আমরা মসজিদে নববীতে বসেই সময়ের পর্দা সরিয়ে দিয়ে চৌদ্দশত বছর পেছনে ফিরে যাব। তারপর আমরা দেখব এই বিশাল ছাদের নিচে কী আছে।
আজকের মসজিদে নববী শুধু একটি ভবন নয়।
এটি একটি জীবন্ত সিরাত। একটি জীবন্ত ইতিহাস।
আজ আপনি যেখানে বসে আছেন, সেখানে ছিল একটি খালি জমি। কিছু খেজুর গাছ। কিছু পরিত্যক্ত কবর। কিছু উঁচুনিচু মাটি। কিছু ভাঙা দেয়াল। কিছু জঙ্গল।
মানুষের চোখে এটি ছিল একটি সাধারণ জমি। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনায় এটি হতে যাচ্ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বরকতময় ভূমিগুলোর একটি।রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন এই জমির সামনে দাঁড়ালেন, তখন তিনি শুধু একটি জমি দেখেননি। তিনি দেখেছিলেন ভবিষ্যতের একটি উম্মাহকে। তিনি দেখেছিলেন এমন একটি কেন্দ্রকে, যেখান থেকে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে যাবে।
এই জমি ক্রয় করা হলো। এর কবরগুলো যথাযথভাবে সরিয়ে নেওয়া হলো। খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলা হলো। জমি সমতল করা হলো। তারপর শুরু হলো নির্মাণ। কিন্তু নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে রাসূল ﷺ দূরে দাঁড়িয়ে থাকেননি।
তিনি নিজেই মাটি বহন করেছেন। তিনি নিজেই ইট বহন করেছেন। তিনি নিজেই শ্রম দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম মাটি বহন করছেন। আবু বকর (রা.) বহন করছেন। উমর (রা.) বহন করছেন। উসমান (রা.) বহন করছেন। আলী (রা.) বহন করছেন। আর তাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও শ্রমিকের মতো কাজ করছেন। আজ আমরা যে মসজিদের নিচে বসে আছি, এর ভিত্তিতে শুধু পাথর নেই।
এই মসজিদে নববীর ভিত্তিতে আছে ত্যাগ। ভালোবাসা। পরিশ্রম। ঈমান। এবং নবুওয়তের স্পর্শ। মসজিদে নববীর চারপাশে তাকান। চিন্তা করুন। চোখ বন্ধ করে অনুভব করুন আপনি কোথায় আছেন। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ফিরে যান।
আজকের এই পুরাতন অংশে কোথাও না কোথাও হয়তো নবী ﷺ দাঁড়িয়েছিলেন। কোথাও না কোথাও তিনি সাহাবাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কোথাও না কোথাও তিনি হেসেছিলেন ।কোথাও না কোথাও তিনি কেঁদেছিলেন। কোথাও না কোথাও তিনি দোয়া করেছিলেন।
এই মাটিতে আবু বকর (রা.)-এর পদচিহ্ন পড়েছে। এই মাটিতে উমর (রা.)-এর পদচিহ্ন পড়েছে। এই মাটিতে উসমান (রা.) হেঁটেছেন। এই মাটিতে আলী (রা.) হেঁটেছেন। এই মাটিতে হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.) ছোটবেলায় চলাফেরা করেছেন।
এমন এক স্থানে বসে আছেন, যেখানে ওহী নাযিল হতো। এমন এক স্থানে বসে আছেন, যেখানে মানবজাতির ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের গড়ে তুলেছিলেন। সুতরাং মসজিদে নববীকে শুধু একটি সুন্দর স্থাপনা হিসেবে দেখবেন না। এটিকে একটি জীবন্ত সিরাত হিসেবে দেখুন। চোখ বন্ধ করে ১৪০০ বছর আগের দৃশ্যটাকে দেখুন। বারবার দেখুন।
এখন আমি আপনাকে মসজিদে নববীর একটি বিশেষ স্থানের দিকে নিয়ে যেতে চাই। আজ সেখানে কোনো দেয়াল নেই। কোনো ঘর নেই। কোনো দরজা নেই। কোনো নামফলক নেই।
হাজার হাজার মুসল্লি হয়তো প্রতিদিন সেই জায়গার পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, অথচ বুঝতেই পারে না এখানেই একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ বসবাস করেছিলেন।
আবার ১৪০০ বছর পেছনের ইতিহাস। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন মদিনায় পৌঁছলেন। মদিনার প্রতিটি পরিবার চায় রাসূলাল্লাহ আমাদের ঘরে আমাদের ঘরে থাকুন।”
কিন্তু তিনি কাউকে অগ্রাধিকার দিলেন না।তিনি বললেন উটনীকে ছেড়ে দাও। সে তার রবের নির্দেশে চলবে। উটনী চলতে লাগল। অবশেষে উটনী একটি স্থানে বসে পড়ল। এই স্থানেই পরে নির্মিত হলো মসজিদে নববী।
আর কাছেই ছিল একজন আনসারী সাহাবীর বাড়ি।
আবু আইয়ুব আনসারী (রা.)। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ঘরে অবস্থান করলেন। আজ সেই বাড়ি আর নেই। মসজিদে নববীর সম্প্রসারণের মধ্যে হারিয়ে গেছে।কিন্তু ইতিহাস হারিয়ে যায়নি। মহব্বত হারিয়ে যায়নি।
আজকের মসজিদে নববীর পূর্ব-দক্ষিণ দিকের পুরাতন এলাকার দিকে তাকালে মনে রাখবেন কোথাও না কোথাও এই এলাকার মধ্যেই ছিল সেই ঘর, যেখানে প্রিয় রাসূলুল্লাহ মদিনায় আসার পর সাহাবী আবু আইয়ুব আনসারীর বাড়িতে সর্বপ্রথম কয়েক মাস থেকেছেন। ইহা সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থান।
আসল মসজিদে নববী কতটুকু ছিল?
প্রিয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্মিত মসজিদ ছিল ছোট। খেজুর গাছের কাণ্ড ছিল স্তম্ভ। খেজুর পাতার ছাউনি ছিল ছাদ। মাটি ছিল মেঝে। বৃষ্টি হলে পানি ঢুকত। কাদা জমত।গরমে রোদ ঢুকত। শীতে ঠাণ্ডা বাতাস প্রবেশ করত। কিন্তু এই ছোট্ট মসজিদেই তৈরি হয়েছে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম।
বর্তমান বিশাল মসজিদের পুরাতন অংশের কিছু স্তম্ভে সেই মূল মসজিদের সীমানার চিহ্ন সংরক্ষিত আছে।
মসজিদে নববীতে বসে সেই চিহ্নগুলোর দিকে তাকিয়ে ১৪ শত বছর আগে ফিরে যান। এখানেই রাসূল ﷺ হেঁটেছেন। এখানেই তিনি ইমামতি করেছেন। এখানেই ওহী নাযিল হয়েছে। এখানেই সাহাবীদের চোখের পানি পড়েছে। এখানেই একটি উম্মাহর জন্ম হয়েছে। তাই মসজিদে নববীর পুরাতন অংশে বসে শুধু স্থাপত্য দেখবেন না।
চেষ্টা করুন খেজুর পাতার সেই ছাউনিটা দেখতে। চেষ্টা করুন সাহাবীদের সেই ছোট্ট মজলিসটা দেখতে। চেষ্টা করুন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাসূল ﷺ-কে কল্পনা করতে। কারণ আপনি শুধু একটি মসজিদে বসে নেই।
আপনি বসে আছেন ইসলামের ইতিহাসের হৃদয়ে।
আজকের মসজিদে নববীর উত্তর অংশে, মূল নববী মসজিদের ভেতরেই ছিল সুফ্ফা। এটি কোনো সাধারণ স্থান ছিল না। এটি ছিল ইসলামের প্রথম আবাসিক শিক্ষা কেন্দ্র।
এখানে থাকতেন দরিদ্র মুহাজির সাহাবীগণ। যাদের অনেকের ঘর ছিল না, সম্পদ ছিল না, কিন্তু ছিল জ্ঞানপিপাসু হৃদয়। এখানেই দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন আবু হুরায়রা (রা.)। এখানেই বসেছেন সালমান ফারসি (রা.)। এখানেই বসেছেন অসংখ্য সাহাবী, যাদের নাম আমরা জানি না, কিন্তু যাদের মাধ্যমে দ্বীন পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছেছে।
কিছুক্ষণ এই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকুন। তারপর চোখ বন্ধ করুন। চৌদ্দশত বছর পেছনে ফিরে যান। কল্পনা করুন এখানে কোনো কার্পেট নেই। কোনো ঝাড়বাতি নেই। এক কোণে বসে আছেন আবু হুরায়রা (রা.)। সামনে বসে আছেন আরও কিছু তরুণ সাহাবী। আর তাদের সামনে বসে আছেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, রাসূলুল্লাহ ﷺ। তিনি কথা বলছেন। তাঁরা শুনছেন। তিনি শিক্ষা দিচ্ছেন। তাঁরা হৃদয়ে ধারণ করছেন।
আজ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যে হাদিস পড়ে, যে সুন্নাহ অনুসরণ করে, তার একটি বড় অংশের সূত্রপাত এই স্থান থেকে। আজ মানুষ পৃথিবীর বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যায়। কিন্তু কত মানুষ জানে, ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এই সুফ্ফা!
এখানে কোনো ডিগ্রি ছিল না। কোনো সনদ ছিল না।
কিন্তু এখান থেকে বের হয়েছিল এমন মানুষ, যারা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল।
তাই এই স্থানে কিছুক্ষণ বসুন। নীরবে বসুন। হয়তো এই মাটিতেই কোনো দিন আবু হুরায়রা (রা.) বসেছিলেন। হয়তো এই স্থানেই কোনো দিন একটি হাদিস প্রথমবারের মতো উচ্চারিত হয়েছিল। হয়তো এই স্থানেই কোনো সাহাবীর চোখে ইলমের আলো জ্বলে উঠেছিল।
তখন অনুভব করবেন আপনি শুধু একটি মসজিদে বসে নেই। আপনি বসে আছেন ইসলামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে।
নবী পরিবারের মহল্লা
এখন হুজরা শরীফের দিকে তাকান। একটু কল্পনা করুন সোনালী গ্রিল নেই। সবুজ গম্বুজ নেই। শুধু একটি ছোট কাঁচা ঘর। এটি আয়েশা (রা.)-এর ঘর।
এখানেই ওহী নাযিল হয়েছে। এখানেই রাসূল ﷺ জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন।এখানেই তিনি ইন্তিকাল করেছেন। এখানেই তিনি শায়িত আছেন।
আর এই ঘরের চারপাশেই ছিল নবী পরিবারের ছোট্ট মহল্লা। হাফসা (রা.)-এর ঘর। উম্মে সালামা (রা.)-এর ঘর। সাফিয়া (রা.)-এর ঘর। জুয়াইরিয়া (রা.)-এর ঘর।
আজ আপনি যেখানে বসে কুরআন পড়ছেন হয়তো সেখান দিয়েই কোনোদিন উম্মাহাতুল মুমিনীন হেঁটে গেছেন।
যেখানে আজ কার্পেট বিছানো। সেখানে একদিন ছিল নবীজির ঘর। চোখ বন্ধ করুন। চৌদ্দশত বছর পেছনে ফিরে যান। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির ঘর ছিল সবচেয়ে সাধারণ। কিন্তু সেই ছোট ছোট ঘর থেকেই আলোকিত হয়েছে সমগ্র পৃথিবী।
তাই হুজরার দিকে তাকিয়ে শুধু একটি স্থাপনা দেখবেন না। দেখার চেষ্টা করুন একটি পরিবারকে।
একটি ঘরকে। একটি জীবনকে। একটি ভালোবাসাকে।
কারণ এখানেই ছিল নবুওয়তের ঘর।এখানেই ছিল উম্মতের হৃদয়।
ফাতিমা (রা.)-এর ঘর
হুজরা শরীফের খুব কাছেই ছিল আরেকটি ছোট ঘর।
ফাতিমা (রা.)-এর ঘর। আলী (রা.)-এর ঘর। রাসূল ﷺ-এর সবচেয়ে আদরের কন্যার ঘর।
একটু চোখ বন্ধ করুন। কল্পনা করুন এই পথ দিয়েই হয়তো রাসূল ﷺ হেঁটে আসছেন। দরজায় কড়া নাড়ছেন। ভেতরে প্রবেশ করছেন। নাতিদের খোঁজ নিচ্ছেন। হাসান (রা.) এখানে খেলেছেন। হুসাইন (রা.) এখানে বড় হয়েছেন। এই ছোট্ট ঘরেই প্রতিধ্বনিত হয়েছে আহলে বাইতের ভালোবাসা।
এই ঘর কোনো রাজপ্রাসাদ ছিল না। কিন্তু এ ঘরের দরজায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটি বারবার এসে দাঁড়িয়েছেন। আজ ঘরটি নেই। দেয়াল নেই। দরজা নেই। কিন্তু ভালোবাসা এখনো আছে।
স্মৃতি এখনো আছে। এই এলাকার বাতাসে আজও যেন আহলে বাইতের সুবাস মিশে আছে। আপনি এখন সেই জায়গার কাছেই বসে আছেন, যেখানে রাসূল ﷺ একজন নবী হিসেবে নয়, একজন বাবা হিসেবে আসতেন। আর এই অনুভূতি হৃদয়ে জাগলে মদিনা শুধু ইতিহাস থাকে না। মদিনা হয়ে যায় ভালোবাসার শহর।
বর্তমান নতুন অংশের দিকে তাকিয়ে এখন মাথা তুলে ছাদের দিকে তাকান। চলমান গম্বুজগুলো দেখুন।
বিশাল সম্প্রসারণ দেখুন। এগুলো একটি ঘোষণা।
একদিন খেজুর পাতার একটি ছোট ছাউনির নিচে যে দাওয়াত শুরু হয়েছিল, আজ তা পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে গেছে। একদিন এখানে ছিল অল্প কয়েকজন সাহাবী। আজ এখানে সমবেত হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ।
এখানে বসে সেই ইতিহাস স্মরণ করে হৃদয় খুলে আল্লাহর কাছে বলুন হে আল্লাহ! আমার জীবনকে আপনার প্রিয় হাবিবের মিশন বাস্তবায়নে কবুল করুন। আমাকেও আপনার দ্বীনের খেদমতের তাওফিক দিন।
মনে রাখবেন মানুষ নিজের জন্য বাঁচলে একদিন হারিয়ে যায়। কিন্তু যে রাসূল ﷺ-এর মিশনের জন্য বাঁচে, আল্লাহ তাকে মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত রাখেন।
তাই মদিনা থেকে শুধু স্মৃতি নিয়ে ফিরবেন না। একটি অঙ্গীকার নিয়ে ফিরুন। আমিও নবী ﷺ-এর মিশনের একজন কর্মী হব।
মদিনা সফরের আসল প্রাপ্তি
মদিনা সফরের উদ্দেশ্য খেজুর কেনা নয়। আতর কেনা নয়। বাজার ঘোরা নয়। ছবি তোলা নয়। এসব স্মৃতি হতে পারে, কিন্তু এগুলো মদিনার আসল সম্পদ নয়।
মদিনার আসল সম্পদ হলো মহব্বতে রাসূল ﷺ।
আজ যখন আপনি দেশে ফিরবেন, তখন যেন শুধু একটি সফর শেষ না হয়, বরং একটি নতুন জীবন শুরু হয়।
তখন যেন বলতে পারেন আমি শুধু মসজিদে নববী দেখিনি। আমি মসজিদে নববীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা মদিনাকে দেখেছি। আমি স্তম্ভগুলোর মাঝে সাহাবীদের পদচিহ্ন খুঁজেছি। আমি স্থাপনার আড়ালে সিরাতকে দেখেছি।
আমি সেই ঘরগুলোকে অনুভব করেছি, যেখানে ওহী নাযিল হয়েছে। আমি সেই মজলিসগুলোকে অনুভব করেছি, যেখানে রাসূল ﷺ মানুষ গড়েছেন।
আর সবচেয়ে বড় কথা আমি মদিনা থেকে শুধু খেজুর নিয়ে ফিরিনি। আমি মহব্বতে রাসূল ﷺ নিয়ে ফিরেছি।
আমি সুন্নাহ নিয়ে ফিরেছি। আমি দরুদ নিয়ে ফিরেছি।আমি তাঁর দ্বীনের জন্য বাঁচার অঙ্গীকার নিয়ে ফিরেছি।
যদি এই মহব্বত হৃদয়ে জেগে ওঠে,তবে জেনে রাখুন মদিনা আপনাকে খালি হাতে বিদায় দেয়নি।