সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার: একটি পারিবারিক উমরাহ

আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমরা সন্তানদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? আজ আমি একটি পরিবারের আলোচনা করতে চাই। একজন বাবার আলোচনা। একজন মায়ের আলোচনা। একটি সন্তানের আলোচনা।

আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত মানুষ কে?

সম্ভবত একজন ঈমানদার বাবা। কারণ তিনি জানেন সন্তানকে খাওয়ানো কঠিন নয়, পড়ানো কঠিন নয়, পোশাক দেওয়া কঠিন নয়। এই সময়ে সবচেয়ে কঠিন হলো সন্তানের ঈমান বাঁচিয়ে রাখা।

◾আজ শয়তান আর দরজায় কড়া নাড়ে না। সে পকেটে ঢুকে গেছে। মোবাইলের মধ্যে ঢুকে গেছে। স্ক্রিনের মধ্যে ঢুকে গেছে।

আল্লাহ তাআলা সূরা আরাফে শয়তানের ভাষা উল্লেখ করেছেন আমি তাদের সামনে থেকে, পিছন থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে আসব।

আজ যেন আমরা সেই আয়াতের বাস্তব চিত্র দেখছি।

সামনে ফিতনা। পিছনে ফিতনা। ডানে ফিতনা। বামে ফিতনা। বাবা-মা অসহায়। অবস্থাকে সামনে রেখে বলতে হয় কোন দিকে পথ নেই সব দিকে বদ্ধ দুয়ার কোন দিকে আলো নেই চারিদিকে ফিরেছে আধার। তবুও চলতে হবে, সামনে যেতেই হবে।

◾প্রথম কথা আমরা সন্তানদের কী দিতে চাই?

একটু চিন্তা করুন। আমরা সন্তানদের জন্য কী রেখে যেতে চাই। অনেকের পরিকল্পনা একখণ্ড জমি অথবা ফ্ল্যাট তাছাড়া কিছু ব্যাংক ব্যালেন্স। আমাদের এই চিন্তা কতটা সঠিক।

আজ কত ধনী মানুষের সন্তান ধ্বংস হয়ে গেছে।

আবার কত সাধারণ মানুষের সন্তান ইতিহাস হয়ে গেছে। কারণ সম্পদ মানুষকে বড় করে না। ঈমান আখলাক মানুষকে বড় করে।

নূহ (আ.)-এর ছেলে ছিল। বাবা নবী। কিন্তু ঈমান ছিল না। বাবা যখন তাকে তার নৌকায় ওঠার জন্য আহবান করল। সন্তান বাবাকে উত্তর দিয়েছিল পাহাড় আমাকে রক্ষা করবে। কিন্তু পাহাড় তাকে বাঁচাতে পারেনি। অন্যদিকে ফিরআউনের স্ত্রী। স্বামী পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ। কিন্তু তিনি জান্নাতের পথ বেছে নিলেন।

এখানে শিক্ষা হলো বংশ মানুষকে বাঁচায় না। ঈমান মানুষকে বাঁচায়।

◾দ্বিতীয় কথা সন্তানের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা কোথায়?

আজ বাবা-মা নিরাপত্তা খুঁজছেন। ভালো স্কুল। ভালো কলেজ। ভালো ক্যাম্পাস। ভালো পরিবেশ।

কিন্তু একটি প্রশ্ন আমার সন্তানের ঈমানের নিরাপত্তা কোথায়? পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা আছে যেখানে শয়তান নেই? আমরা কি তা ভাবছি।

পৃথিবীতে এমন কিছু স্থান আছে যেখানে হৃদয় সবচেয়ে বেশি আল্লাহর দিকে ঝুঁকে যায়। মক্কা সেই স্থান। মদিনা সেই স্থান। সেখানে গেলে মানুষ বদলে যায়। কারণ ওখানে গিয়ে মানুষ নিজের প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পায়।

◾ কাবা শুধু একটি ভবন নয়। পপপপপপপপযখন আপনি সন্তানকে নিয়ে কাবার সামনে দাঁড়াবেন তখন তাকে বলবেন, বাবা, এটা কোনো রাজপ্রাসাদ নয়। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত ঘর। এ ঘরের দিকে মুখ করে পৃথিবীর দুইশো কোটির বেশি মুসলমান প্রতিদিন দাঁড়ায়।

আদম (আ.) থেকে শুরু করে অসংখ্য নবীর স্মৃতি এই ভূমির সাথে জড়িত। ইবরাহিম (আ.)-এর চোখের পানি আছে এখানে। ইসমাঈল (আ.)-এর ত্যাগ আছে এখানে। হাজেরা (আ.)-এর দৌড় আছে এখানে।

এখানে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর পদচিহ্ন আছে। এখানেই তার জন্ম হয়েছে, এখানেই তার শিশু বেলা কেটেছে তার যৌবন কেটেছে। এখানে তার জীবনের ৫৩ বছর কেটেছে। এখানে তার রক্ত ঝরেছে ।এখানে তার অশ্রু ঝরেছে। এখানে ইসলামের জন্য তাকে কঠিন প্রতিরোধ এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে । একজন শিশু যখন এসব অনুভব করবে তার হৃদয়ে ইসলাম বইয়ের বিষয় থাকবে না। জীবনের বিষয় হয়ে যাবে।

◾কাবার সামনে পরিবারের কান্না

একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। কাবা শরীফ সামনে। হাজার হাজার মানুষ তাওয়াফ করছে। আপনার পাশে আপনার সন্তান। আপনার স্ত্রী। আপনার পরিবার। আপনি হাত তুললেন।

কাঁদতে কাঁদতে বললেন “হে আল্লাহ! আজ তোমার দেয়া সন্তানদের নিয়ে তোমার ঘরে নিয়ে এসেছি। আমার পূর্ণ পরিবার আমার সাথে তোমার ঘরের সামনে। তুমি আমাদের সকলকে হেফাজত করো।

তুমি আমাদের ঈমানের হেফাজত করো।

একটিবার মনে করুন পবিত্র ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজ পরিবারকে নিয়ে এ দোয়া আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন এবং সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ নেয়ামত।

◾আমরা আনন্দের জন্য সন্তানদের কোথায় নিয়ে যাই? ছুটিতে আমরা সন্তানদের নিয়ে সমুদ্র সৈকতে আহারে পর্বতে বিভিন্ন পার্কে বিভিন্ন মেলায় বিনোদনের জন্য নিয়ে যাই। হাজার হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু এসব সফরের শেষে সন্তান কী নিয়ে ফিরে আসে? কিছু ছবি। কিছু ভিডিও। কিছু স্মৃতি।

কিন্তু উমরাহর সফরের শেষে? সে নিয়ে আসে কাবার স্মৃতি। পবিত্র মক্কা-মদিনার আজানের স্মৃতি। পবিত্র ঘরে লক্ষ লক্ষ মানুষের মাঝে নামাজ আদায়ের স্মৃতি।

আল্লাহর ঘরের গিলাফ ধরে দোয়ার স্মৃতি। রাসূল ﷺ-এর শহরের স্মৃতি। পবিত্র রওজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রিয় রাসুলকে সালাম জানানোর স্মৃতি। এই স্মৃতিগুলো আপনার পরিবার এবং সন্তানদের জন্য অনেক কিছু।

◾ মদিনা—ভালোবাসার শহর

মক্কা ঈমান শেখায়। মদিনা ভালোবাসা শেখায়।

মদিনায় গিয়ে সন্তানকে বলুন এখানে রাসূল ﷺ হেঁটেছেন। এখানে তিনি কেঁদেছেন। এখানে তিনি সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন। এখানে তিনি উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন। এখানেই তাঁর রওজা মুবারক।

যখন সন্তান রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসতে শিখবে তখন সে নিজেই গুনাহ থেকে দূরে থাকতে চাইবে।‌কারণ ভালোবাসা এমন শক্তি, যা হাজার আদেশের চেয়েও বেশি কাজ করে।

◾একটি উমরাহ কিভাবে জীবন বদলে দেয়?

অনেক মানুষ বলে একবার মক্কা-মদিনা গিয়ে আমি আর আগের মানুষ ছিলাম না।

কারণ সেখানে গিয়ে মানুষ বুঝে আমি পৃথিবীতে চিরদিনের জন্য আসিনি। আমি একজন মুসাফির। আমার আসল ঠিকানা জান্নাত। এই উপলব্ধি জীবন বদলে দেয়।

◾সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার

রাসূল ﷺ বলেছেন, “মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে নেক সন্তান ব্যতিক্রম; সে তার জন্য দোয়া করতে থাকে।”

আপনি সন্তানকে কোটি টাকা দিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু যদি সে আপনার জন্য দোয়া না করে? আর যদি আপনি তাকে ঈমান দিয়ে যান? তাহলে আপনার কবরেও তার দোয়ার আলো পৌঁছাবে।

◾প্রিয় বাবা-মা, আপনি সন্তানকে মোবাইল কিনে দিয়েছেন। ভালো পোশাক দিয়েছেন। ভালো শিক্ষা দিয়েছেন। এবার তাকে কাবাও দেখান। আপনি তাকে পৃথিবীর অনেক শহর দেখিয়েছেন। সমুদ্র সৈকত দেখিয়েছেন, দৃষ্টিনন্দন পাহাড় দেখিয়েছেন। একবার তাকে মক্কা দেখান। আপনি তাকে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। একবার তাকে রাসূল ﷺ-এর শহরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। হয়তো এই সফরের পর আপনার সন্তান আগের মতো থাকবে না।

হয়তো এক রাতে কাবার সামনে আপনার করা একটি দোয়া তার পুরো জীবন বদলে দেবে।

হয়তো আপনার পরিবারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হবে সেই উমরাহ। জীবনটা বদলে গেলে তার ঠিকানা জান্নাত।

◾আজ থেকেই নিয়ত করুন হে আল্লাহ! আমি আমার পরিবারকে নিয়ে তোমার ঘরের মেহমান হতে চাই। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি হলো একজন বাবা, একজন মা, আর তাদের সন্তান কাবার সামনে দাঁড়িয়ে একসাথে আল্লাহর কাছে কান্না করছে। এ দৃশ্য শুধু একটি সফর নয়, এটি একটি পরিবারের নতুন যুগের সূচনা।

Scroll to Top