আজ মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট দারিদ্রতা বা প্রযুক্তিগত দুর্বলতা বা অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা নয়। এসব সমস্যা অবশ্যই আছে। কিন্তু এগুলো মূল সমস্যা নয়। এগুলো রোগের লক্ষণ মাত্র।
মূল রোগ হলো—মুসলিমের হৃদয় থেকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যাওয়া। আর এই কাজটি সবচেয়ে বেশি করেছে আধুনিক সেকুলার চিন্তাধারা।
আমরা যখন সেকুলারিজমের কথা বলি, তখন অনেকেই মনে করেন—সেকুলারিজম মানে হয়তো মসজিদে না যাওয়া, নামাজ না পড়া, দাড়ি না রাখা, পর্দা না করা কিংবা ধর্মীয় জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া। কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়।
সেকুলার চিন্তার সবচেয়ে গভীর প্রভাব মানুষের আমল কমিয়ে দেওয়া নয়; বরং মানুষের চিন্তার কেন্দ্র থেকে আল্লাহর কর্তৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া। সমস্যাটা আমলগত নয় আকিদাগত।
এটি মানুষের সামনে একটি প্রশ্ন দাঁড় করায় জীবনের কোন অংশে আল্লাহর কথা চলবে, আর কোন অংশে আল্লাহর কথা চলবে না। এটাই আসল প্রশ্ন।
ধরুন একজন মানুষ নামাজ পড়ে। রোজা রাখে। কুরআন তিলাওয়াত করে। মসজিদে যায়। রমজানে ইবাদত করে।হজ করে। কিন্ত সে বলে শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলাম নয়। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইসলাম নয়।ব্যবসার ক্ষেত্রে ইসলাম নয়।সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ইসলাম নয়। পারিবারিক নীতিতে ইসলাম নয়।সামাজিক নৈতিকতায় ইসলাম নয়।
তাহলে প্রশ্ন করতে হবে ইসলাম কি শুধু মসজিদের চার দেয়ালের জন্য এসেছিল।কুরআন কি শুধু নামাজের আগে পড়ার জন্য নাযিল হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ কি শুধু অজু, নামাজ ও রোজা শেখাতে এসেছিলেন।নবী-রাসূলগণের দাওয়াত কি শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল?
ইসলাম মানুষের পুরো জীবনকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত করেছে। কুরআনের একটি আয়াত—একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শন।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন—
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু—সবই আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। (সূরা আল-আন‘আম: ১৬২)
একটু থামুন।এই আয়াতটি শুধু পড়ে চলে যাবেন না।একেকটি শব্দের দিকে তাকান। প্রথম শব্দ দেখুন
صَلَاتِي
আমার নামাজ।অর্থাৎ আমার ইবাদত আল্লাহর জন্য।
وَنُسُكِي
আমার কুরবানি ও অন্যান্য ইবাদত আল্লাহর জন্য।
এ পর্যন্ত শুনলে কেউ বলতে পারে ঠিক আছে, এগুলো তো ধর্মীয় বিষয়। কিন্তু আল্লাহ এখানেই থামেননি।এরপর বলেছেন—
وَمَحْيَايَ
আমার জীবন।
শুধু নামাজ আমার জন্য নয়। শুধু রোজা আমার জন্য নয়।
শুধু হজ আমার জন্য নয়। আমার জীবনও আল্লাহর জন্য।
আমার চিন্তা আল্লাহর জন্য। আমার চরিত্র আল্লাহর জন্য।আমার পরিবার আল্লাহর নির্দেশের অধীন। আমার ব্যবসা আল্লাহর বিধানের অধীন।আমার সম্পদ আল্লাহর বিধানের অধীন। আমার সময় আল্লাহর আমানত। আমার জ্ঞান আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। আমার সামাজিক দায়িত্ব আল্লাহর নির্দেশের অধীন।
আর তারপর—
وَمَمَاتِي
আমার মৃত্যুও আল্লাহর জন্য।
অর্থাৎ মুসলমানের জীবন এমন কোনো “ধর্মমুক্ত অঞ্চল” নেই যেখানে আল্লাহর নির্দেশ পৌঁছাবে না।
এখানেই সেকুলার চিন্তার সঙ্গে ইসলামী জীবনদর্শনের মৌলিক পার্থক্য। ইসলাম বলে আল্লাহ আমার রব। আর “রব” শুধু সৃষ্টিকর্তা অর্থে নয়।তিনি পালনকর্তা। তিনি বিধানদাতা। তিনি পথপ্রদর্শক। তিনি হালাল-হারামের নির্ধারক। তিনি সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড।
অন্যদিকে ধর্মকে যদি মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব মানুষের হাতে চলে যাওয়ার প্রশ্ন তৈরি হয়।
এখানেই একজন মুসলমানকে থামতে হবে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে আমার জীবনের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব কার?
আজকের লড়াই শুধু মসজিদ বনাম মার্কেট নয়। আজকের লড়াই শুধু দাড়ি বনাম ক্লিন শেভ নয়। আজকের লড়াই শুধু পোশাক বনাম ফ্যাশন নয়। এ লড়াই পাঞ্জাবি আর প্যান্ট শার্টের নয়। আজকের লড়াই শুধু নামাজ পড়া বনাম নামাজ না পড়া নয়। এসব গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এরও গভীরে একটি প্রশ্ন আছে। সেই প্রশ্ন হলো আমার জীবনের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কার? আমার চিন্তার বিচারক কে?আমি কোনো বিষয়ে ভালো-মন্দ নির্ধারণ করব কীভাবে?
মানুষের প্রবৃত্তি দিয়ে? সমাজের প্রচলন দিয়ে? সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত দিয়ে? নাকি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ দিয়ে? এখানে প্রধান প্রশ্ন আমার উপর কর্তৃত্ব কার।
এটা আকিদাগত বিষয় আমলগত নয়।
রাসূল ﷺ কি শুধু ইবাদত শিখিয়েছেন?
*************************************
একটু সীরাতের দিকে তাকান। রাসূলুল্লাহ ﷺ মসজিদে নামাজ শিখিয়েছেন। কিন্তু শুধু নামাজ শেখাননি।তিনি—
পরিবারের অধিকার শিখিয়েছেন। ব্যবসার নীতি শিখিয়েছেন। উত্তরাধিকার বিধান দিয়েছেন। বিচারের নীতি শিখিয়েছেন। যাকাতের ব্যবস্থা করেছেন। চুক্তির বিধান দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি দেখিয়েছেন। যুদ্ধ ও শান্তির নীতি শিখিয়েছেন।
তিনি বাজারে প্রতারণা নিষিদ্ধ করেছেন। এতিমের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। শাসক ও জনগণের অধিকার-দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন।অর্থাৎ রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শনের বাস্তব রূপ।
নবী-রাসূলগণ সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেছেন
*********************************************
হযরত শু‘আইব (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন ব্যবসায় মাপে-ওজনে কম দিও না। অর্থাৎ অর্থনীতি ও ব্যবসাও নবীদের দাওয়াতের অংশ ছিল।
হযরত লূত (আ.) তাঁর সমাজের নৈতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। হযরত মূসা (আ.) ফিরআউনের সামনে দাঁড়িয়েছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কার শিরক, জুলুম, সুদ, অন্যায়, নারী-নির্যাতন, গোত্রীয় অহংকার ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তাহলে ইসলাম কীভাবে শুধু ব্যক্তিগত জীবনের ধর্ম হয়ে গেল।
এটা অবশ্যই বুঝতে হবে একজন মুসলমানের জীবনে “দুইটি আলাদা অঞ্চল” নেই। একটি অঞ্চল এখানে আমি মুসলমান।আরেকটি অঞ্চল এখানে ইসলাম চলবে না। এমন বিভাজন ইসলামের সামগ্রিক জীবনদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটা শুধু আমলের ঘাটতি নয় এটা আকিদাগত বিচ্যুতি।
একজন মুসলমান নামাজে আল্লাহর বান্দা।ব্যবসায়ও আল্লাহর বান্দা। পরিবারেও আল্লাহর বান্দা।শিক্ষাজীবনেও আল্লাহর বান্দা। চাকরিতেও আল্লাহর বান্দা। সামাজিক জীবনেও আল্লাহর বান্দা। একাকীত্বেও আল্লাহর বান্দা।জনসম্মুখেও আল্লাহর বান্দা। এটাই মুসলমানের আকিদা। বিপরীত চিন্তা সুস্পষ্ট ভ্রষ্টতা।
মুসলমানের কি নিরপেক্ষতার সুযোগ আছে
***************************************
ইসলামের শুরুই হয় একটি ঘোষণা দিয়ে।
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি।
লক্ষ্য করুন এখানে “সাক্ষ্য” আছে। এখানে অবস্থান আছে।এখানে পক্ষ গ্রহণ আছে। এখানে নিরপেক্ষতা নেই।
কোন মুসলিম বলতে পারেনা সব ধর্মই ঠিক। আমি কোনো পক্ষ নিচ্ছি না। আমি নিরপেক্ষ। বরং মুসলিম হওয়ার প্রথম শর্তই হলো আমি ঘোষণা করছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আমি ঘোষণা করছি মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ বলেন—
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ
নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।(সূরা আলে ইমরান: ১৯)
আরও বলেন—
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ
যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অনুসন্ধান করবে, তা কখনো গ্রহণ করা হবে না। (সূরা আলে ইমরান: ৮৫)
নবী-রাসূলগণ কি কখনো সেকুলার বা নিরপেক্ষ ছিলেন?
**************************************************
নবী-রাসূলগণ কখনো সেকুলার ছিলেন না। তাঁরা কখনো বলেননি। ধর্ম আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি আমার বিশ্বাস নিয়ে থাকব, তোমরা তোমাদের বিশ্বাস নিয়ে থাকো। সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যাপারে ধর্মের কোনো কথা থাকবে না।হক ও বাতিলের ব্যাপারে আমি নিরপেক্ষ।
কুরআন খুলে দেখুন। একজন নবীর জীবনও এমন কোনো শিক্ষা দেয় না। বরং কুরআনের প্রতিটি নবীর জীবন এক একটি ঘোষণা। সেই ঘোষণা হলো তাওহীদের ঘোষণা।আল্লাহর আনুগত্যের ঘোষণা। শিরক ও বাতিল প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর ঘোষণা।
নবীদের দাওয়াতের মধ্যে ভাষাগত পার্থক্য ছিল। তাদের যুগ আলাদা। তাদের জাতি আলাদা। তাদের পরিস্থিতি আলাদা। কিন্তু দাওয়াতের মূল ছিল এক আল্লাহর ইবাদত করো। আল্লাহ বলেন—
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন রাসূল পাঠিয়েছি এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে বেঁচে থাকো। (সূরা আন-নাহল: ৩৬)
দেখুন! নবীদের দাওয়াত শুধু আল্লাহকে বিশ্বাস করো”—এতটুকু ছিল না। বরং—
اعْبُدُوا اللَّهَ
আল্লাহর ইবাদত করো। এবং—
وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
তাগুত থেকে বেঁচে থাকো। অর্থাৎ হককে গ্রহণ করতে হবে এবং বাতিলকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এখানে দ্বিমুখী অবস্থান নেই।
হযরত নূহ (আ.): দীর্ঘতম দাওয়াত, কিন্তু আপোষহীন অবস্থান। হযরত নূহ (আ.) তাঁর জাতির কাছে একদিন-দুইদিন দাওয়াত দেননি। কুরআন বলছে—
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا
আমি নূহকে তাঁর জাতির কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি তাদের মধ্যে পঞ্চাশ বছর কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিলেন। (সূরা আল-আনকাবূত: ১৪)
৯৫০ বছর! কল্পনা করুন একজন মানুষ ৯৫০ বছর ধরে একটি জাতিকে একটি কথাই বুঝিয়ে যাচ্ছেন আল্লাহর দিকে ফিরে আসো। তাওহীদ গ্রহণ করো। শিরক ত্যাগ করো।
তাঁর জাতির সামনে তাঁর ঘোষণা ছিল—
اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلٰهٍ غَيْرُهُ
তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো; তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই। (সূরা আল-আ‘রাফ: ৫৯)
নূহ (আ.) কি বলেছিলেন তোমরা মূর্তি পূজা করো, আমি আল্লাহর ইবাদত করি—সবাই যার যার মতো থাকি
তিনি সত্যকে সত্য বলেছেন। শিরককে শিরক বলেছেন।তাওহীদকে তাওহীদ বলেছেন। কারণ নবীর কাজ ছিল না মানুষের প্রতিটি বিশ্বাসকে বৈধতা দেওয়া। নবীর কাজ ছিল মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা।
হযরত ইবরাহীম (আ.): নিজের ঘর থেকে শুরু হওয়া ঈমানী অবস্থান। এবার আসুন ইবরাহীম (আ.)-এর কাছে।
তিনি এমন এক সমাজে জন্মেছেন যেখানে মূর্তি পূজা ছিল সামাজিক বাস্তবতা।তাঁর নিজের পিতাও সেই বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সামাজিক প্রচলন তাঁকে সত্য থেকে সরাতে পারেনি।তিনি তাঁর জাতিকে বললেন—
إِنَّنِي بَرَاءٌ مِّمَّا تَعْبُدُونَ
তোমরা যাদের ইবাদত কর, আমি তাদের থেকে সম্পূর্ণ সম্পর্কমুক্ত। (সূরা আয-যুখরুফ: ২৬)
কী দৃঢ় ঘোষণা! আমি তোমাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত শত্রুতা পোষণ করছি না কিন্তু তোমাদের বাতিল উপাসনার সঙ্গে আমি একমত নই। আমি তোমাদের সম্মান করতে পারি কিন্তু শিরককে সত্য বলতে পারি না। আমি মানুষের সঙ্গে ন্যায় করতে পারি কিন্তু বাতিলকে হক বলে স্বীকৃতি দিতে পারি না। এটাই নবীদের ভারসাম্য।
ইবরাহীম (আ.)-এর আরেকটি ঘোষণা কুরআনে এসেছে—
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ
ইবরাহীম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে। তারপর তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে—
إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ
তোমাদের থেকে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের ইবাদত কর তাদের থেকে আমরা সম্পূর্ণ সম্পর্কমুক্ত। (সূরা আল-মুমতাহিনাহ: ৪)
এটি আকীদার প্রশ্ন। এখানে কোনো আপোষ নেই।
হযরত মূসা (আ.): ক্ষমতার সামনে সত্যের ঘোষণা।
এবার ফিরআউনের দরবারে যান। একদিকে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী শাসক। অন্যদিকে আল্লাহর নবী মূসা (আ.)। আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন—
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ
তোমরা তার সঙ্গে কোমল কথা বলবে; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে। (সূরা ত্ব-হা: ৪৪)
এখানে একটি অসাধারণ শিক্ষা আছে। মূসা (আ.) সত্যের ব্যাপারে আপোষ করেননি। কিন্তু তাঁর ভাষা ছিল কোমল।
অর্থাৎ সত্যে আপোষ নয়, কিন্তু দাওয়াতে হিকমত।
আজ আমাদের অনেকের সমস্যা হলো কেউ সত্যের কথা বলতে গিয়ে ভাষায় অন্যায় করে। আবার কেউ ভাষার কোমলতার অজুহাতে সত্যই গোপন করে।
নবীদের পথ দুটোকে একসঙ্গে ধারণ করে। হকে দৃঢ়তা + দাওয়াতে কোমলতা।
ফিরআউনের সামনে মূসা (আ.) কী বলেছিলেন?
আল্লাহর নির্দেশে মূসা ও হারূন (আ.) বলেছিলেন—
إِنَّا رَسُولَا رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ
আমরা তোমার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল। অতএব আমাদের সঙ্গে বনী ইসরাঈলকে পাঠিয়ে দাও এবং তাদেরকে নির্যাতন করো না। (সূরা ত্ব-হা: ৪৭)
অর্থাৎ ক্ষমতার সামনে সত্য বলা নবীদের সুন্নাহ।
এবার আসুন সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে।মক্কায় তখন কুরাইশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা। রাসূল ﷺ-এর কাছে ক্ষমতা নেই।
সম্পদ নেই।সৈন্য নেই। রাষ্ট্র নেই।
কিন্তু তাঁর কাছে আছেওহী।আছে তাওহীদের দাওয়াত।আছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্যের ঘোষণা।
কুরাইশের নেতারা বুঝতে পারল মুহাম্মাদ ﷺ-কে শুধু নির্যাতন করে থামানো যাচ্ছে না। তাই তারা আপোষের পথ ধরল। তাদের বক্তব্যের সারকথা ছিল আপনি আমাদের কিছুটা গ্রহণ করুন, আমরা আপনার কিছুটা গ্রহণ করি।
কিন্তু তাওহীদ ও শিরকের মধ্যে কোনো আপোষ নেই।
এর জবাব হিসেবে নাযিল হলো—
قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ
বলুন, হে কাফিরগণ!
তারপর—
لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ
তোমরা যার ইবাদত কর, আমি তার ইবাদত করি না।
এবং শেষে—
لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্য আমার দ্বীন। (সূরা আল-কাফিরূন: ১–৬)
এটাই নবুওয়াতের ভাষা।
এই لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ” এটি আকীদাগত স্বাতন্ত্র্যের ঘোষণা। এখানে বলা হচ্ছে তোমাদের উপাসনা আমি গ্রহণ করব না। তোমাদের বাতিল বিশ্বাসকে আমার ঈমানের অংশ বানাব না। আমি আমার তাওহীদ ছেড়ে দেব না।
নূহ (আ.) আপোষ করেননি। ইবরাহীম (আ.) আপোষ করেননি। মূসা (আ.) আপোষ করেননি। ঈসা (আ.) আপোষ করেননি। আর আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ তাওহীদের প্রশ্নে কোনো আপোষ করেননি।
সাহাবীদের ঈমান বনাম আধুনিক নিরপেক্ষতা
******************************************
তারা দর্শক ছিলেন না—তারা ছিলেন সত্যের সাক্ষী
একবার একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকান। আজ আমরা “নিরপেক্ষতা” শব্দটি খুব সুন্দর করে উচ্চারণ করি।
বলতে ভালো লাগে আমি কারও পক্ষে নই। আমি নিরপেক্ষ। আমি কোনো পক্ষের সঙ্গে নেই। কিন্তু সাহাবায়ে কিরামের জীবন খুলে দেখুন।
তাঁদের সামনে যখন হক ও বাতিল দাঁড়িয়েছে, তাঁরা কি মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলেছেন আমরা নিরপেক্ষ। কারণ তাঁদের কাছে ইসলাম কোনো সাংস্কৃতিক পরিচয় ছিল না।
ইসলাম তাঁদের কাছে ছিল জীবন। ইসলাম ছিল আকীদা।
ইসলাম ছিল পরিচয়। ইসলাম ছিল অঙ্গীকার।ইসলাম ছিল আল্লাহর জন্য আত্মসমর্পণ।
বদরের ময়দান: সংখ্যার শক্তি নয়, ঈমানের শক্তি
বদরের ময়দানে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল অল্প। তাঁদের সামনে ছিল অনেক বড় বাহিনী। বাহ্যিক হিসাবে শক্তির ভারসাম্য মুসলমানদের অনুকূলে ছিল না।
কিন্তু মুমিনের শক্তি শুধু সংখ্যায় নয়। শুধু অস্ত্রে নয়। শুধু সম্পদে নয়। মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার রবের প্রতি বিশ্বাস। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ أَلَنْ يَكْفِيَكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَاثَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُنزَلِينَ
যখন আপনি মুমিনদের বলছিলেন—তোমাদের রব তিন হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করলে কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট হবে না? (সূরা আলে ইমরান: ১২৪)
আর যখন তাদের বিরুদ্ধে শত্রুদের সমাবেশের সংবাদ দেওয়া হলো, তখন মুমিনদের ঈমান আরও দৃঢ় হলো।আল্লাহ বলেন—
الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
যাদেরকে লোকেরা বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোকেরা সমবেত হয়েছে; অতএব তাদের ভয় করো। কিন্তু এতে তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পেল এবং তারা বলল—‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক। (সূরা আলে ইমরান: ১৭৩)
লক্ষ করুন বিপদের সংবাদ তাদের ঈমান কমায়নি। বরং—
فَزَادَهُمْ إِيمَانًا
তাদের ঈমান আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটাই সাহাবীদের ঈমান। আজকের মুসলমানের সংকট আজ বিপদের সংবাদ শুনলে অনেকের ঈমান বাড়ে না ভয় বাড়ে। কেউ সমালোচনা করলে আমরা দ্বীনকে লুকাতে চাই। কেউ ইসলামের কোনো বিধানকে “পুরনো” বললে আমরা লজ্জা পাই।
কেউ আধুনিকতার নামে ইসলামের কোনো নির্দেশ নিয়ে প্রশ্ন তুললে আমরা নিজেদের দ্বীনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমনভাবে দুর্বল করে ফেলি, যেন ইসলামের সত্যতা অন্যের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল!
সাহাবীদের কাছে ইসলাম ছিল পরিচয়
***********************************
হযরত বিলাল (রা.)-এর দিকে তাকান।তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে।
পাথরের নিচে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। গরম বালুর ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। তবুও তাঁর মুখ থেকে বের হয়েছে—
أَحَدٌ، أَحَدٌ
আল্লাহ এক। আল্লাহ এক। এটাই পরিচয়।
হযরত খাব্বাব (রা.)-এর দিকে তাকান। হযরত সুমাইয়া (রা.)-এর দিকে তাকান। হযরত ইয়াসির (রা.)-এর দিকে তাকান। সাহাবীদের জীবন দেখুন। তাঁরা ইসলামকে শুধু মসজিদের ভেতরে রাখেননি। তাঁরা ইসলামকে জীবনের কেন্দ্রে রেখেছিলেন।
আজ ইসলাম কি আমাদের কাছে শুধু সংস্কৃতি হয়ে যাচ্ছে? এটি অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন। আমরা মুসলমান কিন্তু ইসলাম কতটুকু আমাদের চিন্তায়? আমরা মুসলমান কিন্তু ইসলাম কতটুকু আমাদের সিদ্ধান্তে? আমরা মুসলমান কিন্তু ইসলাম কতটুকু আমাদের পরিবারে? আমরা মুসলমান কিন্তু ইসলাম কতটুকু আমাদের ব্যবসায়? আমরা মুসলমান কিন্তু ইসলাম কতটুকু আমাদের চরিত্রে?
আমরা মুসলমান কিন্তু ইসলাম কতটুকু আমাদের সন্তান পালনে? আমরা মুসলমান কিন্তু ইসলাম কতটুকু আমাদের আনন্দ-বেদনা, পছন্দ-অপছন্দ এবং জীবনলক্ষ্যে? এখানেই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন।
রাসূল ﷺ কী ধরনের উম্মত তৈরি করেছিলেন?
রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন একটি উম্মত তৈরি করেননি যারা অন্যায় দেখেও বলবে আমি নিরপেক্ষ। তিনি এমন একটি উম্মত তৈরি করেছেন যারা সত্যের সাক্ষ্য দেবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামর্থ্য অনুযায়ী অবস্থান নেবে। মুমিন অন্যায়কে ভালো বলে মেনে নেয় না। মুমিন বাতিলকে হক বলে ঘোষণা করে না। মুমিন নিজের ঈমানের কারণে সত্যকে সত্য বলে।
আজ আমাদের সামনে সত্যিই দুইটি পথ।
একটি পথ—আত্মবিস্মৃতির পথ। নিজের পরিচয় ভুলে যাও। নিজের ইতিহাস ভুলে যাও। নিজের আকীদা নিয়ে লজ্জিত হও। নিজের সন্তানকে নিজের দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দাও।অন্যের চিন্তাকে উন্নত আর নিজের দ্বীনকে পশ্চাৎপদ ভাবো।
আরেকটি পথ—নবীদের পথ। আল্লাহর ওপর ঈমান।
কুরআনের ওপর বিশ্বাস। রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহর অনুসরণ।
সত্যের সাক্ষ্য। ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান। মানুষের কল্যাণের জন্য দাওয়াত। নিজেকে সংশোধন।পরিবারকে সংশোধন।সমাজকে কল্যাণের দিকে আহ্বান।
দ্বীনকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানাও
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আহ্বানে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন কিছুর দিকে আহ্বান করেন যা তোমাদের জীবন দান করে।”
(সূরা আল-আনফাল: ২৪)
কী অসাধারণ ভাষা!আল্লাহ ও রাসূলের আহ্বানকে বলা হয়েছে—
لِمَا يُحْيِيكُمْ
যা তোমাদের জীবন দান করে। অর্থাৎ সত্যিকার জীবন শুধু শ্বাস নেওয়ার নাম নয়। সত্যিকার জীবন হলো ঈমানের জীবন। আল্লাহর আনুগত্যের জীবন। কুরআনের জীবন।সুন্নাহর জীবন। তাকওয়ার জীবন।
আজকের অঙ্গীকার তাহলে আসুন আজ আমরা নিজেদের সঙ্গে নতুন করে অঙ্গীকার করি। কুরআনের সঙ্গে বাঁচব।কুরআন শুধু তাকের ওপর থাকবে না। কুরআন আমাদের চিন্তায় থাকবে। কুরআন আমাদের চরিত্রে থাকবে।কুরআন আমাদের পরিবারে থাকবে। কুরআন আমাদের সিদ্ধান্তে থাকবে।
সুন্নাহর সঙ্গে বাঁচব। রাসূল ﷺ-কে শুধু ভালোবাসার দাবি করব না।তাঁর আদর্শ অনুসরণ করব। তাঁর চরিত্র গ্রহণ করব। তাঁর দাওয়াতের মিশন বুঝব।
ঈমানের ওপর বাঁচব।মানুষ কী বলল তার চেয়ে আল্লাহ কী চান এটি বড় করব। সমাজ কী বলল তার চেয়ে রাসূল ﷺ কী শিখিয়েছেন এটি বড় করব। সত্যের সাক্ষী হয়ে বাঁচব।
সত্যকে সত্য বলব। বাতিলকে বাতিল বলব। তবে হিকমতের সঙ্গে। ন্যায়ের সঙ্গে। উত্তম চরিত্রের সঙ্গে।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন মুসলমান হওয়া সহজ কিন্তু মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকা কঠিন। মুসলমানের নাম রাখা সহজ কিন্তু মুসলমানের চিন্তা ধারণ করা কঠিন। মুসলমানের পোশাক পরা সহজ কিন্তু মুসলমানের চরিত্র ধারণ করা কঠিন।
কুরআন তিলাওয়াত করা সহজ কিন্তু কুরআনকে জীবনের পথনির্দেশ বানানো কঠিন। রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসার দাবি করা সহজ কিন্তু তাঁর সুন্নাহর জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে ত্যাগ করা কঠিন। কিন্তু এটাই ঈমানের পরীক্ষা।
আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমি কি শুধু মুসলমানের পরিচয় বহন করব নাকি মুসলমানের জীবনও বেছে নেব? আমি কি শুধু ইসলামের নাম নেব নাকি ইসলামের সত্যকে ধারণ করব?
আমি কি বাতিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলব আমি নিরপেক্ষ নাকি জ্ঞান, হিকমত, ন্যায় ও উত্তম চরিত্র নিয়ে বলব আমি আল্লাহর বান্দা। আমি মুহাম্মাদ ﷺ-এর উম্মত। আমার পরিচয় ইসলাম। আমার পথ কুরআন ও সুন্নাহ। আমার জীবনের লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি। আমার ওপর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একক কর্তৃত্ব। আমি তার বিধানের কাছে আমাকে সঁপে দিয়েছি। আজকের কঠিন চ্যালেঞ্জে আমাদের বিজয় নিয়ে জীবন পরিচালনা করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সাহস হিম্মত।