রাসূল ﷺ-এর ইমামতি ছিল নেতৃত্ব। মসজিদ ছিল সমাজের কেন্দ্র। ইমাম ছিলেন পথপ্রদর্শক। কিন্তু আজ একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে কেন অনেক ইমাম সমাজকে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না? কেন অনেক ইমাম সত্য কথা বলতে সংকোচবোধ করেন? কেন অনেক সময় মিম্বরের ভাষা দুর্বল হয়ে যায়? কেন অন্যায় দেখেও অনেক সময় নীরবতা নেমে আসে?
এর একটি বড় কারণ হলো অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও মুখাপেক্ষিতা। নবীদের বৈশিষ্ট্য ছিল মুখাপেক্ষী না হওয়া। কুরআনের দিকে তাকালে প্রায় সব নবীই তাদের জাতিকে একটি কথা বলেছেন।
لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا
আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। (সূরা শু’আরা: ১০৯, ১২৭, ১৪৫, ১৬৪, ১৮০)
নবীরা মানুষের কাছে হাত পাততেন না। তারা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতেন। তাই তারা সত্য বলতে পারতেন। কারণ তাদের হৃদয় আল্লাহর সাথে যুক্ত ছিল। সত্য কথা বলার জন্য স্বাধীনতা দরকার। আর প্রয়োজন অমুখাপেক্ষিতা।
একজন ইমাম যদি এমন অবস্থায় থাকেন যে মাসের শেষে সন্তানের ওষুধের টাকা নেই, বাসাভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাহলে তার উপর থাকে কঠিন মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ।
এটি বাস্তবতা। এই অবস্থায় অনেক সময় সত্য কথা বলার সাহস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ চাকরি হারানোর ভয় কাজ করে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ভয় থাকে। রাসূল ﷺ বলেছেন:
أفضل الجهاد كلمة حق عند سلطان جائر
“সর্বোত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)
কিন্তু সত্য কথা বলার জন্য অভ্যন্তরীণ শক্তি স্বাধীনতা প্রয়োজন।
আমাদের দেশের বহু ইমাম অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করেন। ফজর থেকে এশা পর্যন্ত মানুষের সেবা করেন। কিন্তু মাস শেষে তার আয় একজন অদক্ষ শ্রমিকের আয়ের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে কম। ফলে কেউ টিউশনি করেন। কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে কুরআন পড়ান। কেউ ওয়াজের হাদিয়ার উপর নির্ভর করেন। কেউ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দাওয়াতের অপেক্ষায় থাকেন। এটি কোনো ব্যক্তির দোষ নয়। এটি একটি সামাজিক বাস্তবতা।
এখন আমরা আত্মসমালোচনার জায়গায় আসি। যখন একজন আলেম বা ইমাম তার জীবনকে অতিরিক্তভাবে হাদিয়া, দান, কালেকশন ও মানুষের অনুগ্রহের উপর দাঁড় করিয়ে ফেলেন, তখন অজান্তেই একটি মানসিক পরিবর্তন ঘটে। তার মাঝে একটি দুর্বলতা চলে আসে।
ধীরে ধীরে তিনি ভাবতে শুরু করেন এই ব্যক্তিকে কিছু বলা যাবে না। ওই ব্যবসায়ী রাগ করলে সমস্যা হবে।এই কমিটির লোক অসন্তুষ্ট হলে চাকরি থাকবে না। এই দাতাকে খুশি রাখতে হবে। এভাবে নেতৃত্ব দুর্বল হতে শুরু করে। আর মুখাপেক্ষীতা বাড়তে থাকে।
হারাম উপার্জনের বিষয়ে নীরবতা
*****************************
আজ সমাজে সুদ চলছে। ঘুষ চলছে। প্রতারণা চলছে।ওজনে কম দেওয়া চলছে। দুর্নীতি চলছে। হারাম ব্যবসা চলছে। কিন্তু অনেক সময় এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা কম হয়। কারণ সমাজের প্রভাবশালী কিছু মানুষ এসবের সাথে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে মসজিদ কমিটির সদস্যরা এগুলোর সাথে জড়িত থাকেন।
আর ইমাম সাহেব জানেন তাদের বিরাগভাজন হলে সমস্যা হতে পারে। ফলে মিম্বরের ভাষা কখনো কখনো সতর্ক হয়ে যায়। এই অবস্থায় হক কথা বলা সম্ভব হয় না। সচেতন ভাবে তা এড়িয়ে চলা হয়।
রাসূল ﷺ কি কাউকে ছাড় দিয়েছেন?
**********************************
রাসূল ﷺ নিজের চাচা হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকেও দ্বীনের ক্ষেত্রে আলাদা সুবিধা দেননি। তিনি নিজের কন্যা ফাতিমা বিনতে মোহাম্মদ-কে বলেছিলেন হে ফাতিমা! আল্লাহর কাছে নিজের আমলের প্রস্তুতি নাও। আমি আল্লাহর আযাব থেকে তোমাকে রক্ষা করতে পারব না। (সহীহ বুখারী)
এটাই ছিল নববী নেতৃত্ব। সত্যের সামনে আত্মীয়-স্বজনও বিশেষ সুবিধা পেত না।
তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাম্য। প্রিয় রাসুলের গড়ে তোলা সমাজে কোনো বৈষম্য ছিল না।
কালেকশন সংস্কৃতির সমস্যা
*************************
আমাদের সমাজে আরেকটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
কখনো কখনো দ্বীনি কাজের চেয়ে কালেকশন বড় হয়ে যায়। কোথাও ওয়াজ মানেই ফান্ড সংগ্রহ। কোথাও মাহফিল মানেই চাঁদা।
কোথাও সম্পর্ক মানেই আর্থিক সহযোগিতার প্রত্যাশা। ফলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় আলেমদেরকে দাওয়াতদাতা নয়, সংগ্রহকারী হিসেবে দেখতে শুরু করে। এটি আলেম সমাজের মর্যাদার জন্যও ক্ষতিকর।
ধর্মীয় সামাজিক জাতীয় প্রয়োজনে প্রিয় রসূলও চাঁদা গ্রহণ কর করেছেন। মাদ্রাসার জন্য মসজিদের জন্য সমাজের অসহায় মানুষের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করা নিচু কাজ নয়। ইসলামে দান করা যেমন ইবাদত। দানের ব্যাপারে অন্যকে উৎসাহিত করাও এবাদত।সমস্যা হয় তখন যখন শুধু চাওয়া হয়।আর এটা রেওয়াজে পরিণত হয়। মসজিদ যতটুকু চাইবে তার চাইতে বেশি দিবে। তাহলে এ প্রশ্ন থাকবে না। মানুষ যখন উপকৃত হবে তাদের মাঝে ঈমান তৈরি হবে তখন সহযোগিতা
সহজ হবে। যেমনটি আমরা সাহাবাদের জীবনে দেখতে পাই। দ্বীনি সহযোগিতা করার জন্য তারা সারাদিন দিনমজুরি করে কামাই করেছেন। সন্ধ্যায় সারাদিনের উপার্জন দ্বীনের জন্য দান করেছেন।
হাদিয়া গ্রহণ কি দোষ?
*********************
স্পষ্টভাবে বলা দরকার হাদিয়া গ্রহণ দোষ নয়। রাসূল ﷺ নিজেও হাদিয়া গ্রহণ করেছেন। সাহাবীরাও হাদিয়া গ্রহণ করেছেন। ইমাম ও আলেমদের বেতন বা সম্মানী গ্রহণও বৈধ। সমস্যা হাদিয়ায় নয়।
সমস্যা তখন, যখন হাদিয়া নেতৃত্বকে প্রভাবিত করে।
সমস্যা তখন, যখন সত্য কথা অর্থের কাছে বন্দী হয়ে যায়। এই হাদিয়া বিপদজনক। বরং শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা হাদিয়ার মাঝে পড়ে না।
ইমামদের জন্য একটি সতর্কবার্তা
******************************
আমরা নবীদের উত্তরাধিকার বহন করছি। আমাদের সম্মান মানুষের দেওয়া খামে নয়। আমাদের সম্মান কুরআনের সাথে সম্পর্কের মধ্যে। আমাদের শক্তি কমিটির প্রশংসায় নয়। আমাদের শক্তি আল্লাহর উপর ভরসায়। যেদিন আমরা মানুষের সন্তুষ্টির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বড় করব, সেদিন আমাদের মিম্বর শক্তিশালী হবে।
মুসল্লিদের জন্য একটি প্রশ্ন
*********************”***
মুসল্লী সমাজের দায়িত্ব এমন মসজিদ তৈরি করা যেখানে একজন ইমাম সত্য কথা বললেও নিরাপদ থাকেন। তিনি যদি সুদের বিরুদ্ধে বলেন আপনি কি তার পাশে দাঁড়াবেন? তিনি যদি ঘুষের বিরুদ্ধে বলেন আপনি কি তাকে সমর্থন করবেন? তিনি যদি হারাম উপার্জনের বিরুদ্ধে বলেন আপনি কি তাকে সম্মান করবেন?
নাকি বলবেন হুজুর বেশি বলে ফেলেছে?
উমর (রা.)-এর যুগে একজন সাধারণ ব্যক্তি পর্যন্ত শাসকের ভুল ধরতে পারত। কারণ সেখানে সত্যের মূল্য ছিল। আজ আমাদের মসজিদেও এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে সত্যকে সম্মান করা হবে।
মসজিদের নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হলে
প্রথমত, ইমামের সম্মানজনক জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ইমামকে মানুষের অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না।
তৃতীয়ত, ইমামদেরও আত্মমর্যাদা, তাকওয়া ও কানা’আত (অল্পে সন্তুষ্টি) অর্জন করতে হবে।
চতুর্থত, মিম্বরকে অর্থের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
পঞ্চমত, হারাম উপার্জনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও সাহসী অবস্থান নিতে হবে।
যে মিম্বর থেকে একদিন সুদের বিরুদ্ধে ঘোষণা এসেছিল, যে মিম্বর থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছিল, যে মিম্বর থেকে পৃথিবী কাঁপানো মানুষ তৈরি হয়েছিল, সেই মিম্বরকে আবার স্বাধীন করতে হবে।
ইমামকে ভিক্ষুকের অবস্থানে নয়, নেতার অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে। মসজিদকে কালেকশনের কেন্দ্র নয়, হেদায়েতের কেন্দ্র বানাতে হবে। আর সমাজকে এমন হতে হবে, যেখানে একজন ইমাম নির্ভয়ে বলতে পারেন। ইমাম স্পষ্টভাবে বলবেন এটি হারাম। এটি অন্যায়। এটি আল্লাহর নাফরমানি। এবং মানুষ তার প্রতি রাগ না করে নিজের আমল সংশোধন করবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ইমামদেরকে তাকওয়া, ইখলাস, আত্মমর্যাদা ও সত্য বলার সাহস দান করুন। আর আমাদের সমাজকে এমন বানিয়ে দিন, যেখানে দ্বীনি নেতৃত্ব সম্মানিত হয় এবং মিম্বর আবার উম্মাহর বিবেক হয়ে ওঠে।