আমরা আজ যে শহরে অবস্থান করছি, এটি কোনো সাধারণ শহর নয়। এটি সেই শহর যেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ হেঁটেছেন। যেখানে তাঁর পদচিহ্নের ধুলো উড়েছে।যেখানে তাঁর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত হয়েছে।
যেখানে ওহী নাজিল হয়েছে। যেখানে সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের জীবন গড়েছেন। যেখানে ইসলামী সভ্যতার সূচনা হয়েছে। এই শহরের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, ঈমানের অংশ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার জন্য দোয়া করেছেন:
اللَّهُمَّ حَبِّبْ إِلَيْنَا الْمَدِينَةَ كَحُبِّنَا مَكَّةَ أَوْ أَشَدَّ
হে আল্লাহ! মদিনাকে আমাদের কাছে এমন প্রিয় করে দিন যেমন মক্কা প্রিয়, বরং তার চেয়েও বেশি।
লক্ষ করুন রাসূল ﷺ শুধু মদিনায় বাস করেননি। তিনি মদিনাকে ভালোবেসেছেন। আল্লাহর কাছে মদিনার ভালোবাসা চেয়েছেন। মুমিন সেই, যার হৃদয় নবীর হৃদয়ের সাথে যুক্ত। নবী যা ভালোবাসেন, সে তা ভালোবাসে। নবী যা অপছন্দ করেন, সে তা অপছন্দ করে।
আমরা মদিনায় এসেছি কেন? একটু নিজের কাছে প্রশ্ন করুন। হোটেল দেখার জন্য? বাজার দেখার জন্য?
খেজুর কেনার জন্য? সোনার দোকান দেখার জন্য?নাকি এসেছি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর শহরে? এসেছি তাঁর মসজিদে? এসেছি তাঁর ভালোবাসা নিয়ে ফিরে যেতে?
অনেক মানুষ এমনও আছে সারাদিন মার্কেটে।সারাদিন কেনাকাটায়। সারাদিন ছবি তুলতে ব্যস্ত।
কিন্তু মসজিদে নববীর জামাত মিস হয়ে যাচ্ছে।ফজর মিস হয়ে যাচ্ছে। আসর মিস হয়ে যাচ্ছে। ইশা মিস হয়ে যাচ্ছে। এটা অনেক বড় ক্ষতি।
মদিনায় থাকা অবস্থায় অঙ্গীকার করতে হবে এখানে থাকা অবস্থায় নামাজ জামাত সবার আগে। নামাজের ব্যাপারে আপোষ করে অন্য কোন পরিকল্পনা প্রোগ্রাম করা যাবে না। এটা নবীজির মদিনার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা। এটা ছোট বিষয় না এটা বড় বিষয়। এখানে ছোট অপরাধও বড় অপরাধ। আর মদিনায় থেকে অলসতা করে শিথিলতা করে জামাত পরিচয় করা কোন অবস্থাতেই ছোট বিষয় না।
মসজিদে নববীর এক নামাজের মূল্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
صَلَاةٌ فِي مَسْجِدِي هَذَا خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ صَلَاةٍ فِيمَا سِوَاهُ
আমার এই মসজিদে এক নামাজ অন্য মসজিদের এক হাজার নামাজের চেয়েও উত্তম।(বুখারী, মুসলিম)
একবার চিন্তা করুন। একটি নামাজ = এক হাজার নামাজ। আজ যোহর পড়লেন এক হাজার। আসর এক হাজার। মাগরিব এক হাজার। ইশা এক হাজার।ফজর এক হাজার। পাঁচ ওয়াক্তে পাঁচ হাজার নামাজের সওয়াব।
চার দিনে বিশ হাজার।আট দিনে চল্লিশ হাজার।
এটা জীবনের অনেক বড় সুযোগ। এই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রয়োজন। জীবনের এতো বড় সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।
একবার চিন্তা করুন। কত মানুষ আছে, যাদের কাছে কোটি কোটি টাকা আছে। পৃথিবীর যে কোনো দেশে যাওয়ার সামর্থ্য আছে। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে মদিনায় ডাকেননি।
আবার কত মানুষ আছে, যাদের হৃদয় মদিনার ভালোবাসায় ভরা। মসজিদে নববীর নাম শুনলে চোখ ভিজে যায়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা দোয়া করেছে “হে আল্লাহ! একবার মদিনা দেখাও।কিন্তু সেই সুযোগ তাদের হয়নি।
অসংখ্য মানুষ এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে একটি আফসোস নিয়ে হায়! একবার যদি মদিনায় যেতে পারতাম! আর আজ আমি মদিনায়। এটা আমার যোগ্যতার কারণে নয়। এটা আমার অর্থের কারণে নয়।
এটা আল্লাহর বিশেষ দয়া। আল্লাহ আমাকে ডেকেছেন।
আল্লাহ আমাকে তাঁর হাবীব ﷺ-এর শহরে উপস্থিত করেছেন। এখন যদি আমি এই সময় বাজারে নষ্ট করি, নামাজ অবহেলা করি, মসজিদে নববী থেকে দূরে থাকি, তাহলে আমি নিজেকেই বঞ্চিত করলাম।
এটা শুধু একটি ভুল নয়। এটা একটি নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা। আল্লাহ রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন,
আর আমি নিজেই সেই দরজা বন্ধ করে দিলাম।
মদিনায় আসার সৌভাগ্য বড় নয়, মদিনার কদর করার সৌভাগ্য বড়। মসজিদে নববীর পাশে থাকা বড় নয়,
তার হক আদায় করা বড়। মদিনায় পৌঁছানো বড় নয়,
মদিনা থেকে মহব্বত নিয়ে ফিরে আসা বড়।
মদিনায় সবচেয়ে বড় ইবাদত কী?
***************************
অনেকে মনে করেন মক্কার বিশেষ ইবাদত তাওয়াফ।
কিন্তু মদিনার বিশেষ ইবাদত কী? মদিনায় এমন কোনো তাওয়াফ নেই। কোনো নতুন ফরজ নেই।কোনো নতুন রুকন নেই। তাহলে মদিনার বিশেষ ইবাদত কী?
এর উত্তর হলো মহব্বত। মহাব্বত হলো মদিনার এবাদত। মদিনা হলো মহব্বতের শহর। মদিনা হলো প্রেমের শহর। মদিনা হলো নবীর সাথে হৃদয়ের সংযোগ তৈরির শহর। আল্লাহ বলেন
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي
“তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর।” (সূরা আলে ইমরান ৩১)
ইসলামে ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়। এটি ইবাদত।বরং বহু আমলের প্রাণশক্তি। ভালোবাসা ছাড়া আমল অর্থহীন। ভালোবাসা আমলের রূহ।
প্রিয় রাসূলের মোহাব্বাত সবকিছুর ঊর্ধ্বে। প্রিয় রসুলের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন মুমিনের জীবনের ভয়াবহ ক্ষতি। একজন ব্যক্তির জীবনে অনেক এবাদত আছে নামাজ আছে তোয়াফ আছে হজ আছে যাকাত আছে কিন্তু প্রিয় নবীর প্রতি অবজ্ঞা আছে।
অবজ্ঞা এত বড় অন্যায় যা সব আমলকে নষ্ট করে দিতে পারে।
আর ভালোবাসা ছোট্ট ছোট্ট আমল তো অনেক দামি করে দিতে পারে। ভালোবাসার উপর ভিত্তি করে আমলের ওজন বৃদ্ধি পায়। ভালোবাসার দুর্বলতার কারণে আমলের ওজন কমে যায়। ভালোবাসার শহর মদিনায় থেকে ভালোবাসা বৃদ্ধি করা সবচেয়ে বড় আমল।
সাহাবীদের জীবনের মূল রহস্য সাহাবীরা এত বড় কেন হয়েছিলেন? তাঁরা আমাদের চেয়ে বেশি রোজা রাখতেন বিষয়টি তা নয়। তাঁরা নফল এবাদত আমাদের চেয়ে বেশি করতেন বিষয়টি তা নয়।তাঁদের হৃদয় ছিল রাসূল ﷺ–এর মহব্বতে পরিপূর্ণ।
বিলাল (রা.) মদিনায় রাসূল ﷺ–কে না দেখে থাকতে পারতেন না। আবু বকর (রা.) নবীর চেহারা না দেখলে অস্থির হয়ে যেতেন। উমর (রা.) নবীর কথার সামনে নিজের মতামত ত্যাগ করতেন। আলী (রা.) নবীর জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন। সাহাবীদের বড়ত্বের রহস্য ছিল—
محبت رسول ﷺ
এই মদিনা প্রিয় রাসূলের মহব্বতের শহর। তাই এই শহরের প্রতি সারা পৃথিবীর মুসলমানদের মুহাব্বাত।
এই শহরকে ভালোবাসা এবাদত। এই শহরের ভালোবাসা প্রকাশ করা এবাদত।
মদিনায় অবস্থান মুমিনের জীবনের মহব্বতের বড় পরীক্ষা। মদিনায় যাওয়া পরীক্ষা। মদিনায় থাকা পরীক্ষা। মদিনা থেকে ফেরা পরীক্ষা।
মদিনায় যদি মহব্বত নিয়ে না যাও এটা বড় বিপদ।
যদি মদিনায় মহব্বত নিয়ে না থাক এটা বড় বিপদ।
যদি মদিনা থেকে মহব্বত নিয়ে না ফিরো তাহলে এটা বড় বিপদ। তাহলে এটা সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
এখানে প্রশ্ন একটাই আমি মদিনা থেকে কী নিয়ে ফিরবো? মদিনার খেজুর, আবায়া আতর,সোনা নাকি নবীর মহব্বত?
মদিনা থেকে খেজুর নিয়ে বাড়ি আসবো একদিন
খেজুর শেষ হবে। কাপড় নিয়ে ফিরবো একদিন কাপড় পুরোনো হবে। ছবিগুলো একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু যদি হৃদয়ে রাসূল ﷺ–এর মহব্বত জন্ম নেয় তবে সেটি কবর পর্যন্ত যাবে। হাশর পর্যন্ত যাবে। জান্নাত পর্যন্ত যাবে।
সাহাবীদের অস্থিরতা
প্রিয় নবীজির মোহাব্বতে সাহাবীরা ঘরে বসে থাকতে পারতেন না।ৎরাসূল ﷺ যখন মসজিদে তাঁরাও তখন মসজিদে। রাসূল যখন বাসায় বিশ্রামে। সাহাবীরা চলে আসতেন মসজিদে। অপেক্ষায় থাকতেন তিনি কখন আসবেন? কখন দেখা হবে? কখন কথা শুনব? কখন তাঁর চেহারা দেখব?এই অপেক্ষাই ছিল তাদের আনন্দ।
আজ আমরা মসজিদে নববীর সামনে। রাসূল ﷺ–এর রওযার সামনে। কিন্তু আমাদের মন কোথায়?মোবাইলে বা মার্কেটে? দুনিয়ার ব্যস্ততায়?
আজ একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে যাই।
মদিনা থেকে শুধু জিনিস নিয়ে ফিরব না। মদিনা থেকে হৃদয় নিয়ে ফিরব। মদিনা থেকে ভালোবাসা নিয়ে ফিরব।মদিনা থেকে নামাজের স্বাদ নিয়ে ফিরব।মদিনা থেকে সুন্নাহর প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে ফিরব।মদিনা থেকে রাসূল ﷺ–এর প্রতি নতুন সম্পর্ক নিয়ে ফিরব।
যখন মসজিদে নববীর দিকে তাকাবেন ভাববেন:”আমি কোনো ভবনের দিকে তাকিয়ে নেই। আমি সেই মসজিদের দিকে তাকিয়ে আছি, যার ভিত্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের হাতে স্থাপন করেছিলেন। যখন রওযার কাছে যাবেন ভাববেন এখানে আমার প্রিয় নবী ﷺ শায়িত আছেন। যখন আজান হবে ভাববেন এটি কোনো সাধারণ আজান নয়। এটি মদিনার আজান।
যখন জামাতে দাঁড়াবেন ভাববেন এক হাজার নামাজের সওয়াবের দরজা এখন আমার সামনে খুলে আছে।
আর যখন মদিনা ছেড়ে যাবেন তখন চোখের পানি নিয়ে বলবেন ইয়া রাসূলাল্লাহ ﷺ! আমরা ফিরে যাচ্ছি, কিন্তু আমাদের হৃদয় মদিনায় রেখে যাচ্ছি।
আল্লাহ! আমাদেরকে আবার ডেকে নিও। আর এমনভাবে ডেকে নিও, যাতে আমরা আরও বেশি মহব্বত নিয়ে আসতে পারি, আরও বেশি মহব্বত নিয়ে ফিরতে পারি।