মদিনার প্রিয় রসুলের স্মৃতি বিজড়িত কূপ পরিচিতি

যারা সিরাতের চোখে মদিনাকে দেখে, তারা জানে

মদিনা শুধু একটি শহর নয়। মদিনা একটি জীবন্ত ইতিহাস। মদিনার প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি কূপ বলছে এখানে একদিন আল্লাহর রাসূল ﷺ হেঁটেছিলেন।

আজ আমরা মদিনার কূপগুলোরকে পরিচিত হবো।

মদিনার এক স্মৃতি বিজড়িত কূপ হলো বাইরুহা আনাস রা. বলেন, বীরে হা ছিল আবু তালহা রা.-এর বাগান। রাসূল ﷺ সেখানে যেতেন এবং এর মিষ্টি পানি পান করতেন। (সহীহ বুখারী)

এখানে ভাবার বিষয় আছে রাসূল ﷺ মসজিদ থেকে বের হচ্ছেন। খেজুর বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন।একটি কূপের পাশে দাঁড়ালেন। পানি পান করলেন।

এটাই বীরে হা।‌ তারপর নাযিল হলো:

﴿لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ﴾

তোমরা কখনো পূর্ণ নেকী অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় কর।‌ (সূরা আলে ইমরান: ৯২)

আবু তালহা রা. কাঁদতে কাঁদতে বললেন আমার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ এই বাগান। আমি এটি আল্লাহর জন্য দান করলাম।

বর্তমান বাইরুহা মসজিদে নববীর সম্প্রসারণের মধ্যে।

আপনি যখন সেখানে দাঁড়াবেন, মনে হবে‌ এখানেই এক সাহাবী তার হৃদয় আল্লাহর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। হযরত আবু তালহার বাগানটি এবং তার সবচাইতে প্রিয় কূপটি মসজিদে নববীর সম্প্রসারিত সীমানার ভিতরে।

◾মদিনার আরেকটি ঐতিহাসিক কূপ হলো বীরে রূমাহ এর মাধ্যমে হযরত উসমান জান্নাত ক্রয় করেছিলেন।মদিনার মানুষ পানির কষ্টে ছিল। এটি এক ইহুদির মালিকানাধীন কূপ। মদিনা বাসিদের পানি কিনে খেতে হতো।

রাসূল ﷺ বললেন‌‌ কে এই কূপ ক্রয় করে মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত করবে? তার জন্য জান্নাত।”

উসমান রা. এগিয়ে এলেন। মূল্য দিলেন।‌ কূপ কিনলেন।‌ মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করলেন।(তিরমিযী)

এখানে শিক্ষণীয় বিষয় আজকের ধনীরা কী রেখে যায়? বাড়ি ব্যবসা‌নাকি উসমানের মতো একটি সদকায়ে জারিয়া?

বর্তমানেও বীরে রূমাহর জমি ও সম্পত্তি ওয়াকফের ইতিহাস বহন করছে। আপনি সেখানে দাঁড়িয়ে অনুভব করবেন এখানে একজন সাহাবী সম্পদকে জান্নাতের টিকিট বানিয়েছিলেন।

◾ মদিনার আরেকটি কূপ বীরে আরীস — জান্নাতের সুসংবাদের কূপ

আবু মূসা আশআরী রা. বলেন রাসূল ﷺ বীরে আরীসের ধারে বসেছিলেন। আবু বকর এলেন।

জান্নাতের সুসংবাদ পেলেন উমর এলেন। জান্নাতের সুসংবাদ পেলেন। উসমান এলেন। জান্নাতের সুসংবাদ এবং বড় পরীক্ষার পূর্বাভাস পেলেন (সহীহ বুখারী)

খিলাফতে উসমান রা.-এর সময় রাসূল ﷺ-এর মোহরযুক্ত আংটি এই কূপে পড়ে যায়। অনেক খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদরা বলেন, অনেকেই এটিকে ভবিষ্যৎ ফিতনার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন।

আজ সেখানে দাঁড়ালে মনে হয় এই কূপের ধারে বসে জান্নাতের সংবাদ উচ্চারিত হয়েছিল।

◾ ঐতিহাসিক আরেকটি কূপ বীরে গারস — নবীর প্রিয় পানির কূপ। রাসূল ﷺ এই কূপের পানি পছন্দ করতেন।

বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, মৃত্যুর পর তাঁর গোসলে এ কূপের পানি ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

নবী ﷺ বিলাসী জীবনযাপন করেননি। একটি সাধারণ কূপের পানি ছিল তাঁর প্রিয়। আজ সেখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়‌মহানত্ব বিলাসিতায় নয়, বরং সরলতায়।

◾ বীরে বুদাআহ — পবিত্রতার কূপ

সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন এই কূপে নানা জিনিস পড়ে। এর পানি কি ব্যবহার করা যাবে?

রাসূল ﷺ বললেন পানি পবিত্র। কোনো কিছু তাকে অপবিত্র করে না। (আবু দাউদ)

ফিকহি গুরুত্বৎপানি, নাপাকি ও তাহারাতের বহু মাসআলার ভিত্তি এই হাদিস। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়

ইসলামের ফিকহ শুধু মাদরাসার কিতাবে নয়, মদিনার বাস্তব জীবন থেকেই জন্ম নিয়েছে।

◾বীরে সুখইয়া — বদরের প্রস্তুতির কূপ

বদরে যাওয়ার আগে রাসূল ﷺ এখানে অবস্থান করেন। সেনাবাহিনী পরিদর্শন করেন।দোয়া করেন।মদিনার জন্য বরকত কামনা করেন।

বর্তমান যিয়ারতের অনুভূতি এখানে দাঁড়ালে মনে হয় এখান থেকেই বদরের ইতিহাসের এক অধ্যায় শুরু হয়েছিল।

◾ মদিনার ঐতিহাসিক সাত কূপের রহস্য। প্রাচীন মদিনার আলেমরা সাতটি কূপকে বিশেষভাবে স্মরণ করতেন। কারণ এসব কূপের সাথে জড়িয়ে আছে:

নবীর পদচিহ্ন সাহাবীদের ত্যাগ‌ ইসলামের সামাজিক ইতিহাস ওয়াকফের ইতিহাস ফিকহের ইতিহাস জিহাদের ইতিহাস

এই কূপগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

******************************

মদিনার কূপগুলো আমাদের পানি দেয় না।এগুলো আমাদের স্মৃতি দেয়। এগুলো আমাদের ইতিহাস দেয়।এগুলো আমাদের নবী ﷺ-এর কাছাকাছি নিয়ে যায়।

যখন আপনি বীরে হা দেখবেন আবু তালহাকে দেখবেন। যখন বীরে রূমাহ দেখবেন উসমানকে দেখবেন। যখন বীরে আরীস দেখবেন আবু বকর, উমর ও উসমানকে দেখবেন।

যখন বীরে গারস দেখবেন নবীর সরল জীবনকে দেখবেন। তখন বুঝবেন মদিনা শুধু একটি শহর নয়।

মদিনা একটি জীবন্ত জাদুঘর।মদিনা একটি খোলা সিরাত। মদিনা এমন একটি শহর, যেখানে আজও ইতিহাস নিঃশ্বাস নেয়।

আর তখন আপনার হৃদয় থেকে একটি কথাই বের হবে”হে আল্লাহ! আমি শুধু মদিনা দেখিনি; আমি মদিনার ভেতরে লুকিয়ে থাকা নবী ﷺ-এর মদিনাকে দেখেছি।

Scroll to Top