ইমাম, কমিটি ও মুসল্লি সংঘাত নয়, প্রয়োজন অংশীদারিত্ব

আজকের আলোচনার বিষয় এমন একটি সমস্যা, যা বাংলাদেশের হাজার হাজার মসজিদের বাস্তবতা।

আজ মসজিদে সুন্দর ভবন আছে, মিনার আছে, কার্পেট আছে, মাইক আছে; কিন্তু শান্তি নেই।

মহল্লা বাসীর সামাজিক রাজনৈতিক বিভক্তির প্রভাব মসজিদে এসে সংঘাত তৈরি করে। মুসলমানদের ঐক্যের প্রতীক মসজিদ বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

এই বিভক্তির শিকার হয় মসজিদের ইমাম খতিব এবং দায়িত্বশীলতা। একটি পক্ষ মসজিদের ইমামের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করার কারণে আরেকটি পক্ষ অন্যায় ভাবে বিরোধিতা করে।

যারা ইমামকে ভালোবাসে তারা ইমামের মাধ্যমে স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়। ইমামকে দলভুক্ত করতে চায়। এটা মসজিদ গুলোর নোংরা সিস্টেম। অনেক ইমামরা এ সিস্টেমের মাঝে প্রবেশ করে। তারা সামাজিক রাজনৈতিক বিভক্তিতে প্রবেশ করে। এক সময় রাজনৈতিক পরিবর্তনে মসজিদে ইমাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে।

◾মসজিদকে আমি একটি পরিবারের সাথে তুলনা করতে চাই। একটি পরিবারে একজন বাবা আছেন।একজন মা আছেন। সন্তানরা আছে।

বাবা যদি মনে করেন এরা সবাই আমার অধীনস্থ, আমি শুধু আদেশ দেব তাহলে পরিবার ভেঙে যাবে।

মা যদি মনে করেন আমার কথা না শুনলে আমি সম্পর্ক রাখব না পরিবার ভেঙে যাবে। সন্তানরা যদি মনে করে বাবা-মায়ের প্রতি আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই পরিবার ভেঙে যাবে।

সুন্দর পরিবার তখনই গড়ে ওঠে, যখন সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। বাবা ভালোবাসা দেয়। মা মমতা দেয়। সন্তান শ্রদ্ধা দেয়। সবাই একে অপরের দুর্বলতা ঢেকে রাখে।

মসজিদও একটি বড় পরিবার। ইমাম হচ্ছেন আধ্যাত্মিক পিতা। কমিটি হচ্ছে পরিবারের অভিভাবক ও ব্যবস্থাপক। মুসল্লিরা হচ্ছে পরিবারের সদস্য।

এখানে কেউ মালিক নয়। কেউ প্রজা নয়। সকলেই আল্লাহর ঘরের খাদেম।

◾আমরা যদি মসজিদকে মানব দেহের সাথে তুলনা করি তাহলে তা কোরআন হাদিসের বক্তব্যের কাছাকাছি হয়। রাসূল ﷺ বলেছেন‌ মুমিনরা পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে একটি দেহের ন্যায়।” (বুখারী, মুসলিম)

মসজিদকে একটি মানবদেহ কল্পনা করুন। মস্তিষ্ক বলল “আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, হৃদয়ের দরকার নেই।‌হৃদয় বলল‌ আমিই সব, চোখের দরকার নেই। চোখ বলল আমার মূল্য সব চেয়ে বেশি, হাতের দরকার নেই। তাহলে কি শরীর চলবে? কখনোই না।

শরীরের প্রতিটি অঙ্গ অপরটির সহযোগী। মসজিদও ঠিক তেমন। ইমাম মস্তিষ্কের মতো দিকনির্দেশনা দেন।কমিটি হাতের মতো কাজ বাস্তবায়ন করে। মুসল্লিরা রক্তস্রোতের মতো প্রাণ সঞ্চার করে। একটি অংশ দুর্বল হলে পুরো মসজিদ দুর্বল হয়ে যায়।

◾মসজিদ একটি বাগানের মতো। ইমাম হচ্ছেন মালী।কমিটি হচ্ছে সেচ ও পরিচর্যার ব্যবস্থা।‌ মুসল্লিরা হচ্ছে গাছপালা। মালী যদি গাছের যত্ন না নেয়, বাগান শুকিয়ে যাবে। সেচের ব্যবস্থা না থাকলে বাগান শুকিয়ে যাবে। গাছ যদি শিকড় ছেড়ে দেয়, বাগান শুকিয়ে যাবে।ৎঅর্থাৎ একা কেউ বাগানকে সুন্দর রাখতে পারে না।

সবাইকে একসাথে কাজ করতে হয়। আজ আমাদের অনেক মসজিদে ফুলের বাগান আছে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের বাগান শুকিয়ে যাচ্ছে। বাইরের দেয়াল রঙিন,

কিন্তু ভেতরের সম্পর্কগুলো বিবর্ণ। এটাই আমাদের সংকট।

◾মসজিদ একটি দুর্গ। এই দুর্গের প্রাচীর হচ্ছে মুসল্লিরা।প্রহরী হচ্ছে কমিটি। পতাকাবাহী হচ্ছে ইমাম। প্রাচীর যদি দুর্বল হয়, দুর্গ ভেঙে পড়বে। প্রহরী যদি ঘুমিয়ে যায়, দুর্গ আক্রান্ত হবে। পতাকাবাহী যদি পথ হারায়, দুর্গ বিভ্রান্ত হবে। তাই কারো বিরুদ্ধে কারো যুদ্ধ নয়।সকলের লক্ষ্য এক দুর্গকে রক্ষা করা।

মসজিদ কোনো কোম্পানি নয় যে সেখানে মালিক আর কর্মচারীর সম্পর্ক হবে। মসজিদ কোনো রাজনৈতিক দল নয় যে সেখানে ক্ষমতার লড়াই হবে।মসজিদ একটি পরিবার। মসজিদ একটি দেহ। মসজিদ একটি বাগান। মসজিদ একটি দুর্গ।

এখানে ইমাম, কমিটি ও মুসল্লি—কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। সকলেই আল্লাহর ঘরের খাদেম। যেদিন আমরা এই পরিচয়টি বুঝতে পারব, সেদিন মসজিদে সংঘাত কমবে, ভালোবাসা বাড়বে, ঐক্য ফিরবে, আর মসজিদ আবার সমাজের হৃদয়ে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ। ইমাম, কমিটি ও মুসল্লি—তিন পক্ষের সমন্বয়ে একটি সুস্থ মসজিদ গড়ে ওঠে।

◾ইসলামের শিক্ষা: সহযোগিতা। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى

তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা কর। (সূরা মায়িদা: ২)

খেয়াল করুন আল্লাহ প্রতিযোগিতা বলেননি। ক্ষমতার লড়াই বলেননি। সহযোগিতা বলেছেন।

মসজিদের ভেতরে যদি সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়, তাহলে বরকত কমে যায়।

◾ইমামের ভূমিকা কী? ইমাম হচ্ছেন দ্বীনি নেতা। তিনি কুরআন শেখাবেন। হাদিস শেখাবেন। মানুষকে হালাল-হারামের পথ দেখাবেন। আল্লাহ বলেন:

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

“তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর।”

(সূরা নাহল: ৪৩)

দ্বীনি বিষয়ে নেতৃত্বের স্থান আলেমদের। এটি আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থা।

◾কমিটির ভূমিকা কী? কমিটি হচ্ছে মসজিদের প্রশাসনিক খাদেম।

তাদের কাজ হিসাব-নিকাশ দেখা, উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করা, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মসজিদের সম্পদ রক্ষা করা, মুসল্লিদের সেবা করা। কমিটি যদি নিজেকে মালিক মনে করে, সমস্যা সৃষ্টি হবে।ৎআবার ইমাম যদি কমিটির প্রয়োজন অস্বীকার করেন, তাতেও সমস্যা হবে। দুই পক্ষই অপরিহার্য।

◾মুসল্লিদের ভূমিকা কী?

অনেক সময় মুসল্লিরা মনে করেন কমিটি আর ইমামের সমস্যা তাদের বিষয় নয়। এটি ভুল ধারণা।মসজিদ সবার। মসজিদে বিভক্তি হলে ক্ষতি পুরো এলাকার। রাসূল ﷺ বলেছেন:

الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ

একজন মুমিন আরেক মুমিনের জন্য একটি ভবনের মতো। তারপর তিনি হাতের আঙুলগুলো পরস্পরের মধ্যে প্রবেশ করালেন। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

একটি হৃদয়বিদারক বাস্তবতা

*************************

বাংলাদেশের বহু এলাকায় দেখা যায় মসজিদকে কেন্দ্র করে ঝগড়া। একটি মসজিদ কিন্তু মহল্লাবাসী বিভক্ত দুই পক্ষ।‌ যে ঘরে দাঁড়িয়ে আমরা প্রতিদিন বলি—

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ

“আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য চাই।”

সেই ঘরকে কেন্দ্র করেই বিভক্তি! এটি কত বড় ভুল পদক্ষেপ। কখনো ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে ইমাম কমিটি দুই পক্ষের পরিণত হয়।

সাহাবীদের যুগের শিক্ষা

*********************”

হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) খলিফা হওয়ার পর বলেছিলেন আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। যদি আমি সঠিক কাজ করি, আমাকে সাহায্য করো। যদি আমি ভুল করি, আমাকে সংশোধন করো।”

এটাই ইসলামী নেতৃত্বের সৌন্দর্য। অহংকার নয়।পরামর্শ। জবরদস্তি নয়। সহযোগিতা।

শূরা বা পরামর্শের গুরুত্ব

*********************

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:

وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ

“ষতাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। (সূরা শূরা: ৩৮)

রাসূল ﷺ নিজেও সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করতেন।বদরের আগে। উহুদের আগে। খন্দকের আগে।

তাহলে আজ মসজিদের কমিটি, ইমাম ও মুসল্লিরা কেন পরামর্শের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে না? একটি সুন্দর মসজিদ গড়ে তোলার জন্য পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরামর্শে মসজিদ কমিটি ইমাম মুয়াজ্জিন মসজিদের অন্যান্য দায়িত্বশীলরা থাকবে। সংকট গুলো আলোচনা হবে। সমাধান নিয়ে সবাই ভাববে। সবাই ঐক্যবদ্ধ কিভাবে আমরা একটি সুন্দর মসজিদ গড়ে তুলতে পারি।

◾ইমাম মানুষ। তার ভুল হতে পারে। কিন্তু ভুল সংশোধনেরও আদব আছে। রাসূল ﷺ বলেছেন:

الدِّينُ النَّصِيحَةُ

দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা। (সহীহ মুসলিম)

অপমান নয়। সামাজিকভাবে হেয় করা নয়। পেছনে সমালোচনা নয়। বরং সম্মানের সাথে নসীহত।

◾কমিটির ভুল হলে কী করব? কমিটির দায়িত্বশীলদের যে কারো ভুল হতে পারে। একই নিয়ম।

গীবত নয়। অপমান নয়। দলাদলি নয়। বরং পরামর্শ।

কল্পনা করুন একটি কঠিন প্রশ্ন। আজ যদি রাসূল ﷺ আমাদের এলাকার মসজিদে আসতেন তিনি কি ইমাম ও কমিটির ঝগড়া দেখে খুশি হতেন? তিনি কি মুসল্লিদের বিভক্তি দেখে সন্তুষ্ট হতেন? তিনি কি দলাদলি দেখে আনন্দিত হতেন?

তিনি চাইতেন ভালোবাসা। সম্মান। পরামর্শ। ঐক্য।

ইমামদের দৃষ্টি রাখতে হবে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে কোন দায়িত্ব পালন নয়। ঐক্যরক্ষার্থে প্রয়োজনের সম্মান এর সাথে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করা যাবে না।

,

◾মসজিদ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন ইমাম নেতৃত্ব দেন। কমিটি সহযোগিতা করে। মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করে। এরা তিনজন তিন দিক নয়। তিনটি স্তম্ভ।

একটি স্তম্ভ দুর্বল হলে পুরো কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়।

আসুন সংঘাতের রাজনীতি ছেড়ে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলি। ক্ষমতার লড়াই ছেড়ে সওয়াবের প্রতিযোগিতা করি। মসজিদকে বিভক্তির নয়, ঐক্যের কেন্দ্র বানাই। আল্লাহ তাআলা আমাদের মসজিদগুলোকে ভালোবাসা, পরামর্শ, জ্ঞান ও ঐক্যের মডেলে পরিণত করুন।

Scroll to Top