পবিত্র রমজানের ১৮তম তারাবিহ। ২১তম পারা

পবিত্র রমজানের ১৮তম তারাবিহ। ২১তম পারা — ঈমান, রাষ্ট্রনৈতিক নৈতিকতা ও সামাজিক সংস্কারের কুরআনিক দিকনির্দেশনা। আজকের তারাবিহতে তেলাওয়াত করা হবে—সূরা আনকাবুত (শেষাংশ),সূরা রূম,সূরা লুকমান, সূরা সাজদাহ,‌সূরা আহযাব (প্রথমাংশ) এই পারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ব্যক্তিগত ঈমান, পরিবার গঠন, রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিকতা, ইতিহাসের শিক্ষা এবং আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন একত্রে আলোচনা করা হয়েছে।

🔴 সূরা আনকাবুতের শেষাংশ

দুর্বল ভরসার উপমা

আয়াত:

وَمَثَلُ ٱلَّذِینَ ٱتَّخَذُوا۟ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَوۡلِیَاۤءَ كَمَثَلِ ٱلۡعَنكَبُوتِ ٱتَّخَذَتۡ بَیۡتࣰاۖ وَإِنَّ أَوۡهَنَ ٱلۡبُیُوتِ لَبَیۡتُ ٱلۡعَنكَبُوتِ

তরজমা:

“যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যকে অভিভাবক বানায় তাদের উদাহরণ মাকড়সার মতো—সে একটি ঘর বানায়, অথচ ঘরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর।” (২৯:৪১)

◾এই আয়াতের শিক্ষা

আল্লাহ ছাড়া অন্য শক্তির উপর নির্ভর করা মাকড়সার জালের মতো দুর্বল। বিশ্ব রাজনীতিতে বড় শক্তি গুলোর উপর নির্ভরশীলতা অনেক সময় ভঙ্গুর।

বর্তমান বাস্তবতার শিক্ষা মধ্যপ্রাচ্যে আমরা দেখি

বড় শক্তির জোট, সামরিক চুক্তি, অস্ত্রশক্তি—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও সমাজে শান্তি নেই।

কুরআনের শিক্ষা: আল্লাহর উপর ভরসা ছাড়া কোনো শক্তি স্থায়ী নয়।

🔴 সূরা রূম

ইতিহাসের উত্থান-পতনের শিক্ষা

আয়াত:

غُلِبَتِ ٱلرُّومُ • فِیۤ أَدۡنَى ٱلۡأَرۡضِ وَهُم مِّنۢ بَعۡدِ غَلَبِهِمۡ سَیَغۡلِبُونَ

তরজমা:

“রোমানরা পরাজিত হয়েছে, কিন্তু তারা অচিরেই বিজয়ী হবে।” (৩০:২-৩)

এই আয়াতের শিক্ষা ইতিহাসে শক্তির পালাবদল হয়।

কোনো সাম্রাজ্য চিরস্থায়ী নয়।

বিশ্ব পরিস্থিতির আলোকে আজকের বিশ্বে যে শক্তিগুলো নিজেদের অপ্রতিরোধ্য মনে করে কুরআন বলছে: ক্ষমতার চক্র পরিবর্তন হয়।

◾আল্লাহর নিদর্শন

আয়াত:

وَمِنۡ ءَایَـٰتِهِۦۤ أَنۡ خَلَقَ لَكُم مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ أَزۡوَ ٰ⁠جࣰا لِّتَسۡكُنُوۤا۟ إِلَیۡهَا

তরজমা:

“তাঁর নিদর্শনের মধ্যে একটি হলো—তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও।” (৩০:২১)

এই আয়াতের শিক্ষা পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি।পরিবার ধ্বংস হলে সমাজ ধ্বংস হয়।

🔴 সূরা লুকমান

সন্তান শিক্ষার আদর্শ

লুকমান (আ.) তার সন্তানকে যেসব নসিহত করেন তা আজও মানবতার জন্য দিকনির্দেশনা।

◾তাওহীদের শিক্ষা

আয়াত:

یَـٰبُنَیَّ لَا تُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ

তরজমা:

“হে আমার সন্তান! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না।” (৩১:১৩)

এই আয়াতের শিক্ষা সন্তানের প্রথম শিক্ষা হওয়া উচিত তাওহীদ।

◾নামাজ প্রতিষ্ঠা

আয়াত:

یَـٰبُنَیَّ أَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ

তরজমা:

“হে আমার সন্তান! নামাজ প্রতিষ্ঠা করো।” (৩১:১৭)

এই আয়াতের শিক্ষা নামাজ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, এটি সমাজ সংস্কারের শক্তি।

◾অহংকারের বিরুদ্ধে সতর্কতা

আয়াত:

وَلَا تَمۡشِ فِی ٱلۡأَرۡضِ مَرَحًا

তরজমা:

“পৃথিবীতে অহংকার করে চলাফেরা করো না।” (৩১:১৮)

এই আয়াতের শিক্ষা অহংকার ব্যক্তি ও জাতি উভয়কে ধ্বংস করে।

🔴 সূরা সাজদাহ

◾আখিরাতের জবাবদিহিতা

আয়াত:

أَفَمَن كَانَ مُؤۡمِنࣰا كَمَن كَانَ فَاسِقࣰا لَّا یَسۡتَوُۥنَ

তরজমা:

“মুমিন আর ফাসেক কি সমান হতে পারে? তারা কখনো সমান নয়।” (৩২:১৮)

এই আয়াতের শিক্ষা নৈতিকতা ও ঈমানের ভিত্তিতে মানুষ আলাদা। আজকের সমাজে সততা ও দুর্নীতিকে এক করে দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

কুরআন বলছে—সৎ ও অসৎ কখনো সমান নয়।

🔴 সূরা আহযাবের প্রথমাংশ

◾রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের নৈতিকতা

এই সূরায় রাসূল ﷺ-এর নেতৃত্ব এবং মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো আলোচনা করা হয়েছে।

◾নেতৃত্বের মূলনীতি

আয়াত:

یَـٰۤأَیُّهَا ٱلنَّبِیُّ ٱتَّقِ ٱللَّهَ وَلَا تُطِعِ ٱلۡكَـٰفِرِینَ وَٱلۡمُنَـٰفِقِینَ

তরজমা:

“হে নবী! আল্লাহকে ভয় করো এবং কাফের ও মুনাফিকদের অনুসরণ করো না।” (৩৩:১)

এই আয়াতের শিক্ষা নেতৃত্বের ভিত্তি হলো তাকওয়া।

সত্যের বিরুদ্ধে আপস করা যাবে না।

◾রাসূল ﷺ-এর মর্যাদা

আয়াত:

ٱلنَّبِیُّ أَوۡلَىٰ بِٱلۡمُؤۡمِنِینَ مِنۡ أَنفُسِهِمۡ

তরজমা:

“নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের থেকেও অধিক অধিকারী।” (৩৩:৬)

শিক্ষা রাসূল ﷺ-এর আদর্শই মুসলিম সমাজের পথনির্দেশ।

🔴 বর্তমান বিশ্বের জন্য কুরআনের আহ্বান

শক্তির অহংকার ভেঙে পড়ে

সূরা রূম শেখায়—ক্ষমতার চক্র পরিবর্তিত হয়।

দুর্বল জোট স্থায়ী নয়

সূরা আনকাবুত শেখায়— মাকড়সার জালের মতো জোট টেকে না।

পরিবার ও নৈতিকতা রক্ষা করতে হবে

সূরা লুকমান শেখায়— সন্তানদের ঈমানী শিক্ষা দিতে হবে।

নৈতিকতা ছাড়া রাষ্ট্র টেকে না

সূরা সাজদাহ বলছে—মুমিন ও ফাসেক এক নয়।

নেতৃত্বে তাকওয়া দরকার

সূরা আহযাব বলছে—নেতৃত্বের ভিত্তি আল্লাহভীতি।

🔴 আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য শিক্ষা

বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের জন্য এই পারার কিছু জরুরি আহ্বান—সততার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, পরিবারভিত্তিক ঈমানি শিক্ষা, মসজিদকেন্দ্রিক সমাজ গঠন, ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, কুরআনভিত্তিক জীবন গঠন।

Scroll to Top