একজন মুসলমান যখন হালাল রিযিকের সন্ধানে ঘর থেকে বের হয়, তখন সে কেবল টাকা উপার্জনের জন্য বের হয় না; সে আল্লাহর একটি ফরয দায়িত্ব আদায় করার জন্য বের হয়।
অনেক মানুষ মনে করে মসজিদে যাওয়া ইবাদত, মাদরাসায় পড়ানো ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত ইবাদত। অবশ্যই এগুলো ইবাদত। কিন্তু একজন বাবা যখন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সন্তানদের মুখে হালাল খাবার তুলে দেওয়ার জন্য কাজে যায়, একজন যুবক যখন নিজের সম্মান বাঁচাতে এবং মানুষের কাছে হাত না পেতে শ্রমের পথে হাঁটে, একজন ব্যবসায়ী যখন সততার সাথে লেনদেন করে—সেও ইবাদতের ময়দানে আছে।
কারণ ইসলাম অলস মানুষের ধর্ম নয়; ইসলাম কর্মবীর মানুষের ধর্ম। আল্লাহ তাআলা বলেন
﴿وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا﴾
পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই।
পৃথিবীতে কত কোটি প্রাণী আছে! সমুদ্রের গভীরে মাছ, মরুভূমির বুকে পিপীলিকা, পাহাড়ের গুহায় পাখি, মাটির নিচে কীট—সবাইকে আল্লাহ রিযিক দিচ্ছেন।
যে আল্লাহ সমুদ্রের অন্ধকারে মাছের খাবারের ব্যবস্থা করেন, মাটির নিচে পিঁপড়ার খাদ্যের ব্যবস্থা করেন, আকাশে উড়ন্ত পাখির রিযিকের ব্যবস্থা করেন, তিনি কি তোমাকে ভুলে যাবেন?
কিন্তু একটি কথা মনে রাখতে হবে রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন, অলসতার দায়িত্ব নেননি। আল্লাহ রিযিক দেওয়ার ওয়াদা করেছেন, বিছানায় শুয়ে থাকার ওয়াদা করেননি। এজন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ، تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا»
“তোমরা যদি আল্লাহর উপর যথাযথ ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে এমনভাবে রিযিক দিতেন, যেমন পাখিদের রিযিক দেন; তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।”
রাসূল ﷺ বলেননি, পাখি বাসায় বসে থাকে আর খাদ্য এসে মুখে পড়ে। তিনি বলেছেন—পাখি সকালে বের হয়। বাসা ছাড়ে। ডানা ঝাপটায়। আকাশ চষে বেড়ায়।
পরিশ্রম করে। তারপর আল্লাহ তাকে রিযিক দেন।
আজ আমাদের অনেক যুবক তাওয়াক্কুলের ভুল অর্থ বুঝেছে। সে কাজ করবে না। দক্ষতা অর্জন করবে না।ব্যবসা করবে না।কোনো উদ্যোগ নেবে না। তারপর বলবে—“আল্লাহ রিযিক দিলে দিবেন। এটা তাওয়াক্কুল নয়।
এক বেদুইন রাসূল ﷺ এর কাছে এসে বলল আমি কি উটকে ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করব?রাসূল ﷺ বললেন—
«اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ»
আগে উট বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করো। অর্থাৎ আগে চেষ্টা, তারপর তাওয়াক্কুল। আগে শ্রম, তারপর আল্লাহর সাহায্য। আগে মেহনত, তারপর বরকত।
তুমি যদি পৃথিবী পরিবর্তন করতে চাও, তাহলে বিছানা ছাড়তে হবে। তুমি যদি পরিবারের বোঝা না হয়ে সম্পদ হতে চাও, তাহলে ঘাম ঝরাতে হবে। তুমি যদি উম্মাহর জন্য কিছু করতে চাও, তাহলে কাজ শিখতে হবে। দক্ষতা অর্জন করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
সাহাবায়ে কেরাম কেমন ছিলেন। মদিনায় হিজরতের পর অনেক সাহাবীর কাছে কিছুই ছিল না।ঘর নেই। সম্পদ নেই। ব্যবসা নেই। জমি নেই।কিন্তু তারা হতাশ হননি। তারা বসে থাকেননি। তারা বলেননি পরিস্থিতি ভালো হলে কাজ করব।
তারা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-কে যখন সাহায্য দেওয়ার প্রস্তাব করা হলো, তিনি বললেন আমাকে শুধু বাজারের পথ দেখিয়ে দিন। এই একটি বাক্য ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। তিনি ভিক্ষা চাননি। দয়া চাননি। বিশেষ সুবিধা চাননি।তিনি সুযোগ চেয়েছিলেন। পথ চেয়েছিলেন। কাজ চেয়েছিলেন।
তারপর তিনি এমন সম্পদের মালিক হলেন, যার কাফেলা মদিনা কাঁপিয়ে দিত। কিন্তু মনে রাখবেন, সম্পদ তাকে বড় করেনি; তার পরিশ্রম তাকে বড় করেছিল।
আজ মুসলিম যুবকদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন টাকা নয়, কর্মস্পৃহা। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পুঁজি নয়, মানসিকতা। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সুযোগ নয়, উঠে দাঁড়ানোর সাহস।
মনে রাখতে হবে আল্লাহ আকাশ থেকে স্বর্ণমুদ্রা বর্ষণ করেন না। তিনি বরকত দেন পরিশ্রমে। তিনি সম্মান দেন মেহনতকে। তিনি ভালোবাসেন সেই বান্দাকে, যে নিজের হাতের উপার্জনে বাঁচে।
রাসূল ﷺ এক শ্রমিকের কঠিন, রুক্ষ, ঘামে ভেজা হাত দেখে আবেগে বলেছিলেন এ সেই হাত, যাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। কত মানুষ নরম হাত নিয়ে জাহান্নামে যাবে, আর কত শ্রমিকের রুক্ষ হাত জান্নাতের পথে এগিয়ে যাবে!
আজ সিদ্ধান্ত নাও আমি অপেক্ষা করব না, উদ্যোগ নেব। আমি অভিযোগ করব না, কাজ করব। আমি অন্যের মুখাপেক্ষী হব না, নিজের পায়ে দাঁড়াব। আমি হালাল উপার্জনের জন্য সংগ্রাম করব। আমি আমার পরিবারকে হালাল খাবার খাওয়াব। আমি উম্মাহর বোঝা হব না; আমি উম্মাহর শক্তি হব।
যে যুবক আল্লাহর উপর ভরসা করে, পরিশ্রমকে সঙ্গী করে এবং হালাল উপার্জনের পথে অটল থাকে—আল্লাহ তার জন্য এমন দরজা খুলে দেন, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি।
﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾
যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।
হালাল উপার্জন একটি ইবাদত
আমরা অনেক সময় ইবাদতের অর্থকে খুব সংকীর্ণ করে ফেলি। আমরা মনে করি ইবাদত মানে শুধু নামাজ, রোযা, তাসবীহ, তিলাওয়াত, যিকির কিংবা মসজিদে অবস্থান করা। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদতের পরিধি অনেক বিস্তৃত।
ইবাদত শুধু মসজিদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; ইবাদত বাজারেও আছে, মাঠেও আছে, কারখানাতেও আছে, দোকানেও আছে, অফিসেও আছে। একজন মানুষ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বৈধ পথে জীবন পরিচালনা করে, তখন তার জীবনটাই ইবাদতে পরিণত হয়। এই কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
«كسب الحلال فريضة بعد الفريضة»@
ফরয ইবাদত আদায়ের পর হালাল উপার্জনের চেষ্টা করাও ফরয।
এই হাদীসটি হালাল উপার্জনকে শুধু বৈধ বলেনি, বরং ফরযের মর্যাদা দিয়েছে। কেন?
কারণ আল্লাহ চান তাঁর বান্দা কারও বোঝা হয়ে না বাঁচুক। তিনি চান তাঁর বান্দা সম্মানের সাথে জীবনযাপন করুক, নিজের পরিবারকে হালাল খাদ্য দিক, মানুষের কাছে হাত না পাতুক এবং সমাজের উপকারী সদস্যে পরিণত হোক।
আজ একজন পিতা ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে গেলেন। রোদে পুড়ছেন, ঘাম ঝরাচ্ছেন, ক্লান্ত হচ্ছেন। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সন্তানের হাতে এক টুকরো রুটি তুলে দিলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে তিনি শুধু উপার্জন করেছেন। কিন্তু আল্লাহর দরবারে তিনি শুধু টাকা উপার্জন করেননি, একটি ইবাদত সম্পন্ন করেছেন।
একজন মা বিধবা হয়ে সন্তানদের মানুষ করার জন্য সেলাই করছেন। একজন কৃষক কাদামাটির মধ্যে দাঁড়িয়ে ফসল ফলাচ্ছেন। একজন শ্রমিক মাথায় ইট বহন করছেন। একজন রিকশাচালক প্রচণ্ড গরমে মানুষের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন। একজন শিক্ষক নিষ্ঠার সাথে পাঠদান করছেন। একজন ব্যবসায়ী সততার সাথে লেনদেন করছেন।
যদি তাদের অন্তরে থাকে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নিজের ও পরিবারের হালাল জীবিকার জন্য কাজ করছি তাহলে তাদের প্রতিটি ঘামবিন্দু আল্লাহর কাছে ইবাদত হিসেবে লেখা হচ্ছে।
এই হলো ইসলামের সৌন্দর্য। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষ ঘুমালেও সওয়াব পেতে পারে, খেয়েও সওয়াব পেতে পারে, উপার্জন করেও সওয়াব পেতে পারে—যদি তার নিয়ত সঠিক হয়। রাসূল ﷺ বলেছেন—
«إنما الأعمال بالنيات»
সমস্ত আমলের ভিত্তি হলো নিয়ত। একই কাজ দুজন মানুষ করছে। একজন শুধু টাকা উপার্জনের জন্য করছে, আরেকজন আল্লাহর সন্তুষ্টি, পরিবারের হক আদায় এবং মানুষের কাছে মুখাপেক্ষী না হওয়ার জন্য করছে। বাহ্যিকভাবে কাজ এক হলেও আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা এক নয়।
সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তারা ব্যবসা করতেন, কৃষিকাজ করতেন, যুদ্ধ করতেন, বাজার পরিচালনা করতেন; কিন্তু কখনো মনে করতেন না যে তারা দ্বীন থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন। বরং তারা জানতেন—হালাল উপার্জনও দ্বীনেরই একটি অংশ।
একদিন সাহাবায়ে কেরাম একজন শক্তিশালী যুবককে অত্যন্ত পরিশ্রম করতে দেখে বললেন, হায়! যদি সে এই শক্তি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করত!
রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন বললেন, যদি সে নিজের ছোট সন্তানদের জন্য উপার্জন করতে বের হয়ে থাকে, তবে সে আল্লাহর রাস্তায় আছে। যদি সে বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য উপার্জন করতে বের হয়ে থাকে, তবে সে আল্লাহর রাস্তায় আছে। যদি সে নিজের সম্মান রক্ষা এবং মানুষের কাছে হাত না পাতার জন্য বের হয়ে থাকে, তবে সেও আল্লাহর রাস্তায় আছে।
আমরা সাধারণত আল্লাহর রাস্তা বলতে শুধু মসজিদ, মাদরাসা বা জিহাদের ময়দান বুঝি। অথচ রাসূল ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন—হালাল উপার্জনের সংগ্রামও আল্লাহর রাস্তার অন্তর্ভুক্ত।
এ কারণেই মুসলিম যুবকদের একটি ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। অনেকেই মনে করে দ্বীনদার হলে দুনিয়াবিমুখ হতে হবে। ব্যবসা করলে দ্বীন কমে যাবে। অর্থ উপার্জন করলে আখিরাত নষ্ট হবে। এ ধারণা ইসলামের নয়।
দেখুন, নবীগণ ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে দ্বীনদার মানুষ, কিন্তু তারা কর্মহীন ছিলেন না। দাউদ (আ.) নিজ হাতে বর্ম বানাতেন। যাকারিয়া (আ.) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। মূসা (আ.) রাখালের কাজ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে ব্যবসা করেছেন, পশু চরিয়েছেন, যুদ্ধের সময় মাটি কেটেছেন, পাথর বহন করেছেন।
অতএব ইসলাম এমন মানুষ চায় না, যে শুধু কথা বলবে; ইসলাম এমন মানুষ চায়, যে কাজ করবে।
শুধু উপদেশ দেবে না উৎপাদনও করবে। শুধু গ্রহণ করবে না; দানও করবে। শুধু নিজের জন্য বাঁচবে না উম্মাহর জন্যও বাঁচবে। আজ আমাদের উম্মাহর বড় সংকট অর্থের অভাব নয়; কর্মস্পৃহা ও দায়িত্ববোধের অভাব।
যে যুবক বুঝে যাবে যে হালাল উপার্জন শুধু চাকরি নয়, শুধু ব্যবসা নয়, শুধু অর্থ উপার্জন নয়—বরং এটি একটি ইবাদত, একটি দায়িত্ব, একটি আমানত—সেদিন তার জীবন বদলে যাবে।
সে আর অলস থাকবে না। সে আর সময় নষ্ট করবে না। সে আর অন্যের মুখাপেক্ষী হবে না। সে কাজে নামবে, পরিশ্রম করবে, ঘাম ঝরাবে, নিজের পরিবারকে হালাল আহার দেবে, সমাজের উপকার করবে এবং একদিন উম্মাহর শক্তিতে পরিণত হবে।
এমন যুবকরাই ইসলামের ভবিষ্যৎ। এমন শ্রমই ইবাদত। এমন উপার্জনই বরকতের উপার্জন।
নবীদের জীবন ছিল কর্মময় জীবন
আজ অনেক তরুণ কাজকে ছোট মনে করে। কিন্তু নবীদের দিকে তাকান। আদম (আ.) কৃষিকাজ করেছেন। নূহ (আ.) জাহাজ নির্মাণ করেছেন। দাউদ (আ.) নিজ হাতে বর্ম তৈরি করেছেন। মূসা (আ.) রাখালের কাজ করেছেন। যাকারিয়া (আ.) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। আর আমাদের প্রিয় নবী ﷺ? ছাগল চরিয়েছেন। ব্যবসা করেছেন। খন্দক খনন করেছেন। নিজ হাতে কাজ করেছেন।
যখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ নিজ হাতে কাজ করতে লজ্জা পাননি, তখন আমরা কেন লজ্জা পাব?
শ্রমের মর্যাদা: ঘামে লেখা সম্মানের ইতিহাস
আজকের সমাজের একটি বড় রোগ হলো—মানুষ কাজের মর্যাদা ভুলে গেছে। আমরা কাজকে মূল্যায়ন করি না, আমরা পোশাককে মূল্যায়ন করি; আমরা পরিশ্রমকে দেখি না, আমরা আয়ের পরিমাণকে দেখি; আমরা ঘামকে সম্মান করি না, আমরা পদবীকে সম্মান করি।
ফলে এমন একটি সমাজ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক যুবক বেকার থাকতে রাজি, কিন্তু ছোট কোনো কাজ করতে রাজি নয়। অনেকেই বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় বসে থাকে, কিন্তু নিজের হাতে কোনো কাজ শুরু করতে চায় না। অথচ ইসলামের শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইসলাম মানুষের কাজের ধরন দেখে সম্মান দেয় না; ইসলাম মানুষের সততা, পরিশ্রম ও তাকওয়া দেখে সম্মান দেয়। একজন রিকশাচালক যদি হালাল উপার্জন করে, সে সম্মানিত। একজন দিনমজুর যদি নিজের ঘামের বিনিময়ে উপার্জন করে, সে সম্মানিত।
একজন কৃষক যদি মাটির বুকে ফসল ফলায়, সে সম্মানিত। একজন কাঠমিস্ত্রি, একজন মেকানিক, একজন ইলেকট্রিশিয়ান, একজন রাজমিস্ত্রি—যে-ই হোক, যদি সে হালাল উপার্জনের জন্য সংগ্রাম করে, তাহলে সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত।
কারণ ইসলামে সম্মানের মাপকাঠি পদবী নয়, তাকওয়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন
﴿إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।”
একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে এক শ্রমিকের হাত আনা হলো। কঠিন পরিশ্রমের কারণে হাত ছিল রুক্ষ, শক্ত ও ফেটে যাওয়া। রাসূল ﷺ সেই হাত দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি সেই হাতকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখলেন এবং বললেন এ সেই হাত, যাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।
ভাবুন, যে হাতকে সমাজ অবহেলা করে, যে হাতকে মানুষ শ্রমিকের হাত বলে ছোট করে দেখে, সেই হাতের ব্যাপারে রাসূল ﷺ জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন!
কারণ এই হাত চুরি করেনি।এই হাত মানুষের কাছে ভিক্ষা চায়নি। এই হাত প্রতারণা করেনি। এই হাত ঘাম ঝরিয়ে হালাল উপার্জন করেছে।
আজ যুবকদের বুঝতে হবে হাতের কড়া লজ্জার বিষয় নয়। শ্রমের দাগ অপমানের বিষয় নয়। ঘামের গন্ধ দুর্বলতার পরিচয় নয়। এগুলো সম্মানের পদক। এগুলো সংগ্রামের সাক্ষ্য।
হালাল উপার্জন ও পরিবারের সুখ
*****************************
একজন বাবা যখন ভোরে ঘুম থেকে উঠে জীবিকার সন্ধানে বের হয়, তখন সে শুধু টাকা উপার্জন করতে বের হয় না। সে তার সন্তানের হাসির জন্য বের হয়।
সে তার স্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য বের হয়।সে তার পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য বের হয়। সারাদিনের ক্লান্তি, রোদের তাপ, জীবনের সংগ্রাম শেষে যখন সে ঘরে ফিরে আসে এবং নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে সন্তানকে এক টুকরো রুটি কিনে দেয়, তখন সে শুধু খাদ্য দেয় না।
সেই লোকমার মধ্যে শুধু খাদ্য থাকে না; সেখানে একজন বাবার ঘাম থাকে, তার মমতা থাকে, তার দোয়া থাকে, তার ত্যাগ থাকে। এ কারণেই হালাল রিযিকের প্রভাব শুধু শরীরে পড়ে না, হৃদয়েও পড়ে।
যে ঘরে হালাল রিযিক প্রবেশ করে, সেই ঘরে প্রশান্তি নেমে আসে। সেই ঘরে সন্তুষ্টি জন্মায়। সেই ঘরে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
মনে রাখবেন অঢেল সম্পদ পরিবারকে সুখী করে না।
বরকতময় সম্পদ পরিবারকে সুখী করে। আর বরকত আসে হালাল উপার্জনের মাধ্যমে। তাই প্রতিটি পিতা, প্রতিটি যুবক, প্রতিটি কর্মজীবী মানুষের গর্বের সাথে বলা উচিত আমি হালাল উপার্জন করি। আমি আমার পরিবারকে হালাল খাদ্য খাওয়াই। আমি আমার সন্তানের ভবিষ্যৎকে হালাল ভিত্তির উপর নির্মাণ করছি।
তুমি কতদিন অপেক্ষা করবে? তোমার বয়স চলে যাচ্ছে।সময় চলে যাচ্ছে। স্বপ্নগুলো বুড়িয়ে যাচ্ছে।
উঠে দাঁড়াও। কিছু একটা শুরু করো। ছোট থেকে শুরু করো।দোকান। অনলাইন ব্যবসা। কৃষি। ফ্রিল্যান্সিং। কারিগরি। শিক্ষাদান।যে পথই হোক, হালাল পথে শুরু করো।আজ ছোট, আগামীকাল বড় হবে।
উম্মাহর পুনর্জাগরণে অর্থনৈতিক শক্তির গুরুত্ব
*****************************************
মুসলমানদের স্বর্ণযুগ শুধু ইবাদতের কারণে আসেনি।
এসেছিল ব্যবসার কারণে, শিল্পের কারণে, উৎপাদনের কারণে, অর্থনৈতিক শক্তির কারণে। আজ আমরা যদি আবার শক্তিশালী হতে চাই, তাহলে মসজিদও লাগবে, বাজারও লাগবে। সিজদাও লাগবে, কারখানাও লাগবে। কুরআনের মক্তবও লাগবে, ব্যবসায়িক দক্ষতাও লাগবে।
তোমার হাতে শক্তি আছে। তোমার মাথায় মেধা আছে। তোমার সামনে সময় আছে। নিজেকে অবহেলা করো না। তুমি উম্মাহর সম্পদ। আজ সিদ্ধান্ত নাও আমি কারও বোঝা হব না। আমি হালাল উপার্জন করব। আমি আমার পরিবারকে হালাল খাদ্য খাওয়াব।
আমি সমাজের উপকারে আসব। আমি দাতা হব।
আমি কর্মী হব। আমি উৎপাদক হব। আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করব। হয়তো তোমার ঘাম মানুষ দেখবে না, কিন্তু আল্লাহ দেখছেন। হয়তো আজ তোমার সংগ্রামকে কেউ মূল্য দিচ্ছে না, কিন্তু আল্লাহ তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ লিখে রাখছেন।
তাই উঠে দাঁড়াও। কর্মে নেমে পড়ো। হালাল উপার্জনের পথে এগিয়ে যাও। কারণ যে হাত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরিশ্রম করে, সেই হাতই একদিন উম্মাহর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।