্য বদলে দিক।

কিন্তু জীবনের বাস্তবতা হলো—প্রতিষ্ঠা উপহার নয়, প্রতিষ্ঠা উত্তরাধিকারও নয়; প্রতিষ্ঠা হলো অর্জন।প্রতিষ্ঠা সংগ্রামের নাম। প্রতিষ্ঠা পরিশ্রমের নাম। প্রতিষ্ঠা ঘাম ঝরানোর নাম। প্রতিষ্ঠা রাতের পর রাত জেগে থাকার নাম। প্রতিষ্ঠা শত ব্যর্থতার পর আবার নতুন উদ্যমে শুরু করার নাম।

যারা আজ সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন, তারা কারও দয়ার দান নিয়ে সেখানে পৌঁছাননি। তারা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়েছেন, কষ্টকে সঙ্গী করেছেন, বাধাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাই তাদের অর্জনের মূল্য আছে, মর্যাদা আছে, স্থায়িত্ব আছে।

◾তোমার বাবা তোমাকে পথ দেখাতে পারেন। তোমার শিক্ষক তোমাকে জ্ঞান দিতে পারেন। তোমার আত্মীয় স্বজন তোমাকে সহযোগিতা করতে পারেন। তোমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা তোমাকে উৎসাহ দিতে পারেন। কিন্তু তোমার হয়ে কেউ হাঁটতে পারবে না। তোমার হয়ে কেউ পরিশ্রম করতে পারবে না। তোমার হয়ে কেউ কষ্ট সহ্য করতে পারবে না। তোমার হয়ে কেউ তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না।

জীবনের এক পর্যায়ে প্রত্যেক মানুষকেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়। কারণ যে গাছ নিজের শিকড়ের উপর দাঁড়াতে শেখে না, সে ঝড়ের সামনে টিকে থাকতে পারে না। তাই অভিযোগের ভাষা ছেড়ে দাও। অভিমানের বোঝা নামিয়ে রাখো। অপেক্ষার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসো।

আজ থেকেই শুরু করো। ছোট কাজ দিয়ে শুরু করো। সামান্য সুযোগ দিয়ে শুরু করো। ধীরগতিতে হলেও এগিয়ে চলো। কারণ হাজার মাইলের যাত্রাও শুরু হয় একটি ছোট পদক্ষেপ থেকে।

মনে রেখো, আল্লাহর সাহায্য তাদের জন্য আসে যারা তাঁর উপর ভরসা করে এগিয়ে যায়। যারা চেষ্টা করে, আল্লাহ তাদের চেষ্টা কবুল করেন। যারা দরজায় কড়া নাড়ে, আল্লাহ তাদের জন্য দরজা খুলে দেন। যারা পথে নামে, আল্লাহ তাদের জন্য পথ সহজ করে দেন।

আর যারা শুধু অপেক্ষা করে, অভিযোগ করে, অজুহাত খোঁজে—তারা প্রায়ই অপেক্ষার মধ্যেই জীবন কাটিয়ে দেয়।

তাই অন্যের কাঁধে ভর করে নয়, নিজের পায়ে দাঁড়াও। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করো, নিজের শক্তিকে কাজে লাগাও, এবং দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলো। ইনশাআল্লাহ, একদিন তুমিও এমন জায়গায় পৌঁছাবে, যেখানে মানুষ তোমার কাছে সহযোগিতা চাইবে।

এই আলোচনার শেষের জন্য একটি স্মরণীয় বাক্য হতে পারে মানুষের দয়ার অপেক্ষায় থেকো না; আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজের সামর্থ্যকে জাগিয়ে তোলো। কেহ তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করে দিবে না। চেষ্টা চালিয়ে যাও। আল্লাহর সাহায্য তোমার খুবই নিকটে।

Scroll to Top