কুরআনের সৌন্দর্য হলো, কুরআন শুধু অন্ধকার দেখায় না; আলোও দেখায়।শুধু বাতিলের পরিচয় দেয় না; হকের পথও দেখায়। মসজিদে দিরারের নিন্দা করার পর আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে একটি বিকল্প সামনে আনলেন। মসজিদে কুবার প্রশংসা।আল্লাহ বলেন—
لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا
“আপনি সেখানে কখনো দাঁড়াবেন না।”
এরপরই বলেন—
لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ
“যে মসজিদ প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, সেটিই অধিক হকদার যে আপনি সেখানে দাঁড়াবেন।” (তাওবা ১০৮)
একদিকে দিরার। অন্যদিকে কুবা। একদিকে মুনাফিকি। অন্যদিকে তাকওয়া। একদিকে বিভেদ।অন্যদিকে ঐক্য। একদিকে মানুষের প্রশংসা।অন্যদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
হিজরতের পর প্রথম নির্মাণ: কেন একটি মসজিদ?
চলুন ফিরে যাই হিজরতের সেই দিনগুলোতে। মক্কা ছেড়ে রাসূল ﷺ বের হয়েছেন। পেছনে ফেলে এসেছেন জন্মভূমি। কাবা। শৈশব। পরিবার। স্মৃতি।
গারে সাওর অতিক্রম করে, দীর্ঘ সফরের পর তিনি মদিনার উপকণ্ঠ কুবায় পৌঁছলেন। নতুন সমাজ গঠনের প্রথম কাজ কী ছিল?বাজার? প্রশাসন? সামরিক ঘাঁটি? প্রথম কাজ ছিল মসজিদ নির্মাণ।
কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজের কেন্দ্র অর্থনীতি নয়।
রাজনীতি নয়। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক।আল্লাহ বলেন—
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ
“নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য।” (সূরা জিন ১৮)
ইসলামী সভ্যতার হৃদয় হলো মসজিদ।
মসজিদে কুবা: ইসলামের প্রথম মসজিদ। মসজিদে কুবা কেবল একটি ভবন নয়। এটি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম স্থাপনা। এটি হিজরতের প্রথম স্মৃতি। এটি ইসলামী সমাজের প্রথম কেন্দ্র।
এখানে রাসূল ﷺ নিজ হাতে কাজ করেছেন। সাহাবায়ে কিরাম অংশগ্রহণ করেছেন।আবু বকর (রা.)। উমর (রা.)। উসমান (রা.)। আলী (রা.)।
মুহাজির ও আনসার একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। কেউ বলেনি এটি আমার প্রকল্প।কেউ বলেনি এটি আমার নেতৃত্ব। সবাই বলেছে এটি আল্লাহর ঘর।
এখানেই প্রথম শিক্ষা। যেখানে আমি উচ্চারিত হয়, সেখানে বরকত কমে। যেখানে আমরা উচ্চারণ করা হয়, সেখানে রহমত নেমে আসে।
তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত বলতে কী বোঝায়?
আল্লাহ বলেন—
أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى
তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই একটি বাক্য পুরো আলোচনার প্রাণ। কারণ আল্লাহ বলেননি সুন্দর স্থাপত্য। বিশাল গম্বুজ। উঁচু মিনার। বরং বলেছেন—তাকওয়া।
তাকওয়ার চার স্তম্ভ
১. হালাল ভিত্তি। জমি হালাল। অন্যের হক নষ্ট নয়।দখল নয়। প্রতারণা নয়। কারণ আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।
২. হালাল অর্থ। সুদ নয়। আত্মসাৎ নয়। হারাম ব্যবসা নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
“আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।” (মুসলিম)
৩. বিশুদ্ধ নিয়ত।লোক দেখানো নয়।নাম ফলক নয়।খ্যাতি নয়। শুধু আল্লাহ।
৪. বিশুদ্ধ কার্যক্রম। কুরআন শিক্ষা। সুন্নাহ শিক্ষা।দাওয়াহ। তারবিয়াহ। মানুষকে আল্লাহর পথে আনা।
প্রথম দিন থেকেই। আল্লাহ বলেন—
مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ
প্রথম দিন থেকেই। এখানে গভীর শিক্ষা আছে।
অনেক মানুষ ভাবে শুরুটা যেমনই হোক, পরে ঠিক করে নেব। কুরআন বলে শুরুটাই গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুর নিয়ত ভুল হলে, শেষের সৌন্দর্য তাকে রক্ষা করতে পারে না।
শুধু মসজিদ নয় বিয়ে। ব্যবসা। সংগঠন। মাদরাসা।
জীবনের সব কাজের ক্ষেত্রেই এই নীতি সত্য।
ভিত্তি সঠিক না হলে, একদিন ভবন কেঁপে উঠবেই।
আল্লাহ ভবনের প্রশংসা করলেন না, মানুষের প্রশংসা করলেন। আল্লাহ বলেন—
فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا
“সেখানে এমন মানুষ আছে যারা পবিত্রতা ভালোবাসে।”
খেয়াল করুন। আল্লাহ বলেননি সেখানে সুন্দর দেয়াল আছে। সেখানে দামি কার্পেট আছে। সেখানে বিশাল মিনার আছে। বলেছেন সেখানে মানুষ আছে ।ইসলামের আসল সম্পদ। ইসলামের আসল সম্পদ ভবন নয়। মানুষ। মুত্তাকি মানুষ।মুখলিস মানুষ।আখলাকওয়ালা মানুষ।তাই নবী ﷺ তের বছর মক্কায় ভবন বানাননি। মানুষ বানিয়েছেন।
বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা
সাহাবিরা পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসতেন।
ওজু। গোসল। পোশাক। মসজিদের পরিচ্ছন্নতা।
এ কারণেই কুবার অধিবাসীদের প্রশংসা এসেছে।
কিন্তু কুরআনের শিক্ষা এর চেয়েও গভীর।
অন্তরের পবিত্রতা হিংসা থেকে পবিত্রতা। অহংকার থেকে পবিত্রতা। রিয়া থেকে পবিত্রতা। ক্ষমতার লোভ থেকে পবিত্রতা। বিদ্বেষ থেকে পবিত্রতা।
মসজিদে দিরারের মানুষ ভবন বানিয়েছিল।
কুবার মানুষ নিজেদের অন্তর বানিয়েছিল।
আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার পথ। আল্লাহ বলেন—
وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
“আল্লাহ পবিত্রতাপ্রিয়দের ভালোবাসেন।”
কুরআনে বহু স্থানে আল্লাহ কাদের ভালোবাসেন তা বলা হয়েছে। মুত্তাকিদের। সবরকারীদের। তাওবাকারীদের। আর এখানে পবিত্রতাপ্রিয়দের।
দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সম্মান কী? মানুষের ভালোবাসা?
আল্লাহর ভালোবাসা।
মসজিদে কুবার প্রতি নবী ﷺ-এর ভালোবাসা
ইবনে উমর (রা.) বলেন রাসূল ﷺ প্রতি শনিবার কুবায় যেতেন।কখনও হেঁটে। কখনও সওয়ার হয়ে। সেখানে দুই রাকাত নামাজ পড়তেন।্য(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এটি ছিল উম্মতের জন্য শিক্ষা। কুবার সালাতের মর্যাদা। রাসূল ﷺ বলেছেন—
مَنْ تَطَهَّرَ فِي بَيْتِهِ ثُمَّ أَتَى مَسْجِدَ قُبَاءٍ فَصَلَّى فِيهِ كَانَ لَهُ كَأَجْرِ عُمْرَةٍ
“যে ব্যক্তি ঘরে পবিত্রতা অর্জন করে কুবা মসজিদে এসে সালাত আদায় করবে, সে একটি উমরার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।” (তিরমিযী, ইবন মাজাহ)
কারণ এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়। এটি তাকওয়ার প্রতীক।
কিয়ামত পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
এরপর আল্লাহ প্রশ্ন করেন—
أَفَمَنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى تَقْوَى مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٍ خَيْرٌ
“সে কি উত্তম, যে তার ভিত্তি স্থাপন করেছে আল্লাহভীতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর?” (তাওবা ১০৯
এটি শুধু মসজিদের প্রশ্ন নয়। এটি পুরো জীবনের প্রশ্ন।
আমার পরিবার কি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত?
আমার ব্যবসা? আমার দাওয়াহ? আমার মাদরাসা?আমার নেতৃত্ব? আমার জীবন?
ভাঙা পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়ানো জীবন। আল্লাহ বলেন—
أَمْ مَنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى شَفَا جُرُفٍ هَارٍ
“নাকি সে, যে তার ভিত্তি স্থাপন করেছে ধ্বংসপ্রায় পাহাড়ের কিনারায়?”
বাইরে শক্ত। ভিতরে ফাঁপা। বাইরে বড়। ভিতরে দুর্বল।এটাই রিয়ার জীবন। এটাই মুনাফিকির জীবন। এটাই ইখলাসহীন জীবন।
কুবা থেকে কিয়ামত পর্যন্ত
মসজিদে কুবা শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়। এটি একটি দর্শন। একটি জীবনব্যবস্থা। একটি মানদণ্ড।ৎপ্রতিদিন আল্লাহ যেন আমাদের জিজ্ঞেস করছেন তোমার ভিত্তি কোথায়? মানুষের প্রশংসায়?
নাকি আমার সন্তুষ্টিতে? ক্ষমতায়? নাকি তাকওয়ায়?খ্যাতিতে? নাকি ইখলাসে?
আসুন আমরা দোয়া করি হে আল্লাহ!
আমাদের মসজিদগুলোকে মসজিদে কুবার মতো তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত করুন। আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন। আমাদের নিয়তকে পবিত্র করুন।আমাদের দানকে পবিত্র করুন। আমাদের নেতৃত্বকে পবিত্র করুন।
আমাদের পরিবার, মাদরাসা, প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে তাকওয়ার ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিন।
আর আমাদের সম্পর্কে আসমানে ঘোষণা করে দিন—
وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ
“আল্লাহ পবিত্রতাপ্রিয়দের ভালোবাসেন।”
آمين يا رب العالمين