মদিনা এমন এক শহর যে শহরকে ভালোবেসেছেন আল্লাহর রাসূল ﷺ। তিনি মক্কা থেকে হিজরত করলেন, ভালোবেসে তাকে তখন গ্রহণ করেছিল মদিনাবাসী। তারপর এক সময় মক্কা বিজয় হলো। কিন্তু প্রিয় নবী জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মদিনাকেই আঁকড়ে ধরে রাখলেন।
মদিনা ঈমানের শহর। মদিনা হিজরতের শহর। মদিনা সাহাবীদের শহর। মদিনা দুরুদের শহর। মদিনা আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর শহর।
মদিনা দরুদের শহর
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেন—
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি সালাত (দুরুদ) পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ কর।
চিন্তা করুন কুরআনে অসংখ্য আমলের আদেশ এসেছে। নামাজের আদেশ এসেছে। রোজার আদেশ এসেছে। যাকাতের আদেশ এসেছে। কিন্তু এমন কোনো আমল নেই যার শুরুতেই আল্লাহ বলেছেন আমি নিজে করি, আমার ফেরেশতারাও করে, তোমরাও কর।
দুরুদের ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এমনটি বলেছেন।
দুরুদের মর্যাদা এখানেই। দুরুদ কেবল একটি যিকির নয়। এটি সীমাহীন ভালোবাসার প্রকাশ। এটি চুড়ান্ত আনুগত্যের ঘোষণা। এটি গভীর সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ।
প্রিয় নবীর মর্যাদা সম্বলিত কুরআনে কারীমের এই আয়াত নাজিল হয় এমন এক সময়ে যখন মোনাফিক মুশরেকরা তীব্রভাবে প্রিয় নবীর সমালোচনা এবং তার চরিত্র হনন করে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় নবীর প্রতি এই আয়াতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ভালবাসার ঘোষণা দেন।
এই আয়াত বিরুদ্ধবাদীদের জন্য সুস্পষ্ট বার্তা তোমরা অপপ্রচার দ্বারা সফলতা অর্জন করতে পারবে না। ইচ্ছা করলে তোমরা তোমাদের সর্বশক্তি ব্যয় করতে পারো সফলতা আসবে না। কারণ স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামীন তার নবীর প্রতি সর্বোচ্চ ভালবাসা প্রদর্শন করেন। আল্লাহর ফেরেশতারা তার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করেন। কাজেই কাফেরদের সমস্ত পরিকল্পনা শ্রম ব্যর্থ হবে।
প্রিয় নবীর সর্বোচ্চ সম্মান ঘোষণার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈমানদারদের লক্ষ্য করে হুকুম দেন। আল্লাহ বলেন বিরুদ্ধবাদীদের তীব্র সমালোচনার জবাব চূড়ান্ত মোহাব্বত দ্বারা প্রকাশ করতে হবে।
আজও বিরোদ্ধবাদী শক্তি আছে। তার প্রিয় নবীর জীবনের বিভিন্ন অংশ নিয়ে সমালোচনা করে।
মুমিনদের তখন দায়িত্ব হয় তার জবাব পেশ করা। আর তার জবাব হলো চূড়ান্ত ভালোবাসার প্রকাশ করা।
মদিনা মহাব্বতের শহর। এখানে প্রিয় নবীর প্রতি সাহাবায়ে কেরাম সর্বোচ্চ ভালবাসা প্রদর্শন করেছেন। আমাদেরকেও এখানে এসে চূড়ান্ত মহাব্বত প্রকাশ করতে হবে।
কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রিয় নবীর পরিচিতি তুলে ধরেছেন। উদ্দেশ্য সর্বোচ্চ মহাব্বাত ও ভালোবাসার যৌক্তিকতা তুলে ধরা। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন প্রিয় নবীর ব্যাপারে তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত।
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
“আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি। (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৭)
আয়াতটি নিয়ে একটু ভাবুন এটা বলেননি তিনি শুধু মুসলমানদের জন্য রহমত। বরং বলেছেন তিনি সমগ্র মানবতার জন্য রহমত। বরং পূর্ণ সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত।
কুরআন প্রিয় নবীর পরিচিতি পেশ করেছে তিনি তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। (সূরা আহযাব ৩৩:২১)
অর্থাৎ তোমরা যদি আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাও তাহলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্ণ অনুসরণ কর। তাকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করো। জীবনের সকল ক্ষেত্রে।
কুরআন প্রিয় নবীর ভালোবাসার আলোচনা করে। আল্লাহ বলেন তিনি মুমিনদের প্রাণের চেয়েও নিকটবর্তী
النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ
“নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের থেকেও অধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। (সূরা আহযাব ৩৩:৬)
একজন ব্যক্তি সবচাইতে বেশি ভালোবাসে নিজেকে। নিজের ব্যাপারে কেউ ভুল সিদ্ধান্ত নেয় না। কিন্তু কখনো এমন হয় নিজের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়। কাজেই মানুষ নিজেকে সর্বোচ্চ ভালবাসলেও নিজের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত সব সময় সঠিক হয় না।
কিন্তু প্রতিটি মানুষের জন্য প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই মহান ব্যক্তি
তিনি জীবন পরিচালনার এমন কিছু নিয়ম-নীতি তৈরি করে গেছেন একজন মানুষ যদি তার অনুসরণ করে তাহলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তাই প্রতিটি ব্যক্তি উচিত নিজের ব্যাপারে নিজের সিদ্ধান্তের ওপর প্রিয় নবীর সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দেয়া। এবং এ কথা বিশ্বাস করা আমার নিজের ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে কিন্তু আমার ব্যাপারে প্রিয় নবীর সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে না। সেই আস্থা এবং ভালোবাসা থাকতে হবে প্রিয় নবীর প্রতি। এটা ঈমানের দাবি।
একজন মুসলমান মনে করে প্রিয় নবী যা করেছেন তা ভালো। প্রিয় নবী যা নিষিদ্ধ করেছেন তা খারাপ। একটি কাজকে সারা পৃথিবী যদি ভালো বলে কিন্তু প্রিয় নবী তা খারাপ বলেছেন। আমরা প্রিয় নবীর কথা কে প্রাধান্য দিব এবং পৃথিবীর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আমরা বলব এটা ভালো নয় খারাপ।
আর প্রিয় নবী যে কাজের অনুমোদন দিয়েছেন সারা পৃথিবীও যদি তাকে নিষিদ্ধ করে আমরা বলব এটা বৈধ এটা অনুমোদিত। কারন আমাদের প্রিয় নবী এটাকে অনুমোদন করেছেন। এটাই রাসুলের ব্যাপারে কাঙ্খিত ইমান। এই ধরনের ঈমান অপরিহার্য। আর এই ধরনের জন্যই প্রয়োজন ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া ঈমান হয় না।
আল্লাহর কাছে রাসূল ﷺ-এর মর্যাদা কুরআনে এভাবও প্রকাশ পেয়েছে। কুরআনে লক্ষ্য করে দেখুন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় নবীকে কিভাবে ডেকেছেন। আল্লাহ অন্য নবীদের নাম ধরে ডাকেন।
يَا آدَم। يَا نُوحُ। يَا مُوسَى
কিন্তু যখন প্রিয় রাসূল ﷺ-কে ডেকেছেন বলেছেন
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ। يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ
এটি সম্মানের ভাষা। এটি মহব্বতের ভাষা। কাজেই যারা আমরা আল্লাহর ভালোবাসা চাই তাদের উচিত প্রিয় নবীকে সর্বোচ্চ ভালবাসা। আর প্রিয় নবীর ভালোবাসার শহর মদিনা। এখানে এসে ভালোবাসা প্রকাশ করা।
কুরআনে আল্লাহ প্রিয় নবীর মর্যাদা এভাবেও ঘোষণা করেছেন
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
“আমি আপনার স্মরণকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি।” (সূরা ইনশিরাহ ৯৪:৪)
আজ পৃথিবীর প্রতিটি আযানে তাঁর নাম। প্রতিটি ইকামতে তার নাম। প্রতিটি নামাজে তাঁর নাম। প্রতিটি খুতবায় তাঁর নাম। যেখানে আল্লাহর নাম সেখানে সাথে প্রিয় নবীর নাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনের জীবনের সর্বত্র নবীকে এভাবে উপস্থাপন করেছেন। এটা এজন্য যে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য আমাদের তাকে ভালবাসতে হবে।
প্রিয় নবী যখন তৌহিদের দাওয়াত পেশ করেন। বিরুদ্ধবাদীরা অপবাদ দিয়ে কটুক্তি করে প্রিয় নবীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইলো প্রিয় নবীর পক্ষ থেকে তাদের এ কটুক্তি গুলোর কোন জবাব ছিল না। কাফিররা কটুক্তি করেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রিয় নবীর ব্যাপারে কাফেরদের কটুক্তি মেনে নেননি। আল্লাহ জবাব দিয়েছেন সেই জবাব কুরআনের মাঝে আজও আছে। মুশরিকরা যখন কটুক্তি করে বলল তিনি কবি। আল্লাহ তার জবাব দিয়ে বললেন—
وَمَا عَلَّمْنَاهُ الشِّعْرَ
“আমি তাঁকে কবিতা শিক্ষা দিইনি। (ইয়াসীন ৩৬:৬৯)
মুশরিকরা কটুক্তি করে বলল তিনি পাগল। আল্লাহ তার জবাব দিয়ে বললেন—
مَا أَنْتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُونٍ
“আপনি মোটেও উন্মাদ নন। (কলম ৬৮:২)
মুশরিকরা অপবাদ দিয়ে বলল তিনি মিথ্যাবাদী।
আল্লাহ তার জবাব দিয়ে বললেন—
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى
“তিনি প্রবৃত্তির বশে কথা বলেন না। (নাজম ৫৩:৩)
মুশরিকরা তার সন্তানের সন্তানের মৃত্যূ হলে উল্লাস করে বলল তাঁর নাম মুছে যাবে। আল্লাহ বললেন—
إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ
“আপনার শত্রুই নাম-নিশানহীন। (কাওসার ১০৮:৩)
আজ কোটি কোটি মানুষ মুহাম্মাদ ﷺ-এর নাম শুনে দুরুদ পড়ে। তার শত্রুদের নামই মুছে গেছে।
কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উম্মতের প্রতি রাসূল ﷺ-এর সীমাহীন ভালোবাসা
তুলে ধরেছেন। আল্লাহ বলেন—
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ
عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ
“তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে কষ্টদায়ক। (তাওবা ৯:১২৮)
তায়েফে তাঁকে রক্তাক্ত করা হলো। তিনি বদদোয়া করলেন না। উহুদে তাঁর দাঁত ভেঙে গেল।তিনি দোয়া করলেন। তিনি বললেন হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন, তারা জানে না।”
নবীপ্রেম ঈমানের অংশ। নবীপ্রেম ইবাদতের অংশ।রাসূল ﷺ বলেন তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।” (বুখারী, মুসলিম)
এটি নফল ঐচ্ছিক বিষয় নয়। এটি ঈমানের শর্ত।
******************************************
মুসলমানের জীবনে এটা গুরুত্বপূর্ণ তাকে নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে। এবং এটা চ্যালেঞ্জ তাকে নবীকে ভালোবাসার বাস্তব প্রমাণ দিতে হবে।অনেকেই মুখে ভালোবাসার দাবি করে। মুখের ভালোবাসার দাবি যথেষ্ট নয়। কাজের ভালবাসা প্রয়োজন। কুরআন বলে—
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي
“তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো। (আলে ইমরান ৩:৩১)
ভালোবাসার প্রমাণ সুন্নাহ অনুসরণ। একনিষ্ঠ আনুগত্য। ভালবাসার অর্থ এই নয় যে আমি আমার পরিকল্পনায় এগিয়ে যাবো। বরং ভালবাসার অর্থ হলো আমি আমার পরিকল্পনা বাদ দিবো। তিনি যেভাবে চান সেভাবেই পরিকল্পনা সাজাব তা আমার পছন্দ হোক অথবা না হোক।
নবীর ভালোবাসা এবং জান্নাত
*****************************
এক সাহাবী বললেন আমার আমল কম।
কিন্তু আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি।
রাসূল ﷺ বললেন—
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
“মানুষ যার সাথে ভালোবাসা রাখে, সে তার সাথেই থাকবে।”(বুখারী) এটি সাহাবাদের সবচেয়ে আনন্দদায়ক হাদীসগুলোর একটি। কারন তাদের মাঝে প্রিয় নবীর প্রতি সর্বোচ্চ ভালবাসা ছিল।
সর্বোচ্চ আনুগত্য ছিল।
মদিনায় দাঁড়িয়ে আমাদের করণীয়
********************************
রওজার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু ছবি নয়। শুধু স্মৃতি নয়। বরং জীবন বদলানোর অঙ্গীকার করতে হবে।
আজ সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা নামাজ ঠিক করবো। আমরা দুরুদ বাড়াবো। সুন্নাহ আঁকড়ে ধরবো। গুনাহ ছাড়বো। পরিবারকে দ্বীনের পথে আনবো।
এমন পরিবার গড়ে তুলবো যে পরিবারের পরিচিতি তারা প্রীয় ভালবাসে।
হে মদিনার মুসাফির! আপনি সেই শহরে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে আবু বকর (রা.) কেঁদেছেন। উমর (রা.) হেঁটেছেন। উসমান (রা.) জীবন দিয়েছেন। আলী (রা.) বসবাস করেছেন।
আর যার জন্য এই শহর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহরগুলোর একটি হয়ে উঠেছে, তিনি হলেন মুহাম্মাদ ﷺ। তাই মদিনা থেকে ফিরে যাবেন না শুধু খেজুর নিয়ে।
ফিরে যান নবীপ্রেম নিয়ে। ফিরে যান দুরুদের অভ্যাস নিয়ে। ফিরে যান সুন্নাহর জীবন নিয়ে।