বাবরি মসজিদ ধ্বংস- ভারতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, প্রতিবেশী বাংলাদেশে আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ও আজকের বাংলাদেশ

আজ ৬ ডিসেম্বর বাবরী মসজিদের শাহাদাত দিবস। ১৯৯২ সালের এই দিনে ভারতের হিন্দু জনগোষ্ঠী মুসলমানদের কলিজায় আঘাত করে প্রায় ৫ শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে ধ্বংস করে দেয়।

{ وَمَنۡ أَظۡلَمُ مِمَّن مَّنَعَ مَسَـٰجِدَ ٱللَّهِ أَن یُذۡكَرَ فِیهَا ٱسۡمُهُۥ وَسَعَىٰ فِی خَرَابِهَاۤۚ ———– لَهُمۡ فِی ٱلدُّنۡیَا خِزۡیࣱ وَلَهُمۡ فِی ٱلۡـَٔاخِرَةِ عَذَابٌ عَظِیمࣱ

[Surah Al-Baqarah: 114]

{ وَأَنَّ ٱلۡمَسَـٰجِدَ لِلَّهِ }

[Surah Al-Jinn: 18]

বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মূল হোতা বিজিপি নেতা আদভানীর দাবি ছিল, মসজিদের ইমাম যে মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে খুতবা দেন, রামের জন্মস্থান ছিল তারই নীচে। তাদের এই দাবি ছিল ঢাহা মিথ্যা। তারা তা কোথাও প্রমাণ করতে পারেনি।

বাবরি মসজিদকে ভেঙে দিয়ে ভারতীয় হিন্দুগণ মহান আল্লাহর মালিকানায় হাত দিয়েছে। আল্লাহর ঘরে কেউ হাত দিলে প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হয় তাঁর খলিফা রূপে সেই ঘরের হেফাজতে জীবন বাজি রাখা। এ নিয়ে আপোষ করার কোন এখতিয়ার কোন মুসলিম রাজনৈতিক দল বা ওয়াকফ কমিটিরও থাকে না।

মসজিদের ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা হল কোন ভূমিতে যখন মসজিদ নির্মিত হয় তখন সে ভূমির মালিকানা কোন ব্যক্তি, সরকার বা ওয়াক্বফ বোর্ডের থাকে না। প্রতিটি মসজিদই মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের নিজের ঘর। এবং প্রতিটি মসজিদের ইমারত এবং জমির তিনিই একমাত্র মালিক।

আল্লাহর ঘরের ভিটায় আজ মন্দির নির্মাণ হয়েছে। যেই পবিত্র জায়গা একমাত্র আল্লাহর উপাসনার জন্য এখানে গাইরুল্লাহর উপাসনা করা হচ্ছে। কোন মুসলিম এটা মেনে নিতে পারে না। এটা ভারত রাষ্ট্রের ভয়াবহ নাশকতা। ভিন্ন ধর্মের প্রতি এই তাদের আচরণ। এই তাদের কট্টরতা।

ভৌগোলিকভাবে আমরা বাংলাদেশ তিনদিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। এদেশে ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হলে সাথে এ দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। এবং জাতিগতভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে। এ ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা কি?

{ ۞ لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ ٱلنَّاسِ عَدَ ٰ⁠وَةࣰ لِّلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ ٱلۡیَهُودَ وَٱلَّذِینَ أَشۡرَكُوا۟ۖ }

[Surah Al-Māʾidah: 82]

তুমি মানবমন্ডলীর মধ্যে ইয়াহুদী ও মুশরিকদেরকে মুসলিমদের সাথে অধিক শক্রতা পোষণকারী পাবে।

এই আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিন ক্লিয়ার করে দিচ্ছেন মুশরিক সম্প্রদায় মুসলমানদের কখনো বন্ধু হবে না। আল্লাহ যা বলেন সত্য বলেন। আমাদেরকে তার উপর আস্থা রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

আজকের ভারত এক কট্টরপন্থী হিন্দু রাষ্ট্র। ‌সমগ্র ভারতে হিন্দুত্ববাদ এতটাই প্রবল ২০১৪ এবং ২০১৯ সালে নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজিপি)র বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার কারণটি এ নয় যে, দলটি ক্ষমতায় এসে ভারত থেকে দারিদ্র্য দূর করেছে। বরং বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব ভারতে দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে দলটির ব্যর্থতা বিশাল।

ভারতের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ক্ষমতাসীন দল বিজিপির জনপ্রিয়তার মূল কারণ মুসলিম বিদ্বেষ। ভারতীয় হিন্দুদের মাঝে চরম মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টিতে এ দলটিসফল। মুসলিম বিদ্বেষকে পুঁজি করেই মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে বিজেপি ক্ষমতায়। ভারতীয় জনগণ হিন্দুত্ববাদকে সামনে রেখেই নরেন্দ্র মোদিকে বার বার বিজয়ী করছে। বরং নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে ভারতের সেকুলার দলগুলোও হিন্দুত্ববাদে ঝুঁকে পড়েছে।

ভারতের রাজনীতিতে বিজেপির রাজনীতির উত্থান মূলত বাবরি মসজিদের স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের দাবিকে কেন্দ্র করে। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গায় তারাই নেতৃত্বে দান করে। এবং তাদের শাসনামলেই মসজিদের স্থানে রাম মন্দির নির্মিত হয়।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের করে হিন্দুত্ববাদী এ শক্তির পরিকল্পনা শেষ হয়নি। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর হিন্দুবাদীরা আরো বিভিন্ন মুসলিম ঐতিহাসিক নিদর্শন স্থাপনা এবং বিভিন্ন মসজিদ নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। ইতিমধ্যে তারা আজমীর শরীফ আগ্রার তাজমহল দিল্লির কুতুব মিনার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী এ সংগঠনের মূল লক্ষ্য শুধু মসজিদ নির্মূল নয়, বরং ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে মুসলমানদের নির্মূল করা।

নরেন্দ্র মোদী যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী তখন ৩ হাজারের বেশী মুসলিম নর-নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় মুসলিমদের শত শত ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশে আমরা মুসলমানরা যখন মন্দির পাহাড়ার জিম্মাদারী পালন করি ঠিক তার বিপরীত প্রতিবেশী ভারতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তদারকিতে উগ্র হিন্দু জনগোষ্ঠী মুসলমানদের কলিজায় আঘাত করে আল্লাহর ঘর মসজিদ ভেঙে বিলীন করে দেয়।

বাবরি মসজিদ কি মন্দিরের স্থানে ছিল

**********************************

তাদের অন্যায় দাবি বাবরি মসজিদ রামের জন্মস্থানে মন্দিরের ওপর নির্মিত হয়েছিল ভারতীয় আদালতে হিন্দু জনগোষ্ঠী তা প্রমাণ করতে পারেনি। প্রশ্ন হলো, কোথায় এবং কোন বছরে রামের জন্ম -সে বিবরণ কি কোথাও কোন কিতাবে লেখা আছে? বাস্তবতা হলো সেটি কোথাও লেখা নাই। এটা তাদের এক কাল্পনিক দাবি।

রায়ে বিচারকগণ একথা বলতে বাধ্য হয়েছে যে, এ প্রমাণ কোথাও পাওয়া যায়নি যে মসজিদের নীচে মন্দির ছিল। অতীতে এই দাবী ভারতের ইতিহাসে প্রখ্যাত কোন হিন্দু পন্ডিত বা বুদ্ধিজীবী কখনো করেনি।

আদালতে তাদের দাবি প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ এখানে বিরোধ মীমাংসায় মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত দেয়। আর মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলমানদের ৫ একর জায়গা দেয়।

দাবি প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও এই বিচারের মূল লক্ষ্য ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মনবাসনা পূর্ণ করা। বিচারের রায়ে হিন্দু ফ্যাসিস্টদের বিজয়টি তাই বিশাল। ভারতীয় আদালত এখানে ন্যায়বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে। হিন্দুত্ববাদ ভারতে এতটাই শক্তিশালী। না রাষ্ট্রের কাছে ইনসাফ আছে না আদালতের কাছে ইনসাফ আছে।

বাবরি মসজিদের জমির পরিমাণ ছিল ২.৭ একর। প্রশ্ন হলো, এত বড় বিশাল জমির উপর রামের জন্ম হলো এবং সেখানে একটি বিশাল মন্দির নির্মিত ছিল তারপর সে মন্দিরের স্থানে মসজিদ হল ভারতীয় ইতিহাসে তার কি কোন আলোচনা আছে। এরূপ এক বিশাল ঘটনা ভারতীয় ইতিহাস থেকে বিলুপ্ত হয় কি করে?

তাছাড়া বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল ১৫২৮ সালে। ভারতে ইতিহাস লেখার কাজের শুরু তারও বহুশত বছর আগে থেকে। হিন্দুদের দাবী সত্য হলে বাবরি মসজিদ নির্মিত হওয়ার পূ্র্বে সেই স্থানে মন্দির ভাঙ্গার ইতিহাস কোথাও তো থাকার কথা। কিন্তু আদালতে হিন্দুগণ এরূপ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোন প্রমাণই পেশ করতে পারেনি।

আদালতের দায়িত্বটি ছিল, বাবরি মসজিদের ভূমিটি কি আদৌ রামের জন্মভূমি তা নিয়ে নিরপেক্ষ ফয়সালা দেয়া। কিন্তু তারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেনি।

আদালতের বিচারে মসজিদের জন্য ৫ একর জমি দিয়ে মুসলিমদের তুষ্ট করতে চাওয়া হয়েছে। বিচারকদের রায়ে বাবরি মসজিদের ন্যায় ঐতিহাসিক মসজিদের মূল্য যেন ৫ একর জমি। এটা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারের নামে নাশকতা।

বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ

******************************

নিজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে বিগত সময়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদ আমরা দেখতে পেয়েছি। ভারত প্রভাবিত মিডিয়া ও কালচারাল সেন্টারগুলো এদেশে ইসলাম বিদ্বেষ ধর্মীয় অঙ্গনে জঙ্গিবাদের তালাশ ইত্যাদির দ্বারা এদেশে ইসলাম ধ্বংসের সর্বোচ্চ অপতৎপরতা চালিয়েছে। দেশের জাতীয় শিক্ষা সেক্টরে সেকুলারিজম এর নামে সর্বত্র হিন্দুত্ববাদ চাপিয়ে দিয়েছে।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনে ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের দীর্ঘ পরিকল্পনার পরাজয় হয়েছে। ভারতের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে দেশটি এই পরাজয় হজম করতে পারছে না। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী ভারতের একের পর এক পদক্ষেপ সে কথাই বোঝাচ্ছে।

জুলাই পরিবর্তনের পর সর্বপ্রথম তারা এদেশের উপর পানি আগ্রাসন চাপিয়ে দিয়েছে। এদেশের মানুষকে পানি দ্বারা হত্যা করতে চেয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাপারে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা প্রচারণা, সংখ্যালঘু নির্যাতনের অজুহাত, হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাধানোর প্রচেষ্টা, বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানিতে অস্থিরতা সৃষ্টি এমন কিছু নেই যা তারা করছে না। সাধ্যের সবটুকু দ্বারা তারা আজকের বাংলাদেশকে ব্যর্থ করতে চাচ্ছে।

সম্প্রতি এই সপ্তাহে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আগরতলায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনে হামলা করেছে হিন্দুত্ববাদীরা। এটা সভ্যতা বহির্ভূত এক জঙ্গি হামলা । এটা একরকম যুদ্ধ ঘোষণা। বাংলাদেশের হাইকমিশনের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল ভারত সরকারের। কিন্তু এখানে তারা ব্যর্থ।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এক হিন্দুত্ববাদী উগ্র ইসকন নেতা গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা খুন করেছে রাষ্ট্রপক্ষের একজন মুসলিম আইনজীবিকে।

অন্যদিকে ভারতীয় মিডিয়া এবং বিভিন্ন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বাংলাদেশ নিয়ে উত্তেজনামূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সব কিছু দ্বারা একটি বিষয় পরিষ্কার ভারত মূলত আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ দেখতে চায় না। ভারত দেখতে চায় অনুগত তাবেদার বাংলাদেশ।

বিগত দিনগুলোতে ভারত ইচ্ছামত বাংলাদেশের বুকের উপর দিয়ে করিডর নিয়েছে, পদ্মা-তিস্তাসহ সকল নদীর পানি ইচ্ছামত বাঁধ তৈরি করে তুলে নিয়েছে, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরসহ সমুদ্র বন্দরের সুবিধা নিয়েছে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে ভারতীয় পণ্যের বাজারে পরিণত করেছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কৃতিতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মুক্তি কোন পথে

****************

জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশীদের সামনে এখন মাত্র দুটি পথ। এক, ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণ। ভারত সেটিই চায়। ‌দ্বিতীয়টি পথটি হলো মাথা উঁচু করে স্বাধীন ভাবে বাঁচা। আমাদের সিদ্ধান্ত কি হবে এটা ঠিক করে নিতে হবে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আমরা রাসুলুল্লাহর জীবনকে সামনে রাখতে পারি। আজকের বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই চমৎকার দিকনির্দেশনা রয়েছে রাসুলুল্লাহর জীবনে।

আজকের বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত। আল্লাহর রাসূল যখন তার সমস্ত অনুসারীদের নিয়ে মদিনায় হিজরত করলেন এবং মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে তুললেন। মদিনা চতুর্দিক থেকে কাফেরদের দ্বারা অবরুদ্ধ ছিল। মদিনার চতুর্দিকের কাফের শক্তিগুলো মদিনার জনপদকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিল।

তখন রাসূলুল্লাহ এবং মুসলমানদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। এক বেঁচে থাকার জন্য জাহিলিয়াত এর কাছে আত্মসমর্পণ। দ্বিতীয় জীবন বাজি রেখে লড়াই। লড়াইয়ের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত হবে আরবের মাটিতে ইসলাম থাকবে না জাহিলিয়াত থাকবে।

চতুর্দিকের কুফরী শক্তি গুলোর সাথে লড়াই করার জন্য রাসূলুল্লাহর কাছে ছিল না ৫০০ যোদ্ধা। মদিনায় হিজরত করে আসা সহায় সম্বলহীন শত শত মুহাজির এখনো তাদের নিরাপদ আশ্রয় পায়নি। রাসূলুল্লাহর হিজরতের পর চতুর্দিকের কুফরি শক্তিগুলোর বয়কটে মদিনার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। বেঁচে থাকতেই যাদের সংগ্রাম করতে হচ্ছে সেই কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসলো তোমাদের লড়াই করতে হবে। কোন অবস্থাতেই জাহেলিয়াতের কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না।

রাসূলুল্লাহর জীবনকে সামনে রেখে ইসলামের নির্দেশনা পরিষ্কার ভারতের ন্যায় কোন কাফের শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ নিয়ে বাঁচা ইসলামে হারাম। কারণ, কাফির শক্তির কাছে আত্মসমর্পণে অসম্ভব হয় পূর্ণ মুসলিম রূপে বাঁচা এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালন করা।

{ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوۤا۟ إِن تَنصُرُوا۟ ٱللَّهَ یَنصُرۡكُمۡ وَیُثَبِّتۡ أَقۡدَامَكُمۡ (7)

হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় করে দেবেন।

وَٱلَّذِینَ كَفَرُوا۟ فَتَعۡسࣰا لَّهُمۡ وَأَضَلَّ أَعۡمَـٰلَهُمۡ (😎 }

[Surah Muḥammad: 8]

আর যারা কুফরী করে তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংস এবং তিনি তাদের আমলসমূহ ব্যর্থ করে দিয়েছেন।

কোরআনে কারীমের আয়াত পরিষ্কার আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আহবান করেছেন আল্লাহর দিন হেফাজতের জিম্মাদারী পালন করো। দ্বীন প্রতিষ্ঠার মেহনত আল্লাহকে সাহায্য করা। এই পথে তোমরা আল্লাহর সাহায্য পাবে আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তোমাদের কদম দৃঢ় করে দিবেন। আর তোমাদের বিপরীতে কাফেররা ধ্বংস হবে।

ذَ ٰ⁠لِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ مَوۡلَى ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ وَأَنَّ ٱلۡكَـٰفِرِینَ لَا مَوۡلَىٰ لَهُمۡ (11)

[Surah Muḥammad:11]

এটা এজন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক এবং নিশ্চয় কাফিরদের কোন অভিভাবক নেই।

ইসলামে অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কাফের শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জিহাদ। নবীজির এমন কোন সাহাবী ছিলেন না যিনি জিহাদে অংশ নেননি। বরং সত্য হলো, শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ সাহাবা মদিনার ইসলামে রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সুরক্ষার জিহাদে শহীদ হয়ে গেছেন।

বুঝতে হবে, পবিত্র কুর’আনে যেমন নামাজ-রোজা ও হজ্ব-যাকাতের হুকুম এসেছে, তেমনি হুকুম এসেছে সশস্ত্র জিহাদের হুকুম । যেমন নিসার ৭৪ ও ৭৫ নম্বর আয়াতে ঘোষিত নির্দেশ হলো:

۞ فَلْيُقَـٰتِلْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ ٱلَّذِينَ يَشْرُونَ ٱلْحَيَوٰةَ ٱلدُّنْيَا بِٱلْـَٔاخِرَةِ ۚ وَمَن يُقَـٰتِلْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًۭا ٧٤

“অতঃপর যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে আল্লাহর কাছে বিক্রয় করেছে তারা যেন অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে অতঃপর নিহত হয় বা বিজয়ী হয়, অচিরেই তাকে দেব মহা পুরস্কার।

{ وَدَّ ٱلَّذِینَ كَفَرُوا۟ لَوۡ تَغۡفُلُونَ عَنۡ أَسۡلِحَتِكُمۡ وَأَمۡتِعَتِكُمۡ فَیَمِیلُونَ عَلَیۡكُم مَّیۡلَةࣰ وَ ٰ⁠حِدَةࣰۚ }

[Surah An-Nisāʾ: 102]

কাফিররা কামনা করে যদি তোমরা তোমাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও আসবাব-পত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও তাহলে তারা তোমাদের উপর একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

নবীজী (সা‍:)’র যুগে প্রতিটি মুসলিমদের মাঝে দেখা গেছে জিহাদের প্রস্তুতি। হে প্রস্তুতি ছিল এমনকি মহান নবীজী (সা‍:)’রও। নবীজী (সা‍:)’র ইন্তেকালের পর তাঁর ঘরে কোন সম্পদ পাওয়া যায়নি; কিন্তু পাওয়া গেছে অনেকগুলি তরবারি, বর্ম ইত্যাদি অস্ত্র। এরূপ অস্ত্র ছিল প্রতিটি সাহাবীর ঘরেও।

দায়িত্ব প্রতিটি মুসলিমের

মুসলিম দেশের প্রতিরক্ষার দায়িত্বটি শুধু সেনাবাহিনীর বেতনভূক সৈনিকের নয়। প্রশাসনেরও নয়। নামাজ-রোজা যেমন প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ, তেমনি প্রত্যেকের উপর ফরজ হলো দেশরক্ষার দায়িত্ব।

দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও ইসলাম রক্ষায় দেশের প্রতিটি জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। ‌ মুসলিম ভন্ডের প্রতি যখন কোন ভিন জাতি কুদৃষ্টি দেয় তখন প্রকৃত মুসলমান দেশ রক্ষায় সোলজারে পরিণত হয়। একজন মুসলমান মানেই সৈনিক। তার মাঝে কাপুরুষতা বা ভীতি নেই।

আমরা যদি আত্মসমর্পণ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই দাসত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই তাহলে লড়াই নেই। ‌ কিন্তু আছে অপমান অপদস্থতা দুনিয়াতে ও আখেরাতে। আর আমরা যদি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে চাই তাহলে আছে সম্মান ও মর্যাদা দুনিয়াতেও আখেরাতে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্বাধীনতা না অধীনতা।

রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। রক্ত দিয়েই স্বাধীনতা সুরক্ষা করতে হবে। রক্ত দিয়েই স্বাধীনতা বাঁচাতে হয়। একটি গাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচে না ঠিক তেমনি রক্ত ছাড়া স্বাধীনতা বাঁচে না। আমাদের আল্লাহও আমাদের কাছ থেকে রক্ত চান।

আল্লাহর এ ক্ষমতা আছে ইসলাম বিরোধী শক্তি গুলোকে তিনি মিশিয়ে দেবেন মাটির সাথে। কিন্তু তিনি আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের সাথে মোকাবেলা করতে। তিনি আমাদের ভালোবাসা দেখতে চান। আমরা জীবনকে বেশি ভালোবাসি না আল্লাহকে বেশি ভালোবাসি। এজন্যই তিনি হুকুম দিয়েছেন।

{ وَلَوۡ یَشَاۤءُ ٱللَّهُ لَٱنتَصَرَ مِنۡهُمۡ وَلَـٰكِن لِّیَبۡلُوَا۟ بَعۡضَكُم بِبَعۡضࣲۗ وَٱلَّذِینَ قُتِلُوا۟ فِی سَبِیلِ ٱللَّهِ فَلَن یُضِلَّ أَعۡمَـٰلَهُمۡ }

[Surah Muḥammad: 4]

আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না।

{ قَـٰتِلُوهُمۡ یُعَذِّبۡهُمُ ٱللَّهُ بِأَیۡدِیكُمۡ وَیُخۡزِهِمۡ وَیَنصُرۡكُمۡ عَلَیۡهِمۡ وَیَشۡفِ صُدُورَ قَوۡمࣲ مُّؤۡمِنِینَ (14)

তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, আল্লাহ তোমাদের হাতে তাদেরকে আযাব দেবেন এবং তাদেরকে অপদস্থ করবেন, আর তোমাদেরকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন এবং মুমিন কওমের অন্তরসমূহকে চিন্তামুক্ত করবেন।

অবিশ্বাসীরা পরাজিত হবে। আল্লাহ সাহায্যে বিশ্বাসীদেরই বিজয় হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। আজকের এ পরিস্থিতি আমাদের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে হবে। আমরা যদি লড়াই করি হয়তো ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে নয়তো আমরা শাহাদাতের সৌভাগ্য লাভ করবো। আর আজ যদি ভীরুতা আমরা বিরত অবলম্বন করি তাহলে আমাদের জন্য ঈমানের পরাজয় জীবনের পরাজয়।

তাই আসুন আজকের ৬ ডিসেম্বর আমাদের শপথ বাবরি মসজিদ আবার আমরা নির্মাণ করব ইনশাল্লাহ যেখানে ছিল সেখানেই। আমরা যদি সক্ষম না হই আমাদের সন্তানরা আমাদের জিম্মাদারি পালন করবে।

আসুন আজ দেশ রক্ষায় শপথ করি অধীনতা নয় স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচবো। গোলামি দাসত্বের জীবন চাইনা। ইসলামের শিক্ষায় জুলুম অবিচারের ময়লা আবর্জনা মুক্তের সোনার বাংলাদেশ গড়বো।

সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ইসলাম মুসলমান সবসময় সচেতন। ইসলাম সকল পরিস্থিতিতে সর্বাবস্থায় জুলুমের বিপক্ষে। সকল ধর্ম মতের লোকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে ইসলাম। বাংলাদেশে হিন্দুরা এতটাই নিরাপদ মায়ের কোলে একজন সন্তান যতটা নিরাপদ।

ইসলাম জোরপূর্বক কাউকে ধর্মান্তরিত করা বা কারো ধর্ম পালনে বাধা দেয়াকে সমর্থন করে না। ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় মুসলমানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের খালিফা হযরত ওমর ভিন্ন ধর্মের উপাসনালয়ে তাদের আবেদন সত্ত্বেও নামাজ আদায় করেননি। শুধুমাত্র এজন্য ভবিষ্যতে মুসলমানরা এই স্থানকে নিজেদের খলিফার নামায আদায়ের স্থান হিসেবে দাবি করতে পারে। এখানে ইসলামের সৌন্দর্য। আমরা চাই সবাই যার যার ধর্ম যার যার অঙ্গনে পালন করবে। এভাবেই সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।

আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি কেউ আমাদের পরাজিত করতে পারবে না। আমরা সংখ্যায় স্বল্পতার কারণে কখনো পরাজিত হইনি। আমরা পরাজিত হয়েছি বিভক্তির কারণে। আমাদের পুর্ন জাতিকে মুসলিম এ ভূমি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমরা জীবন দিব কিন্তু হেরে যাবো না। আমরা রক্ত দিব কিন্তু পিছপা হবো না। ইনশাআল্লাহ ‌

Scroll to Top