কারবালা: শুধু একটি যুদ্ধ নয়, কারবালা: উম্মতের বিবেকের আর্তনাদ

কারবালা কেবল ইতিহাস নয়। কারবালা একটি প্রশ্ন। কারবালা একটি আয়না। কারবালা একটি কান্না।কারবালা একটি আহ্বান। যে আহ্বান আজও পৃথিবীর

প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে ধ্বনিত হয়।

কারবালা আমাদের শেখায় ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু সত্য চিরস্থায়ী। তলোয়ার জয়ী হতে পারে। কিন্তু তরবারি আদর্শকে হত্যা করতে পারে না।

◾কারবালাকে বুঝতে হলে আগে হুসাইনকে বুঝতে হবে। হযরত হোসাইন কে ছিলেন ? তিনি শুধু আলী (রা.)-এর ছেলে নন। তিনি শুধু ফাতিমা (রা.)-এর সন্তান নন। তিনি শুধু একজন সাহাবী নন।

হযরত হুসাইন ছিলেন সেই শিশু, যাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের কাঁধে বহন করেছেন। তিনি ছিলেন সেই শিশু, যার জন্য রাসূল ﷺ সালাত দীর্ঘ করেছেন। তিনি ছিলেন সেই নূরের ফুল, যার সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেছেন “হাসান ও হুসাইন জান্নাতী যুবকদের নেতা।”

আরেক হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন‌ “হে আল্লাহ! আমি তাদেরকে ভালোবাসি, আপনিও তাদেরকে ভালোবাসুন এবং যে তাদেরকে ভালোবাসে তাকেও ভালোবাসুন।”

যে ব্যক্তিকে ভালোবাসার সাথে রাসূল ﷺ নিজের ভালোবাসাকে যুক্ত করেছেন, তার মর্যাদা কত বড়!

◾ কারবালায় হযরত হুসাইন কেন গিয়েছিলেন। হুসাইন (রা.) কি ক্ষমতার জন্য বা দুনিয়ার লোভে বের হয়েছিলেন? ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মিথ্যাগুলোর একটি হলো হুসাইন (রা.) ক্ষমতার জন্য বের হয়েছিলেন।

যদি আরাম আয়েশের জীবন তার উদ্দেশ্য হতো‌ তাহলে তিনি মক্কায় নিরাপদ থাকতে পারতেন। ইয়াজিদের সাথে সমঝোতা করতে পারতেন। রাজকীয় জীবন কাটাতে পারতেন।

কিন্তু তিনি এমন একটি পথ বেছে নিলেন যার শেষ প্রান্তে তিনি নিজের মৃত্যু দেখতে পাচ্ছিলেন। এটা ক্ষমতার পথ নয়। এটা নীতির পথ। এটা আত্মত্যাগের পথ।

◾সবচেয়ে কষ্টের বিষয়। কারবালার সবচেয়ে কষ্টের বিষয় শত্রুর সংখ্যা নয়। তলোয়ার নয়। বর্শা নয়।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো রাসূল ﷺ-এর দৌহিত্রকে যারা চিঠি লিখেছিল, শেষ পর্যন্ত তারাই তাকে একা ছেড়ে দিয়েছিল। তাকে ডেকে নিয়ে তার সাথে গাদ্দারি করেছিল। আনুগত্যের বাইয়াত করে শপথ ভঙ্গ করেছিল।

ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার অনেক ঘটনা আছে।

কিন্তু কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতা ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়গুলোর একটি।

◾ কারবালার ইতিহাসে কষ্টের বিষয় যেখানে হৃদয় ভেঙে যায় তা হলো ফোরাতের তীরে রাসূল ﷺ-এর পরিবারের শিশুদের পানি দেওয়া হচ্ছে না। ফোরাত নদী প্রবাহিত হচ্ছে।‌ ছোট ছোট শিশুরা পানির পিপাসায় কাঁদছে।‌ নারীরা পিপাসায় কাতর।

শিশুরা বলছে‌ “পানি, পানি।”‌কিন্তু তাদের জন্য পানি নেই। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে ভাষা হারিয়ে ফেলে।

◾হযরত হুসাইন (রা.)-এর জীবনের শেষ রাত

মুহাররমের ৯ তারিখের রাত। ১০ তারিখ যুদ্ধের দিন। আগামীকাল মৃত্যু নিশ্চিত। এই যুদ্ধে বিজয়ের কোন সম্ভাবনা নেই। হুসাইনের তাঁবুতে কী হচ্ছে?

কেউ কাঁদছে না। কেউ পালানোর পরিকল্পনা করছে না। সেখানে কুরআন তিলাওয়াত হচ্ছে। সেখানে তাহাজ্জুদ হচ্ছে। সেখানে দোয়া হচ্ছে। মৃত্যু দরজায় কড়া নাড়ছে। আর তারা আল্লাহর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ছে। এটাই ছিল আহলে বাইতের শিক্ষা।

শাহাদাতের পূর্ব রাতে হুসাইনের আমল।

◾ মোহাররমের ১০ তারিখ। আশুরার দিন। কারবালার প্রান্তরে যুদ্ধ হলো। যুদ্ধের শুরুতেই হযরত হুসাইন (রা.) তাঁর ভাইদের হারালেন। ভাতিজাদের হারালেন। একে একে সব সাথীদের হারালেন। পরিবারের একের পর এক সদস্যকে হারালেন।কিন্তু একটি জিনিস হারাননি। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি হারাননি। তিনি সত্য হারাননি। তিনি মর্যাদা হারাননি।

◾ কারবালার শহীদ হযরত হুসাইন আজও বেঁচে আছেন পৃথিবী জুড়ে কোটি মুসলমানের হৃদয়ে?

আজ পৃথিবীতে কোটি কোটি মুসলমানের সন্তানদের নাম হুসাইন।কোটি মুসলমান আজও হোসাইন এর ব্যথায় কাঁদে। হোসাইন শহীদ পরাজিত নন।

কারণ সত্য কখনো মরে না।‌ কারণ শাহাদাত কখনো পরাজিত হয় না। কারণ রক্ত শুকিয়ে যায়। কিন্তু আদর্শ শুকায় না।‌কারবালায় বাহ্যিকভাবে তলোয়ার জিতেছিল। কিন্তু ইতিহাসে জয়ী হয়েছে হুসাইন।

হযরত হুসাইন এর প্রতি ভালোবাসার অর্থ শুধু কান্না নয়। শুধু শোক নয়। শুধু মিছিল নয়। হুসাইনের প্রতি ভালবাসার অর্থ ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হওয়া। কোন অবস্থাতেই আপোশ নয়। শক্তির কাছে নত হওয়া নয়।

আহলে বাইতকে ভালোবাসা মানে নামাজ ভালোবাসা।কুরআন ভালোবাসা। ত্যাগকে ভালোবাসা। সত্য কে ভালোবাসা। জুলুমকে ঘৃণা করা। মজলুমকে ভালোবাসা।

◾সাহাবাদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান

কারবালার আলোচনা করতে গিয়ে আমরা কখনো সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করব না। উম্মতের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবায়ে কেরাম। আমরা সকল সাহাবাকে সম্মান করি।

আমরা আহলে বাইতকেও সম্মান করি। আমরা কাউকে গালি দিই না। কাউকে অপমান করি না।

আহলুস সুন্নাহর পথ এটাই। একবার চোখ বন্ধ করুন।

মদিনার সেই ঘরটি কল্পনা করুন।‌ প্রিয় রাসূল ﷺ হাসছেন, কোলে ছোট্ট হুসাইন। রাসূল ﷺ তাকে চুমু দিচ্ছেন।বুকে জড়িয়ে ধরছেন। তার জন্য দোয়া করছেন। তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছেন।

তারপর কল্পনা করুন কয়েক দশক পর সেই শিশুটি কারবালার প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে শত্রু।

পরিবার তৃষ্ণার্ত। সাথীরা সব শহীদ। তবুও তার কণ্ঠে আল্লাহর স্মরণ। তবুও তার মাথা নত নয়।

তখন বুঝতে পারবেন‌ কারবালা শুধু একটি যুদ্ধ নয়।

কারবালা হলো রাসূল ﷺ-এর পরিবারের পক্ষ থেকে উম্মতের জন্য লেখা এক রক্তাক্ত নসিহত। প্রিয় রাসূলের আদরের হুসাইন রক্ত দিয়ে আমাদের আহবান করে গেল এই দ্বীনের হেফাজতের জন্য যুগে যুগে আমাদের দিতে হবে রক্ত।

তাই আজ আমরা দোয়া করি-

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি সম্মান দান করুন। হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আহলে বাইতের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন

হে আল্লাহ! আমাদেরকে জালিমের বিরুদ্ধে সত্য বলার সাহস দিন।‌ হে আল্লাহ! হুসাইন (রা.)-এর ত্যাগ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দিন। হে আল্লাহ! কিয়ামতের দিন আমাদেরকে রাসূল ﷺ, তাঁর সাহাবাগণ এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের সান্নিধ্যে একত্রিত করুন। আমীন

Scroll to Top