তাওয়াক্কুল : আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসার ঈমানী শিক্ষা

মানুষের জীবনে দুশ্চিন্তা, ভয়, হতাশা, অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট, রোগ-ব্যাধি, পারিবারিক সমস্যা, ভবিষ্যতের চিন্তা—এসব কখনো শেষ হয় না। কিন্তু একজন মুমিনের হৃদয়কে শক্তিশালী, প্রশান্ত ও স্থির রাখে যে মহৎ গুণ, তার নাম তাওয়াক্কুল।

আজ মুসলিম সমাজে নামাজ আছে, রোজা আছে, দান-সদকা আছে; কিন্তু তাওয়াক্কুলের দুর্বলতা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করে, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা করতে পারে না। বিপদ এলে হতাশ হয়, রিযিকের ব্যাপারে অস্থির হয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

তাই আজকের আলোচনার বিষয়‌ তাওয়াক্কুল: অর্থ, গুরুত্ব, বাস্তবতা ও সামাজিক ভুল ধারণা।

◾ তাওয়াক্কুল কী?

তাওয়াক্কুল এমন একটি ঈমানী গুণ, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে দৃঢ় করে এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাঁর উপর নির্ভর করতে শেখে। কুরআন মাজীদে বহু স্থানে তাওয়াক্কুলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নবী-রাসূলগণের জীবনীতে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক মানুষ তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ না বুঝে একে কখনো অলসতার নাম দেয়, আবার কেউ একে কেবল মুখের একটি বাক্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। তাই সর্বপ্রথম আমাদের জানা দরকার—তাওয়াক্কুল আসলে কী?

তাওয়াক্কুলের শাব্দিক অর্থ

**********************

“তাওয়াক্কুল” শব্দটি আরবি “وكل” (ওয়াকালা) ধাতু থেকে উদ্ভূত।

আরবি ভাষায় “وكيل” বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যার নিকট কোনো কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। যেমন, কেউ নিজের সম্পদ পরিচালনার জন্য কাউকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করলে তাকে “ওয়াকিল” বলা হয়।

সুতরাং তাওয়াক্কুলের শাব্দিক অর্থ হলো‌ কাউকে নিজের প্রতিনিধি বানানো। কোনো বিষয়ে কারো উপর নির্ভর করা। নিজের বিষয় তার হাতে সোপর্দ করা। নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করে শক্তিশালী ও ক্ষমতাবানের উপর ভরসা করা।

যখন বান্দা আল্লাহকে নিজের সকল বিষয়ের একমাত্র অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে গ্রহণ করে, তখনই প্রকৃত অর্থে তাওয়াক্কুলের সূচনা হয়।

◾ইসলামী পরিভাষায় তাওয়াক্কুল হলো—

***********************************

বৈধ ও শরয়ী উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার পর ফলাফল সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তাআলার হাতে সোপর্দ করা এবং তাঁর ফয়সালার উপর অন্তরকে সন্তুষ্ট রাখা।

অর্থাৎ তাওয়াক্কুলের দুটি মৌলিক স্তম্ভ রয়েছে। প্রথম স্তম্ভ। বৈধ উপায় গ্রহণ করা।

আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীকে “দারুল আসবাব” বা উপায়-উপকরণের জগৎ বানিয়েছেন। এখানে ক্ষুধা লাগলে খাদ্য গ্রহণ করতে হয়, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে হয়, জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়াশোনা করতে হয়, রিযিকের জন্য পরিশ্রম করতে হয়।

নবী ﷺ নিজেও উপায় অবলম্বন করেছেন। হিজরতের সময় তিনি পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেছেন, গুহায় অবস্থান করেছেন, খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন, শত্রুদের গতিবিধির সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। অথচ তিনি ছিলেন আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় বান্দা।

এ থেকে বোঝা যায়, উপায় গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়; বরং তাওয়াক্কুলেরই অংশ।

দ্বিতীয় স্তম্ভ অন্তরকে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল রাখা

উপায় গ্রহণ করার পর মানুষ যেন উপায়কেই সবকিছু মনে না করে। কারণ উপায় ফল সৃষ্টি করে না; ফল সৃষ্টি করেন আল্লাহ তাআলা।

কৃষক জমিতে বীজ বপন করে, কিন্তু বীজকে বৃক্ষে পরিণত করেন আল্লাহ। চিকিৎসক ওষুধ দেন, কিন্তু রোগমুক্তি দান করেন আল্লাহ। ব্যবসায়ী ব্যবসা করেন, কিন্তু লাভের ফয়সালা করেন আল্লাহ। চাকরি মানুষকে বেতন দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত রিযিকদাতা আল্লাহ।

সুতরাং হাত থাকবে কাজে, কিন্তু হৃদয় থাকবে আল্লাহর সঙ্গে—এটাই তাওয়াক্কুল।

তাওয়াক্কুল অলসতার নাম নয়

,**************************

আজ সমাজে একটি বড় ভুল ধারণা হলো, কিছু মানুষ মনে করে তাওয়াক্কুল মানে কোনো চেষ্টা না করা। কেউ বলে, আল্লাহ দিলে দিবেন, কাজ করে কী হবে? কেউ বলে, “চিকিৎসা নেব না, আল্লাহ ভরসা। কেউ বলে, চাকরি খুঁজব না, রিযিক তো আল্লাহর হাতে। এগুলো তাওয়াক্কুল নয়; বরং ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে ভুল ধারণা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

«اعقلها وتوكل»

উটটিকে আগে বেঁধে রাখ, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।‌

এ হাদিসে নবী ﷺ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাষায় তাওয়াক্কুলের পূর্ণ সংজ্ঞা বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ উপায় গ্রহণও করতে হবে, আবার আল্লাহর উপর ভরসাও রাখতে হবে।

◾তাওয়াক্কুলের সারকথা এক বাক্যে যদি তাওয়াক্কুলকে ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে বলা যায় আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, কিন্তু ফলাফলকে নিজের ক্ষমতার ফল মনে করব না; বরং আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকব।”

একজন কৃষক চাষ করবে, একজন ছাত্র পড়বে, একজন ব্যবসায়ী ব্যবসা করবে, একজন রোগী চিকিৎসা নেবে; কিন্তু প্রত্যেকেই অন্তরে বিশ্বাস রাখবে

আমার চেষ্টা কারণ মাত্র, সফলতা দানকারী একমাত্র আল্লাহ।”

এই বিশ্বাস যখন মানুষের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই সে প্রকৃত মুতাওয়াক্কিল বা আল্লাহর উপর ভরসাকারী বান্দায় পরিণত হয়।

কুরআনে তাওয়াক্কুলের আলোচনা

******************************

তাওয়াক্কুল কুরআনের একটি মৌলিক শিক্ষা এবং ঈমানের অপরিহার্য দাবি।

পবিত্র কুরআনের অসংখ্য স্থানে আল্লাহ তাআলা তাওয়াক্কুলের কথা উল্লেখ করেছেন। কোথাও তিনি এর আদেশ দিয়েছেন, কোথাও এর প্রশংসা করেছেন, কোথাও এর ফলাফল বর্ণনা করেছেন এবং কোথাও তাওয়াক্কুলকারীদের প্রতি তাঁর বিশেষ ভালোবাসার ঘোষণা দিয়েছেন।

এখন আমরা কুরআনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের আলোকে তাওয়াক্কুলের মর্যাদা ও তাৎপর্য আলোচনা করব।

১. আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন

«فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ»

যখন তুমি দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। উহুদের যুদ্ধের পর কিছু ভুলত্রুটি সংঘটিত হয়েছিল। তারপরও আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং অতঃপর আল্লাহর উপর ভরসা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ বলেননি পরামর্শ ছেড়ে দাও পরিকল্পনা ছেড়ে দাও ব্যবস্থা গ্রহণ করো না। বরং তিনি বলেছেন পরামর্শ করো, চিন্তা করো, সিদ্ধান্ত নাও, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করো।

এ থেকেই বোঝা যায় যে ইসলাম পরিকল্পনা ও তাওয়াক্কুলকে একত্রে শিক্ষা দেয়। আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ বলেন—

«إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ»

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।”

এটি তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে বড় মর্যাদাগুলোর একটি।

আমরা সবাই আল্লাহর জান্নাত চাই, রহমত চাই, ক্ষমা চাই। কিন্তু এর চেয়েও বড় বিষয় হলো— আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা। যে বান্দাকে আল্লাহ ভালোবাসেন – তাকে তিনি হেফাজত করেন, তাকে সঠিক পথ দেখান, তার দোয়া কবুল করেন, তার অন্তরে প্রশান্তি দান করেন, এবং আখিরাতে তাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন।

তাই একজন মুমিনের জন্য প্রশ্ন হওয়া উচিত আমি কি আল্লাহর ভালোবাসার উপযুক্ত কাজ করছি? তাওয়াক্কুল সেই মহৎ কাজগুলোর অন্যতম।

২. আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

«وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ»

যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। (সূরা তালাক : ৩)

এটি কুরআনের অন্যতম শক্তিশালী ও আশাব্যঞ্জক আয়াত। মানুষ সাধারণত নিরাপত্তা খোঁজে বিভিন্ন জিনিসে‌ অর্থ-সম্পদে, চাকরিতে, ব্যবসায়, ক্ষমতাবান ব্যক্তির পরিচয়ে, আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায়।

কিন্তু বাস্তবতা হলো‌ মানুষের সাহায্য সীমিত। সম্পদের শক্তি সীমিত। পদমর্যাদা সীমিত। ক্ষমতা সীমিত।

আজ যে সাহায্য করছে, কাল সে নিজেই সাহায্যের মুখাপেক্ষী হতে পারে।

কিন্তু আল্লাহ তাআলার সাহায্যের কোনো সীমা নেই।

অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে, আল্লাহ তার জন্য এমনভাবে ব্যবস্থা করেন যা সে কখনো কল্পনাও করেনি।

অনেক সময় মানুষ সব দরজা বন্ধ দেখে হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু যে ব্যক্তি তাওয়াক্কুল করে, সে জানে যখন পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখনও আসমানের দরজা খোলা থাকে।

৩. মুমিনের পরিচয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-

«وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ»

মুমিনদের উচিত আল্লাহর উপর ভরসা করা। (সূরা ইবরাহীম : ১১)

এখানে আল্লাহ তাওয়াক্কুলকে ঈমানের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ তাওয়াক্কুল শুধু একটি উত্তম চরিত্র নয়; বরং এটি ঈমানের দাবি।

যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করে আল্লাহ সবকিছুর মালিক, আল্লাহ সবকিছু জানেন, আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, আল্লাহই উপকার ও অপকারের একমাত্র অধিকারী, তার অন্তরে অবশ্যই তাওয়াক্কুল সৃষ্টি হবে।

৪. আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

«أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ»

আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? (সূরা যুমার : ৩৬)

এটি আসলে একটি প্রশ্ন, কিন্তু এর উদ্দেশ্য উত্তর চাওয়া নয়; বরং হৃদয়ে দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি করা।

অর্থ হলো অবশ্যই আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট।তিনি রিযিকের জন্য যথেষ্ট। তিনি নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট। তিনি সাহায্যের জন্য যথেষ্ট। তিনি হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট। তিনি বিপদ থেকে মুক্তির জন্য যথেষ্ট।

যখন মানুষ কাউকে হারায়, তখন ভাবে আমার সব শেষ। যখন ব্যবসায় ক্ষতি হয়, তখন ভাবে‌ আর কোনো পথ নেই।‌ যখন চাকরি হারায়, তখন মনে করে‌ এখন কী হবে?

কিন্তু মুমিনের বিশ্বাস হলো যতক্ষণ আমার রব আছেন, ততক্ষণ আমি নিঃস্ব নই। যতক্ষণ আমার রব আছেন, ততক্ষণ আমি অসহায় নই। যতক্ষণ আমার রব আছেন, ততক্ষণ আমার জন্য কল্যাণের দরজা বন্ধ হতে পারে না।

এই আয়াত মুমিনের হৃদয়ে এমন শক্তি সৃষ্টি করে, যা তাকে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও অবিচল থাকতে সাহায্য করে।

!

◾কুরআনের এই আয়াতগুলো আমাদের সামনে চারটি মহান সত্য তুলে ধরে—

প্রথমত, আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহর উপর ভরসাকারীর জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।

তৃতীয়ত, তাওয়াক্কুল মুমিনের অন্যতম পরিচয়।

চতুর্থত, আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য সর্বাবস্থায় যথেষ্ট।

এটাই কুরআনের শিক্ষা, নবীদের শিক্ষা এবং সফল মুমিনদের পথ।

◾হাদিসে তাওয়াক্কুল আলোচনা

১. পাখির উদাহরণ। রাসূল ﷺ বলেন—

«لو أنكم تتوكلون على الله حق توكله لرزقكم كما يرزق الطير»

তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথার্থ তাওয়াক্কুল করতে তাহলে তিনি তোমাদেরকে পাখির মতো রিযিক দিতেন। (তিরমিযি)

খেয়াল করুন পাখি বাসায় বসে থাকে না। সকালেই বের হয়।‌‌ পরিশ্রম করে। তারপর রিযিক নিয়ে ফিরে আসে। অর্থাৎ তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা সাথে আল্লাহর উপর ভরসা।

২. উট বেঁধে তাওয়াক্কুল। এক ব্যক্তি বললেন “আমি উট ছেড়ে রেখে তাওয়াক্কুল করব? রাসূল ﷺ বললেন

«اعقلها وتوكل»

প্রথমে উট বেঁধে রাখ, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।্য(তিরমিযি) এটি তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে বড় নীতিমালা।

নবী-রাসূলদের জীবনে তাওয়াক্কুল

******************************

তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ বাস্তব নমুনা আমরা দেখতে পাই নবী-রাসূলদের জীবনে। তারা শুধু মানুষকে তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দেননি; বরং নিজেদের জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে এর বাস্তব প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন।

যখন সমস্ত বাহ্যিক উপায়-উপকরণ শেষ হয়ে গেছে তখনও নবী-রাসূলগণ আল্লাহর উপর ভরসা হারাননি। আর এর ফলেই আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য এমন সাহায্যের ব্যবস্থা করেছেন, যা মানব ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

১. হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর তাওয়াক্কুল।তাওয়াক্কুলের আলোচনায় সর্বপ্রথম স্মরণ করতে হয় খলীলুল্লাহ ইবরাহীম (আ.)-এর কথা।

তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন, মূর্তিপূজার বিরোধিতা করেছিলেন এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জাতির বিরোধিতা সহ্য করেছিলেন।অবশেষে তাঁর শত্রুরা সিদ্ধান্ত নিল তাঁকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করবে।

ইতিহাসবিদগণ উল্লেখ করেছেন, এত বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয়েছিল যে মানুষ তার নিকটেও যেতে পারছিল না। তাই তাঁকে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে একজন মানুষের সামনে কোনো উপায়-উপকরণ থাকে না। কিন্তু সেই ভয়াবহ মুহূর্তেও ইবরাহীম (আ.)-এর অন্তর আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থায় পরিপূর্ণ ছিল। তিনি বললেন—

«حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ»

“আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।

এ ছিল একজন মুমিনের হৃদয়ের ঘোষণা। এরপর আল্লাহ তাআলা এমন আদেশ দিলেন, যা সমগ্র সৃষ্টিজগতের নিয়মকে স্তব্ধ করে দিল—

«يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ»

হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। (সূরা আম্বিয়া : ৬৯)

ফলে যে আগুন মানুষকে পুড়িয়ে দেয়, সেই আগুনই আল্লাহর আদেশে তাঁর জন্য নিরাপত্তার মাধ্যম হয়ে গেল। এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যখন বান্দা আল্লাহর উপর ভরসা করে, তখন আল্লাহ অসম্ভবকেও সম্ভব করে দেন।

২. হযরত মূসা (আ.)-এর তাওয়াক্কুল

আরেকটি বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হলো মূসা (আ.)-এর ঘটনা।‌আল্লাহর নির্দেশে তিনি বনী ইসরাঈলকে নিয়ে মিসর ত্যাগ করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরআউন তার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করে।‌ একসময় বনী ইসরাঈল এসে পৌঁছাল সমুদ্রের তীরে।‌ সামনে উত্তাল সমুদ্র। পেছনে সশস্ত্র ফিরআউনের বাহিনী।

মানুষের চোখে তখন মুক্তির কোনো পথ ছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে বনী ইসরাঈল আতঙ্কিত হয়ে বলল

«إِنَّا لَمُدْرَكُونَ»

“আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম।‌ (সূরা শু‘আরা : ৬১)

কিন্তু মূসা (আ.)-এর ঈমান ও তাওয়াক্কুল ছিল অটল।

তিনি বললেন—

«كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ»

কখনো নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। (সূরা শু‘আরা : ৬২)

সামনে সমুদ্র, পেছনে শত্রু, তবুও তিনি বলছেন আমার রব আমার সঙ্গে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন সমুদ্রের উপর লাঠি মারতে। আল্লাহর কুদরতে সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। মূসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নিরাপদে পার হয়ে গেলেন।

আর ফিরআউন ও তার বাহিনী ডুবে ধ্বংস হলো।‌ এ ঘটনা আমাদের শেখায় যখন সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনও আল্লাহর সাহায্যের পথ বন্ধ হয় না।

৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর তাওয়াক্কুল। নবী-রাসূলদের মধ্যে তাওয়াক্কুলের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ।‌ তাঁর সমগ্র জীবনই ছিল তাওয়াক্কুলের এক উজ্জ্বল শিক্ষা। বিশেষভাবে হিজরতের ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শিক্ষণীয়।

মক্কার কাফিররা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে হত্যা করবে। আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করেন এবং পথিমধ্যে সাওর গুহায় আশ্রয় নেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর (রা.)।এদিকে কুরাইশের অনুসন্ধানকারী দল গুহার মুখ পর্যন্ত এসে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ ছিল যে আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন

তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকায়, তাহলে আমাদের দেখে ফেলবে।”

কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অন্তরে বিন্দুমাত্র ভয় ছিল না।

তিনি বললেন—

«لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا»

“চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা তাওবা : ৪০)

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ সব ধরনের উপায়ও গ্রহণ করেছিলেন। রাতের অন্ধকারে বের হয়েছেন।‌ গোপন পথ ব্যবহার করেছেন। অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেছেন। গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন।

অর্থাৎ তিনি উপায় গ্রহণ করেছেন, কিন্তু হৃদয়ের ভরসা ছিল একমাত্র আল্লাহর উপর। এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুলের শিক্ষা।

নবী-রাসূলদের তাওয়াক্কুল থেকে আমাদের শিক্ষা

****************************************

এই ঘটনাগুলো থেকে আমরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করি—

প্রথমত, তাওয়াক্কুল মানে উপায়-উপকরণ ত্যাগ করা নয়; বরং উপায় গ্রহণের পর আল্লাহর উপর নির্ভর করা।

দ্বিতীয়ত, যত বড় বিপদই আসুক, মুমিন কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।

তৃতীয়ত, আল্লাহর সাহায্য অনেক সময় এমনভাবে আসে, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।

চতুর্থত, প্রকৃত তাওয়াক্কুল মানুষের অন্তরে সাহস, দৃঢ়তা এবং প্রশান্তি সৃষ্টি করে।

ইবরাহীম (আ.) আগুনের মধ্যে থেকেও আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন। মূসা (আ.) সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়েও আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায়ও আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন। তাহলে আমাদের জীবনেও যখন বিপদ আসবে, তখন আমাদের হৃদয়ের ভাষা হওয়া উচিত—

«حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ»

“আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।”

কারণ যে রব আগুনকে শীতল করতে পারেন, সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারেন এবং গুহায় আশ্রয় নেওয়া দুইজন মানুষকে সমগ্র আরবের শক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন, সেই রব আজও জীবিত, ক্ষমতাবান এবং তাঁর বান্দাদের সাহায্য করতে সক্ষম।

সমাজে তাওয়াক্কুল সম্পর্কে ভুল ধারণা

********************************

একটি ভুল ধারণা হলো চেষ্টা না করাই তাওয়াক্কুল।এটি সম্পূর্ণ ভুল। কৃষক জমিতে বীজ না বপন করে ফসল আশা করতে পারে না।

আরেকটি ভুল ধারণা চাকরি খোঁজার দরকার নেই, আল্লাহ দিবেন। আল্লাহ দিবেন। ‌কিন্তু চেষ্টা করতে হবে।

এটাও ভুল ধারণা চিকিৎসা না নেওয়াই তাওয়াক্কুল।রাসূল ﷺ চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসা নেওয়া সুন্নাহ।

এটা সামাজিক ভুল ধারণা মানুষের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। আজ অনেকে আল্লাহর চেয়ে মানুষের উপর বেশি ভরসা করে।‌ এটি তাওয়াক্কুলের দুর্বলতা।

রিযিক ও তাওয়াক্কুল

*******************

তাওয়াক্কুলের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব একটি বিষয় হলো— রিযিক।

বর্তমান যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, সবচেয়ে বড় অস্থিরতা এবং সবচেয়ে বড় ভয় হলো রিযিকের ভয়। সন্তান জন্ম নিলে মানুষ তার ভবিষ্যৎ রিযিক নিয়ে চিন্তা করে, যুবক চাকরি নিয়ে চিন্তা করে, ব্যবসায়ী লাভ-লোকসান নিয়ে চিন্তা করে, বৃদ্ধ তার জীবনের শেষ সময়ের ব্যয় নিয়ে চিন্তা করে।

এমনকি অনেক সময় রিযিকের দুশ্চিন্তা মানুষকে হারাম উপার্জনের দিকে ঠেলে দেয়, সুদে জড়িয়ে ফেলে, প্রতারণার পথে নিয়ে যায় এবং আল্লাহর উপর ভরসা দুর্বল করে দেয়।

অথচ কুরআনুল কারিম এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

«وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا»

“

পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর নয়। সূরা হূদ : ৬)

এই আয়াতের মধ্যে মুমিনের জন্য অপরিসীম সান্ত্বনা ও আশ্বাস রয়েছে। যে আল্লাহ সমুদ্রের গভীরে থাকা মাছকে রিযিক দেন, যে আল্লাহ আকাশে উড়ন্ত পাখিকে রিযিক দেন, যে আল্লাহ মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা পিপীলিকাকে রিযিক দেন, সেই আল্লাহ কি তাঁর মুমিন বান্দাকে ভুলে যেতে পারেন? কখনো না।

রিযিকের মালিক কে?

আজ অনেক মানুষ বাস্তবে না হলেও মানসিকভাবে মনে করে চাকরিই তার রিযিকদাতা,ব্যবসাই তার জীবিকার মালিক, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণেই সে বেঁচে আছে।

কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো রিযিকের মালিক আল্লাহ।চাকরি রিযিকের মালিক নয়; চাকরি একটি মাধ্যম মাত্র। ব্যবসা রিযিকের মালিক নয়; ব্যবসা একটি উপায় মাত্র।

অনেক মানুষ চাকরি হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু আল্লাহ অন্য দরজা খুলে দিয়েছেন। অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু আল্লাহ নতুন পথ সৃষ্টি করেছেন। অনেক সময় মানুষ যেখানে আশা করে, সেখানে কিছুই পায় না; আবার যেখানে কোনো আশা ছিল না, সেখান থেকে আল্লাহ রিযিক দান করেন।

তাই মুমিন উপায় গ্রহণ করে, কিন্তু অন্তরকে উপায়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে না। তার অন্তর থাকে আল্লাহর সঙ্গে।

রিযিক নির্ধারিত

***************-

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«إن روح القدس نفث في روعي أن نفسا لن تموت حتى تستكمل رزقها وأجلها»

রূহুল কুদুস আমার অন্তরে এ কথা প্রেরণ করেছেন যে, কোনো প্রাণ তার নির্ধারিত রিযিক ও নির্ধারিত আয়ু পূর্ণ না করে মৃত্যুবরণ করবে না। (মুসনাদে আহমদ)

এই হাদিস আমাদেরকে এক মহান শিক্ষা দেয়—

কেউ কারো রিযিক ছিনিয়ে নিতে পারে না। আপনার জন্য যা নির্ধারিত, তা আপনার কাছেই পৌঁছাবে।

আর যা আপনার জন্য নির্ধারিত নয়, তা সমস্ত পৃথিবী চেষ্টা করলেও আপনাকে দিতে পারবে না।

এ বিশ্বাস মানুষকে হিংসা, লোভ ও অন্যায় প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করে।

রিযিকের জন্য হারাম পথ অবলম্বন নয়

*********************************

কখনো কখনো মানুষ মনে করে এভাবে না চললে সংসার চলবে না।সুদ না নিলে ব্যবসা হবে না। মিথ্যা না বললে লাভ হবে না। ঘুষ না দিলে কাজ হবে না। এ ধরনের ধারণা তাওয়াক্কুলের দুর্বলতার পরিচয়।

যিনি হালাল রিযিকের ব্যবস্থা করতে সক্ষম, তিনি হারাম ছাড়াও ব্যবস্থা করতে সক্ষম। আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করা যায় না। বরং হারাম উপার্জন সাময়িকভাবে সম্পদ বাড়ালেও বরকত ধ্বংস করে দেয় এবং অন্তরের শান্তি কেড়ে নেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«لو أنكم تتوكلون على الله حق توكله لرزقكم كما يرزق الطير، تغدو خماصا وتروح بطانا»

“তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথার্থ তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে পাখির মতো রিযিক দিতেন। পাখি সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে। (তিরমিযি)

এ হাদিসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। প্রথম শিক্ষা— রিযিক আল্লাহ দেন। দ্বিতীয় শিক্ষা— রিযিকের জন্য চেষ্টা করতে হয়।

পাখি বাসায় বসে থাকে না। সে সকালবেলা বের হয়, খাদ্য অনুসন্ধান করে, তারপর রিযিক নিয়ে ফিরে আসে। অতএব তাওয়াক্কুল মানে ঘরে বসে থাকা নয়; বরং চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর উপর নির্ভর করা।

দুশ্চিন্তা নয়, দোয়া ও আমল।‌ আজ অনেক মানুষ রিযিক নিয়ে এত বেশি চিন্তা করে যে, তার ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়, ঘুম নষ্ট হয়ে যায়, মানসিক শান্তি নষ্ট হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে‌ দুশ্চিন্তা রিযিক বাড়ায় না। কিন্তু দোয়া, ইস্তিগফার, তাকওয়া এবং তাওয়াক্কুল রিযিকে বরকত আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

«وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۝ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ»

“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ সৃষ্টি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করেনি। (সূরা তালাক : ২-৩)

এ আয়াত আমাদের শেখায় যে, রিযিক বৃদ্ধির প্রকৃত চাবিকাঠি শুধু দক্ষতা নয়; বরং তাকওয়া, দোয়া এবং আল্লাহর উপর ভরসা।

রিযিকের জন্য চেষ্টা করা সুন্নাহ। হালাল উপার্জন করা ইবাদত। পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। কিন্তু হৃদয়ের ভরসা কোনো চাকরি, ব্যবসা, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর নয়; বরং একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপর হওয়া উচিত।

মুমিনের বিশ্বাস‌ রিযিকের মালিক আল্লাহ। রিযিকের ভাণ্ডার আল্লাহর হাতে। আমার জন্য যা নির্ধারিত, তা আমি অবশ্যই পাব। তাই আমি চেষ্টা করব, হালাল পথ অবলম্বন করব, দোয়া করব, ইস্তিগফার করব এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করব।

বিপদ-মুসিবতে তাওয়াক্কুল

***********************

তাওয়াক্কুলের প্রকৃত পরীক্ষা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে নয়; বরং বিপদ, সংকট, দুঃখ-কষ্ট এবং অনিশ্চয়তার সময়ে হয়।

যখন সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করার দাবি করা সহজ। কিন্তু যখন রোগ আসে, ব্যবসায় ক্ষতি হয়, প্রিয়জন হারিয়ে যায়, ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হয়, তখনই বোঝা যায়— অন্তরে তাওয়াক্কুল কতটুকু আছে।

তাই মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সে বিপদে ভেঙে পড়ে না; বরং আল্লাহর দিকে আরও বেশি ফিরে আসে।

অনেক মানুষ মনে করে, বিপদ মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা হলো— বিপদ সবসময় শাস্তি নয়। কখনো তা পরীক্ষা। কখনো তা গুনাহ মোচনের মাধ্যম। কখনো তা মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। কখনো তা বান্দাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

«وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ»

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদের ক্ষতি, প্রাণহানি ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (সূরা বাকারা : ১৫৫)

রোগ হলে : তাওয়াক্কুল ও চিকিৎসা

*****************************

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো অসুস্থতা। অনেক সময় দীর্ঘদিন রোগভোগ করতে হয়। কখনো চিকিৎসা কাজ করতে দেরি হয়। কখনো ব্যয় বেড়ে যায়। কখনো রোগের কারণে মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে।

এ সময় মুমিনের পথ কী? আল্লাহর উপর ভরসা এবং চিকিৎসা—দুটোই। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

«تداووا عباد الله»

“হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো।”

(আবু দাউদ, তিরমিযি)

অতএব চিকিৎসা গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের বিপরীত নয়; বরং সুন্নাহ। ভুল হলো যখন মানুষ ওষুধকেই আরোগ্যদাতা মনে করে।

সঠিক বিশ্বাস হলো ওষুধ একটি মাধ্যম। ডাক্তার একটি মাধ্যম। হাসপাতাল একটি মাধ্যম। কিন্তু আরোগ্যদাতা একমাত্র আল্লাহ। যেমন ইবরাহীম (আ.) বলেছেন—

«وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ»

“আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে সুস্থতা দান করেন। (সূরা শু‘আরা : ৮০)

ব্যবসায় ক্ষতি হলে : হতাশা নয়, তাওয়াক্কুল

*************************************

অনেক মানুষের জীবনের বড় পরীক্ষা হলো অর্থনৈতিক সংকট। ব্যবসায় লোকসান হলো।চাকরি চলে গেল। ফসল নষ্ট হয়ে গেল। বিনিয়োগ ব্যর্থ হলো।এ সময় শয়তান মানুষের মনে হতাশা সৃষ্টি করে।

কিন্তু একজন মুমিন জানে আজকের ক্ষতি চিরস্থায়ী নয়। যিনি প্রথমবার দিয়েছেন, তিনি আবারও দিতে সক্ষম। যিনি একটি দরজা বন্ধ করেছেন, তিনি আরও অনেক দরজা খুলে দিতে পারেন।

তাই ব্যবসায় ক্ষতি হলে আত্মসমালোচনা করবে, বৈধ কারণ অনুসন্ধান করবে, নতুন পরিকল্পনা করবে, নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করবে, কিন্তু কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন—

«لَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ»

তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। (সূরা ইউসুফ : ৮৭)

সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তা : দোয়া ও প্রচেষ্টা

*******************************

বর্তমান যুগে অভিভাবকদের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো সন্তান। সন্তানের ঈমান, চরিত্র, শিক্ষা, ভবিষ্যৎ, বন্ধু-বান্ধব, দ্বীনের উপর টিকে থাকা এসব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চিন্তা থাকে। কিন্তু অনেক সময় এই চিন্তা অতিরিক্ত উদ্বেগে পরিণত হয়।

মনে রাখতে হবে সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু হেদায়েত দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নয়। হেদায়েতের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

তাই সন্তানের ব্যাপারে মুমিনের নীতি হলো দোয়া এবং চেষ্টা—দুটোই চলবে। সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা দিতে হবে।ভালো পরিবেশ দিতে হবে। সৎ সঙ্গ দিতে হবে। নিজে আদর্শ হতে হবে। এরপর সন্তানের জন্য কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে।

কারণ নবীগণও তাদের সন্তানদের জন্য দোয়া করেছেন। ইবরাহীম (আ.) দোয়া করেছেন—

«رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي»

হে আমার রব! আমাকে এবং আমার সন্তানদের নামাজ কায়েমকারী বানান। (সূরা ইবরাহীম : ৪০)

বিপদের সময় মুমিনের ভাষা

*************************

যখন কোনো বিপদ আসে, তখন মুমিন প্রথমেই আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয়—

«إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ»

নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী।(সূরা বাকারা : ১৫৬)

এই বাক্য শুধু মৃত্যুসংবাদে নয়; বরং সব ধরনের বিপদে মুমিনের আত্মসমর্পণের ঘোষণা। আর তাওয়াক্কুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাক্য হলো—

«حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ»

“আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।”

এই বাক্য ইবরাহীম (আ.) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবাগণও সংকটময় সময়ে এ বাক্য পাঠ করেছিলেন।

বিপদে তাওয়াক্কুলের ফল

ও********************

যে ব্যক্তি বিপদের সময় আল্লাহর উপর ভরসা করে—

তার অন্তরে প্রশান্তি আসে, হতাশা দূর হয়, ঈমান শক্তিশালী হয়, আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়, এবং সে এমন সব সাহায্য পায়, যা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।

বিপদ সবসময় দূর হবে—এমন নয়। কিন্তু তাওয়াক্কুল বিপদ বহন করার শক্তি সৃষ্টি করে।

রোগ হলে আল্লাহর উপর ভরসা থাকবে, চিকিৎসাও চলবে। ব্যবসায় ক্ষতি হলে আল্লাহর উপর ভরসা থাকবে, নতুন উদ্যোগও চলবে। সন্তান নিয়ে উদ্বেগ হলে দোয়া চলবে, প্রচেষ্টাও চলবে।

সংকট এলে ধৈর্য থাকবে, তাওয়াক্কুলও থাকবে। কারণ প্রকৃত তাওয়াক্কুল হলো উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা, কিন্তু হৃদয়কে উপায়ের সঙ্গে নয়; বরং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে যুক্ত রাখা।

তাওয়াক্কুলের ফলাফল

********************

মানুষ সাধারণত কোনো আমল বা গুণের গুরুত্ব তখনই গভীরভাবে উপলব্ধি করে, যখন সে এর ফলাফল ও উপকারিতা জানতে পারে।

তাওয়াক্কুল এমন একটি মহৎ ইবাদত, যার সুফল শুধু আখিরাতে নয়; বরং দুনিয়াতেও প্রকাশ পায়। একজন মানুষ যত বেশি আল্লাহর উপর নির্ভর করতে শেখে, তার জীবন তত বেশি শান্ত, স্থির ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।

তাওয়াক্কুলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল

************************************

১. অন্তরের প্রশান্তি লাভ হয়। বর্তমান যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো মানসিক অস্থিরতা। অর্থ আছে কিন্তু শান্তি নেই। ক্ষমতা আছে কিন্তু নিরাপত্তা নেই। সুবিধা আছে কিন্তু প্রশান্তি নেই।

কারণ অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি কোনো বস্তু বা সম্পদের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং আল্লাহর উপর ভরসার মাধ্যমে অর্জিত হয়। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে আমার রব সবকিছু জানেন। আমার রব আমার অবস্থা দেখছেন।আমার রব আমার জন্য সর্বোত্তম ফয়সালা করেন। তার হৃদয় স্বাভাবিকভাবেই প্রশান্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

«أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ»

“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে। (সূরা রা‘দ : ২৮)

২. দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ কমে যায়। মানুষ সাধারণত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তা করে। আগামীকাল কী হবে?

ব্যবসা চলবে তো?‌ সন্তানের ভবিষ্যৎ কী হবে? চাকরি থাকবে তো? অসুস্থতা বাড়বে না তো?

কিন্তু যে ব্যক্তি তাওয়াক্কুল করে, সে জানে ভবিষ্যৎ আমার হাতে নয়, আমার রবের হাতে। আর আমার রব কখনো ভুল করেন না। তাই তাওয়াক্কুল মানুষকে অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করে।

এর অর্থ এই নয় যে সে পরিকল্পনা করবে না; বরং পরিকল্পনা করবে, চেষ্টা করবে, কিন্তু উদ্বেগের বোঝা নিজের কাঁধে বহন করবে না। সে সেই বোঝা আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দেবে।

৩. আল্লাহর বিশেষ সাহায্য লাভ হয়। আল্লাহ তাআলা তাওয়াক্কুলকারীদের একা ছেড়ে দেন না। তিনি তাদের সাহায্য করেন, পথ দেখান এবং অদৃশ্য উপায়ে তাদের জন্য ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ বলেন—

«وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ»

যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। (সূরা তালাক : ৩)

কত মানুষ আছে, যাদের সব বাহ্যিক উপায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ এমন জায়গা থেকে সাহায্য পাঠিয়েছেন, যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি।

তাওয়াক্কুলকারী ব্যক্তি জানে মানুষ ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সাহায্য কখনো ব্যর্থ হয় না।

৪. ঈমান বৃদ্ধি পায়। তাওয়াক্কুল এবং ঈমানের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যখন একজন বান্দা বারবার আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং বাস্তবে আল্লাহর সাহায্য দেখতে পায়, তখন তার ঈমান আরও শক্তিশালী হয়ে যায়। কুরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—

«وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ»

তারা তাদের রবের উপর ভরসা করে। (সূরা আনফাল : ২)

তাই তাওয়াক্কুল কেবল ঈমানের ফল নয়; এটি ঈমান

৫. রিযিকে বরকত আসে। তাওয়াক্কুল রিযিক বৃদ্ধির এবং রিযিকে বরকত লাভের অন্যতম কারণ। বরকত মানে শুধু বেশি পাওয়া নয়; বরং অল্পের মধ্যে কল্যাণ ও উপকারিতা সৃষ্টি হওয়া। অনেক মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক, কিন্তু শান্তি নেই। আবার অনেকের সম্পদ তুলনামূলক কম, কিন্তু তাতে সুখ, প্রশান্তি ও কল্যাণ রয়েছে। এটাই বরকত।

আল্লাহ তাআলা তাকওয়া ও তাওয়াক্কুলকারীদের জন্য এমন জায়গা থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করেন, যা তাদের ধারণার বাইরে।

«وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ»

এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না। (সূরা তালাক : ৩)

৬. বিপদে স্থিরতা ও দৃঢ়তা আসে। বিপদ মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। কেউ সামান্য কষ্টেই ভেঙে পড়ে। কেউ হতাশ হয়ে যায়। কেউ আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করে। কিন্তু তাওয়াক্কুলকারী ব্যক্তি বিপদের মধ্যেও স্থির থাকে।

কারণ সে জানে এই বিপদও আল্লাহর ইচ্ছায় এসেছে।

এই বিপদের মধ্যেও কোনো না কোনো কল্যাণ রয়েছে।

আর আমার রব আমাকে একা ছেড়ে দেননি।‌তাই সে কান্না করতে পারে, কষ্ট পেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা হারায় না। এই মানসিক দৃঢ়তা তাওয়াক্কুলের অন্যতম বড় ফল।

৭. জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ হয়। তাওয়াক্কুল শুধু দুনিয়ার কল্যাণের কারণ নয়; বরং আখিরাতের সফলতারও অন্যতম মাধ্যম।

রাসূলুল্লাহ ﷺ সত্তর হাজার এমন ব্যক্তির কথা বলেছেন, যারা হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।

তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো

«وعلى ربهم يتوكلون»

তারা তাদের রবের উপর ভরসা করত। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এ থেকে বোঝা যায়, তাওয়াক্কুল এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ আমল, যা বান্দাকে জান্নাতের উচ্চ স্তরে পৌঁছে দিতে পারে। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় আল্লাহর উপর নির্ভর করতে শিখেছে, আখিরাতে আল্লাহ তাকে বিশেষ সম্মান দান করবেন।

◾ কীভাবে তাওয়াক্কুল অর্জন করব

১. আল্লাহর পরিচয় অর্জন। তাওয়াক্কুলের মূল ভিত্তিই হলো আল্লাহকে চেনা। যাকে যত বেশি চেনা যায়, তার উপর তত বেশি ভরসা করা যায়।

একজন মানুষ যখন জানে আল্লাহ সর্বশক্তিমান, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, আল্লাহ পরম দয়ালু, আল্লাহ কখনো অন্যায় করেন না, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ভালোবাসেন, আল্লাহর ভাণ্ডারে কোনো কিছুর অভাব নেই, তখন তার অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর উপর নির্ভরতা সৃষ্টি হয়।

উলামায়ে কেরাম বলেছেন “মারিফাত যত বৃদ্ধি পায়, তাওয়াক্কুলও তত বৃদ্ধি পায়।”

এ কারণেই আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ (আসমাউল হুসনা) এবং তাঁর গুণাবলির জ্ঞান অর্জন তাওয়াক্কুল বৃদ্ধির অন্যতম বড় মাধ্যম।

২. কুরআন অধ্যয়ন। কুরআন হলো তাওয়াক্কুলের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ।

কুরআনের প্রতিটি সূরায়, প্রতিটি যুগের নবীদের ঘটনায় এবং অসংখ্য আয়াতে আল্লাহর সাহায্য, কুদরত ও হিকমতের বর্ণনা রয়েছে।

যখন একজন মানুষ নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে এবং তার অর্থ নিয়ে চিন্তা করে, তখন তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

বিশেষভাবে সূরা ইউসুফ, সূরা হূদ, সূরা কাসাস, সূরা আনফাল, সূরা তাওবা, সূরা তালাক তাওয়াক্কুলের শিক্ষা দ্বারা পরিপূর্ণ। তাই প্রতিদিন কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা তাওয়াক্কুল অর্জনের একটি অপরিহার্য মাধ্যম।

৩. দোয়া বৃদ্ধি। দোয়া নিজেই তাওয়াক্কুলের একটি প্রকাশ। কারণ দোয়া করার অর্থ হলো আমি অক্ষম, আর আমার রব সর্বশক্তিমান। আমি মুখাপেক্ষী, আর আমার রব অমুখাপেক্ষী। আমি দরিদ্র, আর আমার রব ধনবান।

যত বেশি মানুষ দোয়া করে, তত বেশি সে নিজের দুর্বলতা এবং আল্লাহর ক্ষমতা উপলব্ধি করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সংকটের সময় বিশেষভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যেতেন এবং দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য চাইতেন। তাই প্রতিদিন আল্লাহর কাছে নিজের সকল প্রয়োজন পেশ করা উচিত।

৪. ইস্তিগফার বৃদ্ধি। গুনাহ মানুষের অন্তরকে দুর্বল করে দেয় এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে ইস্তিগফার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহর রহমত আকর্ষণ করে। কুরআনে নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছেন—

«فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا»

“তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।”

এরপর তিনি বৃষ্টি, সম্পদ এবং সন্তান বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। (সূরা নূহ : ১০-১২)

ইস্তিগফার বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং আশাবাদ বৃদ্ধি করে।

৫. হারাম বর্জন। হারাম উপার্জন, হারাম সম্পর্ক, হারাম লেনদেন এবং গুনাহ মানুষের অন্তরকে অন্ধকার করে দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতার মধ্যে ডুবে থাকে, তার জন্য প্রকৃত তাওয়াক্কুল অর্জন কঠিন হয়ে যায়।

কারণ তাওয়াক্কুলের ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি আস্থা, আর গুনাহ সেই আস্থাকে দুর্বল করে দেয়। বিশেষ করে সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, মিথ্যা, হারাম উপার্জন

এসব তাওয়াক্কুলের পথে বড় বাধা।

অতএব তাওয়াক্কুল অর্জন করতে চাইলে হারাম থেকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে হবে।

৬. নামাজের যত্ন। নামাজ হলো বান্দা ও রবের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক। যে ব্যক্তি দিনে পাঁচবার আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, তাঁর কাছে সাহায্য চায় এবং তাঁর উপর নির্ভরতার ঘোষণা দেয়, তার অন্তরে তাওয়াক্কুল সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।

প্রতিদিন আমরা সূরা ফাতিহায় পড়ি—

«إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ»

“আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং একমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।”

এ আয়াত তাওয়াক্কুলের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। তাই নামাজ যত সুন্দর হবে, তাওয়াক্কুলও তত শক্তিশালী হবে।

৭. নবীদের ঘটনা অধ্যয়ন। নবীগণের জীবন তাওয়াক্কুলের জীবন্ত উদাহরণ। ইবরাহীম (আ.) আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। মূসা (আ.) সমুদ্র ও ফিরআউনের বাহিনীর মাঝে আটকা পড়েছেন।ইউসুফ (আ.) কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, কারাগারে বন্দি হয়েছেন।রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কার নির্যাতন, হিজরত, যুদ্ধ ও অবরোধের মতো অসংখ্য পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন।কিন্তু তারা কেউ আল্লাহর উপর ভরসা হারাননি। যখন আমরা এসব ঘটনা অধ্যয়ন করি, তখন আমাদের অন্তরেও দৃঢ়তা ও তাওয়াক্কুল সৃষ্টি হয়।

৮. আল্লাহর পূর্ববর্তী নিয়ামত স্মরণ। মানুষের একটি দুর্বলতা হলো— সে বর্তমান সংকটকে মনে রাখে, কিন্তু অতীতের অনুগ্রহ ভুলে যায়।

অথচ চিন্তা করে দেখুন কত বিপদ থেকে আল্লাহ আমাদের উদ্ধার করেছেন! কত সংকট দূর করেছেন!কত দোয়া কবুল করেছেন! কতবার অসম্ভব মনে হওয়া সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন!

যখন মানুষ এসব নিয়ামত স্মরণ করে, তখন তার অন্তরে এই বিশ্বাস জন্মায় যিনি অতীতে সাহায্য করেছেন, তিনি ভবিষ্যতেও সাহায্য করবেন। এভাবেই তাওয়াক্কুল শক্তিশালী হয়।

তাওয়াক্কুল হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। আল্লাহকে চেনার মাধ্যমে, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে, দোয়া ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে, হারাম বর্জনের মাধ্যমে, নামাজের যত্নের মাধ্যমে, নবীদের জীবন অধ্যয়নের মাধ্যমে, এবং আল্লাহর পূর্ববর্তী অনুগ্রহ স্মরণের মাধ্যমে।

যে ব্যক্তি এই পথগুলো অবলম্বন করবে, তার অন্তরে ধীরে ধীরে এমন এক শক্তিশালী তাওয়াক্কুল জন্ম নেবে, যা তাকে দুনিয়ার ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও অবিচল রাখবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন তাওয়াক্কুল দান করুন, যা আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী করবে, অন্তরকে প্রশান্ত করবে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার মাধ্যম হবে। আমীন।

Scroll to Top