আমরা যখন “ইমাম” শব্দটি শুনি, তখন আমাদের চোখের সামনে কাকে দেখি? একজন মানুষকে দেখি যিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ান, জানাজা পড়ান, খুতবা দেন, দোয়া করেন।
কিন্তু রাসূল ﷺ-এর যুগে ইমামের পরিচয় এতটুকুই ছিল না। রাসূল ﷺ ছিলেন ইমাম। কিন্তু তিনি শুধু মুসাল্লিদের সামনে দাঁড়িয়ে তাকবীর বলতেন না। তিনি একটি জাতিকে গড়েছিলেন, একটি সভ্যতা নির্মাণ করেছিলেন, একটি উম্মাহকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
মদীনায় হিজরতের পর তিনি সর্বপ্রথম যে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করলেন, সেটি ছিল মসজিদ। আর সেই মসজিদ ছিল শুধু নামাজের স্থান নয়; শিক্ষা, বিচার, সামাজিক কল্যাণ, পরামর্শ এবং নেতৃত্বের কেন্দ্র। মসজিদে নববী ছিল মুসলিম সমাজের হৃদয়।
মসজিদ নির্মাণ দিয়েই নবযুগের সূচনা
****************”****************
রাসূল ﷺ মদীনায় পৌঁছে সর্বপ্রথম কোনো প্রাসাদ নির্মাণ করেননি। কোনো দুর্গ নির্মাণ করেননি। কোনো সরকারি ভবন নির্মাণ করেননি। প্রথমে নির্মাণ করেছিলেন মসজিদ।
কারণ তিনি জানতেন যদি মসজিদ ঠিক হয়, সমাজ ঠিক হবে। যদি মসজিদ জেগে ওঠে, উম্মাহ জেগে উঠবে। যদি মসজিদ মরে যায়, মুসলিম সমাজও ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়বে।
আজ আমরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে বহুতল ভবন নির্মাণ করি, কিন্তু কতজন মসজিদকে সমাজ গঠনের কেন্দ্র হিসেবে ভাবি?
ইমাম মানে সামনে দাঁড়ানো মানুষ নয়। আরবি “ইমাম” শব্দের অর্থই হলো যাকে অনুসরণ করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا
আমি তাদেরকে এমন ইমাম বানিয়েছি, যারা আমার নির্দেশে মানুষকে পথ দেখায়। (সূরা আম্বিয়া: ৭৩)
দেখুন! এখানে ইমামের পরিচয় কী? ইমাম পথপ্রদর্শক।
ইমাম নেতা। ইমাম দিশারী। অর্থাৎ ইমাম কেবল নামাজের নেতা নন; জীবন পরিচালনারও নেতা।
রাসূল ﷺ-এর মিম্বর ছিল জাতি গঠনের কারখানা
*****************************************
জুমার খুতবায় রাসূল ﷺ শুধু জান্নাত-জাহান্নামের কথা বলতেন না। তিনি সমাজের সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন। তিনি অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতেন। তিনি পরিবার নিয়ে কথা বলতেন। তিনি যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে কথা বলতেন। তিনি যুবকদের চরিত্র গঠন করতেন।
তিনি ব্যবসায়ীদের সততা শিক্ষা দিতেন। তিনি নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেন।তিনি শাসকদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিতেন।
তাঁর মিম্বর ছিল উম্মাহ গঠনের বিশ্ববিদ্যালয়।
আজ প্রশ্ন হলো আমাদের মসজিদের মিম্বর কি সমাজ পরিবর্তনের মিম্বর? নাকি শুধু আনুষ্ঠানিক কিছু বক্তব্যের স্থান?
সাহাবীদের চোখে ইমাম
********************
রাসূল ﷺ বলেছেন:
يَؤُمُّ الْقَوْمَ أَقْرَؤُهُمْ لِكِتَابِ اللَّهِ
যে কুরআন সবচেয়ে ভালো জানে, সে মানুষের ইমামতি করবে।— সহীহ মুসলিম
কারণ সমাজের সামনে সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষকেই দাঁড়ানো উচিত। আজ আমরা সমাজে কাকে সামনে বসাই? ধনী মানুষকে। প্রভাবশালী মানুষকে। ক্ষমতাবান মানুষকে। কিন্তু সাহাবাদের সমাজে সামনে দাঁড়াতেন আল্লাহভীরু ও জ্ঞানী মানুষ।
একটি আবেগময় দৃশ্য কল্পনা করুন। মসজিদে নববীতে ফজরের নামাজ। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রাসূল ﷺ। পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব হযরত ওসমান ইবনে আফফান হযরত আলী ইবনে আবি তালিব।
এরা সবাই পৃথিবী পরিবর্তনকারী মানুষ। কিন্তু তারা রাসূল ﷺ-এর পেছনে দাঁড়িয়ে শিখছেন। সেখানে নেতৃত্বের উৎস ছিল মসজিদ। ক্ষমতার উৎস ছিল ঈমান। চরিত্রের উৎস ছিল কুরআন।
উমরের (রা.) ঘটনা
একদিন উমর ফারুক খুতবা দিচ্ছেন। তিনি একটি বিষয়ে বক্তব্য দিলেন। এক সাধারণ মহিলা দাঁড়িয়ে কুরআনের আয়াত দ্বারা তাঁর মতের সংশোধন করলেন।্যউমর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে বললেন উমর ভুল করেছে, মহিলা সঠিক বলেছে।”
ভাবুন! মসজিদ ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সত্যের সামনে খলিফাও মাথা নত করতেন। আজ আমরা কি সেই সংস্কৃতি গড়তে পেরেছি?
আবাদ মসজিদ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
********************
আল্লাহ বলেন:
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ
আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করে তারাই, যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে। (সূরা তাওবা: ১৮)
মসজিদ আবাদ করা শুধু ভবন নির্মাণ নয়। মসজিদ আবাদ করা মানে মসজিদকেন্দ্রিক কুরআনের শিক্ষা চালু করা, মসজিদে যুবকদের ফিরিয়ে আনা, মসজিদ মহল্লার পরিবারকে ইসলামের সাথে যুক্ত করা, মসজিদ থেকেই সমাজের সমস্যা সমাধান করা
মসজিদ কমিটির নেতৃত্বে দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ানো।
আজকের সবচেয়ে বড় সংকট আমাদের দেশে মসজিদ আছে। মিনার আছে। মাইক্রোফোন আছে।এয়ার কন্ডিশন আছে। কার্পেট আছে। কিন্তু অনেক জায়গায় মসজিদকেন্দ্রিক সমাজ নেই।
মানুষ আসে, নামাজ পড়ে, চলে যায়। পাশের মুসল্লির নামও জানে না। এ যেন হৃদয় আছে, কিন্তু স্পন্দন নেই। দেহ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই।
যেদিন মসজিদ আবার সমাজের কেন্দ্র হবে,
যেদিন ইমাম আবার শিক্ষক, অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক হবেন, যেদিন মুসল্লিরা ইমামকে কেবল কর্মচারী নয়, দ্বীনের নেতা হিসেবে সম্মান করবে,
সেদিন আমাদের পরিবার বদলাবে। সমাজ বদলাবে।
জাতি বদলাবে।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী মসজিদে নববী থেকেই পৃথিবীর সবচেয়ে মহান প্রজন্ম তৈরি হয়েছিল। রাসূল ﷺ নিজে সেখানে ইমামতি করেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন এবং উম্মাহকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।