এই সপ্তাহের দুঃখজনক সংবাদ হল দেশের শীর্ষস্থানীয বিদ্যাপীঠ ঢাকা ইউনিভার্সিটি এবং জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে একই দিনে পিটিয়ে দুইজনকে হত্যা করা হয়েছে। ইসলামে একজন মানুষের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষ হত্যা ইসলামের দৃষ্টিতে মানবতা বিরোধী জঘন্যতম অপরাধ। এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কঠোর।
মানব হত্যা ইসলামে মানবতাবিরোধী অপরাধ
************************************
সূরা আনআম আয়াত ১৫১
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন
{ ۞ قُلۡ تَعَالَوۡا۟ أَتۡلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمۡ عَلَیۡكُمۡۖ أَلَّا تُشۡرِكُوا۟ بِهِۦ شَیۡـࣰٔاۖ وَبِٱلۡوَ ٰلِدَیۡنِ إِحۡسَـٰنࣰاۖ وَلَا تَقۡتُلُوۤا۟ أَوۡلَـٰدَكُم مِّنۡ إِمۡلَـٰقࣲ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكُمۡ وَإِیَّاهُمۡۖ وَلَا تَقۡرَبُوا۟ ٱلۡفَوَ ٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَۖ وَلَا تَقۡتُلُوا۟ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِی حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّۚ ذَ ٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ }
[Surah Al-Anʿām: 151]
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হারাম কাজের তালিকা আলোচনা করেছেন। এবং তার মাঝে গুরুত্বের সাথে মানবহত্যার বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন।
সূরা আল ইমরান আয়াত ২১ -২২
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এরশাদ করেন
{ إِنَّ ٱلَّذِینَ یَكۡفُرُونَ بِـَٔایَـٰتِ ٱللَّهِ وَیَقۡتُلُونَ ٱلنَّبِیِّـۧنَ بِغَیۡرِ حَقࣲّ وَیَقۡتُلُونَ ٱلَّذِینَ یَأۡمُرُونَ بِٱلۡقِسۡطِ مِنَ ٱلنَّاسِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِیمٍ (21) أُو۟لَـٰۤىِٕكَ ٱلَّذِینَ حَبِطَتۡ أَعۡمَـٰلُهُمۡ فِی ٱلدُّنۡیَا وَٱلۡـَٔاخِرَةِ وَمَا لَهُم مِّن نَّـٰصِرِینَ (22) }
[Surah Āli-ʿImrān: 21-22]
কুরআনে কারীমের এই আয়াতে মানবহত্যাকারী ব্যক্তির দুনিয়া ও আখেরাতে ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।
চলমান বাংলাদেশ একটি পর্যালোচনা
*********************************
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত ছেলেটি সাবেক ক্ষমতায় থাকা দলের কর্মী ছিল। তাকে প্রতিপক্ষরা মেরে হত্যা করেছে। সে যদি অপরাধী হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তাকে তুলে দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শাস্তি প্রদান করার ফলাফল ভালো নয়।
এ অন্যায় হত্যার মাধ্যমে আমরা দুনিয়া আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবো। জাতি হিসেবে আমাদের সভ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা ব্যর্থ হবো। আমাদের সমাজ জীবন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। কারো জীবনের নিরাপত্তা থাকবে না। একই সমাজে থাকা মানুষের মাঝে চিন্তার মতপার্থক্য থাকতে পারে। এজন্য খুন করা সমর্থনযোগ্য নয়।
ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে নিহত ব্যক্তিটির আচরণ সন্দেহজনক ছিল। সে কিছুটা এবনরমাল ছিল। কথাবার্তা এলোমেলো ছিল।
সন্দেহজনক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারার সংস্কৃতি এ দেশে নতুন নয়, এর আগেও দেশে একাধিকবার এমন হয়েছে। সম্ভবত আরও ৫/৭ বছর আগে, ভিকারুননিসা অথবা ঢাকার কোনো স্কুলের সামনে একজন নারী গার্ডিয়ানকে ছেলেধরা সন্দেহে জনসম্মুখে নৃশংসভাবে পিটিয়ে মারা হয়।
এদিকে তার ছোট্ট মেয়েটা ভিড় দেখে যখন দেখতে আসে, তখন দেখে তার মায়ের নিথর দেহ পড়ে আছে। ভিডিওতে দেখা গেছে সেই নারী মৃত্যুর আগে ফিসফিস দুর্বল স্বরে বলছিন, আমি ছেলেধরা না। কিন্তু তার কথাকে কেউ পাত্তা দেয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে যাকে সন্দেহজনকভাবে হত্যা করা হয়েছে এর ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে এটা কোন সভ্য মানুষ মেনে নিবে না। প্রচন্ডভাবে মেরে ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে খাবার দেয়া হয়েছে তারপর আবার একরকম উৎসব করে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এটা অন্যায় হত্যা।
মানুষ হত্যা এটা ব্যক্তি পর্যায়ে হোক আর রাষ্ট্রীয়ভাবে হোক কোনটাই কাম্য না। একজন মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। জীবন মৃত্যু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের হাতে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে মেরে ফেলবে এটা ভয়াবহ বিষয়। এটাকে সমর্থন করা যায় না।
কেন এই হত্যা নিশংসতা
*********************
এই অন্যায় হত্যার একটি কারণ আমাদের এদেশের হিংস্র রাজনীতি। হিংসা বিদ্বেষ বিভেদ বিভক্তি আমাদের মনুষ্যত্ব মানবতা কেড়ে নিচ্ছে। পশুর চেয়েও আমাদেরকে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি এমন ঠান্ডা মাথায় খুন করতে পারে তাহলে দেশ কোথায় যাচ্ছে আমাদের চিন্তা করা চাই। রাজনীতি হবে মানুষের জন্য। মানুষের সেবার জন্য। মানুষ খুনের রাজনীতি থেকে চলে আসতে হবে।
অতীত সব ধরনের বিভক্তি থেকে মুক্ত হয়ে আমরা আগামী দিনে একটি ঐক্যবদ্ধ ইনসাফ পূর্ণা বাংলাদেশ চাই। এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
এই ভয়াবহ হত্যার একটি কারণ নৈতিকতার শিক্ষা নেই। বস্তুবাদী শিক্ষা। এটা আমাদের সকলের সম্মিলিত ফসল। দালানকোঠা হচ্ছে টাকা পয়সা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনুষত্ব হারিয়ে যাচ্ছে । ক্ষমতা নেতৃত্বের নোংরা প্রতিযোগিতায় আমরা বিজয়ী হচ্ছি কিন্তু পরাজিত হচ্ছে আমাদের মানবতা মনুষত্ব ঈমান।
ক্ষমতার চেয়ার পরিবর্তন হচ্ছে। আগের মানুষগুলো পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু নতুন মানুষ আর আগের মানুষের মাঝে পার্থক্য কোথায়। যে ছাত্র জনতা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে জীবন দিল এটা কোন নতুন বাংলাদেশ। আমরা তো হিংস্র তাই দেখছি।
অন্যায় হত্যার আরেকটি কারণ হলো এসব হত্যার বিচার হয় না। যদিও বিচার হয় ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া বিচারিক পদ্ধতিতে বিচার সমাপ্ত হতে পার হয়ে যায় যুগের পর যুগ। ততদিনে মানুষ ভুলে যায় প্রকৃত ঘটনা। দীর্ঘ সময় জেলে থাকা খুনিরা হয়ে যায় অলি আউলিয়া। তখন খুনিদের পরিবর্তন দেখে আমাদের ভালোবাসা সহানুভূতি তৈরি হয়ে যায় তাদের প্রতি। বুয়েটে যে আবরার কে পিটিয়ে মারা হয়েছিল তার খুনিরা এখন কোরআনে হাফেজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী।
প্রয়োজন শরিয়া শাসন
*******************
অন্যায় হত্যা বন্ধে সোনালী সমাজ গড়ে তুলতে প্রয়োজন শরীয়া শাসন। হত্যার প্রয়োজনীয় সাক্ষী প্রমাণে অপরাধী সাব্যস্তের পর প্রকাশ্যে কিসাস কার্যকর করা হবে, তখন অপরাধীদের কলিজায় আর পানি থাকবে না।
মানুষ হত্যা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই। এ কঠিন শাস্তি প্রয়োগেই সমাজ অপরাধমুক্ত হবে।
সূরা বাকারা ১৭৮ আয়াত
আল্লাহ রব্বুল আলামীন এরশাদ করেন
{ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَیۡكُمُ ٱلۡقِصَاصُ فِی ٱلۡقَتۡلَىۖ ٱلۡحُرُّ بِٱلۡحُرِّ وَٱلۡعَبۡدُ بِٱلۡعَبۡدِ وَٱلۡأُنثَىٰ بِٱلۡأُنثَىٰۚ فَمَنۡ عُفِیَ لَهُۥ مِنۡ أَخِیهِ شَیۡءࣱ فَٱتِّبَاعُۢ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَأَدَاۤءٌ إِلَیۡهِ بِإِحۡسَـٰنࣲۗ ذَ ٰلِكَ تَخۡفِیفࣱ مِّن رَّبِّكُمۡ وَرَحۡمَةࣱۗ فَمَنِ ٱعۡتَدَىٰ بَعۡدَ ذَ ٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِیمࣱ }
[Surah Al-Baqarah: 178]
সূরা আল মাঈদা আয়াত ৩২
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এরশাদ করেন
{ مِنۡ أَجۡلِ ذَ ٰلِكَ كَتَبۡنَا عَلَىٰ بَنِیۤ إِسۡرَ ٰۤءِیلَ أَنَّهُۥ مَن قَتَلَ نَفۡسَۢا بِغَیۡرِ نَفۡسٍ أَوۡ فَسَادࣲ فِی ٱلۡأَرۡضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ ٱلنَّاسَ جَمِیعࣰا وَمَنۡ أَحۡیَاهَا فَكَأَنَّمَاۤ أَحۡیَا ٱلنَّاسَ جَمِیعࣰاۚ وَلَقَدۡ جَاۤءَتۡهُمۡ رُسُلُنَا بِٱلۡبَیِّنَـٰتِ ثُمَّ إِنَّ كَثِیرࣰا مِّنۡهُم بَعۡدَ ذَ ٰلِكَ فِی ٱلۡأَرۡضِ لَمُسۡرِفُونَ }
[Surah Al-Māʾidah: 32]
মানব হত্যার পরকালীন শাস্তি সূরা নিসা আয়াত ৯৩
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন
{ وَمَن یَقۡتُلۡ مُؤۡمِنࣰا مُّتَعَمِّدࣰا فَجَزَاۤؤُهُۥ جَهَنَّمُ خَـٰلِدࣰا فِیهَا وَغَضِبَ ٱللَّهُ عَلَیۡهِ وَلَعَنَهُۥ وَأَعَدَّ لَهُۥ عَذَابًا عَظِیمࣰا }
[Surah An-Nisāʾ: 93]
হাদিসের মাঝে এসেছে
كل المسلم على المسلم حرام دمه وماله وعرض
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্য আল্লাহ যে বিধান রাব্বুল আলামীন দিয়েছেন তা নিখুত। এর প্রয়োগের মাধ্যমেই সম্ভব জুলুম অবিচারের ময়লা আবর্জনা মুক্ত একটা পৃথিবী গড়ে তোলা। ইসলাম বিমুখতা আজ দুনিয়াতে আমাদের ভোগাচ্ছে আর এর দ্বারা আমাদের আখেরাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।