ইলমের আগে আদব প্রয়োজন

বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় সংকট আজ আমরা শিখছি কীভাবে বিতর্ক করতে হয়। কীভাবে প্রতিপক্ষকে হারাতে হয়। কীভাবে জবাব দিতে হয়।

কিন্তু শিখছি না কীভাবে ভুল স্বীকার করতে হয়। কীভাবে উস্তাদদের সম্মান করতে হয়। কীভাবে ভিন্নমতের মানুষকে মর্যাদা দিতে হয়।

ফলে জ্ঞান বাড়ছে, কিন্তু বিনয় বাড়ছে না। বক্তৃতা বাড়ছে, কিন্তু আমল বাড়ছে না। তথ্য বাড়ছে, কিন্তু নূর বাড়ছে না।

◾আজ যা হারিয়ে যাওয়ার কারণে শুধু ব্যক্তি নয়, পরিবার, মাদরাসা, সমাজ, এমনকি উম্মাহও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তা হলো ইলমের আগে আদব।

আজ মানুষ ইলম খুঁজছে, কিন্তু আদব খুঁজছে না। সনদ খুঁজছে, কিন্তু চরিত্র খুঁজছে না।‌ বক্তা হতে চায়, কিন্তু মানুষ হতে চায় না। ফলে জ্ঞান বাড়ছে, কিন্তু হেদায়েত বাড়ছে না।

সালাফরা বলতেন:

الأدب قبل العلم

“ইলমের আগে আদব।”

◾আদব কী?

অনেকে মনে করেন আদব মানে শুধু ভদ্রতা। আদব মূলত একটি ব্যাপক বিষয়। এখানে রয়েছে আল্লাহর সামনে আদব, রাসূল ﷺ-এর সামনে আদব, কুরআনের সামনে আদব, উস্তাদের সামনে আদব, পিতা-মাতার সামনে আদব, মানুষের সাথে আদব, নিজের নফসের সাথে আদব। সংক্ষেপে, যথাস্থানে যথাযথ আচরণের নাম আদব।

◾কুরআনে আদবের শিক্ষা

১. আল্লাহর সামনে আদব

আল্লাহ বলেন “তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আগে অগ্রসর হয়ো না।” (সূরা হুজুরাত: ১)

এ আয়াতের শিক্ষা নিজের মতামতকে ওহীর উপরে স্থান দেওয়া যাবে না। এটা আল্লাহর হুকুমের প্রতি আদব।

২. রাসূল ﷺ-এর সামনে আদব

সূরা হুজুরাতে আল্লাহ বলেছেন:

“তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না।” কেন? কারণ বেয়াদবি আমল নষ্ট করে দিতে পারে। আদব হল রাসুলের মতামত জানার পর তার বিপরীতে নিজের মতামত প্রদান না করা।

৩. পিতা-মাতার সামনে আদব

আল্লাহ বলেন “তাদেরকে উফ পর্যন্ত বলো না।” লক্ষ্য করুন। মারধর করতে নিষেধ করেননি শুধু। “উফ” বলতেও নিষেধ করেছেন। এটা আদবের পরিপন্থী।

◾ প্রিয় রাসূল ﷺ ছিলেন আদবের সর্বোচ্চ নমুনা

রাসূল ﷺ বলেছেন “আমি উত্তম চরিত্র পূর্ণতা দিতে প্রেরিত হয়েছি।”

চিন্তা করুন নবী ﷺ চাইলে বলতে পারতেন “আমি নামাজ শেখাতে এসেছি।‌”আমি জিহাদ শেখাতে এসেছি।” কিন্তু তিনি চরিত্রের কথা বলেছেন। প্রিয় রাসুলের আগমন এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এ পৃথিবীর মানুষদের আদব শিক্ষা দেয়া। তার শিক্ষায় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষগুলো তৈরি হয়েছিল।

◾সালাফদের কাছে আদব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

ইমাম মালেক রহ. তার মা পাগড়ি পরিয়ে বলতেন:

“রাবিয়ার কাছে যাও। আগে তার আদব শিখো, পরে ইলম শিখো।”

আজ মা-বাবারা বলেন “বেশি নাম্বার আনো।” কিন্তু সেই মায়েরা বলতেন “আগে আদব শেখো।” আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক রহ. তিনি বলেন “ত্রিশ বছর আদব শিখেছি, বিশ বছর ইলম শিখেছি।” আরও বলেন:

“আমরা অল্প আদবের বেশি মুখাপেক্ষী, অনেক ইলমের চেয়ে।”

◾কেন আদব আগে?

কারণ আদব ছাড়া ইলম অহংকার সৃষ্টি করে। ইবলিসের ইলেম ছিল। কিন্তু আদব ছিল না। তাই সে ধ্বংস হয়েছে।

কেন আদব আগে এর আরেকটি কারণ আদব ছাড়া ইলম ফিতনা সৃষ্টি করে। আজ অনেকের তথ্য আছে। কিন্তু বিনয় নেই। তাই সামান্য মতভেদ হলেই গালি, অপমান, তাকফির, হেয় প্রতিপন্ন শুরু হয়ে যায়।

এই সমস্যার মূল আদব না থাকা।

◾সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আদবের সংকট

সবচাইতে বেশি। এখানে ছোটরা বড়দের শুধু ভুল ধরে না। অপমান করে ব্যঙ্গ করে।

ভুল ধরিয়ে দেয়া, ভুলের সমালোচনা আর অপমান ব্যঙ্গ করা এক জিনিস নয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বামী স্ত্রীর মনোমালিন্য পারিবারিক দন্দ কেন আসবে। ঘরের সমস্যা ঘরেই সমাধান করা চাই। নিজেদের ঘরের গল্প পৃথিবীকে বলে ফায়দা নেই।

◾আদবের ফল. ইলমে বরকত, দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, মানুষের ভালোবাসা, আল্লাহর নৈকট্য, সুন্দর মৃত্যু।

◾কিয়ামতের দিন আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন না তুমি কত বিতর্ক জিতেছ? জিজ্ঞাসা করবেন না তুমি কত পোস্ট লিখেছ? জিজ্ঞাসা করবেন না তুমি কতজনকে হারিয়েছ?

জিজ্ঞাসা করবেন তুমি কেমন মানুষ ছিলে? তোমার চরিত্র কেমন ছিল? তোমার আদব কেমন ছিল?

◾ইলম তোমাকে আলেম বানাতে পারে। কিন্তু আদব তোমাকে মানুষ বানায়। ইলম তোমাকে মিম্বারে উঠাতে পারে। কিন্তু আদব তোমাকে মানুষের হৃদয়ে বসায়।

ইলম তোমাকে পরিচিত করে। কিন্তু আদব তোমাকে প্রিয় করে। তাই সালাফদের কণ্ঠে আজও ধ্বনিত হয়—

“আগে আদব, পরে ইলম।”

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইলমের সাথে আদব, আমল, ইখলাস ও বরকত দান করুন। আমীন।

Scroll to Top