মুহাররমের দশ তারিখ—আশুরা।‌

মুহাররমের দশ তারিখ—আশুরা।‌ বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে কিছু দিন আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। যেমন জুমার দিন, আরাফার দিন, লাইলাতুল কদর। তেমনি একটি বিশেষ দিন হলো ইয়াওমে আশুরা।

◾এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন নয়। এটি কৃতজ্ঞতার দিন। এটি নবীদের স্মৃতিবিজড়িত দিন। এটি আল্লাহর সাহায্যের উপর ভরসার দিন। এটি গুনাহ মাফের সুসংবাদের দিন।

◾ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে আশুরার গুরুত্ব

অনেকে মনে করেন আশুরার গুরুত্ব শুধু মদীনায় গিয়ে শুরু হয়েছে। বাস্তবে তা নয়। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন “জাহিলী যুগে কুরাইশরা আশুরার দিন রোজা রাখত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও সে রোজা রাখতেন।”

(সহীহ বুখারী)

অর্থাৎ মক্কার মুশরিকরাও এ দিনটিকে বিশেষ মর্যাদার দিন মনে করত। উলামায়ে কেরাম বলেন, ইবরাহীম (আ.)-এর যুগ থেকে কিছু স্মৃতি আরবদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিল। সময়ের সাথে অনেক কিছু বিকৃত হলেও আশুরার সম্মান কিছুটা রয়ে গিয়েছিল।

চিন্তা করুন!মূর্তি পূজায় ডুবে থাকা একটি সমাজও একটি দিনকে সম্মান করত।

◾মক্কী জীবনে রাসূল ﷺ ও আশুরা

রাসূলুল্লাহ ﷺ নবুওয়তের পূর্বেও আশুরার রোজা রাখতেন। নবুওয়তের পরও রাখতেন।

এটি প্রমাণ করে আশুরার মর্যাদা রমযানের রোজা ফরজ হওয়ার আগ থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল।

এ দিনটি আল্লাহর নিকট প্রিয় একটি দিন ছিল।

◾মদীনায় এসে আশুরার নতুন ইতিহাস

হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় পৌঁছালেন।

তিনি দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখছে।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন “তোমরা কেন রোজা রাখো?”

তারা বলল এ দিন আল্লাহ মূসা (আ.) ও বনী ইসরাঈলকে ফিরআউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন বললেন মূসার সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার। অতঃপর তিনি রোজা রাখলেন এবং সাহাবাদেরও রোজা রাখতে বললেন। (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

◾আশুরার দিন ফেরাউনের মোকাবেলায় হযরত মূসা আলাইহিস সালামের এবং বনি ইসরাইলের বিজয়ের দিন। এটা ছিল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাহায্যে এক ঐতিহাসিক বিজয়। সমুদ্র সামনে। ফিরআউনের বাহিনী পেছনে। বেঁচে থাকার কোনো পথ নেই। মানুষ বলছে”আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম! মূসা (আ.) বললেন “কখনো নয়! নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন। তিনি পথ দেখাবেন। তারপর সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত হলো। ফিরআউন ডুবে গেল। সত্য বিজয়ী হলো।

এই কারণেই আশুরা শুধু রোজার দিন নয়; এটি ঈমানের শক্তির দিন। এটি আল্লাহর উপর ভরসার দিন।

◾আশুরার রোযার ফজিলত

১. এক বছরের গুনাহ মাফ

হযরত আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন আমি আশা করি আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।‌(সহীহ মুসলিম)

একটি রোজা। মাত্র একটি দিন। আর বিনিময়ে এক বছরের গুনাহ মাফের সুসংবাদ! আমরা কত কিছু পাওয়ার জন্য কষ্ট করি। কিন্তু আল্লাহ কত সহজে মাগফিরাতের দরজা খুলে দেন!

২. রাসূল ﷺ-এর বিশেষ আগ্রহ

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আশুরার দিনের রোজার মতো অন্য কোনো নফল রোজার ব্যাপারে এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি। (সহীহ বুখারী) এ হাদিসই আশুরার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।

◾কেন শুধু ১০ তারিখ নয়?

রাসূলুল্লাহ ﷺ জীবনের শেষ দিকে বলেছিলেন “আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তবে নবম তারিখেও রোজা রাখব।”(সহীহ মুসলিম)

এ রোজার কারণ ‌যাতে মুসলমানদের আমল ইহুদিদের আমল থেকে পৃথক হয়। এ কারণেই উলামায়ে কেরাম বলেছেন উত্তম পদ্ধতি ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা‌১০ ও ১১ মুহাররম।

◾আশুরার করণীয় আমল

১. রোজা রাখা

এ দিনের সবচেয়ে বড় সুন্নত।

২. তওবা করা

একটি নতুন হিজরি বছরের শুরু।নিজেকে প্রশ্ন করুন

৩. ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা

“আস্তাগফিরুল্লাহ” শুধু মুখের শব্দ নয়।

এটি আল্লাহর কাছে ফিরে আসার ঘোষণা।

৪. কুরআন তিলাওয়াত

কারণ কুরআনই মানুষকে ফিরআউনের পথ থেকে মূসার পথে নিয়ে যায়।

৫. দান-সদকা

মুহাররম সম্মানিত মাস।

এ মাসে নেক আমলের মূল্যও অনেক বেশি।

◾আশুরায় বর্জনীয়

১. জাল বর্ণনার উপর আমল

অনেকেই বলে আশুরার বিশেষ নামাজ নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত, বিশেষ খাবারের নির্দিষ্ট সওয়াব0বিশেষ গোসলের নির্দিষ্ট ফজিলত। এসবের অধিকাংশেরই নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।

২. দিনটিকে উৎসব বানানো

আবার কেউ এটিকে শুধুই আনন্দের দিন বানায়।

কেউ আবার এমন শোকের দিন বানায়, যা শরীয়ত অনুমোদন করে না। ইসলাম চায় ভারসাম্য। রোজা রাখো। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো।ইবাদত করো।

কত আশুরা আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে। কত ১০ মুহাররম এসেছে, আমরা খেয়ালও করিনি। কিন্তু কে জানে‌ হয়তো এটাই আমাদের জীবনের শেষ আশুরা। হয়তো আগামী মুহাররম আমরা আর দেখব না।

তাই আসুন মূসা (আ.)-এর ঈমান শিখি। আল্লাহর উপর ভরসা শিখি। আশুরার রোজা রাখি। পরিবারকে রোজা রাখার উৎসাহ দিই। সন্তানদের আশুরার ইতিহাস শেখাই। এবং আল্লাহর কাছে কাঁদতে কাঁদতে বলি “হে আল্লাহ! যেভাবে আপনি আশুরার দিনে মূসা (আ.)-কে নাজাত দিয়েছিলেন, তেমনি আমাদেরকে গুনাহ, গাফেলত, ফিতনা ও জাহান্নাম থেকে নাজাত দান করুন।” আমীন।

Scroll to Top