প্রথমেই একটি কথা মনে রাখুন—
মক্কা আমাদের শেখায় ভালোবাসা। মদিনা আমাদের শেখায় প্রশান্তি। তায়েফ আমাদের শেখায় ধৈর্য।
তায়েফের সফরকে পর্যটন সফর মনে করবেন না। মনে করবেন, আমরা ১৪০০ বছর পেছনে ফিরে যাচ্ছি। আমরা এমন একজন মানুষের পদচিহ্ন অনুসরণ করছি, যিনি পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ, অথচ এই শহরেই তিনি সবচেয়ে বেশি অপমানিত হয়েছিলেন।
নবীজি ﷺ কেন তায়েফ গিয়েছিলেন
*********************************
নবুওয়তের দশম বছর। একের পর এক দুটি বড় আঘাত এল। প্রথমে ইন্তিকাল করলেন প্রিয় স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)—যিনি ঘরে তাঁর সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা ছিলেন।
এরপর ইন্তিকাল করলেন চাচা আবু তালিব—যিনি মক্কার কাফিরদের অত্যাচার থেকে তাঁকে রক্ষা করতেন। এই দুই মহান ব্যক্তির মৃত্যুর পর মক্কায় নবীজি ﷺ-এর অবস্থা আরও কঠিন হয়ে গেল। কুরাইশের নির্যাতন বেড়ে গেল। কঠিন হয়ে গেল মক্কায় বসবাস।
নবীজির মক্কায় দাওয়াত যখন কঠিন হয়ে গেল। তখন তিনি তায়েফ গেলেন আশা ছিল হয়তো তায়েফের মানুষ আল্লাহর দীন গ্রহণ করবে।
এই আশা নিয়েই তিনি তায়েফের উদ্দেশে রওনা হলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল না সম্পদ, ক্ষমতা বা নিরাপদ আশ্রয় লাভ করা। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা এবং তাদের জাহান্নাম থেকে বাঁচানো। তিনি তায়েফে গিয়েছিলেন নিজের জন্য নয়, উম্মাহর জন্য। তিনি তায়েফ গিয়েছিলেন কিছু দিতে, কিছু নিতে নয়।
ভাবুন আজ আমরা তায়েফ যাচ্ছি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে । আর আল্লাহর রাসূল ﷺ উত্তপ্ত মরুভূমিতে হেঁটে এসেছিলেন উম্মাহকে বাঁচানোর জন্য।
তায়েফ এটি সেই শহর, এখানে মুহাম্মাদ ﷺ এর শৈশব কেটেছে।
(حليمة السعدية و بني سعد)
তায়েফের দিকে যেতে যেতে মনে করুন এই পাহাড়গুলোর কোথাও, এই উপত্যকাগুলোর কোথাও, বনি সা’দের তাঁবু ছিল। সেখানে হালিমা সাদিয়া (রা.) কোলে নিয়েছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিশুকে। এখানেই তিনি ছাগল চরিয়েছেন।এখানেই মরুর বিশুদ্ধ বাতাসে বেড়ে উঠেছেন।
প্রিয় নবীর দায়িত্ব নেয়ার পর এখানেই হালিমা (রা.) দেখেছেন একের পর এক বরকত। শুকিয়ে যাওয়া উট দুধ দিতে শুরু করেছে। অনাবাদী ভূমি সবুজ হতে শুরু করেছে। গরিব ঘরে রিযিকের দরজা খুলে গেছে।
তখন কেউ জানত না এই শিশু একদিন পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেবেন। প্রিয় রাসূল ﷺ! আজ আমরা তার শৈশবের ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি।
তায়েফ সেই শহর। এখানে প্রিয় নবী দাওয়াত দিতে এসেছিলেন। প্রিয় নবীর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।নবুওতির দশম বছর। এই বছরটি ছিল তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের। প্রিয় জীবনসঙ্গিনী খাদিজা (রা.) নেই। গোত্রীয় অভিভাবক আবু তালিব নেই। ইসলামের দাওয়াত মক্কাবাসীরা চুড়ান্ত ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তখন তিনি তায়েফে এলেন। ক্ষমতা চাইতে নয়। রাজত্ব চাইতে নয়। উম্মাহকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে।
তিনি তায়েফের নেতাদের কাছে গেলেন। একটি কথাই বললেন “তোমরা আল্লাহকে চিনো।” কিন্তু তারা শুনল না। বরং উপহাস করল। অবজ্ঞা করল। অপমান করল। পাথর মেরে প্রিয় নবীকে রক্তাক্ত করল।
এখন কল্পনা করুন। তায়েফের রাস্তা। চারদিক থেকে শিশু ও উচ্ছৃঙ্খল লোকেরা পাথর মারছে। একটি পাথর। আরেকটি পাথর। আরেকটি পাথর। পা থেকে রক্ত বের হচ্ছে। জুতা রক্তে ভরে গেছে। যায়েদ (রা.) নিজের শরীর দিয়ে নবীজিকে আড়াল করছেন।।তবুও পাথর আসছে।
আজ যে রাস্তা দিয়ে আমরা আরামে যাচ্ছি, সেই রাস্তা একদিন রাসূল ﷺ-এর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল।
এখানে কিছুক্ষণ নীরব থেকে প্রিয় নবীর সেই কষ্টকে অনুভব করুন।
তার এ কষ্ট নিজের জন্য ছিল না। আমাদেরকে ভাবতে হবে এই কষ্ট আমার জন্য। আমার ঈমানের জন্য।আমার জান্নাতের জন্য। আমার নবী আমার জন্য এই কষ্ট সহ্য করেছেন
যখন তায়েফের সবাই প্রিয় নবীর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল। তখন একজন মানুষ এগিয়ে এল। তিনি আদ্দাস। একজন খ্রিস্টান যুবক। তিনি আসলেন এক থালা আঙ্গুর নিয়ে।
নবীজি ﷺ “বিসমিল্লাহ” বললেন। এই একটি শব্দ তার হৃদয়ে ঈমানের একটি বাক্য। একটি চরিত্র। একটি আচরণ। একটি হৃদয় বদলে গেল। পুরো পৃথিবী আপনার বিরুদ্ধে থাকলেও আল্লাহ একজন আদ্দাস পাঠিয়ে দেন।
এই তায়েফের ইতিহাস দেখুন। এখানেই প্রিয়নবী প্রিয় উম্মতের জন্য আরশ কাঁপানো দোয়া করেছিলেন। ওয়াদি মিথনার দিকে তাকান।এখানেই নবীজি ﷺ সেই দোয়া করেছিলেন বলে প্রসিদ্ধ “হে আল্লাহ! আমি আমার দুর্বলতা, আমার অসহায়ত্ব, মানুষের কাছে আমার মূল্যহীনতার অভিযোগ তোমার কাছেই করছি।
খেয়াল করুন। তিনি মানুষের কাছে অভিযোগ করেননি।সামাজিক মাধ্যমে লেখেননি। প্রতিশোধ চাননি। সরাসরি রবের কাছে চলে গেছেন।
এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সর্বাবস্থায় সকল পরিস্থিতিতে মুমিনের আশ্রয় মানুষ নয়। মুমিনের একমাত্র আশ্রয় আল্লাহ।
এই তায়েফ সাক্ষি প্রিয় নবীর রহমতের। যখন পূর্ণ শরীর আঘাতে জর্জরিত। এই অবস্থায় জিবরাইল (আ.) এলেন। সাথে পাহাড়ের ফেরেশতা এলেন।
প্রস্তাব দিলেন আপনি চাইলে দুই পাহাড় একত্র করে পুরো তায়েফ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
এখন চিন্তা করুন। যারা রক্তাক্ত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আসমানি প্রতিশোধ প্রস্তুত। কিন্তু রাসূল ﷺ কী বললেন?্তিনি বললেন আমি আশা করি তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ আসবে যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।”
এই একটি বাক্য তায়েফের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।।আমরা অপমানের বদলে অপমান করি। তিনি অপমানের বদলে দোয়া করেছেন। আমরা ঘৃণার বদলে ঘৃণা দিই। তিনি ঘৃণার বদলে রহমত দিয়েছেন।
আজকের তায়েফ। আজ তায়েফে মসজিদ আছে।
আযান আছে। কুরআনের মজলিস আছে। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর স্মৃতি আছে। মসজিদ আদ্দাস আছে। আল-কু’ মসজিদ আছে। পুরনো তায়েফের গলি আছে। এসব স্থান নবীজির সফরের স্মৃতি বহনকারী ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
যে শহর একদিন পাথর ছুঁড়েছিল আজ সেই শহরেই “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়।এটাই আল্লাহর ওয়াদা।
চোখ বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করুন। আমি কি আমার তায়েফের পরীক্ষায় ধৈর্য ধরতে পারছি? আমি কি কাউকে ক্ষমা করতে পারছি? আমি কি নবীজির মতো মানুষের হিদায়াতের জন্য কাঁদতে পারছি?
আজ তায়েফ থেকে যদি একটি শিক্ষা নিয়ে ফিরি,তবে সেটি হবে মানুষ আমাকে প্রত্যাখ্যান করলেও আমি আল্লাহর পথে থাকব। কারণ তায়েফের রক্তাক্ত রাস্তা থেকেই ভবিষ্যতের বিজয়ের সূচনা হয়েছিল। আর তায়েফের অশ্রুসিক্ত দোয়া থেকেই উম্মাহর জন্য রহমতের নতুন দরজা খুলেছিল।
আজকের তায়েফের বাগান, পাহাড়, ঠান্ডা আবহাওয়া খুবই মনোরম। এ শহর আরবের সবচেয়ে সুন্দর শহরগুলোর একটি। নবীজি ﷺ যখন প্রথম এটি দেখেছিলেন, হয়তো তিনিও আশা করেছিলেন হয়তো এরা আমার কথা শুনবে।
কিন্তু মানুষের হিসাব আর আল্লাহর হিসাব এক নয়।
কখনো কখনো সবচেয়ে সুন্দর শহরের মানুষগুলো সবচেয়ে অসুন্দর হয়। এই তায়েফ শহরের অধিবাসীরাই প্রিয় নবীকে কষ্ট দিল। পাথরের আঘাতে তাকে রক্তাক্ত করলো।
এই তায়েফ নগরীতে মসজিদ ইবনে আব্বাস (রা.) দেখুন। এখানে দাঁড়িয়ে স্মরণ করুন ইবনে আব্বাস (রা.) ছিলেন এই উম্মতের “হিবরুল উম্মাহ”—উম্মতের মহান আলেম। তিনি তায়েফের অধিবাসী ছিলেন।
এই তায়েফ একদিন ইসলাম প্রত্যাখ্যান করেছিল।
কিন্তু পরে এখান থেকেই ইসলামের বড় বড় আলেম বের হয়েছে। যে শহর একদিন পাথর ছুঁড়েছিল, সেই শহর একদিন কুরআনের ব্যাখ্যাকারক তৈরি করেছে।
প্রিয় নবীর দাওয়াত সফল হয়েছে।
এখানে শিক্ষা গ্রহণ করুন কোনো সন্তান আজ ভালো না হলেই হতাশ হওয়া যাবে না। কোনো সমাজ আজ দ্বীন থেকে দূরে থাকলেই হতাশ হওয়া যাবে না।
আল্লাহ চাইলে আগামী প্রজন্মকে হিদায়াত দেবেন।
এই তায়েফে রয়েছে মসজিদ আদ্দাস। এটাই তায়েফের সবচেয়ে আবেগময় স্থান। এখানে এসে কিছুক্ষণ নীরব থাকুন। চোখ বন্ধ করুন। কল্পনা করুন রাসূল ﷺ রক্তাক্ত। মাথা ফেটে গেছে। পা থেকে রক্ত ঝরছে। এই তায়েফে তাঁকে শুধু প্রত্যাখ্যান করা হয়নি।
শহরের শিশুরা তাঁকে ঘিরে পাথর মেরেছে।তখন তিনি একটি আঙ্গুর বাগানে আশ্রয় নিলেন।
তায়েফের মানুষ নবীজিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু একজন আদ্দাস তাঁকে গ্রহণ করেছিল। আপনার দাওয়াত সবাই গ্রহণ করবে না। একজন মানুষও যদি হিদায়াত পায়, সফর সফল।
ওয়াদি মিতনা। এখানে এসে বসুন। এখানে বসে নিরবে উম্মাহর প্রতি প্রিয় নবীর দরদ ও ভালোবাসাকে অনুভব করুন।
হে আল্লাহর রাসূল! আপনি উম্মাহকে দ্বীনের পথে ডাকলেন । তারা আপনাকে পাথর মারল।
আপনি তাদের জন্য দোয়া করলেন। আপনি বললেন হয়তো এদের বংশধরদের মধ্য থেকে আল্লাহ এমন মানুষ বের করবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।
هذا رسول الله
আমরা সামান্য অপমান সহ্য করতে পারি না। একটি কথা শুনলেই সম্পর্ক নষ্ট করি। একটি কষ্ট পেলে প্রতিশোধ চাই। কিন্তু রাসূল ﷺ নিজের রক্তের বদলে তাদের সন্তানদের জন্য হিদায়াত চাইলেন।
মসজিদ আল-কু’। এই স্থানটি নবীজির অবস্থান বা দাওয়াতের স্মৃতির সঙ্গে লোকমুখে ও ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত বলে পরিচিত।
প্রিয় নবীর স্মৃতি বিজড়িত তায়েফ। এখানকার বাসিন্দারা তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল। এখানে উপলব্ধি করতে হবে দাওয়াতদাতার কাজ ফল আনা নয়। দাওয়াতদাতার কাজ পৌঁছে দেওয়া। নূহ (আ.) ৯৫০ বছর দাওয়াত দিয়েছেন। অনেকেই ঈমান আনেনি। কিন্তু তিনি সফল। কারণ তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
পুরাতন তায়েফ নগরী। পুরনো বাজার ও ঐতিহাসিক এলাকার দিকে তাকিয়ে দেখুন। এখানকার কোনো গলি দিয়ে হয়তো নবীজি ﷺ হেঁটেছেন। কোনো দেয়ালের পাশে হয়তো তাঁকে অপমান করা হয়েছে। আজ সবকিছু বদলে গেছে। কিন্তু সেই ঘটনা বদলায়নি। পৃথিবীর সব ক্ষমতা, সম্পদ, সৌন্দর্য একদিন শেষ হবে। থেকে যাবে শুধু আমল।
তায়েফ থেকে ফেরার পথে ভাবুন নবীজি ﷺ আমার জন্য কী করেছেন? তিনি ঘুম হারিয়েছেন। রক্ত দিয়েছেন। অপমান সহ্য করেছেন। আমি তাঁর জন্য কী করেছি?
তায়েফ থেকে ফিরে আসার সময় মনে করুন আমি পাহাড় দেখিনি, আমি রাসূল ﷺ-এর ধৈর্য দেখেছি।
আমি বাগান দেখিনি, আমি রাসূল ﷺ-এর অশ্রু দেখেছি। আমি শুধু ঐতিহাসিক স্থান দেখিনি, আমি উম্মাহর প্রতি তাঁর সীমাহীন দরদ দেখেছি।
আর যদি তায়েফ থেকে ফিরে এসে আমাদের অন্তরে এই সংকল্প জন্মায় হে আল্লাহ! মানুষ আমাকে গ্রহণ করুক বা না করুক, আমি দ্বীনের পথে অবিচল থাকব তাহলেই তায়েফ সফর সফল হবে, ইনশাআল্লাহ।