আজ আমরা অবস্থান করছি সেই শহরে, যার মাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পদধূলিতে ধন্য হয়েছে। এই শহরের প্রতিটি পথ, প্রতিটি খেজুর গাছ, প্রতিটি পাহাড় ভালোবাসার সাক্ষী।
এখানে এসেই মানুষ বুঝতে পারে ইসলাম কেবল একটি দর্শন নয়। ইসলাম কেবল কিছু বিধান নয়।ইসলাম মূলত একটি সম্পর্ক। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক।রাসূল ﷺ-এর সাথে সম্পর্ক। এবং এই সম্পর্কের নাম ইশক, মহব্বত, ভালোবাসা।
ইলম কী? ইশক কী?
**********************
ইকবাল বলেন—
علم نے مجھ سے کہا عشق ہے دیوانہ پن
عشق نے مجھ سے کہا علم ہے تخمین و ظن
জ্ঞান আমাকে বলল—প্রেম হলো উন্মাদনা। প্রেম আমাকে বলল—জ্ঞান হলো অনুমান, ধারণা ও হিসাবের জগৎ।
এই কয়েকটি পঙক্তির মধ্যে ইকবাল মুসলিম উম্মাহর একটি গভীর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
তিনি জ্ঞানের বিরোধিতা করেননি। বরং তিনি নিজেই ছিলেন একজন অসাধারণ জ্ঞানী, দার্শনিক, গবেষক ও কুরআনের চিন্তাবিদ। তিনি জানতেন, জ্ঞান ছাড়া মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনি এটাও দেখেছিলেন, শুধু জ্ঞান মানুষকে আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেয় না।
কারণ জ্ঞান মাথায় থাকে। কিন্তু প্রেম হৃদয়ে থাকে।
জ্ঞান মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেয়। প্রেম মানুষকে আত্মসমর্পণ করায়। জ্ঞান বলে—এটাই রাসূলুল্লাহ ﷺ।
প্রেম বলে—আমার জান, আমার প্রাণ, আমার বাবা-মা সবকিছু তাঁর জন্য কুরবান।
জ্ঞান বলে এটাই কুরআন। প্রেম বলে এই কুরআনের প্রতিটি শব্দ আমার রবের কালাম। জ্ঞান বলে নামাজ ফরজ। প্রেম বলে নামাজ আমার রবের সাথে সাক্ষাতের মুহূর্ত।
এখানেই ইলম ও ইশকের পার্থক্য। অনেকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে চিনত। মক্কার কাফিররাও তাঁকে চিনত। আবু জাহল তাঁকে চিনত। আবু লাহাব তাঁকে চিনত। উতবা, শায়বা, উমাইয়া তারা সবাই জানত মুহাম্মাদ ﷺ মিথ্যাবাদী নন।
তারা জানত তাঁর চরিত্র আকাশের মতো নির্মল। তারা জানত তিনি আল-আমীন। তারা জানত তিনি সত্যবাদী। কিন্তু তারা তাঁকে ভালোবাসেনি। তাদের জ্ঞান ছিল। ইশক ছিল না।
অপরদিকে আবু বকর (রা.) যখন শুনলেন—রাসূল ﷺ মিরাজে গিয়েছেন তিনি কোনো যুক্তি খুঁজলেন না।
কোনো প্রশ্ন করলেন না। কোনো ব্যাখ্যা দাবি করলেন না। তিনি শুধু বললেন যদি তিনি বলে থাকেন, তাহলে অবশ্যই সত্য বলেছেন।”
এটাই ইশক। এটাই মহব্বত। এটাই আত্মসমর্পণ।
ইলম প্রশ্ন করে—”কীভাবে সম্ভব?”ইশক বলে যিনি বলেছেন তিনি যদি মুহাম্মাদ ﷺ হন, তবে অবশ্যই সম্ভব।”
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন—
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ
“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”
আল্লাহ এখানে বলেননি—যদি তোমরা আল্লাহকে জানতে চাও। বরং বলেছেন—যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো কারণ ইসলামের মূল ভিত্তি শুধু জ্ঞান নয়, ভালোবাসা। জ্ঞান পথ দেখায়। কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে সেই পথে হাঁটায়।
জ্ঞান বলে—এটাই সত্য।ভালোবাসা বলে—আমি সেই সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত।
জ্ঞান বলে—জান্নাত আছে। ভালোবাসা বলে আমি জান্নাত চাই না, আমি জান্নাতের মালিককে চাই।
জ্ঞান বলে মদিনায় রাসূল ﷺ শায়িত আছেন। ভালোবাসা বলে আমাকে মদিনায় নিয়ে চল। আমাকে তাঁর রওজার সামনে দাঁড় করিয়ে দাও। আমাকে তাঁর প্রতি সালাম পেশ করতে দাও।
এ কারণেই সাহাবিদের জীবন ছিল ইলম ও ইশকের অপূর্ব সমন্বয়। তারা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ। আবার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রেমিক মানুষ। তাদের জ্ঞান তাদের চোখ খুলে দিয়েছিল। আর তাদের প্রেম তাদের জীবন বদলে দিয়েছিল।
আজ উম্মাহর বড় সংকট হলো—আমাদের জ্ঞান বাড়ছে। তথ্য বাড়ছে। বই বাড়ছে। বক্তৃতা বাড়ছে। কিন্তু হৃদয়ের আগুন কমে যাচ্ছে। চোখের অশ্রু শুকিয়ে যাচ্ছে। রাসূল ﷺ-এর নাম শুনে হৃদয় কাঁপছে না। কুরআন শুনে চোখ ভিজছে না। এ কারণেই আমাদের আবার ইলমের সাথে ইশককে ফিরিয়ে আনতে হবে। এমন ইলম, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়। এমন ইশক, যা মানুষকে সুন্নাহর পথে অটল রাখে। কারণ ইলমহীন ইশক মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। আর ইশকহীন ইলম মানুষকে পাথরের মতো কঠিন করে দিতে পারে।
কাম্য হলো সেই হৃদয় যেখানে ইলম আছে, ইয়াকীন আছে, এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি গভীর মহব্বত আছে। সাহাবিদের হৃদয় ছিল এমনই হৃদয়। আর সেই হৃদয়ই পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল।
রওজার সামনে দাঁড়িয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা
***************************************
ইকবাল বলেন—
بندۂ تخمین و ظن! کرمِ کتابی نہ بن
عشق سراپا حضور، علم سراپا حجاب
“হে মানুষ! শুধু বইয়ের পোকা হয়ো না।
প্রেম হলো উপস্থিতি, আর জ্ঞান অনেক সময় পর্দা হয়ে যায়।”
রওজার সামনে দাঁড়িয়ে আপনি কী অনুভব করেন?
আপনি কি শুধু ইতিহাস মনে করেন। ভাবেন—৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল হয়েছে, এখানে সমাহিত আছেন।
এখানে এসে মনে হয়—“হে আল্লাহ! আমি সেই মানুষটির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি, যিনি আমাকে না দেখেও ভালোবেসেছেন।”
হয়তো হাজারো কথা বলতে চান, কিন্তু কোনো কথাই মুখ দিয়ে বের হয় না। শুধু চোখ দিয়ে পানি ঝরে। শুধু হৃদয় কাঁদে। শুধু মনে হয়—আরেকটু কাছে থাকি, আরেকটু দাঁড়িয়ে থাকি, আরেকটু সালাম পাঠাই।
এই অনুভূতির নামই ভালোবাসা। এটা কোনো বই পড়ে অর্জন করা যায় না। এটা কোনো তথ্য মুখস্থ করে পাওয়া যায় না। এটা হৃদয়ের বিষয়।
জ্ঞান আপনাকে বলে দেবে—এটি রওজা মুবারক। কিন্তু ভালোবাসা আপনাকে কাঁদাবে। জ্ঞান আপনাকে ইতিহাস শোনাবে। কিন্তু ভালোবাসা আপনাকে রাসূল ﷺ-এর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্য অনুভব করাবে। জ্ঞান আপনাকে তথ্য দেবে। কিন্তু ভালোবাসা আপনাকে বদলে দেবে।
সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম রাসূল ﷺ-এর কাছে শুধু জ্ঞান অর্জনের জন্য বসতেন না। তারা তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতেন। তাঁর কথা শুনতেন। তাঁর চলাফেরা দেখতেন। তাঁর হাসি দেখতেন। তাঁর নীরবতাও উপভোগ করতেন। কারণ তাঁরা তাঁকে ভালোবাসতেন। একজন প্রেমিক যেমন প্রিয়জনের পাশে বসে থাকতে ভালোবাসে, সাহাবিরাও তেমনই রাসূল ﷺ-এর সান্নিধ্যকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিয়ামত মনে করতেন।
আজ আমরা মদিনায় এসে বুঝতে পারি—ভালোবাসা কী জিনিস। রওজার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়—“ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি অনেক দেরি করে এসেছি।
আমার হাতে আমলের ঝুলি খুব ভারী নয়। আমার জীবনে অনেক ত্রুটি, অনেক গুনাহ, অনেক অবহেলা।
তবু আমি এসেছি। কারণ আমি আপনাকে ভালোবাসি। আপনার উম্মত হিসেবে পরিচয় দিতে আমার ভালো লাগে। আপনার নাম শুনলে আমার হৃদয় নরম হয়ে যায়। তখন আর ভাষা কাজ করে না।
তর্ক কাজ করে না। বিশ্লেষণ কাজ করে না।শুধু হৃদয় কথা বলে। শুধু চোখ কথা বলে। শুধু ভালোবাসা কথা বলে।
আর সেই ভালোবাসাই মানুষকে বদলে দেয়। যে ভালোবাসা মানুষকে নামাজে দাঁড় করায়। যে ভালোবাসা মানুষকে সুন্নাহর পথে আনে। যে ভালোবাসা মানুষকে গুনাহ ছাড়তে শেখায়।যে ভালোবাসা মানুষকে মদিনা থেকে ফিরে গিয়েও মদিনার মানুষ বানিয়ে রাখে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ শুধু জ্ঞান দিয়ে বাঁচে না। মানুষ বাঁচে ভালোবাসা দিয়ে।
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার চেয়ে পবিত্র, সুন্দর ও জীবন-পরিবর্তনকারী ভালোবাসা পৃথিবীতে আর নেই।
সাহাবিদের ইশক।
*******************
হুদাইবিয়ার সময় কুরাইশদের প্রতিনিধি হয়ে এসেছিলেন উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফী। তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং বহু রাজা-বাদশাহর দরবার দেখা একজন মানুষ। মুসলমানদের অবস্থা দেখে তিনি ফিরে গিয়ে কুরাইশদের বলেছিলেন আমি পারস্যের সম্রাটের দরবার দেখেছি, রোমের সম্রাটের দরবার দেখেছি, আবিসিনিয়ার নাজাশীর দরবারও দেখেছি। কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ-এর সাথীরা তাঁকে যে পরিমাণ ভালোবাসে ও সম্মান করে, তেমন দৃশ্য আমি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি।
একজন মানুষকে অন্য মানুষ এতটা ভালোবাসতে পারে—এটা উরওয়ার কাছে ছিল অবিশ্বাস্য।
কিন্তু এই ভালোবাসার রহস্য কী ছিল?
এটা কোনো অন্ধ ভক্তি ছিল না। এটা ছিল না ব্যক্তিপূজা। এটা ছিল না ক্ষমতার ভয়। কারণ সাহাবিরা জানতেন, মুহাম্মাদ ﷺ একজন মানুষ, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। কিন্তু তারা তাঁর মধ্যে দেখেছিলেন সত্য, সততা, দয়া, মমতা এবং আল্লাহর নূরের প্রতিফলন।
তারা দেখেছিলেন যে মানুষটি নিজের জন্য নয়, তাদের জন্য কাঁদেন। নিজে ক্ষুধার্ত থেকেও উম্মতের কথা ভাবেন। তায়েফে রক্তাক্ত হয়েও মানুষের হেদায়েত চান। উহুদে আহত হয়েও বদদোয়া না করে ক্ষমার দোয়া করেন। রাতভর দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে উম্মতের জন্য কান্না করেন। এমন একজন মানুষকে ভালো না বেসে কি থাকা যায়?
সাহাবিদের কাছে রাসূল ﷺ শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না। শুধু একজন নেতা ছিলেন না। শুধু একজন বিচারক ছিলেন না। তিনি ছিলেন তাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। তাই হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার কাছে সবকিছুর চেয়ে প্রিয়, তবে আমার নিজের প্রাণ ছাড়া। রাসূল ﷺ বললেন, না, উমর! ততক্ষণ পর্যন্ত নয়, যতক্ষণ না আমি তোমার নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয় হই। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন,
এখন আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়।
এটাই ছিল সেই ভালোবাসা। যে ভালোবাসা মানুষকে ত্যাগ শেখায়। যে ভালোবাসা মানুষকে আনুগত্য শেখায়। যে ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়। সাহাবিদের এই ইশক শুধু চোখের পানি ছিল না।
শুধু আবেগ ছিল না।
এটি ছিল আমল, আনুগত্য, ত্যাগ এবং সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে প্রকাশিত ভালোবাসা। কারণ সত্যিকারের প্রেমের প্রমাণ দাবি ন—অনুসরণ।
আর সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের জীবন ছিল সেই প্রেমের জীবন্ত তাফসির।
জ্ঞান আল্লাহ চিনায়, প্রেম তার দিকে টেনে নেয়।
******************************************
ইকবাল বলেন—
علم مقامِ صفات، عشق تماشائے ذات
“জ্ঞান আল্লাহর গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করে, আর প্রেম আল্লাহর সত্তার দিকে ছুটে যায়।”
জ্ঞান আমাদের শেখায়আল্লাহ রহমান। আল্লাহ রহীম।আল্লাহ গফুর। আল্লাহ সাত্তার।আল্লাহ লতীফ। আল্লাহ আমাদের রব। এসব জানা জরুরি। ঈমানের ভিত্তিই হলো সঠিক জ্ঞান।
কিন্তু শুধু জানাই কি যথেষ্ট?
একজন মানুষ মধুর সংজ্ঞা জানতে পারে, মধুর রং জানতে পারে, মধুর উপকারিতা নিয়ে বই লিখতে পারে। কিন্তু মধুর স্বাদ সে তখনই বুঝবে, যখন এক ফোঁটা মধু জিহ্বায় রাখবে। ঠিক তেমনি আল্লাহ সম্পর্কে জানা এক জিনিস, আর আল্লাহকে হৃদয়ে অনুভব করা আরেক জিনিস।
আমরা জানি আল্লাহ ক্ষমাশীল।কিন্তু কখনো কি তাহাজ্জুদের নীরব রাতে দুই হাত তুলে কেঁদেছি হে আল্লাহ! আমি অনেক দূরে চলে গেছি। আমাকে ফিরিয়ে নিন।
আমরা জানি আল্লাহ দয়ালু। কিন্তু কখনো কি একান্ত নির্জনে বলেছি হে আল্লাহ! পৃথিবীর কাউকে না পেলেও আমি আপনাকে চাই।
আমরা জানি আল্লাহ ভালোবাসেন তাঁর বান্দাদের।কিন্তু কখনো কি হৃদয়ের গভীর থেকে বলেছি হে আল্লাহ! আমি আপনার ভালোবাসা চাই। আপনার সন্তুষ্টি চাই। আপনার নৈকট্য চাই।
এখানেই জ্ঞান থেকে প্রেমের যাত্রা শুরু হয়। জ্ঞান বলে আল্লাহ আছেন। প্রেম বলে আমি আল্লাহকে চাই। জ্ঞান বলে আল্লাহ মহান। প্রেম বলে তাঁকে ছাড়া আমার হৃদয় শান্তি পায় না। জ্ঞান বলে জান্নাত আছে।
প্রেম বলে জান্নাতের চেয়েও বড় পাওয়া হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।
জ্ঞান পথ দেখায়। প্রেম সেই পথে হাঁটায়। জ্ঞান আলো জ্বালায়। প্রেম পা চালায়। জ্ঞান চিনিয়ে দেয় প্রভুকে।প্রেম পৌঁছে দেয় প্রভুর দরজায়। তাই মুমিনের জীবনে দুটিই দরকার।
জ্ঞানহীন প্রেম মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
আর প্রেমহীন জ্ঞান মানুষকে শুষ্ক করে দিতে পারে।
সবচেয়ে সুন্দর অবস্থা হলো মস্তিষ্কে ইলম থাকবে,
হৃদয়ে ইশক থাকবে, জিহ্বায় যিকির থাকবে, আর চোখে থাকবে আল্লাহর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা।
তখন বান্দা শুধু আল্লাহ সম্পর্কে জানে না, সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। সে আল্লাহকে ডাকে। সে আল্লাহর জন্য কাঁদে। আর কখনো কখনো রাতের গভীর নীরবতায় তার হৃদয় থেকে শুধু একটি কথাই বের হয় হে আল্লাহ! আমি আপনার রহমত চাই না শুধু, আপনার দান চাই না শুধু, আপনার জান্নাতও চাই না শুধু আমি আপনাকেই চাই।”
কেন প্রেম ছাড়া ইবাদত শুকিয়ে যায়?
************************************
ইকবাল বলেন—
عشق سکون و ثبات
عشق حیات و ممات
প্রেমই প্রশান্তি। প্রেমই স্থিরতা। প্রেমই জীবন। প্রেমই মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকার শক্তি।”
ইবাদতের শরীর আছে, আবার প্রাণও আছে। নামাজের শরীর হলো কিয়াম, রুকু, সিজদা। রোজার শরীর হলো খাওয়া-দাওয়া থেকে বিরত থাকা।
তিলাওয়াতের শরীর হলো অক্ষর উচ্চারণ করা।
কিন্তু এসবের প্রাণ কী?
সেটা হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা। প্রেম চলে গেলে ইবাদত থেকে প্রাণ চলে যায়। তখন নামাজ পড়া হয়, কিন্তু নামাজে শান্তি পাওয়া যায় না। কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, কিন্তু হৃদয় নরম হয় না। যিকির করা হয়, কিন্তু চোখে পানি আসে না। দাওয়াতের কাজ করা হয়, কিন্তু তা আর ইবাদত মনে হয় না; দায়িত্ব বা চাকরি মনে হয়।
কারণ ভালোবাসা ছাড়া কোনো সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একজন মা রাত জেগে সন্তানের সেবা করেন। কেন? ভালোবাসেন বলে। একজন মানুষ প্রিয়জনের জন্য কষ্ট সহ্য করে। কেন? ভালোবাসেন বলে।
একজন মুমিন আল্লাহর জন্য রাত জাগে, গুনাহ ছাড়ে, নিজের নফসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কেন? কারণ সে আল্লাহকে ভালোবাসে। যখন হৃদয়ে প্রেম জেগে ওঠে, তখন ইবাদতের রূপ বদলে যায়। তখন দুই রাকাত নামাজও দীর্ঘ মনে হয় না। বরং সালাম ফিরিয়ে আফসোস হয় আরেকটু যদি দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম!
হাসান বসরী (রহ.) বলতেন, কিছু মানুষ এমন আছে যারা জান্নাতের ভয়ে বা পুরস্কারের আশায় ইবাদত করে। আর কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহর ভালোবাসায় ইবাদত করে। এটাই ইবাদতের সর্বোচ্চ স্তর।
তাই আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা দরকার আমি নামাজ পড়ি, কিন্তু নামাজ কি আমাকে টানে?
আমি কুরআন পড়ি, কিন্তু কুরআন কি আমার হৃদয় নাড়ায়?
আমি দোয়া করি, কিন্তু আল্লাহর সাথে কি আমার কোনো অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে?
যেদিন হৃদয়ে আল্লাহর মহব্বত জাগবে, সেদিন ইবাদত বোঝা থাকবে না। ইবাদত হবে সাক্ষাৎ। সিজদা হবে আশ্রয়। কুরআন হবে প্রিয়জনের চিঠি। দোয়া হবে হৃদয়ের কথোপকথন।
আর তখন বান্দা বুঝতে পারবে ইবাদতের আসল স্বাদ রুকু-সিজদার সংখ্যায় নয়, ইবাদতের আসল স্বাদ আল্লাহর ভালোবাসায়। কারণ প্রেমহীন ইবাদত চলতে পারে,্যকিন্তু হৃদয়কে জীবিত করতে পারে না।
আর আল্লাহর প্রেম এসে গেলে একটি সিজদাই যথেষ্ট হৃদয়কে কাঁদানোর জন্য, একটি আয়াতই যথেষ্ট জীবন বদলে দেওয়ার জন্য, একটি “ইয়া রব”ই যথেষ্ট চোখ ভিজিয়ে দেওয়ার জন্য।
যত প্রশ্নের জগৎ ও উত্তরের জগৎ
********************************
ইকবাল বলেন—
علم ہے پیدا سوال
عشق ہے پنہاں جواب
জ্ঞান প্রশ্ন সৃষ্টি করে, আর প্রেম নিজের ভেতরেই উত্তর বহন করে। জ্ঞান মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়। কেন?কীভাবে? কখন? কোথায়? জ্ঞান অনুসন্ধান শেখায়, চিন্তা করতে শেখায়। এটা আল্লাহর বড় নিয়ামত।
কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। রওজার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ এমন এক অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়।
সেখানে দাঁড়িয়ে কেউ ইতিহাসের বই খুলে বসে না।
কেউ বিতর্ক করতে চায় না। কেউ যুক্তি সাজাতে চায় না। বরং হৃদয়ের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে।অনেক প্রশ্ন হঠাৎ করেই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
কারণ সেখানে মাথার চেয়ে হৃদয় বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে তথ্যের চেয়ে সম্পর্ক বড় হয়ে যায়। সেখানে জানা নয়, অনুভব করাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
যেমন একটি শিশু তার মাকে নিয়ে কোনো দর্শন জানে না।
মায়ের ত্যাগের ইতিহাসও জানে না। কিন্তু সে জানে এটাই আমার মা। এই জানার মধ্যে যুক্তি কম, ভালোবাসা বেশি। ঠিক তেমনি একজন মুমিন যখন রাসূল ﷺ-এর রওজার সামনে দাঁড়ায়, তখন তার হৃদয় বলে ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার উম্মত।
আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমি আপনার পথেই চলতে চাই।এই অনুভূতির সামনে অনেক প্রশ্ন ছোট হয়ে যায়।
কারণ সব প্রশ্নের উত্তর বইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না।
কিছু উত্তর চোখের পানিতে পাওয়া যায়। কিছু উত্তর সিজদায় পাওয়া যায়। কিছু উত্তর রাতের নির্জনে পাওয়া যায়। আর কিছু উত্তর ভালোবাসার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের জীবনেও আমরা এটি দেখি।
তারা রাসূল ﷺ-কে নিয়ে শুধু প্রশ্ন করেননি, তাঁকে ভালোবেসেছেন। শুধু তাঁর কথা শোনেননি, তাঁর জন্য জীবন দিয়েছেন।শুধু তাঁর সত্যতা বুঝেননি, তাঁর প্রতি নিজেদের হৃদয় সমর্পণ করেছেন। তাই তাদের কাছে রাসূল ﷺ ছিলেন কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নন; তিনি ছিলেন জীবনের অর্থ, হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু।
আজ আমাদের অনেক প্রশ্ন আছে। কিন্তু প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রয়োজন হলো এমন একটি হৃদয়, যা আল্লাহকে ভালোবাসে, রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসে।
কারণ জ্ঞান পথ দেখায়, কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। জ্ঞান বলে এটাই সত্য। আর প্রেম বলে—আমি সেই সত্যের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। তখন আর সব প্রশ্নের আলাদা উত্তর লাগে না।
হৃদয় নিজেই বলে ওঠে আমি বুঝেছি না সবকিছু, কিন্তু আমি ভালোবেসেছি। আর এই ভালোবাসাই আমাকে পথ দেখাবে।”
বদর, উহুদ ও তাবুকের পেছনের শক্তি
****************************”*******
ইকবাল বলেন—
عشق کے ہیں معجزات
سلطنت و فقر و دیں
প্রেমেরই বিস্ময়কর শক্তি— সভ্যতা গড়ে, সাম্রাজ্য গড়ে, দ্বীনকে জীবন্ত রাখে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা অনেক ঘটনা দেখি, কিন্তু গভীরে গেলে একটি শক্তিকে দেখতে পাই সেটি হলো ইশক, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা।
বদরের ময়দানে ৩১৩ জন মানুষ দাঁড়িয়েছিলেন। সামনে প্রায় এক হাজার সশস্ত্র সৈন্য। অস্ত্র কম, ঘোড়া কম, উট কম। বাহ্যিক হিসাব বলছিল এ যুদ্ধ জেতার কথা নয়। তবু তারা এগিয়ে গেলেন। কেন? কারণ তাদের হৃদয়ে এমন কিছু ছিল, যা সংখ্যার চেয়েও বড়।
তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করতেন।রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসতেন।
তারা জানতেন জীবন থাকলেও আল্লাহর জন্য, মৃত্যু এলেও আল্লাহর জন্য। এই ভালোবাসাই তাদের পা কাঁপতে দেয়নি। এই ভালোবাসাই তাদের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে সাহায্য করেছে।
তারপর আসলো উহুদ। সত্তর জন শহীদ। রাসূল ﷺ আহত। মুখমণ্ডল রক্তাক্ত। দাঁত মুবারক শহীদ। অনেক সাহাবি আহত। বাহ্যিকভাবে এটি ছিল কঠিন এক পরীক্ষা। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, তারা ভেঙে পড়েননি।পরাজয়ের ক্ষত নিয়ে আবার দাঁড়িয়েছেন।
আবার প্রস্তুত হয়েছেন। আবার রাসূল ﷺ-এর ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
কারণ ভালোবাসা আঘাতে শেষ হয়ে যায় না।সত্যিকারের ভালোবাসা আঘাতের পরেও টিকে থাকে।বরং আরও গভীর হয়। আর তারপর তাবুক। প্রচণ্ড গরম। দীর্ঘ পথ। খাদ্যের সংকট। যানবাহনের সংকট।শত্রু ছিল শক্তিশালী রোমান সাম্রাজ্য।
এমন সময় মানুষের সাধারণ প্রবৃত্তি বলে—ঘরে থাকো, বিশ্রাম নাও, নিরাপদ থাকো। কিন্তু সাহাবিরা বেরিয়ে পড়লেন। কেউ নিজের সম্পদ দিলেন।কেউ নিজের আরাম ত্যাগ করলেন। কেউ চোখের পানি ফেললেন শুধু এই কারণে যে যাওয়ার মতো বাহন নেই।
এ কোন শক্তি? এ কোন আবেগ? এ কোন প্রেরণা?
উত্তর একটাই ইশক। রাসূল ﷺ-এর প্রতি ইশক।আল্লাহর প্রতি ইশক।এই প্রেমই আবু বকর (রা.)-কে সমস্ত সম্পদ এনে রাসূল ﷺ-এর সামনে রাখতে শিখিয়েছে। এই প্রেমই উমর (রা.)-কে অর্ধেক সম্পদ দান করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
এই প্রেমই উসমান (রা.)-কে তাবুকের বাহিনী সাজাতে শত শত উট ও বিপুল সম্পদ দিতে অনুপ্রাণিত করেছে। এই প্রেমই বিলাল (রা.)-কে নির্যাতনের মাঝেও “আহাদ, আহাদ” বলতে শিখিয়েছে। এই প্রেমই মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে বিলাসিতার জীবন ছেড়ে দাওয়াতের পথে নামিয়েছে।
সাহাবিদের কাছে ইসলাম শুধু একটি মতবাদ ছিল না।
শুধু কয়েকটি বিধান ছিল না। এটি ছিল ভালোবাসার সম্পর্ক। তারা আল্লাহকে ভালোবাসতেন। রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসতেন। আর সেই ভালোবাসাই তাদের এমন কাজ করিয়েছে, যা সাধারণ হিসাব-নিকাশ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আজও দ্বীনের বড় বড় কাজ জ্ঞান দিয়ে শুরু হয়, পরিকল্পনা দিয়ে এগোয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলোকে টিকিয়ে রাখে ভালোবাসা। কারণ মানুষ কষ্ট সহ্য করে জ্ঞানের কারণে নয়, ভালোবাসার কারণে। ত্যাগ করে ভালোবাসার কারণে। অটল থাকে ভালোবাসার কারণে।
বদরের পেছনে ছিল ভালোবাসা। উহুদের ধৈর্যের পেছনে ছিল ভালোবাসা। তাবুকের ত্যাগের পেছনে ছিল ভালোবাসা। আর কিয়ামত পর্যন্ত দ্বীনের পথে যারা অবিচল থাকবে, তাদের শক্তির উৎসও হবে সেই একই জিনিস আল্লাহর প্রতি ইশক, আর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি অকৃত্রিম মহব্বত।
প্রেম মানুষকে রাজাদের থেকেও বড় করে
**************************************
ইকবাল বলেন—
عشق کے ادنیٰ غلام
صاحبِ تاج و نگیں
“প্রেমের সামান্য একজন গোলামও মুকুটধারী রাজাদের চেয়ে বড়।”
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক রাজা এসেছে। অনেক সম্রাট এসেছে। তাদের ছিল সেনাবাহিনী, ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, প্রাসাদ, মুকুট। কিন্তু আজ তাদের অধিকাংশের নাম মানুষ মনে রাখে না।
আর কিছু মানুষ ছিলেন, যাদের মাথায় কোনো মুকুট ছিল না, হাতে কোনো রাজদণ্ড ছিল না, তবু তারা যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয় শাসন করছেন।
কারণ তারা প্রেমের মানুষ ছিলেন। তাদের হৃদয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসায় পূর্ণ ছিল।
হযরত বিলাল (রা.)-এর কথা ভাবুন। তিনি ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাস। সমাজে তাঁর কোনো মর্যাদা ছিল না। কোনো বংশীয় গৌরব ছিল না। কোনো সম্পদ ছিল না। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল ঈমানের আলো এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা।
নির্যাতনের উত্তপ্ত বালুর ওপর শুয়ে থেকেও তিনি বলেছিলেন আহাদ! আহাদ! আল্লাহ এক! আল্লাহ এক!
আজ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করে। প্রতিদিন তাঁর ত্যাগের গল্প বলা হয়। তাঁর নাম শুনলে মানুষের হৃদয় ভালোবাসায় ভরে ওঠে। অন্যদিকে আবু জাহলকে দেখুন। মক্কার নেতা।প্রভাবশালী ব্যক্তি। ক্ষমতাবান। সম্মানিত গোত্রপ্রধান।কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল অহংকারে ভরা। সত্যকে চিনেও তিনি তা মেনে নেননি।
রাসূল ﷺ-এর প্রতি বিদ্বেষ তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল।
আজ তাঁর নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণার প্রতীক হিসেবে।
কেন এই পার্থক্য?কারণ একদিকে ছিল প্রেম, অন্যদিকে ছিল অহংকার। একদিকে ছিল আত্মসমর্পণ। অন্যদিকে ছিল আত্মগরিমা। একদিকে ছিল হে আল্লাহ, আমি আপনার। অন্যদিকে ছিল আমি নিজেই যথেষ্ট। ইতিহাসের এই শিক্ষা কখনো পুরোনো হয় না।
আল্লাহর কাছে মানুষের মূল্য সম্পদে নয়। পদমর্যাদায় নয়। ক্ষমতায় নয়। মূল্য হলো হৃদয়ে। হৃদয়ে কতটুকু ঈমান আছে। কতটুকু মহব্বত আছে। কতটুকু আনুগত্য আছে।
তাই আমরা দেখি সালমান ফারসি (রা.) ছিলেন বিদেশি।সুহাইব রুমি (রা.) ছিলেন রোমান বংশোদ্ভূত। বিলাল (রা.) ছিলেন সাবেক দাস। কিন্তু তারা এমন মর্যাদা লাভ করেছেন, যা বহু সম্রাটও পায়নি।
কারণ আল্লাহর পথে ভালোবাসা মানুষকে উঁচু করে।
রাসূল ﷺ-এর মহব্বত মানুষকে সম্মানিত করে দুনিয়ার মুকুট মাথার উপর থাকে।ঋআজ আছে, কাল নেই। কিন্তু প্রেমের মুকুট হৃদয়ের উপর থাকে। আর সেই মুকুট মৃত্যু কেড়ে নিতে পারে না।
ইতিহাস মুছে ফেলতে পারে না। তাই প্রকৃত সম্মান ক্ষমতায় নয়,প্রকৃত সম্মান হলো এমন একটি হৃদয়, যা আল্লাহকে ভালোবাসে, রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসে, এবং সেই ভালোবাসার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে।
কারণ প্রেমের একজন সাধারণ গোলামও কখনো কখনো এমন উচ্চতায় পৌঁছে যায়, যেখানে অনেক রাজা-বাদশাহর দৃষ্টি পর্যন্ত পৌঁছায় না।
ইয়াকীন ও প্রেম
**************
প্রেমের ফল হলো ইয়াকীন
ইকবাল বলেন—
عشق سراپا یقیں
اور یقیں فتحِ باب
প্রেমের সারাংশই হলো ইয়াকীন (দৃঢ় বিশ্বাস)। আর ইয়াকীনই সাফল্যের দরজা খুলে দেয়। মানুষ যখন কাউকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসে, তখন তার প্রতি বিশ্বাসও গভীর হয়ে যায়।
আর যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন সেই ভালোবাসা ধীরে ধীরে ইয়াকীনে পরিণত হয়।
সাহাবায়ে কেরাম (রা.) জান্নাত দেখেননি। তারা জাহান্নামও দেখেননি। তারা ফেরেশতাদের প্রতিনিয়ত চোখে দেখতেন না। কিন্তু তাদের বিশ্বাস ছিল পাহাড়ের চেয়েও দৃঢ়।
কারণ তারা রাসূল ﷺ-কে ভালোবেসেছিলেন। তাঁর সত্যবাদিতা, তাঁর চরিত্র, তাঁর আমানতদারিতা, তাঁর জীবন সবকিছু তাদের হৃদয় জয় করেছিল। তারা জানতেন যিনি কখনো মানুষের কাছে মিথ্যা বলেননি, তিনি আল্লাহর ব্যাপারেও মিথ্যা বলতে পারেন না।
তাই রাসূল ﷺ যখন বললেন জান্নাত আছে, তারা বিশ্বাস করলেন। তিনি যখন বললেন আল্লাহ আছেন,
তারা বিশ্বাস করলেন। তিনি যখন বললেন একদিন পুনরুত্থান হবে, তারা বিশ্বাস করলেন।
এই বিশ্বাস শুধু মুখের কথা ছিল না। এটি তাদের রক্তে মিশে গিয়েছিল। তাই বদরের ময়দানে তারা এগিয়ে গেছেন। উহুদের ক্ষত নিয়ে আবার দাঁড়িয়েছেন।খন্দকের শীতল রাত পার করেছেন।তাবুকের জ্বলন্ত রোদে পথ চলেছেন। কারণ তাদের হৃদয়ে সন্দেহ ছিল না।
ইয়াকীন ছিল।হযরত হারিসা (রা.)-কে রাসূল ﷺ একদিন জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সকাল কেমন হয়েছে?”
তিনি বললেন আমি প্রকৃত মুমিন হিসেবে সকাল করেছি। রাসূল ﷺ জিজ্ঞেস করলেন,প্রত্যেক কথার একটি বাস্তবতা আছে। তোমার ঈমানের বাস্তবতা কী?তিনি বললেন,যেন আমি আল্লাহর আরশ দেখতে পাচ্ছি, জান্নাতবাসীদের জান্নাতে দেখতে পাচ্ছি এবং জাহান্নামবাসীদের জাহান্নামে দেখতে পাচ্ছি।”
এটি ছিল ইয়াকীনের ভাষা। চোখে দেখা নয়,হৃদয়ে দেখা। কানে শোনা নয়, অন্তরে অনুভব করা। আজ আমাদের অনেক জ্ঞান আছে। অনেক বই আছে।অনেক আলোচনা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের ইয়াকীন কতটুকু? আযান হলে কি আমরা এমনভাবে উঠি, যেন আল্লাহ আমাদের ডাকছেন? দোয়া করার সময় কি আমরা এমনভাবে হাত তুলি, যেন তিনি অবশ্যই শুনছেন?
গুনাহ থেকে দূরে থাকার সময় কি আমরা এমনভাবে বাঁচি, যেন কিয়ামত সত্যিই আসছে?
সাহাবিদের শক্তি শুধু জ্ঞান ছিল না। তাদের শক্তি ছিল ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসা জন্ম দিয়েছিল ইয়াকীনের। ইয়াকীন তাদের ভয়কে সাহসে বদলে দিয়েছে। দুর্বলতাকে শক্তিতে বদলে দিয়েছে।
সাধারণ মানুষকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত করেছে।
তাই হৃদয়ে যদি আল্লাহর মহব্বত জাগে, রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা গভীর হয়, তবে সেই ভালোবাসা একদিন ইয়াকীনে পরিণত হবে।
আর যখন ইয়াকীন জন্ম নেয়, তখন পথের দরজা খুলে যায়। ইবাদতের স্বাদ জন্ম নেয়। ত্যাগ সহজ হয়ে যায়। দুনিয়ার ভয় ছোট হয়ে যায়। কারণ তখন বান্দা শুধু জানে না সে বিশ্বাস করে। আর শুধু বিশ্বাসই করে না সে সেই বিশ্বাস নিয়েই বাঁচে, চলে, সংগ্রাম করে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। প্রেম হৃদয়কে জাগায়, আর জাগ্রত হৃদয়ের নামই ইয়াকীন।
প্রেমের শরীয়ত
******************
ইকবাল বলেন—
شرعِ محبت میں ہے
عشرتِ منزل حرام
ভালোবাসার শরীয়তে গন্তব্যে পৌঁছে আরামে বসে থাকা হারাম।
প্রেমের একটি স্বভাব আছে। প্রেম মানুষকে থামতে দেয় না। প্রেম মানুষকে সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকতে দেয় না। প্রেমিক কখনো মনে করে না আমি অনেক করেছি, এখন যথেষ্ট।
বরং যত এগোয়, তত নিজের অপূর্ণতা দেখতে পায়।
তত আরো কাছে যেতে চায়। তত আরো দিতে চায়।
তত আরো কাঁদতে চায়। তত আরো ইবাদত করতে চায়।একজন মুমিনের জীবন তাই আরামের জীবন নয়।
এটি সংগ্রামের জীবন। নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।গুনাহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।অবহেলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। যতদিন নিঃশ্বাস আছে ততদিন তাওবা। ততদিন দাওয়াত। ততদিন কুরআনের সাথে সম্পর্ক। ততদিন সিজদা। ততদিন চোখের পানি। ততদিন নিজেকে বদলানোর চেষ্টা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা।
তাঁর সব গুনাহ মাফ ছিল। তবুও তিনি রাতের পর রাত দাঁড়িয়ে ইবাদত করতেন। পা মুবারক ফুলে যেত।
কারণ ভালোবাসা বিশ্রাম চেনে না। ভালোবাসা আরো কাছে যেতে চায়। আল্লাহর ওলিরাও তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমল করে গেছেন। তাদের কাছে দ্বীন কোনো দায়িত্ব ছিল না শুধু, এটি ছিল প্রেমের সফর। আর প্রেমের সফরে “এবার যথেষ্ট” বলে কোনো কথা নেই।
প্রেমিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করে না
******************************
ইকবাল বলেন—
عشق پہ بجلی حلال
عشق پہ حاصل حرام
প্রেমিকের জন্য বজ্রপাতও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু লাভ-ক্ষতির হিসাব করা গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রেমের ভাষা ব্যবসার ভাষা নয়। প্রেমের ভাষা হিসাবের ভাষা নয়। ব্যবসায়ী আগে জিজ্ঞেস করে আমি কী পাব? প্রেমিক আগে জিজ্ঞেস করে আমি কী দিতে পারি? ব্যবসায়ী লাভ দেখে। প্রেমিক প্রিয়জনকে দেখে।
সাহাবিদের জীবন এই সত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে সৌখিন যুবকদের একজন। সেরা পোশাক।সেরা সুগন্ধি। সেরা জীবনযাপন। কিন্তু ঈমান আনার পর সবকিছু হারালেন। পরিবার ছেড়ে দিল। সম্পদ চলে গেল। বিলাসিতা চলে গেল। তবুও তিনি ফিরে তাকাননি। কারণ তাঁর হৃদয় রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসায় ভরে গিয়েছিল।
উহুদের দিন যখন তিনি শহীদ হলেন, তখন তাঁর কাফনের জন্যও পুরো কাপড় ছিল না। মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত। পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যেত।
কিন্তু তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষের একজন হয়ে রইলেন। কারণ প্রেমিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করে না। হযরত সুমাইয়া (রা.)-কে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। কিন্তু তিনি ঈমান ছাড়লেন না। কারণ তাঁর কাছে জীবন থেকেও বড় ছিল আল্লাহর ভালোবাসা।
হযরত খুবাইব (রা.)-কে যখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছিল, তখন তাঁকে বলা হলো তুমি কি চাও, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মাদ ﷺ এখানে থাকুক আর তুমি মুক্তি পাও? খুবাইব (রা.) বললেন “আল্লাহর কসম! আমি তো এটাও চাই না যে, আমি আমার পরিবারের মাঝে নিরাপদে থাকি আর রাসূল ﷺ-এর পায়ে একটি কাঁটাও ফুটুক।”
সুবহানাল্লাহ! এ কেমন ভালোবাসা? এ কেমন সম্পর্ক?এ কেমন হৃদয়? এটি সেই হৃদয়, যা নিজের কষ্ট ভুলে গেছে। নিজের লাভ-ক্ষতির হিসাব ভুলে গেছে। শুধু প্রিয়জনের কথা ভাবছে।
আজ আমরা অনেক সময় দ্বীনের কাজও হিসাব করে করি। কত লাভ হবে? কত সম্মান পাব? কত মানুষ প্রশংসা করবে? কিন্তু প্রেমিকের প্রশ্ন অন্য। আল্লাহ কি খুশি হবেন? রাসূল ﷺ কি এই কাজ পছন্দ করতেন?
এটাই তার চিন্তা। কারণ প্রেমিক পুরস্কারের জন্য কাজ করে না, প্রেমিক কাজ করে ভালোবাসার কারণে।
আর ইতিহাস সাক্ষী যারা হিসাব করে বেঁচেছে, তারা ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে।আর যারা ভালোবেসে দিয়েছে, ত্যাগ করেছে, কেঁদেছে, সংগ্রাম করেছে তারা মানুষের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে আছে।
প্রেমিক কষ্টকে ভয় পায় না। প্রেমিক ক্ষতিকে ভয় পায় না। প্রেমিক শুধু একটি বিষয়কে ভয় পায় প্রিয়জনের অসন্তুষ্টি।
علم ہے ابن الکتاب، عشق ہے ام الکتاب
জ্ঞান হলো কিতাবের সন্তান, আর প্রেম হলো কিতাবের জননী। ইকবালের এই শেরটি তাঁর সমগ্র দর্শনের এক অসাধারণ সারসংক্ষেপ।
অর্থাৎ জ্ঞান জন্ম নেয় পাঠ, অধ্যয়ন, গবেষণা ও চিন্তা থেকে। মানুষ পড়ে। শেখে। গবেষণা করে। তারপর জ্ঞান অর্জন করে। জ্ঞান অত্যন্ত মূল্যবান।
কুরআনের প্রথম শব্দই—
اقْرَأْ
“পড়।”
ইসলাম অজ্ঞতার ধর্ম নয়। ইসলাম জ্ঞানের ধর্ম। কিন্তু ইকবাল এখানেই থামেননি।
عشق ہے ام الکتاب
প্রেম হলো উম্মুল কিতাব—কিতাবের জননী। এ কথার অর্থ কী? এর অর্থ হলো যে শক্তি মানুষকে কিতাবের দিকে নিয়ে যায়, তা হলো প্রেম।
যে ভালোবাসা মানুষকে রাত জেগে কুরআন পড়তে বাধ্য করে, তা হলো প্রেম। যে মহব্বত মানুষকে হাদিস মুখস্থ করায়, তা হলো প্রেম। যে ভালোবাসা একজন মুহাদ্দিসকে হাজার মাইল সফরে পাঠায়, তা হলো প্রেম।
ইমাম বুখারী (রহ.) কেন হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করেছিলেন? শুধু তথ্য সংগ্রহের জন্য?রাসূল ﷺ-এর প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে। ইমাম আহমদ (রহ.) কেন নির্যাতন সহ্য করেছিলেন? কারণ তাঁর হৃদয়ে ইশক ছিল। জ্ঞান ছিল সেই প্রেমের ফল।
রওজার সামনে দাঁড়িয়ে এই শেরের অর্থ
***********************************
মদিনায় রওজার সামনে দাঁড়ালে মানুষ এই শেরের অর্থ নতুনভাবে বুঝতে পারে। অনেকেই রাসূল ﷺ-এর জীবনী পড়েছে। অনেকেই হাজারো হাদিস জানে।এগুলো ইলম।
কিন্তু যখন সালাম পেশ করতে গিয়ে চোখ ভিজে যায় যখন বিদায়ের সময় বুক ভেঙে আসে যখন মনে হয়, হে আল্লাহ! আবার আমাকে এখানে ফিরিয়ে আনুন
তখন বোঝা যায়, ইশক কী।
সেই মুহূর্তে মানুষ অনুভব করে জ্ঞান আমাকে এখানে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু প্রেম আমাকে কাঁদাচ্ছে। জ্ঞান আমাকে রাসূল ﷺ-কে চিনিয়েছে। কিন্তু প্রেম আমাকে তাঁর উম্মত হওয়ার গৌরব অনুভব করাচ্ছে।
ইকবাল আমাদের শেখান জ্ঞান চাই। অনেক জ্ঞান চাই।কুরআনের জ্ঞান চাই। হাদিসের জ্ঞান চাই। ফিকহের জ্ঞান চাই। কিন্তু সেই জ্ঞানের প্রাণ হতে হবে প্রেম।
কারণ প্রেমহীন জ্ঞান অহংকার সৃষ্টি করতে পারে।কিন্তু প্রেম জ্ঞানকে বিনয়ী করে। প্রেম জ্ঞানকে জীবন্ত করে।প্রেম জ্ঞানকে আমলে রূপান্তরিত করে।
আর যখন ইলম ও ইশক একত্রিত হয় তখন আবু বকর (রা.) জন্ম নেন, উমর (রা.) জন্ম নেন, বিলাল (রা.) জন্ম নেন, খালিদ (রা.) জন্ম নেন, এবং ইতিহাস বদলে যায়।
আল্লাহ আমাদেরকে এমন ইলম দান করুন, যা ইশকের দিকে নিয়ে যায়; এবং এমন ইশক দান করুন, যা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর উপর অবিচল রাখে। আমীন।
আল্লামা ইকবালের বিখ্যাত কবিতা “ইলম ও ইশক
*******************************************
(জ্ঞান ও প্রেম)-এর বাংলা তরজমা :
علم نے مجھ سے کہا عشق ہے دیوانہ پن
عشق نے مجھ سے کہا علم ہے تخمین و ظن
জ্ঞান আমাকে বলল, প্রেম হলো উন্মাদনা।
প্রেম আমাকে বলল, জ্ঞান হলো অনুমান আর ধারণার জগৎ।
بندۂ تخمین و ظن! کرمِ کتابی نہ بن
عشق سراپا حضور، علم سراپا حجاب
হে অনুমান-নির্ভর মানুষ! শুধু বইয়ের পোকা হয়ো না।
প্রেম হলো পূর্ণ উপস্থিতি, আর জ্ঞান অনেক সময় পর্দা হয়ে দাঁড়ায়।
عشق کی گرمی سے ہے معرکۂ کائنات
علم مقامِ صفات، عشق تماشائے ذات
প্রেমের উত্তাপেই বিশ্বজগতের আন্দোলন।
জ্ঞান আল্লাহর গুণাবলী নিয়ে আলোচনা করে, আর প্রেম তাঁর সত্তার দিকে ধাবিত হয়।
عشق سکون و ثبات، عشق حیات و ممات
علم ہے پیدا سوال، عشق ہے پنہاں جواب
প্রেমই স্থিরতা, প্রেমই জীবন ও মৃত্যু।
জ্ঞান প্রশ্ন সৃষ্টি করে, প্রেম গোপন উত্তর খুঁজে পায়।
عشق کے ہیں معجزات سلطنت و فقر و دیں
عشق کے ادنیٰ غلام صاحبِ تاج و نگیں
রাজত্ব, দীন ও আধ্যাত্মিকতার বিস্ময়কর শক্তি প্রেমেরই ফল। প্রেমের সামান্য গোলামও মুকুটধারীদের চেয়ে মহৎ।
عشق مکان و مکیں، عشق زمان و زمیں
عشق سراپا یقیں، اور یقیں فتحِ باب
প্রেম স্থান ও স্থানের অধিবাসী, সময় ও পৃথিবীকে অতিক্রম করে। প্রেম সম্পূর্ণ বিশ্বাস, আর বিশ্বাসই সফলতার দ্বার খুলে দেয়।
شرعِ محبت میں ہے عشرتِ منزل حرام
شورشِ طوفاں حلال، لذتِ ساحل حرام
প্রেমের শরীয়তে গন্তব্যে আরাম করে বসে থাকা হারাম। ঝড়ের সাথে সংগ্রাম হালাল, কিন্তু তীরে বসে আরাম করা হারাম।
عشق پہ بجلی حلال، عشق پہ حاصل حرام
علم ہے ابن الکتاب، عشق ہے ام الکتاب
প্রেমের জন্য বজ্রপাতও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু লাভের হিসাব গ্রহণযোগ্য নয়। জ্ঞান হলো কিতাবের সন্তান, আর প্রেম হলো কিতাবের জননী।
ইকবালের দৃষ্টিতে ইলম পথ দেখায়, কিন্তু ইশক মানুষকে চলার শক্তি দেয়। জ্ঞান চোখ, আর প্রেম হৃদয়; উভয়ের সমন্বয়েই পূর্ণ মানুষ তৈরি হয়।