ইমামের অজ্ঞতা শুধু তার নিজের ক্ষতি নয়, পুরো মহল্লার ক্ষতি। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন ইমামের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা সুন্দর কণ্ঠ না দীর্ঘ কিরাত?
বরং সবচেয়ে বড় দক্ষতা কুরআনের ইলম।সুন্নাহর ইলম। ফিকহের ইলম। ঈমান ও আকিদার ইলম।হালাল-হারামের ইলম। মানুষকে সঠিক পথে পরিচালনার ইলম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
“বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান? (সূরা যুমার: ৯)
আল্লাহ নেতৃত্বের ভিত্তি বানিয়েছেন ইলমকে। ক্ষমতাকে নয়। ধন-সম্পদকে নয়। বংশকে নয়। প্রভাবকে নয়।
ইমামতি মানে নেতৃত্ব
******************
আমরা অনেক সময় ভুলে যাই ইমামতি মানে নেতৃত্ব।
আর নেতৃত্বের জন্য দুইটি জিনিস অপরিহার্য এক. ইলম। দুই. সাহস।
ইলম ছাড়া সাহস বিপজ্জনক। সাহস ছাড়া ইলম দুর্বল।
এই দুইয়ের সমন্বয়েই জন্ম নেয় প্রকৃত নেতৃত্ব।
শুধু তিলাওয়াত যথেষ্ট নয়। আজ অনেক সময় মসজিদে ইমাম নির্বাচনের সময় বলা হয় তিলাওয়াত ভালো। কণ্ঠ সুন্দর। তারাবীহ ভালো পড়ায়। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো তিনি কি নামাজের সূক্ষ্ম মাসআলা জানেন? সাহু সিজদার বিধান জানেন? মুকতাদির ভুলের হুকুম জানেন? মুসাফিরের মাসআলা জানেন?নারীদের নামাজের মাসআলা জানেন? জানাজার মাসআলা জানেন?
যদি না জানেন তাহলে সুন্দর কণ্ঠ একা মানুষকে বাঁচাবে না। কারণ মানুষ তার পেছনে দাঁড়িয়ে নিজের ইবাদত আদায় করছে।
ভুল ইমামতির ভয়াবহতা
*********************
একজন ব্যবসায়ী ভুল করলে তার ক্ষতি সীমিত।একজন কৃষক ভুল করলে তার ক্ষতি সীমিত। কিন্তু একজন ইমাম ভুল করলে? শত শত মানুষের নামাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হাজার মানুষের আমল প্রভাবিত হতে পারে।
পুরো মহল্লা ভুল বুঝতে পারে। তাই ইমামতির ভুল ব্যক্তিগত ভুল নয়। এটি সামাজিক ভুল।
ঈমানের মাসআলা নামাজের মাসআলার চেয়েও বড়
নামাজের মাসআলা জানা জরুরি। কিন্তু তারও আগে জরুরি ঈমানের মাসআলা জানা। আজ কত মানুষ শিরক করছে অথচ বুঝছে না। কত মানুষ কুসংস্কারে জড়িত। কত মানুষ তাবিজ, কবরপূজা, ভাগ্যগণনা, জ্যোতিষ, ভ্রান্ত বিশ্বাসের মধ্যে ডুবে আছে।
কত যুবক নাস্তিকতার প্রশ্নে আক্রান্ত। কত শিক্ষিত ছেলে দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে সন্দেহে ভুগছে।একজন ইমাম যদি এগুলোর উত্তর না জানেন তাহলে মানুষের ঈমান রক্ষা করবে কে?
অজ্ঞ ইমাম: একটি মহল্লার জন্য নীরব বিপর্যয়
*****************************************
একজন অজ্ঞ ডাক্তার যেমন বিপজ্জনক, একজন অজ্ঞ পাইলট যেমন বিপজ্জনক, একজন অজ্ঞ প্রকৌশলী যেমন বিপজ্জনক, তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক একজন অজ্ঞ ইমাম।
কারণ ডাক্তার দেহ নষ্ট করতে পারে। কিন্তু অজ্ঞ ইমাম মানুষের দ্বীন নষ্ট করতে পারে। ডাক্তারের ভুল দুনিয়ার ক্ষতি।্ইমামের ভুল দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষতি
কেন পূর্ববর্তী উলামারা কাঁদতেন?
*****************************
ইমাম মালিক (রহ.)-কে একটি প্রশ্ন করা হলে তিনি বহুবার বলতেন;আমি জানি না।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বহু রাত একটি মাসআলা নিয়ে চিন্তা করেছেন।কেন? কারণ তারা জানতেন
একটি ভুল ফতোয়া হাজার মানুষের ভুল আমলের কারণ হতে পারে। আজ আমরা কত সহজে কথা বলি!কত সহজে সিদ্ধান্ত দিই! কত সহজে হালাল-হারাম ঘোষণা করি!কিন্তু কিয়ামতের দিন সেই কথাগুলোরও হিসাব দিতে হবে।
ইলমের চর্চা বন্ধ হওয়া মানেই পতন শুরু
**********************************
একজন ইমামের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ইলম অর্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া। অনেকেই ছাত্রজীবনে পড়াশোনা করেন। সনদ নেন। তারপর বই বন্ধ। মুতালাআ বন্ধ।গবেষণা বন্ধ। উস্তাদের সাথে সম্পর্ক বন্ধ। নতুন মাসআলা শেখা বন্ধ। প্রয়োজন একজন ইমামকে মৃত্যু পর্যন্ত ছাত্র থাকা শিখতে থাকা। কারণ প্রতিদিন নতুন বিষয়ের প্রয়োজন পড়ে।
সুস্থ ইমাম: মুসল্লিদের হক
**********************
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইমামের সুস্থতা। মুসল্লিদের হক হলো তারা একজন সুস্থ, সচেতন, সক্ষম ইমাম পাবে। যিনি সঠিকভাবে নামাজ পরিচালনা করতে পারেন। যিনি কুরআন ঠিকমতো পড়তে পারেন। যিনি ভুল সংশোধন করতে পারেন। যিনি মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন।
যদি এমন অবস্থা আসে যে বারবার কিরাতে ভুল হচ্ছে, স্মৃতিশক্তি ভেঙে যাচ্ছে, দায়িত্ব পালন সম্ভব হচ্ছে না,
তাহলে নিজের অবস্থার সৎ মূল্যায়ন করা তাকওয়ার পরিচয়।
চাকরি রক্ষা নাকি আমানত রক্ষা?
****************************
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো আমি কি দায়িত্ব পালন করছি নাকি শুধু পদ আঁকড়ে আছি?
যদি কোনো দিন একজন ইমাম বুঝতে পারেন এখন আমার চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি আছে, আমার কারণে মানুষের ক্ষতি হচ্ছে, আমি দায়িত্ব ঠিকমতো আদায় করতে পারছি না তাহলে দায়িত্ব হস্তান্তর করাও ইবাদত। কারণ লক্ষ্য পদ নয়। লক্ষ্য দ্বীনের খিদমত।
মেহরাবে দাঁড়ানো সহজ। কিন্তু মেহরাবের হক আদায় করা কঠিন। ইমাম হওয়া সহজ। কিন্তু উম্মাহর আমানত বহন করা কঠিন। তাই একজন প্রকৃত ইমাম সবসময় জিজ্ঞাসা করবেন আমি কি যথেষ্ট জানি?আমি কি শিখছি? আমি কি নিজেকে উন্নত করছি?
আমি কি এখনও এই আমানতের যোগ্য?
যে দিন এই প্রশ্নগুলো হৃদয় থেকে হারিয়ে যাবে, সেই দিন থেকেই পতন শুরু হবে। আর যে দিন এই প্রশ্নগুলো জীবন্ত থাকবে, সেই দিন ইমামতি আবার নববী উত্তরাধিকারের আলোয় আলোকিত হবে, ইনশাআল্লাহ।