আজও বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে নগরে বন্দরে সাধারণ মানুষের আলেম সমাজের প্রতি সর্বোচ্চ ভালবাসা ভক্তি দেখা যায় । বিয়ে পড়াতে হবে? সাধারণ মানুষ আলেমের কাছে যায়। কারো মৃত্যু হয়েছে? সাধারণ মানুষ আলেমের কাছে যায়। সন্তানের নাম রাখতে হবে? মানুষ আলেমের কাছে যায়। মসজিদ বানাতে হবে? মানুষ আলেমের কাছে যায়। মাদরাসা বানাতে হবে? মানুষ আলেমের কাছে যায়। মানুষের ঈমান, নামাজ, জানাজা, নিকাহ, তালাক, উত্তরাধিকার—সবকিছুর কেন্দ্রে আলেম সমাজ।
এমন কোনো শ্রেণি বাংলাদেশে নেই যাদের প্রতি সাধারণ মানুষের এত স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো যাদের পেছনে কোটি মানুষ নামাজ পড়ে, তারা কেন কোটি মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারে না?
যাদের এক ডাকেই লক্ষ মানুষ মাঠে আসে, তারা কেন রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গনে প্রান্তিক হয়ে যায়? এই প্রশ্ন আজ আমাদের নিজেদেরকে করতে হবে।
আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট শত্রুর শক্তি নয়, বরং সবচেয়ে বড় সংকট নিজেদের দুর্বলতা। অনেক সময় আমরা বলি মিডিয়া আমাদের বিরুদ্ধে। সেক্যুলাররা আমাদের বিরুদ্ধে। বিদেশি শক্তি আমাদের বিরুদ্ধে। এসব আংশিক সত্য হতে পারে।
কিন্তু কুরআন আমাদেরকে প্রথমে নিজের দিকে তাকাতে শিখিয়েছে। আমাদের দুর্বলতার কারণে শত্রু শক্তিশালী।
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ
“তোমরা পরস্পর বিবাদ করো না; তাহলে দুর্বল হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি চলে যাবে। (সূরা আনফাল: ৪৬)
আজ প্রশ্ন হলো—
আমাদের শক্তি কোথায় গেল? আল্লাহ উত্তর দিয়েছেন—
তোমরা বিবাদ করেছ। এই বিবাদ থেকে মুক্ত হলে আমরাই বিজয়ী।
আমাদের নিজেদের কিছু আত্মসমালোচনা
***************************************
পরস্পরে কাদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতি।
এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমাদের মিম্বারগুলো কখনো কখনো ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যত না ব্যবহৃত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে নিজেদের বিরুদ্ধে।
এক আলেম আরেক আলেমকে সহ্য করতে পারেন না। এক মাদরাসা আরেক মাদরাসাকে সহ্য করতে পারে না।এক খানকা আরেক খানকাকে সহ্য করতে পারে না। এক সংগঠন আরেক সংগঠনকে সহ্য করতে পারে না।
এর ফলাফল জনগণ দেখে যাদের কাছ থেকে উম্মাহর ঐক্যের কথা শোনার কথা, তারাই বিভক্তির প্রতীক হয়ে গেছেন।
আমরা মতভেদকে শত্রুতায় পরিণত করেছি।
আমাদের পূর্বসূরিদের মাঝেও মতভেদ ছিল। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিকের মতভেদ ছিল। ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদের মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা একে অপরকে ধ্বংস করেননি।
আজ আমাদের অনেকের অবস্থা একটি মাসআলায় মতভেদ হলেই যেন সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল!একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে মতভেদ হলেই যেন সে উম্মাহর শত্রু হয়ে গেল! এভাবে কোনো জাতি নেতৃত্বে উঠতে পারে না।
কেন অন্যরা এগিয়ে যায়।
ইতিহাসের একটি নির্মম বাস্তবতা হলো যারা সংগঠিত, তারা এগিয়ে যায়। যারা শৃঙ্খলাবদ্ধ, তারা এগিয়ে যায়। যারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে, তারা এগিয়ে যায়। এবং যারা সারাক্ষণ নিজেদের সাথে যুদ্ধ করে, তারা পিছিয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করেছেন যে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আদর্শ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়লেও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে আলেম সমাজের সবচেয়ে বড় মূলধন জনভালোবাসা হলেও সেই শক্তিকে একটি ঐক্যবদ্ধ কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া কঠিন হয়েছে।
ঈর্ষা — নেতৃত্ব ধ্বংসের নীরব আগুন
অনেক সময় বাইরের ষড়যন্ত্রের চেয়ে ভেতরের হিংসা বেশি ক্ষতি করে। অমুক জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে। অমুকের মাহফিলে বেশি লোক হচ্ছে। অমুকের প্রতিষ্ঠানে বেশি ছাত্র হচ্ছে। অমুকের ভিডিও বেশি চলছে।
তারপর শুরু হয় সমালোচনা। অপপ্রচার। ইঙ্গিত। কটাক্ষ।কুৎসা। অথচ রাসূল ﷺ বলেছেন তোমরা পরস্পর হিংসা করো না। যেখানে হিংসা প্রবেশ করে, সেখানে বরকত চলে যায়।
জনগণ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
জনগণ আজও আলেমদের ভালোবাসে। এটাই বাস্তবতা। গ্রামের কৃষক।রিকশাওয়ালা।ব্যবসায়ী।মা-বোনেরা। তারা আজও আলেমদের সম্মান করে।
কিন্তু তারা একটি প্রশ্ন করে আপনারা নিজেদের মধ্যে এক হতে পারেন না, দেশকে কীভাবে এক করবেন?
এই প্রশ্ন আমাদের কাঁদায়। কারণ প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়।
ইতিহাসের শিক্ষা।
স্পেন হারিয়েছে মুসলমান অনৈক্যের কারনে। দিল্লি হারিয়েছে মুসলমান। অনৈক্যের কারনে উসমানী খেলাফত দুর্বল হয়েছে শুধু বাইরের আক্রমণে নয়। ভেতরের বিভাজনে।
কুরআনের ইতিহাসে বারবার একটি শিক্ষা এসেছে বাইরের শত্রুর আগে ভেতরের রোগ জাতিকে ধ্বংস করে।
আমরা কী চাই?
আমরা কি সবাই এক দল হব? এটা বাস্তবসম্মত নয়।
আমাদের পূর্বসূরিরাও তা ছিলেন না কিন্তু আমরা কি এক উম্মাহ হতে পারি? অবশ্যই পারি।
আমরা কি একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার বন্ধ করতে পারি? অবশ্যই পারি। আমরা কি ইসলামের মৌলিক স্বার্থে এক কাতারে দাঁড়াতে পারি? অবশ্যই পারি।
বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ এখনও আলেমদের ভালোবাসে। এটা আল্লাহর বিশাল নিয়ামত। কিন্তু যদি আমরা সেই ভালোবাসাকে ঝগড়া, বিভেদ, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং দলীয় সংকীর্ণতার মধ্যে নষ্ট করি তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
আজ দরকার কম কথা। বেশি আমল। কম কাদা ছোড়া।
দোয়া। কম দলীয় অহংকার। বেশি উম্মাহর চিন্তা। আল্লাহ আমাদেরকে এমন আলেম বানান, যাদের দেখে মানুষ ইসলামের সৌন্দর্য দেখে; বিভক্তি নয়, ঐক্য দেখে; প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ভ্রাতৃত্ব দেখে।
وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ
“তিনি তাদের অন্তরগুলোর মধ্যে মিলন সৃষ্টি করেছেন।”
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরগুলোর মধ্যেও মিলন সৃষ্টি করে দিন।