আমাদের মদিনায় আসা কি শুধু সালাম দিয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য? শুধু খেজুর কেনার জন্য? শুধু বাজার করার জন্য? শুধু ছবি তোলার জন্য?
তাহলে তো সামান্য কিছু বিষয় নেয়া হলো। আমরা যদি মদিনা থেকে হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা নিয়ে যেতে পারি তাহলে বিশাল কিছু নেয়া হলো। তাই আসুন মদিনা থেকে ভালোবাসা নিয়ে যাই। ছুটকেস ভর্তি মালামাল নয়। হৃদয় ভর্তি করে রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসা।
মদিনার পথে পথে যে মদিনায় রাসূল ﷺ হেঁটেছেন। যে মদিনায় সাহাবারা কেঁদেছেন। যে মদিনায় ওহী নাযিল হয়েছে। যে মদিনা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে।
সেই মদিনার পথে পথে ১৪ বছরের আগের সেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামদের জীবনটাকে দেখার চেষ্টা করি।
মসজিদে নববী
কয়েক মুহূর্তের জন্য আজকের এই বিশাল মসজিদ, সুউচ্চ মিনার, সুবিশাল ছাতা, ঝকঝকে মার্বেল সবকিছু মন থেকে সরিয়ে দিন। চোখের সামনে আনুন চৌদ্দশ বছর আগের সেই দৃশ্য।
মাটির দেয়াল। খেজুর পাতার ছাউনি। খেজুর গাছের কাণ্ডের স্তম্ভ। বালির মেঝে। বর্ষা হলে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে। কখনো কাদা জমে যাচ্ছে। গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম।
শীতে ঠান্ডা। বাহ্যিক সৌন্দর্যের দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ স্থাপনাগুলোর একটি।
কিন্তু বাস্তবে এটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভবন। কারণ এখানে বসতেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ।
এখানেই ওহী নাযিল হতো। এখানেই জিবরীল (আ.) আসতেন। এখানেই কুরআনের আয়াত শিক্ষা দেওয়া হতো। এখানেই মানুষকে আল্লাহর পরিচয় শেখানো হতো।
আশ্চর্যের বিষয় হলো মসজিদটি বড় ছিল না।
সম্পদও ছিল না। প্রযুক্তিও ছিল না। বিশাল ভবনও ছিল না। কিন্তু ছিল কুরআন। ছিল ওহী। ছিল তারবিয়াত। ছিল নবীর সোহবত।
আজ আমরা অনেক সময় মসজিদের সৌন্দর্য দেখি।
মার্বেল দেখি। কারুকাজ দেখি।স্থাপত্য দেখি। কিন্তু সাহাবারা যখন মসজিদে নববীর দিকে তাকাতেন, তারা একটি ভবন দেখতেন না।
তারা দেখতেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়। একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। একটি তারবিয়াতের ময়দান। একটি ঈমান তৈরির কারখানা। একটি উম্মাহ গড়ার কেন্দ্র।
মসজিদে নববীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ইসলাম ভবন দিয়ে ইতিহাস বদলায়নি ইসলাম মানুষ গড়ে ইতিহাস বদলেছে। মসজিদের সবচেয়ে বড় কাজ দেয়াল নির্মাণ নয় বরং মানুষ নির্মাণ।
যে মসজিদ মানুষ গড়ে, সেই মসজিদই উম্মাহ গড়ে।
আর যে উম্মাহ গড়ে, সেই উম্মাহই ইতিহাস গড়ে।
এই মসজিদে বসে নিজেদেরকে আসুন প্রশ্ন করি আমরা কি শুধু মসজিদের সৌন্দর্য দেখছি না সেই সাহাবিদের উত্তরাধিকার গ্রহণ করতে এসেছি, যারা এই মসজিদের মেঝেতে বসে কুরআন শিখেছিল, ঈমান শিখেছিল এবং পৃথিবী পরিবর্তন করেছিল?
মসজিদে কুবা।
হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বপ্রথম যে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, সেটিই মসজিদে কুবা।কুরআন এই মসজিদকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে—
لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ
“যে মসজিদ প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে…” (সূরা তাওবা: ১০৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই মসজিদকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এসেছে, তিনি প্রায়ই—বিশেষত প্রতি শনিবার—কুবায় আসতেন, কখনো হেঁটে, কখনো বাহনে চড়ে, এবং এখানে দুই রাকাআত নামাজ আদায় করতেন।
আর এই মসজিদের নামাজের একটি অসাধারণ ফজিলত রয়েছে। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন—
مَنْ تَطَهَّرَ فِي بَيْتِهِ ثُمَّ أَتَى مَسْجِدَ قُبَاءٍ فَصَلَّى فِيهِ صَلَاةً كَانَ لَهُ كَأَجْرِ عُمْرَةٍ
যে ব্যক্তি নিজের ঘরে ওযু করবে, তারপর মসজিদে কুবায় এসে নামাজ আদায় করবে, তার জন্য একটি উমরার সমপরিমাণ সওয়াব হবে।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
একটি উমরার সওয়াব! এ কারণেই যুগে যুগে আল্লাহর নেক বান্দারা মসজিদে কুবায় এসে দুই রাকাআত নামাজ আদায় করার সৌভাগ্য অর্জনের চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু একটু লক্ষ্য করুন এই ফজিলতের পেছনেও একটি শিক্ষা রয়েছে। রাসূল ﷺ মদিনার কেন্দ্র থেকে কুবা পর্যন্ত আসতেন।
এর মাধ্যমে তিনি শিখিয়েছেন যে মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে কষ্ট স্বীকার করে, আল্লাহ তার জন্য বিশেষ প্রতিদান সংরক্ষণ করেন।
কুবার সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু এই ফজিলত নয়।
মদিনায় এসে রাসূল ﷺ প্রথমে কোনো প্রাসাদ নির্মাণ করেননি। কোনো বাজার নির্মাণ করেননি। কোনো দুর্গ নির্মাণ করেননি। প্রথমে নির্মাণ করেছিলেন একটি মসজিদ।
কারণ ইসলাম জানে মানুষের অন্তর ঠিক হলে সমাজ ঠিক হবে। সমাজ ঠিক হলে সভ্যতা ঠিক হবে। আর অন্তর গঠনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হলো মসজিদ। তাই ইসলামের ইতিহাস শুরু হয়েছে একটি মসজিদ দিয়ে।
আজ আমরা কুবার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে প্রশ্ন করি আমাদের জীবনের কেন্দ্র কী?ব্যবসা চাকরি দুনিয়া নাকি মসজিদ ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক?
মসজিদে কিবলাতাইন
অর্থাৎ—দুই কিবলার মসজিদ। আজ আমরা এটিকে একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে দেখি। এখানে সাহাবায়ে কেরামদের ঈমানের কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল এবং তার উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।
রাসূল ﷺ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর প্রায় ষোল বা সতেরো মাস মুসলমানরা বায়তুল মাকদিসের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর অন্তরে একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল।
তাঁর হৃদয় চাইত কিবলা হোক কাবা। আল্লাহ তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা দেখছিলেন। আল্লাহ বলেন—
قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ
“আমি আপনার মুখমণ্ডলকে বারবার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। (সূরা বাকারা : ১৪৪)
তারপর নির্দেশ এলো—
فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ
আপনি আপনার মুখমণ্ডল মসজিদুল হারামের দিকে ফিরিয়ে নিন।
এখানে শুধু কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেনি। এখানে ঈমানের পরীক্ষা হয়েছে। আল্লাহ নিজেই বলেন—
وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنْتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّنْ يَنْقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ
আমি পূর্বের কিবলাকে শুধু এজন্য নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে প্রকাশ পায় কে রাসূলের অনুসরণ করে আর কে পিছনে ফিরে যায়।(সূরা বাকারা : ১৪৩)
আল্লাহ বলছেন এটি ছিল একটি পরীক্ষা। প্রশ্ন ছিল
তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের সামনে কতটা আত্মসমর্পণ করতে পারো?
ভাবুন সেই দৃশ্য। সাহাবারা নামাজ পড়ছেন। রুকু-সিজদা করছেন। এমন সময় নির্দেশ এলো কিবলা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন কাবার দিকে মুখ করতে হবে। তারা নামাজ ভেঙে ফেললেন না।
তারা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ালেন। যেদিকে মুখ ছিল সেদিক ছেড়ে দিলেন। যেদিকে আল্লাহ চাইলেন সেদিকে মুখ করলেন। এ কারণেই কুরআন তাদের প্রশংসা করেছে।
এই মসজিদের দেয়াল যেন আজও আমাদের একটি প্রশ্ন করে আমাদের আনুগত্য কেমন? নামাজের আদেশ এলে? পর্দার আদেশ এলে? সুদ বর্জনের আদেশ এলে?
আগে বুঝতে চাই তারপর মানতে চাই। না আগে মানতে চাই তারপর বুঝতে চাই।
সাহাবাদের ঈমানের সৌন্দর্য ছিল তারা সবকিছু বুঝে মানতেন না।ৎতারা বিশ্বাস করতেন যিনি আদেশ দিচ্ছেন, তিনি আল্লাহ। যার মাধ্যমে আদেশ এসেছে, তিনি রাসূল ﷺ। সুতরাং মানতেই হবে।
এ কারণেই কুরআন মুমিনদের পরিচয় দিয়েছে—
سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। (সূরা বাকারা : ২৮৫)
আর মুনাফিকদের পরিচয়—
سَمِعْنَا وَعَصَيْنَا
“আমরা শুনলাম, কিন্তু অমান্য করলাম।”
এই মসজিদ আমাদের শেখায় ইসলাম শুধু আবেগের নাম নয়। ইসলাম শুধু ভালো লাগার নাম নয়। ইসলাম আত্মসমর্পণের নাম। ইসলাম আনুগত্যের নাম। ইসলাম নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে কুরবানি করার নাম।
তাই মসজিদে কিবলাতাইনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন আমার জীবনে এমন কোন বিষয় আছে, যেখানে আমি এখনও আল্লাহর দিকে ঘুরে দাঁড়াতে পারিনি? কোন গুনাহ এখনও আমার কিবলা হয়ে আছে? কোন দুনিয়াবী আকর্ষণ এখনও আমাকে আল্লাহর আদেশ থেকে ফিরিয়ে রাখছে?
কারণ কিবলা পরিবর্তনের প্রকৃত শিক্ষা শুধু দিক পরিবর্তন নয়। এটি হৃদয়ের দিক পরিবর্তন।
যে দিন একজন মানুষ নিজের নফস, প্রবৃত্তি, অহংকার এবং দুনিয়ার দাসত্ব থেকে ফিরে আল্লাহর দিকে মুখ ফেরায়সেদিন তার জীবনেও একটি নতুন “কিবলাতাইন” ঘটতে শুরু করে।
আল্লাহ আমাদেরকে সাহাবাদের মতো বলতে তাওফিক দিন—
سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
“আমরা শুনলাম এবং আমরা মেনে নিলাম।”
মসজিদুল গামামাহ
ঈদের ময়দান, কান্নার ময়দান। এখানে যে ছোট্ট মসজিদটি দেখছেন, এটি শুধু একটি মসজিদ নয়।
এটি একসময় ছিল মদিনার ঈদগাহ।
একটু কল্পনা করুন এখানে ঈদের দিন প্রিয় নবী সাহাবায়ে কেরাম মদিনার পুরুষ, নারী, শিশু—সবাই ঈদের আনন্দে একত্রিত হয়েছে। চারদিকে তাকবীরের ধ্বনি—
الله أكبر الله أكبر لا إله إلا الله، والله أكبر الله أكبر ولله الحمد
মদিনার আকাশ মুখরিত হয়েছে। এটি ছিল একটি উম্মাহর মিলনমেলা। এখানে ধনী-গরিবের পার্থক্য ছিল না। আরব-অনারবের পার্থক্য ছিল না।সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করত।
যখন মদিনায় বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যেত, মাটি ফেটে যেত,
খেজুর বাগান শুকিয়ে যেতে শুরু করত, পশুপাখি কষ্ট পেত, মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ত, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবাদের নিয়ে এখানে আসতেন। এখানে সালাতুল ইস্তিসকা আদায় করতেন।
দুই হাত আকাশের দিকে তুলে দোয়া করতেন। মানুষ কান্না করত। মানুষ নিজেদের অসহায়ত্ব স্বীকার করত।
মানুষ বুঝত পানি কূপ থেকে আসে না। মেঘ থেকে আসে না। সবকিছু আসে আল্লাহর কাছ থেকে।
তারপর আল্লাহ আকাশের দরজা খুলে দিতেন। মেঘ আসত। বৃষ্টি নামত। শুকিয়ে যাওয়া জমিন আবার জীবন্ত হয়ে উঠত।
তাই মসজিদুল গামামাহ আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয় মদিনা শুধু বিজয়ের শহর ছিল না। মদিনা শুধু বদর, উহুদ ও খন্দকের শহর ছিল না। মদিনা ছিল দোয়ার শহর। মদিনা ছিল বিনয়ের শহর। মদিনা ছিল আল্লাহর সামনে কান্নার শহর।
যে শহরের মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসী ছিল, সেই শহরের মানুষ সিজদায় ছিল অশ্রুসিক্ত। যে হাত তলোয়ার ধরত, সেই হাতই আবার আকাশের দিকে উঠত দোয়ার জন্য।
আজ আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি।জ্ঞান আছে।
প্রযুক্তি আছে। সুযোগ-সুবিধা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—
আমাদের চোখে কি সেই অশ্রু আছে? আমাদের হৃদয়ে কি সেই অসহায়ত্ব আছে? আমরা কি এখনও বিপদের সময় আল্লাহর দিকে ফিরি, নাকি শুধু দুনিয়ার উপকরণের ওপর ভরসা করি?
মসজিদুল গামামাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—
একটি উম্মাহ তখনই মহান হয়, যখন সে বিজয়ের সময় শুকরিয়া আদায় করে, আর সংকটের সময় আল্লাহর দরবারে কান্না করতে জানে।
আবু বকর ও উমরের মসজিদ
দুটি ছোট মসজিদ। এগুলো হয়তো স্থাপত্যের দিক থেকে খুব বড় নয়। এখানে বিশাল গম্বুজ নেই। এখানে সুবিশাল চত্বর নেই। এখানে হাজার হাজার মুসল্লির ভিড়ও নেই।
কিন্তু এই দুটি মসজিদ আপনাকে এমন দুই মানুষের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যাদের ছাড়া ইসলামের ইতিহাস কল্পনা করা যায় না। একটি মসজিদের নাম আবু বকর। অন্যটি উমর।
এই স্থানগুলো সেই ঐতিহাসিক মুসাল্লা এলাকার অংশ, যেখানে রাসূল ﷺ ঈদের নামাজ আদায় করতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর আবু বকর (রা.) এবং পরে উমর (রা.) একই স্থানে ঈদের জামাত পরিচালনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য এই মসজিদগুলো নির্মিত হয় এবং তাদের নামে পরিচিতি লাভ করে।
আবু বকর (রা.)-এর মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন কীভাবে একজন মানুষ “সিদ্দীক” হয়ে গেলেন? কীভাবে একজন মানুষ এমন মর্যাদা পেলেন যে কুরআন তাঁকে রাসূল ﷺ-এর “সঙ্গী” বলে পরিচয় দিল? আল্লাহ বলেন—
إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا
“যখন তিনি তাঁর সঙ্গীকে বলছিলেন, চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। (সূরা তাওবা : ৪০)
কুরআন বহু মানুষের নাম উল্লেখ করেনি। কিন্তু আবু বকর (রা.)-কে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেস সাহিবিহি তাঁর সঙ্গী। কোন ঈমান একজন মানুষকে এই মর্যাদায় পৌঁছে দেয়?
তারপর হযরত ওমরের কথা বলি। ইবনু মাসউদ (রা.) বলতেন “উমরের ইসলাম ছিল বিজয়, তাঁর হিজরত ছিল সাহায্য, তাঁর খিলাফত ছল রহমত।”
একদিন রাসূল ﷺ দোয়া করেছিলেন হে আল্লাহ! উমর ইবনু খাত্তাব অথবা আমর ইবনু হিশামের মাধ শক্তিশালী করুন।আল্লাহ উমরকে বেছে নিলেন।
রাসূল ﷺ বলেছেন “উমর যে পথে চলে, শয়তান সে পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে যায়। শয়তান যাকে ভয় পায়, সে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় পেত।
এই মসজিদ দুটি আমাদের কী শেখায়? আবু বকরের মসজিদ বলে ঈমান মানে নিঃশর্ত বিশ্বাস। উমরের মসজিদ বলে ঈমান মানে আল্লাহভীতি ও মানুষের সেবা। আবু বকর শেখান রাসূল ﷺ-কে সত্য মনে করো। উমর শেখান আল্লাহকে ভয় করো।
এই মসজিদ দুটি দেখে শুধু ছবি তুলবেন না। নিজেকে প্রশ্ন করবেন আমার জীবনে আবু বকরের মতো বিশ্বাস কতটুকু আছে? আমার জীবনে উমরের মতো আল্লাহভীতি কতটুকু আছে?
কারণ মদিনা থেকে যদি শুধু খেজুর নিয়ে ফিরি, তাহলে খুব সামান্য কিছু নিয়ে ফিরলাম। কিন্তু যদি আবু বকরের ঈমানের কিছু অংশ এবং উমরের তাকওয়ার কিছু অংশ নিয়ে ফিরতে পারি তাহলে আমরা সত্যিই মদিনা থেকে সম্পদ নিয়ে ফিরলাম।
খন্দকের যুদ্ধ ও মাসাজিদে সাবআ
যখন পুরো পৃথিবী মদিনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। এটি শুধু কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদের সমষ্টি নয়। এখানে রয়েছে ঈমান ও কুফরের সবচেয়ে কঠিন সংঘর্ষগুলোর একটির স্মৃতি।
এটি সেই ভূমি, যেখানে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেছিলেন। এটি সেই ভূমি, যেখানে সাহাবারা প্রমাণ করেছিলেন—ঈমান শুধু মুখের কথা নয়।
চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন। মক্কার কুরাইশ। নাজদের গোত্রসমূহ। গাতাফান। ইহুদি গোত্রগুলো। সবাই এক হয়ে গেছে।
লক্ষ্য একটাই মদিনাকে ধ্বংস করতে হবে। ইসলামের আলো নিভিয়ে দিতে হবে। দশ হাজার সৈন্য এগিয়ে আসছে। আর মদিনায় মাত্র তিন হাজার মুসলমান। অস্ত্র কম। খাদ্য কম। সামর্থ্য কম। কিন্তু ঈমান ছিল পাহাড়সম।
তখন সালমান (রা.) একটি পরামর্শ দিলেন। পারস্যে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। তিনি বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা খন্দক খনন করি। পরামর্শ গ্রহণ করা হলো। রাসূল ﷺ নিজেও কোদাল হাতে নেমে গেলেন। নেতা নির্দেশ দিচ্ছেন না। নেতা শ্রমিক হয়ে গেছেন। পাথর ভাঙছেন। মাটি বহন করছেন। ঘাম ঝরাচ্ছেন।
ক্ষুধার সেই দিনগুলো। সাহাবারা পেটে পাথর বেঁধেছেন। রাসূল ﷺ নিজের কাপড় উঠিয়ে দেখালেন একটি নয়, দুটি পাথর বাঁধা। সাহাবারা ক্ষুধার্ত। কিন্তু অভিযোগ নেই। কারণ সামনে রাসূল ﷺ দাঁড়িয়ে আছেন।
খনন করতে গিয়ে একটি বিশাল পাথর সামনে এল।
কেউ ভাঙতে পারছে না। রাসূল ﷺ এলেন। কোদালের আঘাত করলেন। একটি স্ফুলিঙ্গ বের হলো।
তিনি বললেন আমাকে শামের চাবি দেওয়া হয়েছে। আরেক আঘাত। আমাকে পারস্যের চাবি দেওয়া হয়েছে। আরেক আঘাত। আমাকে ইয়েমেনের চাবি দেওয়া হয়েছে।
খন্দকের ভেতরে ক্ষুধার্ত মানুষ। চারদিকে শত্রু। তবুও রাসূল ﷺ ভবিষ্যতের বিজয়ের কথা বলছেন। মুমিন সংকট দেখে না। মুমিন আল্লাহর ওয়াদা দেখে।
কুরআন সেই দৃশ্য বর্ণনা করছে। আল্লাহ বলেন—
إِذْ جَاءُوكُم مِّن فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ
“যখন তারা তোমাদের উপর থেকে ও নিচ থেকে এসে পড়েছিল, আর চোখ ভয়ে স্থির হয়ে গিয়েছিল, হৃদয় কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। (সূরা আহযাব : ১০)
সাহাবারাও ভয় পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা পালিয়ে যাননি। মুনাফিকরা বলছিল মুহাম্মাদ আমাদের কিসরা-কায়সারের রাজ্যের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, অথচ আমরা নিরাপদে পায়খানায়ও যেতে পারছি না!
এটাই মুনাফিকের দৃষ্টি। সে শুধু বর্তমান দেখে। মুমিন ভবিষ্যৎ দেখে। মুনাফিক সমস্যা দেখে। মুমিন আল্লাহকে দেখে।
নু’আইম ইবনে মাসউদের ঘটনা। একজন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন। নু’আইম ইবনে মাসউদ (রা.)।
রাসূল ﷺ বললেন তুমি তো একাই আছো, যতটুকু পারো আমাদের সাহায্য করো।
তিনি শত্রু শিবিরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলেন। কুরাইশ ও ইহুদিদের মাঝে অবিশ্বাস ছড়িয়ে দিলেন। কোনো তরবারি নয়। কোনো সেনাবাহিনী নয়। একজন মানুষের হিকমত পুরো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
তারপর আল্লাহর সাহায্য এল। আল্লাহ একটি ঝড় পাঠালেন। তীব্র বাতাস। শত্রুদের তাঁবু উড়ে গেল।আগুন নিভে গেল। শিবির ভেঙে গেল। অবশেষে তারা পালিয়ে গেল। আল্লাহ বলেন—
وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا
আল্লাহ কাফিরদের তাদের ক্রোধসহ ফিরিয়ে দিলেন; তারা কোনো কল্যাণ অর্জন করতে পারল না। (সূরা আহযাব : ২৫)
মাসজিদে সাবআ আমাদের কী শেখায়?
মাসজিদে ফাতহ শেখায় বিজয় প্রথমে সিজদায় আসে, পরে ময়দানে আসে। সালমান ফারসীর মসজিদ শেখায় একজন মানুষের সৎ পরামর্শ একটি উম্মাহকে রক্ষা করতে পারে। আলী (রা.)-এর মসজিদ শেখায় সাহস ঈমানের ফল। উমর (রা.)-এর মসজিদ শেখায় সংকটে দৃঢ়তা দরকার।
খন্দকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা জীবনে এমন সময় আসবেৎযখন সব দরজা বন্ধ মনে হবে। সব হিসাব ব্যর্থ মনে হবে। সবাই বিপক্ষে মনে হবে।
কিন্তু খন্দক আমাদের শেখায়্যযখন বান্দা আল্লাহকে ছাড়ে না, আল্লাহও বান্দাকে ছাড়েন না। সাহাবারা খন্দকে ক্ষুধা দেখেছেন। ভয় দেখেছেন। বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছেন। কিন্তু আল্লাহর ওয়াদা নিয়ে সন্দেহ করেননি।
আর এজন্যই আজ আমরা তাদের কথা বলছি। খন্দক শুধু একটি যুদ্ধের নাম নয়। খন্দক হলো সংকটের মধ্যেও আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার নাম।
মসজিদুল ফাতহ।
মাসাজিদে সাবআর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ মসজিদুল ফাতহ। ফাতহ অর্থ বিজয়। কিন্তু এই বিজয় তলোয়ারের আগে এসেছিল চোখের পানিতে।
খন্দকের সেই ভয়ংকর দিনগুলো। চারদিক থেকে দশ হাজার সৈন্য। মদিনা অবরুদ্ধ। মুনাফিকদের বিদ্রূপ।
আল্লাহ সেই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন—
وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ
চোখ ভয়ে স্থির হয়ে গিয়েছিল, আর হৃদয় কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। (সূরা আহযাব : ১০)
এই অবস্থায় রাসূল ﷺ হতাশ হলেন না। তিনি আল্লাহর কাছে দাঁড়ালেন। হাত তুললেন। কাঁদলেন।দোয়া করলেন। হযরত জাবির (রা.) ও অন্যান্য সাহাবীদের বর্ণনায় আসে, তিনি আল্লাহর সাহায্যের জন্য বারবার প্রার্থনা করেছেন।
এখানে দাঁড়িয়ে ভাবুন মুহাম্মাদ ﷺ-এর মতো আল্লাহর প্রিয় বান্দাকেও বিজয়ের জন্য দোয়া করতে হয়েছে।
আর আজ আমরা ফলাফল চাই। কিন্তু দোয়ার অশ্রু চাই না। আমরা সাহায্য চাই। কিন্তু তাহাজ্জুদ চাই না।
আমরা বিজয় চাই। কিন্তু আত্মসমর্পণ চাই না। খন্দক আমাদের শেখায় সিজদায় যে কাঁদতে পারে না, সে ময়দানে বিজয়ীও হতে পারে না।
এই মসজিদ আপনাকে একটি কথাই শেখাবে বিজয় শক্তি থেকে আসে না, বিজয় আসে আল্লাহর সাহায্য থেকে।
মসজিদে সালমান ফারসী (রাঃ)
হযরত সালমান ফারসি তিনি জন্মসূত্রে আরব ছিলেন না। তিনি কুরাইশ ছিলেন না। তিনি মদিনাবাসীও ছিলেন না।তিনি ছিলেন দূর পারস্যের একজন যুবক।
সালমান ফারসী (রা.)। তাঁর জীবনের গল্প শুনলে মনে হয় যেন হিদায়াতের জন্য লেখা একটি উপন্যাস। ধনী পরিবারের সন্তান। পিতা তাঁকে খুব ভালোবাসতেন।কিন্তু একদিন তিনি সত্যের সন্ধান পেলেন। এরপর শুরু হলো দীর্ঘ যাত্রা। এক শহর থেকে আরেক শহর।
এক আলেম থেকে আরেক আলেম। এক দেশ থেকে আরেক দেশ। শেষ পর্যন্ত তিনি দাস হিসেবে বিক্রি হয়ে গেলেন। শৃঙ্খলে আবদ্ধ জীবন। কিন্তু তিনি থামেননি।
তিনি আল্লাহকে খুঁজছিলেন। অবশেষে তিনি মদিনায় এলেন। এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে চিনে ফেললেন। তিনি জানলেন এটাই সেই নবী, যার কথা পূর্ববর্তী আলেমরা বলেছিলেন।
একজন মানুষ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে রাসূল ﷺ-এর কাছে পৌঁছালেন। এই মসজিদ আমাদের শেখায় যে সত্যকে সত্যিকার অর্থে খোঁজে, আল্লাহ তাকে পথ দেখান।
খন্দকের যুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। পারস্যের যুদ্ধকৌশল থেকে তিনি খন্দক খননের পরামর্শ দিয়েছিলেন। একজন মানুষের চিন্তা পুরো উম্মাহকে রক্ষা করেছিল। তাই এই মসজিদ শুধু সালমানের স্মৃতি নয়। এটি জ্ঞানের মর্যাদার স্মৃতি। সত্য অনুসন্ধানের স্মৃতি। কুরবানির স্মৃতি।
মসজিদে আলী (রা.)
হযরত আলী (রা.)-কে শুধু যুদ্ধের মানুষ মনে করলে তাঁকে চেনা হবে না। তিনি ছিলেন রাতের কান্নার মানুষ।
দিনে মুজাহিদ। রাতে আবিদ। দিনে সিংহ। রাতে অশ্রুসিক্ত বান্দা। খায়বারের দিন রাসূল ﷺ বলেছিলেন “আগামীকাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন।”
পরদিন পতাকা দেওয়া হলো আলী (রা.)-কে। এটি শুধু সামরিক যোগ্যতার স্বীকৃতি ছিল না। এটি ছিল ঈমানের স্বীকৃতি। মহব্বতের স্বীকৃতি। আল্লাহর নৈকট্যের স্বীকৃতি।
এই মসজিদ আমাদের শেখায় সত্যিকারের বীর সে নয় যে মানুষকে পরাজিত করে। সত্যিকারের বীর সে, যে নিজের নফসকে পরাজিত করে।
এই মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আলী (রা.) যেন আমাদের প্রশ্ন করেন তুমি কি শুধু বিজয়ের গল্প শুনতে চাও? নাকি সেই ঈমানও অর্জন করতে চাও, যা মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বানিয়ে দেয়?
মসজিদে জুমু’আহ
হিজরতের পথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রথম জুমু’আহ এখানে আদায় করেন। এটি শুধু একটি নামাজ ছিল না। এটি ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি মুহূর্ত।
মক্কায় মুসলমান ছিল। তারা ঈমান নিয়ে বেঁচে ছিল। নির্যাতন সহ্য করছিল। তাওহীদের দাওয়াত দিচ্ছিল।
কিন্তু মদিনায় এসে শুধু মুসলমানদের একটি দল তৈরি হলো না, একটি উম্মাহ প্রতিষ্ঠিত হলো।
এখানেই প্রথমবারের মতো ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম রইল না; ইসলাম সমাজ গঠনের শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
মদিনার প্রথম জুমু’আহ আমাদের শিখায়, মুসলমান শুধু নিজের নাজাত নিয়ে চিন্তা করবে না; সে উম্মাহর চিন্তা করবে। দ্বীনের চিন্তা করবে। সমাজের চিন্তা করবে। জুমু’আহ শুধু দুই রাকাআত নামাজের নাম নয়। জুমু’আহ হলো প্রতি সপ্তাহে উম্মাহর পুনর্জাগরণের দিন। ঈমান নবায়নের দিন। ভ্রাতৃত্ব দৃঢ় করার দিন। আল্লাহর দিকে ফিরে আসার দিন।
আজ আমরা যখন এই ঐতিহাসিক স্থানে দাঁড়াই, নিজেকে প্রশ্ন করি আমার জীবনে কি জুমু’আহ শুধু একটি রুটিন? নাকি এটি আমার ঈমানকে জাগিয়ে তোলার একটি উপলক্ষ?
মদিনার প্রথম জুমু’আহ ছিল ঐক্যের সূচনা। আমাদের প্রতিটি জুমু’আহও যেন ঈমান, ঐক্য ও দ্বীনের নবজাগরণের কারণ হয়ে যায়।
মসজিদে ইজাবাহ
ইজাবাহ”—অর্থাৎ দোয়া কবুল হওয়ার মসজিদ।
একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার উঁচু এলাকা থেকে ফিরে এসে বনী মু’আবিয়ার এই মসজিদে প্রবেশ করলেন। তিনি দুই রাকাআত নামাজ আদায় করলেন। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। সাহাবারা অপেক্ষা করছিলেন।
দোয়া শেষে তিনি বললেন “আমি আমার রবের কাছে তিনটি বিষয় চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে দুটি দিয়েছেন, আর একটি দেননি।
প্রথম দোয়া ছিল—
হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষ ও সামষ্টিক ক্ষুধায় ধ্বংস করো না।
দ্বিতীয় দোয়া ছিল—
হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে মহাপ্লাবন বা ডুবিয়ে ধ্বংস করো না। আল্লাহ এই দুটি দোয়া কবুল করেছেন।
কিন্তু তৃতীয় দোয়া ছিল—
“হে আল্লাহ! আমার উম্মতের মধ্যে পারস্পরিক বিভক্তি, সংঘাত ও রক্তপাত সৃষ্টি করো না। এই দোয়াটি আল্লাহ কবুল করেননি।
এখানে নবী ﷺ নিজের জন্য কিছু চাননি। ধন-সম্পদ চাননি। দীর্ঘ জীবন চাননি। তিনি চিন্তা করেছেন তাঁর উম্মতকে নিয়ে। আর সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি তাঁকে ব্যথিত করেছিল, সেটি ছিল উম্মতের বিভক্তি।
আজ চৌদ্দশ বছরের ইতিহাস আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা দেখেছি মতভেদ, দলাদলি, সংঘাত, রক্তপাত, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। মনে হয় যেন মসজিদে ইজাবাহর সেই দীর্ঘ দোয়ার প্রতিধ্বনি আজও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
এই মসজিদ আমাদের শেখায় উম্মাহর সবচেয়ে বড় শক্তি সংখ্যা নয়, সম্পদ নয়, ক্ষমতা নয় সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ঐক্য। আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বিভক্তি।
আজ এই পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত যে নবী ﷺ উম্মতের জন্য কেঁদেছেন,
আমি কি উম্মতের জন্য কাঁদি? যে নবী ﷺ উম্মতের ঐক্যের জন্য দোয়া করেছেন, আমি কি ঐক্য নষ্ট করি, নাকি ঐক্য গড়ি?
মসজিদে সাজদাহ
এটি সেই স্থান, যেখানে একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন এক সিজদায় পড়ে গিয়েছিলেন, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়ে গিয়েছিল। সাহাবায়ে কেরাম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
তাঁরা ভাবলেন হয়তো ওহী নাযিল হচ্ছে। হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ নির্দেশ আসছে।
নামাজ শেষে সাহাবারা কারণ জানতে চাইলে রাসূল ﷺ জানালেন, জিবরীল (আ.) তাঁর কাছে এসে এমন একটি সুসংবাদ দিয়েছেন, যার কারণে তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়ার সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন।
সুসংবাদটি ছিল তাঁর উম্মতকে নিয়ে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জানিয়েছিলেন যে ব্যক্তি নবীর প্রতি একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার প্রতি দশটি রহমত নাযিল করবেন, দশটি গুনাহ মাফ করবেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করবেন।
এই সুসংবাদে নবী ﷺ এতটাই আনন্দিত হয়েছিলেন যে সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় চলে গিয়েছিলেন।
একটু চিন্তা করুন যে সংবাদ আমাদের জন্য, যে রহমত আমাদের জন্য, যে ক্ষমা আমাদের জন্য,
সেই সুসংবাদ শুনে আনন্দে সিজদায় পড়ে গেছেন রাসূল ﷺ।
তিনি নিজের জন্য আনন্দিত হননি তিনি উম্মতের নাজাতের জন্য আনন্দিত হয়েছেন। আজ আমরা কত নিয়ামত পাই! সুস্থ শরীর পাই। নিরাপদ জীবন পাই।
মসজিদে আসার তাওফীক পাই। কাবা ও মদিনা জিয়ারতের সুযোগ পাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা কি শুকরিয়া আদায় করি? নিয়ামত বাড়লে আমরা আনন্দিত হই, কিন্তু সিজদায় পড়ি কতবার?
আমরা চাই আল্লাহ আরও দান করুন, কিন্তু যা দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতা কতটুকু প্রকাশ করি?
মসজিদে সাজদাহ আমাদের শেখায় মুমিনের পরিচয় শুধু চাওয়ায় নয়, শুকরিয়ায়। শুধু দুআয় নয়, সিজদায়। শুধু প্রাপ্তিতে নয়, প্রাপ্তির স্বীকৃতিতে।
এই ঐতিহাসিক মসজিদের পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়ে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি হে আল্লাহ! তুমি যে অগণিত নিয়ামত দিয়েছ, তার কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়ার তাওফীক দাও। আমাদের জীবনকে অভিযোগের জীবন নয়,
শুকরিয়ার জীবন বানিয়ে দাও।
মসজিদে সুকইয়া
এখানেই বদরের অভিযানে বের হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর সঙ্গীদের পরিদর্শন করেছিলেন।
এখানেই সেনাদলকে সাজানো হয়েছিল। এখানেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এখানেই আল্লাহর সাহায্যের জন্য দোয়া করা হয়েছিল।
বদরের যুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি। বিজয়ের কোনো নিশ্চয়তা চোখে দেখা যাচ্ছিল না। সংখ্যায় মুসলমান ছিল মাত্র তিন শতাধিক। অস্ত্র ছিল অল্প। সামর্থ্য ছিল সীমিত। কিন্তু ঈমান ছিল আকাশসমান। তাওয়াক্কুল ছিল অটুট। আর নেতৃত্বে ছিলেন আল্লাহর রাসূল ﷺ।
ইতিহাসের বড় বিজয়গুলো যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয়,
কিন্তু তার প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে। বদরের বিজয়ও শুরু হয়েছিল এই ধরনের প্রস্তুতির স্থানগুলো থেকে। তাই মসজিদে সুকইয়া আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—
শুধু দোয়া যথেষ্ট নয়, প্রস্তুতিও দরকার।
শুধু আশা যথেষ্ট নয়, চেষ্টা ও ত্যাগও দরকার।
রাসূল ﷺ দোয়া করেছেন, আবার সেনাদলও প্রস্তুত করেছেন। আল্লাহর ওপর ভরসা করেছেন, আবার সব সামর্থ্যও কাজে লাগিয়েছেন।
আজ আমরা অনেক সময় ফলাফল চাই, কিন্তু প্রস্তুতি চাই না। বিজয় চাই, কিন্তু ত্যাগ চাই না। সফলতা চাই,
কিন্তু কষ্ট সহ্য করতে চাই না।
মদিনা আমাদের শেখায় মসজিদ শুধু সিজদার জায়গা নয়, মানুষ গড়ার জায়গা। মসজিদ শুধু ইবাদতের কেন্দ্র নয়, উম্মাহর শক্তি গঠনের কেন্দ্র।
তাই মদিনার ইতিহাস শুধু মসজিদের ইতিহাস নয়।
এটি ঈমানের ইতিহাস। এটি ত্যাগের ইতিহাস। এটি প্রস্তুতির ইতিহাস। এটি সেই মানুষদের ইতিহাস, যারা আল্লাহর জন্য নিজেদের জীবন, সম্পদ, আরাম ও স্বার্থ কুরবান করেছিলেন।
আজ মসজিদে সুকইয়ার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে প্রশ্ন করি আমরা কি শুধু বিজয়ের গল্প শুনতে ভালোবাসি, নাকি সেই বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগের পথেও হাঁটতে প্রস্তুত?
আপনি যখন মদিনার ঐতিহাসিক মসজিদগুলো দেখবেন শুধু ছবি তুলবেন না। শুধু ভিডিও করবেন না।
প্রতিটি স্থানে দাঁড়িয়ে কল্পনা করুন এখানে রাসূল ﷺ দাঁড়িয়েছিলেন। এখানে সাহাবারা বসেছিলেন। এখানে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে। এখানে উম্মাহর ইতিহাস লেখা হয়েছে।
মদিনা থেকে যদি আপনি শুধু খেজুর নিয়ে ফেরেন তাহলে খুব সামান্য জিনিস নিয়ে ফিরলেন। যদি আতর নিয়ে ফেরেন তাহলেও খুব সামান্য জিনিস নিয়ে ফিরলেন। কিন্তু যদি রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসা নিয়ে ফেরেন, যদি সাহাবাদের ঈমান নিয়ে ফেরেন,যদি সুন্নাহর প্রতি নতুন অঙ্গীকার নিয়ে ফেরেন, তাহলে আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নিয়ে ফিরলেন।
আল্লাহর কাছে দোয়া করুন তিনি যেন আমাদের মদিনার প্রেমিক বানান। আমরা যেন শুধু মসজিদ থেকে ফিরে না যাই। আমরা যেন এখান থেকে কিছু নিয়ে যাই। প্রিয় রাসুলের ভালোবাসা এবং মৃত্যু পর্যন্ত আনুগত্যের অঙ্গীকার মদিনায় করে যেতে হবে।