ইসলামের বিদেশ নীতি ও আজকের বাংলাদেশ

আমাদের প্রভাবশালী প্রতিবেশী ভারত। তিন দিক দিয়ে আমরা তাদের দ্বারা বেষ্টিত। তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন হবে? ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়দের আলোচনা হবে।

১৯৭১। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রতিবেশী দেশের রয়েছে অবদান। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা চাই আমাদের লড়াই সংগ্রাম ছিল অধিকার আদায়ের জন্য বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য। আর প্রতিবেশী ভারতের সহযোগিতা ছিল তাদের নিজেদের স্বার্থে তাদের অখন্ডতা রক্ষার জন্য। এ সহযোগিতা ছিল স্বার্থের জন্য।

আজ ২০২৪ স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছর। আজ দেশবাসী দেখছে প্রতিবেশী ভারতের আচরণ আমাদের সাথে বন্ধুত্বের না শোসনের। এই ৫৪ বছরে এদেশে অনেক সরকার পরিবর্তন হয়েছে। বন্ধুত্বের নামে নিজ প্রভাব দ্বারা প্রতিবেশী ভারত এই দেশ থেকে নিয়েছে অনেক দেয়নি কিছুই।

ভারত নিজ সংস্কৃতি অর্থনীতি দ্বারা ধর্মীয় আগ্রাসন দ্বারা এ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আমাদের পরিবার সমাজে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা আমাদের গোলামীর জিনজিরে আবদ্ধ করতে চেয়েছে। পুতুল সরকার বসিয়ে তারা ইচ্ছামাফিক তাদের স্বার্থগুলো আদায় করতে চেয়েছে। ভারত নির্ভর আমাদের সরকার গুলো পররাষ্ট্র নীতিতে ভারত তোষণ আর ভারতের সাথে নতজানু নীতিই অবলম্বন করে আসছে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে নতজানু পররাষ্ট্র নীতি অবলম্বন ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। ইসলাম শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের নির্দেশনা দেয়। ‌এ ব্যাপারে কোরআনের দৃষ্টি ভঙ্গি পরিষ্কার। সূরা আনফালের ৬০- ৬১ নাম্বার আয়াতে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

{ وَأَعِدُّوا۟ لَهُم مَّا ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن قُوَّةࣲ وَمِن رِّبَاطِ ٱلۡخَیۡلِ تُرۡهِبُونَ بِهِۦ عَدُوَّ ٱللَّهِ وَعَدُوَّكُمۡ وَءَاخَرِینَ مِن دُونِهِمۡ لَا تَعۡلَمُونَهُمُ ٱللَّهُ یَعۡلَمُهُمۡۚ وَمَا تُنفِقُوا۟ مِن شَیۡءࣲ فِی سَبِیلِ ٱللَّهِ یُوَفَّ إِلَیۡكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ (60) ۞

ইসলামের নির্দেশনা ভিরুতা নয় সাহস প্রদর্শন করো। প্রয়োজনে লড়াই করবে এমন একটি শক্তিশালী বাহিনী থাকতে হবে যে বাহিনীর মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর দুশমন তোমাদের শত্রুদের ভয় দেখাবে।

এটি ইসলামের শিক্ষা, ঈমানের দাবি। আয়াত কিন্তু বলেনি যুদ্ধ কর। আয়াতের পরবর্তী আয়াতের নির্দেশনা দেখুন—–

وَإِن جَنَحُوا۟ لِلسَّلۡمِ فَٱجۡنَحۡ لَهَا وَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلسَّمِیعُ ٱلۡعَلِیمُ (61) }

[Surah Al-Anfāl: 60-61]

যদি প্রতিপক্ষ সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে তাহলে তুমিও সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড় এবং আল্লাহর উপর ভরসা করো।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আচরণ বন্ধুত্বের হলে মুসলিমদের আচরণও বন্ধুত্বের হবে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী কোন শক্তির কাছে মুসলমান নতজানু নীতি অবলম্বন করবে না। মুসলমান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা নত করে না।

আমরা দেখতে পাই প্রিয় নবী মদিনায় হিজরত করার পর মদিনা চতুর্দিক থেকে কাফেরদের দ্বারা অবরুদ্ধ ছিল। মুসলমানদের জনপথকে গুড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তে চতুর্দিকের কাফেররা ছিল বদ্ধপরিকর।

সেই পরিস্থিতিতে মুসলমানদের জন্য দুটি পথ খোলা ছিল

*****************************************

১/বেঁচে থাকার জন্য জাহিলিয়াতের কাছে আত্মসমর্পণ করা

২/ জীবন বাজি রেখে লড়াই করা। লড়াই করেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সেই অবস্থায় প্রতিপক্ষের সাথে প্রিয় নবীকে লড়াইয়ের হুকুম প্রদান করলেন।

মক্কার প্রশিক্ষিত সশস্ত্র যুদ্ধা বাহিনীর মোকাবেলায় মুসলমানদের এমন এক সময় যুদ্ধের হুকুম দেওয়া হল যাদের কাছে ছিল না ৫০০ যোদ্ধা। শত শত মুসলিম হিজরত করে তখনও আশ্রয় খুঁজে পায়নি। চতুর্দিকের বয়কটে অর্থনীতির নাজুক অবস্থা। বেঁচে থাকতেই যাদেরকে সংগ্রাম করতে হচ্ছিল তাদেরকে হুকুম দেয়া হয় দ্বীন প্রতিষ্ঠায় লড়াই করো। এখান থেকে ইসলামের বিদেশ নীতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।

ঠিক সেই সময়ে প্রিয় নবীকে লক্ষ্য করে কুরআনে কারীমের এই আয়াতগুলোর নির্দেশনা অত্যন্ত সুস্পষ্ট

{ وَقَـٰتِلُوا۟ فِی سَبِیلِ ٱللَّهِ ٱلَّذِینَ یُقَـٰتِلُونَكُمۡ وَلَا تَعۡتَدُوۤا۟ۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَا یُحِبُّ ٱلۡمُعۡتَدِینَ (190) وَٱقۡتُلُوهُمۡ حَیۡثُ ثَقِفۡتُمُوهُمۡ وَأَخۡرِجُوهُم مِّنۡ حَیۡثُ أَخۡرَجُوكُمۡۚ وَٱلۡفِتۡنَةُ أَشَدُّ مِنَ ٱلۡقَتۡلِۚ وَلَا تُقَـٰتِلُوهُمۡ عِندَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ حَتَّىٰ یُقَـٰتِلُوكُمۡ فِیهِۖ فَإِن قَـٰتَلُوكُمۡ فَٱقۡتُلُوهُمۡۗ كَذَ ٰ⁠لِكَ جَزَاۤءُ ٱلۡكَـٰفِرِینَ (191) فَإِنِ ٱنتَهَوۡا۟ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَفُورࣱ رَّحِیمࣱ (192) وَقَـٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةࣱ وَیَكُونَ ٱلدِّینُ لِلَّهِۖ فَإِنِ ٱنتَهَوۡا۟ فَلَا عُدۡوَ ٰ⁠نَ إِلَّا عَلَى ٱلظَّـٰلِمِینَ (193) }

[Surah Al-Baqarah: 190-193]

একজন ঈমানদার সাহসী। ইসলাম সাহসের শিক্ষা দেয়। মুসলমান বেঁচে থাকবে সাহস নিয়ে। সকল পরিস্থিতির মোকাবেলা করবে সাহস দিয়ে।

আজকের বাংলাদেশ আমাদের করণীয়

******************************

আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি কঠিন সংকটের শিকার। দেশের বিশাল এক অঞ্চল প্লাবিত। এই বন্যা একদিকে যেমন প্রাকৃতিক। অন্যদিকে এই বন্যার সাথে জড়িয়ে আছে প্রতিবেশী দেশের নোংরা রাজনীতি। প্রতিবেশী দেশ এর দায় এড়াতে পারে না।

প্রথমত সে প্রায় ৫৭ টি বর্ডার পয়েন্টে বাধ তৈরি করেছে। সে চাইলেই এ বাঁধ গুলো দিতে পারে না। সে যদি বাধ না দিয়ে নদী পথ খোলা রাখতো তাহলে এই অবস্থা হতো না। শুকনো মৌসুমে আমরা পানি পাই না। আর বর্ষায় আমাদের ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়তঃ সে বিপদে পড়লেও এ বাঁধ গুলো খুলে দিতে পারে না। সে বাঁধ দিয়ে পানি সারা বছর আটকে রাখবে। তাহলে বন্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কেন সে করেনি। নিজের বিপদ সে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারে না।

তৃতীয়তঃ বাঁধ খোলার পূর্বে বাংলাদেশকে সে পর্যাপ্ত সময় দেয়নি। যদিও প্রধান উপদেষ্টার সাথে দেখা করে তারা জানিয়েছে যে ইচ্ছাকৃত তারা বাঁধগুলো খুলে দেয় নি পানির চাপে বাঁধ খুলে গেছে। কিন্তু তাদের বক্তব্যের মাঝে স্ববিরোধিতা রয়েছে।

এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় ঐক্যবদ্ধভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করা। আমরা সবাই আক্রান্ত। এটা মনে করার সুযোগ নেই আমি ভালো আছি। আমরা এক দেশ এক জাতি।

প্রথম আমাদের কর্তব্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে দোয়া করা। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটি পরীক্ষা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন সাহায্য করেন।

দ্বিতীয়ত নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্লাবনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে আসা। ন্যূনতম ১০০ টাকা হলে সাহায্য করা।

তৃতীয়ত সার্বিকভাবে দেশের নাযুক পরিস্থিতিতে সব ধরনের অনিয়ম থেকে নিজে বেঁচে থাকা। এবং একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে ভূমিকা পালন করা।

দেশের এ সংকটে ছাত্র জনতা সকলে যেমন ঐক্যবদ্ধভাবে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করছে আশা করছি তারা যদি নীতিতে অটল থাকে আগামীর বাংলাদেশ পথ হারাবে না। তবে আমরা আমাদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আগামী দিনে সাহসী নেতৃত্ব কামনা করছি। এদেশের ছাত্র জনতা নতযানু পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চায় না।

আমরা এ দেশের মুসলমান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যবদ্ধ। আমাদের সকলের পরিচয় আমরা এ দেশের নাগরিক। আমরা সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবো।

আমাদের বিভক্তির কারণেই প্রতিবেশী আমাদের উপর শক্তিশালী। তারা আমাদেরকে বিভক্ত করে শাসন করতে চায়। আমাদের কাউকে পাকিস্তানপন্থী কাউকে ভারতপন্থী কাউকে আমেরিকা পন্থী কাউকে চিনপন্থী বানিয়ে আমাদের মাঝে নোংরা রাজনীতি তারা ছড়িয়ে দিয়েছে।

আগামী দিনে আমরা সবাই বাংলাদেশ পন্থী। সকল বিভক্তির কবর রচনা করে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারি তাহলে কেউ আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। সাহসী হই। শপথ করি দেশের স্বার্থে ইসলামের স্বার্থে আমরা কারো সাথে আপোষ করবো না কারো কাছে নত হবো না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সহায় হোন-

Scroll to Top