আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি যুবকদের মসজিদের প্রতি আগ্রহ না থাকা। অথচ যুবুকরা মসজিদের প্রাণ।
আমাদের গড়ে তোলা মসজিদের ভবিষ্যৎ কী? দশ বছর পরে আমাদের কাতারে কারা দাঁড়াবে? বিশ বছর পরে এই মসজিদের আলো কারা জ্বালিয়ে রাখবে? ত্রিশ বছর পরে এই মিম্বরের সামনে কারা বসবে?
এই প্রশ্নের উত্তর একটিই আজকের যুবকরা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজের একটি বড় অংশের যুবক ধীরে ধীরে মসজিদ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
যেখানে রাসূল ﷺ-এর যুগে মসজিদ ছিল যুবকদের প্রাণকেন্দ্র, আজ অনেক যুবকের কাছে মসজিদ অপরিচিত এক জগৎ। যুবকরাই হওয়ার কথা ছিল ইসলামের প্রথম সৈনিক।
ইসলামের ইতিহাস খুলে দেখুন। প্রথম সারির অনেক সাহাবীই ছিলেন যুবক। এই ইসলামের প্রচার প্রসারে সবচেয়ে বেশি অবদান যুবকদের। যুবকরাই ইসলামকে শক্তিশালী করেছে। রাসূল ﷺ যুবকদের অবহেলা করেননি। তাদের উপর আস্থা রেখেছেন। তিনি যুবকদের দায়িত্ব দিয়েছেন। যুবকদের তিনি বেছে বেছে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সমাজ পরিবর্তনের চাবিকাঠি: যুবক
*****************************
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় বড় বড় পরিবর্তন সমাজের বৃত্তশালী প্রভাবশালীদের দ্বারা হয়নি। বেশিরভাগ পরিবর্তনের পেছনে ছিল একদল আদর্শবাদী যুবক।
কারণ যুবক শুধু একটি বয়সের নাম নয়। যুবক একটি শক্তির নাম। যুবক একটি সাহসের নাম। যুবক একটি স্বপ্নের নাম। যুবক একটি বিপ্লবের নাম।
কুরআন যুবকদের প্রশংসা করেছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা আসহাবে কাহফের কথা উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ বলেন:
إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى
“তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের রবের উপর ঈমান এনেছিল, আর আমি তাদের হিদায়াত আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।”
আল্লাহ তাদের ঈমানের প্রশংসা করেছেন। কিন্তু তার আগে তাদের যুবক হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
কারণ যৌবন এমন একটি সময়, যখন মানুষ আনন্দের পিছনে ছুটতে পারে, আবার আদর্শের জন্য জীবনও উৎসর্গ করতে পারে। আসহাবে কাহফ দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিল।
হযরত ইবরাহীম (আ.) ছিলেন যুবক। যখন পুরো সমাজ মূর্তিপূজায় ডুবে ছিল, তখন একজন যুবক দাঁড়িয়ে বলেছিলেন এটা ভুল। লোকেরা বলেছিল:سَمِعْنَا فَتًى يَذْكُرُهُمْ يُقَالُ لَهُ إِبْرَاهِيمُ
আমরা এক যুবকের কথা শুনেছি, যার নাম ইবরাহীম।
(সূরা আম্বিয়া: ৬০)
খেয়াল করুন। আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছিলেন একজন যুবক।
মূসা (আ.)-এর অনুসারীদের মধ্যেও ছিল যুবকরা।ফিরআউনের ভয়ংকর শাসনের মধ্যে অনেক মানুষ সত্য বুঝেও চুপ ছিল। কিন্তু কুরআন বলছে—
فَمَا آمَنَ لِمُوسَىٰ إِلَّا ذُرِّيَّةٌ مِنْ قَوْمِهِ
“মূসার প্রতি ঈমান এনেছিল তার জাতির কিছু তরুণ।”
(সূরা ইউনুস: ৮৩)
কারণ যুবকরা ঝুঁকি নিতে পারে। আদর্শের জন্য মূল্য দিতে পারে।
রাসূল ﷺ-এর দাওয়াতেও যুবকরাই ছিল অগ্রভাগে। ইসলামের প্রথম সারির মানুষদের দিকে তাকান।
আলী (রা.) যুবক। মুসআব ইবন উমাইর (রা.) যুবক।
যুবাইর (রা.) যুবক। তালহা (রা.) যুবক। উসামা (রা.) যুবক।
মদিনায় ইসলামের প্রথম দূত মুসআব (রা.)। তার বয়স কত ছিল? আজকের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের কাছাকাছি।
কেন প্রভাবশালীরা পিছিয়ে থাকে?
এটি ইতিহাসের একটি বাস্তবতা। অনেক সময় সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ঝুঁকি নিতে হয়। ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি। সম্মান হারানোর ঝুঁকি। ব্যবসা হারানোর ঝুঁকি। অবস্থান হারানোর ঝুঁকি।
এ কারণেই দেখা যায় অনেক প্রভাবশালী মানুষ সত্য বুঝেও নীরব থাকে। কিন্তু যুবকরা এগিয়ে আসে।
কারণ তাদের হৃদয়ে আদর্শ বড় হয়।স্বার্থ ছোট হয়।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট কী?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়।
রাজনৈতিকও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো যুবকদের হারিয়ে ফেলা। আজ লক্ষ লক্ষ যুবক আছে।
কিন্তু তাদের একটি বড় অংশের সামনে কোনো মহান লক্ষ্য নেই।
তারা জানে চাকরি কী। ক্যারিয়ার কী।কিন্তু জানে না উম্মাহর জন্য তাদের দায়িত্ব কী। সমাজের জন্য তাদের ভূমিকা কী। আল্লাহ তাদের কাছ থেকে কী চান।
শুধু নামাজ পড়া যুবক যথেষ্ট নয়। একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। আমি নামাজের গুরুত্ব কমাচ্ছি না। নামাজ ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের জন্য এমন যুবক দরকার,
যে শুধু মুসল্লি নয়, দায়িত্ববান মুসল্লি। শুধু ইবাদতকারী নয়, দাঈ। শুধু নিজের জান্নাত নিয়ে চিন্তিত নয়, উম্মাহর ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত।
রাসূল ﷺ এমন যুবক তৈরি করেছিলেন,যারা ফজরে নামাজ পড়ত, আবার দিনে মানুষের ঘরে ঘরে হেদায়েত পৌঁছে দিত। রাতে তাহাজ্জুদ পড়ত,আবার দিনে সমাজের নেতৃত্ব দিত।
মসজিদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কোথায় হওয়া উচিত। কার্পেটে? মার্বেলে? রঙে? ঝাড়বাতিতে?এসবের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত যুবকদের উপর।
কারণ আজকের যুবকই আগামী দিনের ইমাম। খতিব।
শিক্ষক। ব্যবসায়ী। রাজনীতিবিদ। বাবা। নেতা।যদি যুবককে হারাই, তাহলে ভবিষ্যৎকে হারাব।
আজ অনেক মসজিদে বৃদ্ধদের কাতার আছে।কিন্তু যুবকদের কাতার নেই।্যএটি শুধু আজকের সমস্যা নয়। টএটি আগামী দিনের বিপদ।
কারণ আজকের যুবকই আগামী দিনের মুসল্লি।আজকের যুবকই আগামী দিনের অভিভাবক।আজকের যুবকই আগামী দিনের নেতৃত্ব। যদি আজ যুবক মসজিদের সাথে না থাকে, তাহলে আগামীকাল পুরো সমাজ মসজিদ থেকে দূরে সরে যাবে।
আসহাবে কাহফ ছিল যুবক। ইবরাহীম (আ.) ছিলেন যুবক। মূসা (আ.)-এর প্রথম অনুসারীদের মধ্যে ছিল যুবক। রাসূল ﷺ-এর দাওয়াতের প্রথম সৈনিকরা ছিল যুবক। ইসলামের ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল যুবক।
তাই যদি আমরা বাংলাদেশকে বদলাতে চাই, পরিবারকে রক্ষা করতে চাই, মাদককে পরাজিত করতে চাই, অশ্লীলতাকে থামাতে চাই, দুর্নীতিকে কমাতে চাই, তাহলে আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ হবে যুবকদের জয় করা। যুবকদের ভালোবাসা। যুবকদের গড়ে তোলা। যুবকদের হাতে কুরআন তুলে দেওয়া।
যুবকদের মসজিদের সাথে যুক্ত করা। কারণ যুবক হারালে ভবিষ্যৎ হারাবে।
আর যুবক জেগে উঠলে ইতিহাস বদলে যাবে। যেমন বদলেছিল মক্কা। যেমন বদলেছিল মদিনা। তেমনই বদলাতে পারে বাংলাদেশও, ইনশাআল্লাহ।
সাত শ্রেণির সৌভাগ্যবানদের একজন
********************************
রাসূল ﷺ বলেছেন সাত শ্রেণির মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করবে। তাদের একজন হলো “সে যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে বেড়ে উঠেছে।” (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
খেয়াল করুন! আল্লাহ বৃদ্ধ বয়সের ইবাদতের কথা বলেননি। বিশেষভাবে যুবকের ইবাদতের কথা বলেছেন। কারণ যৌবন হলো পরীক্ষা ও সম্ভাবনার সময়।
কেন যুবকরা দূরে যাচ্ছে? এটি শুধু যুবকদের সমস্যা নয়। এটি পরিবার, সমাজ ও মসজিদেরও সমস্যা।
প্রথম কারণ: ডিজিটাল আসক্তি
আজকের যুবক একটি মোবাইল ফোনের মধ্যে পুরো পৃথিবী পেয়ে যায়। ঘুম থেকে ওঠে মোবাইল নিয়ে।
ঘুমাতে যায় মোবাইল নিয়ে।
ফেসবুক, ইউটিউব, শর্ট ভিডিও, গেম ঘন্টার পর ঘন্টা সময় চলে যায়। কিন্তু কুরআনের জন্য সময় নেই। মসজিদের জন্য সময় নেই।
দ্বিতীয় কারণ: পরিচয়ের সংকট। আজকের যুবক জানে কোন ফুটবলার কী করল। কোন অভিনেতা কী করল।
তৃতীয় কারণ: মসজিদে তাদের জন্য জায়গা নেই। এটি একটি কঠিন কিন্তু সত্য কথা। কখনো কখনো কোনো যুবক মসজিদে এলে তাকে এমন আচরণ করা হয় যে সে আর ফিরে আসতে চায় না।
সে একটু ভুল করল। কেউ ধমক দিল। সে একটু দেরিতে এলো। কেউ অপমান করল। সে একটু চঞ্চল।
কেউ তাড়িয়ে দিল। কিন্তু আমরা ভুলে যাই সাহাবীরাও একদিন নতুন ছিল।
রাসূল ﷺ যুবকদের সাথে কেমন আচরণ করতেন? এক যুবক রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চাইল। কী ভয়ংকর চাওয়া! কিন্তু রাসূল ﷺ তাকে অপমান করেননি। গালি দেননি। মসজিদ থেকে বের করে দেননি। বরং ভালোবাসা দিয়ে বুঝিয়েছেন। তার জন্য দোয়া করেছেন। ফলে সেই যুবকের হৃদয় বদলে গেল। (মুসনাদ আহমদ) এটাই নববী পদ্ধতি।
মসজিদে এক বেদুঈনের ঘটনা
এক বেদুঈন মসজিদের মধ্যে প্রস্রাব করে ফেলল।সাহাবীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। কিন্তু রাসূল ﷺ বললেন তাকে থামিও না। তারপর শান্তভাবে তাকে শিক্ষা দিলেন। (সহীহ বুখারী) আজ আমরা অনেক সময় নতুন প্রজন্মের প্রতি এই ধৈর্য দেখাতে পারি না।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
আজ গ্রামের মাঠে যুবক আছে। চায়ের দোকানে যুবক আছে। স্টেডিয়ামে যুবক আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যুবক আছে। রাজনৈতিক মিছিলে যুবক আছে। কিন্তু ফজরের কাতারে যুবক কম।
এটি শুধু যুবকের ব্যর্থতা নয়। এটি পুরো সমাজের ব্যর্থতা। যুবকদের কী দরকার?
যুবকদের শুধু বক্তৃতা দরকার নয়।
তাদের দরকার ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা, আদর্শ, অংশগ্রহণের সুযোগ, দায়িত্ব। রাসূল ﷺ যুবকদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাই তারা উম্মাহর নেতা হয়েছিল।
মসজিদ কী করতে পারে?
মসজিদকে যুবক বান্ধব হতে হবে। কুরআন শিক্ষা সিরাত পাঠ কিশোর হালাকা খেলাধুলা ও চরিত্র গঠন, ক্যারিয়ার পরামর্শ, নেশাবিরোধী কার্যক্রম, সামাজিক সেবা এসব উদ্যোগ মসজিদকে যুবকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
ইমামদের প্রতি আবেদন
যুবকদের শুধু সমালোচনা করবেন না। তাদের বুঝুন।তাদের ভাষা শিখুন। তাদের কষ্ট শুনুন। তাদের পাশে দাঁড়ান। কারণ আজকের সমস্যাগ্রস্ত যুবকই আগামী দিনের মসজিদের নেতা হতে পারে।
অভিভাবকদের প্রতি আবেদন
আপনি যদি চান আপনার সন্তান মসজিদমুখী হোক,
তাহলে তাকে শুধু বলবেন না “নামাজ পড়।” বরং তাকে নিয়ে নিজে মসজিদে যান। শিশুরা কথার চেয়ে উদাহরণ বেশি শেখে। বাবা যদি ফজরে না যায়, ছেলে কেন যাবে?
একটি আবেগময় দৃশ্য। কল্পনা করুন ফজরের নামাজ। প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ। তার পাশে তার ছেলে। তার পাশে তার নাতি। তিন প্রজন্ম একই কাতারে। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। এটাই মসজিদের ভবিষ্যৎ। এটাই উম্মাহর ধারাবাহিকতা।
কিন্তু যদি আজ আমরা যুবকদের হারিয়ে ফেলি, তাহলে আগামী দিনের কাতার ফাঁকা হয়ে যাবে।
একটি কঠিন প্রশ্ন আজ যদি রাসূল ﷺ আমাদের মসজিদে আসতেন, তিনি কি যুবকদের অনুপস্থিতি দেখে খুশি হতেন?
নাকি তিনি জিজ্ঞেস করতেন “তোমাদের তরুণরা কোথায়? যুবকরা সমস্যা নয়। যুবকরা সম্ভাবনা। যুবকরা বোঝা নয়। যুবকরা ভবিষ্যৎ। রাসূল ﷺ যুবকদের দিয়ে ইতিহাস বদলেছেন। আমরাও যদি মসজিদকে আবার জীবন্ত করতে চাই, তাহলে যুবকদের হৃদয় জয় করতে হবে।
তাদেরকে দূরে ঠেলে নয়, বুকে টেনে। অপমান করে নয়, ভালোবেসে। আদেশ দিয়ে নয়,আদর্শ দেখিয়ে।