আখিরাতে মোবাইলের হিসাব কঠিন হবে

আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ইসরায় ঘোষণা করেছেন—

﴿إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾

“নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং হৃদয়—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা আল-ইসরা: ৩৬)

🔳আখিরাতে মোবাইলের হিসাব কিভাবে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর এই আয়াতের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন না—তোমার ফোনটি কোন কোম্পানির ছিল? কত জিবি র‍্যাম ছিল? কত মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা ছিল? কত দামে কিনেছিলে?

বরং প্রশ্ন হবে তোমার চোখ কোথায় ব্যবহার করেছিলে। তোমার কান কী শুনেছিল। তোমার হৃদয় কিসে ব্যস্ত ছিল। আর মোবাইল এমন একটি যন্ত্র, যা এই তিনটিকেই একসাথে নিয়ন্ত্রণ করে।

🔳প্রথম হবে চোখের হিসাব। মোবাইলের সবচেয়ে বড় দরজা হলো চোখ।‌শয়তান মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর জন্য অনেক পথ ব্যবহার করে, কিন্তু সবচেয়ে দ্রুত পথগুলোর একটি হলো চোখ। কারণ হৃদয়ের দিকে যাওয়ার অধিকাংশ রাস্তা চোখ দিয়ে শুরু হয়।

মোবাইলের পর্দা মূলত চোখের খাদ্য। প্রতিদিন আমরা শত শত ছবি দেখি, ভিডিও দেখি, সংবাদ দেখি, পোস্ট দেখি, বিজ্ঞাপন দেখি। কখনো প্রয়োজনের কারণে, কখনো অভ্যাসের কারণে, কখনো কৌতূহলের কারণে, আবার কখনো শুধু সময় কাটানোর জন্য।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এসবের মধ্যে অনেক ছিল এমন, যা আল্লাহ দেখতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন—

﴿قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ﴾

“মুমিনদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।” (সূরা আন-নূর: ৩০)

লক্ষ্য করুন, আল্লাহ প্রথমে দৃষ্টির কথা বলেছেন, তারপর লজ্জাস্থান হেফাজতের কথা বলেছেন। কারণ অধিকাংশ গুনাহের সূচনা হয় একটি দৃষ্টি থেকে।

একটি হারাম দৃষ্টি কখনো এক মুহূর্তের বেশি নয়। কয়েক সেকেন্ড। কয়েকটি ক্লিক। একটি ছবি। একটি ভিডিও। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের বিষ কখনো কখনো বছরের পর বছর হৃদয়ে জমে থাকে।

ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন দৃষ্টি হলো শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহের একটি তীর। তীর শরীরে বিদ্ধ হলে যেমন ক্ষত সৃষ্টি করে, হারাম দৃষ্টি তেমনি হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে।

আজ কত যুবক একটি ছবির কারণে গুনাহে জড়িয়েছে!কত যুবতী একটি ভিডিওর কারণে ঈমানী লজ্জা হারিয়েছে! কত সংসার একটি অবৈধ সম্পর্কের কারণে ধ্বংস হয়েছে!

প্রথমে মানুষ শুধু দেখে। তারপর চিন্তা করে। তারপর কল্পনা করে। তারপর আকৃষ্ট হয়। তারপর গুনাহে জড়িয়ে পড়ে।শয়তানের অনেক বড় ফাঁদ শুরু হয় একটি দৃষ্টি থেকে।

আজকের মোবাইল সংস্কৃতি এই হারাম দৃষ্টিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ করে দিয়েছে। আগে মানুষকে হারাম কিছু দেখতে হলে বিশেষ জায়গায় যেতে হতো। আজ হারাম জিনিস মানুষের পকেটে এসে বসে আছে।

আগে দরজা খুলতে হতো। আগে মানুষ গুনাহ খুঁজত। আজ গুনাহ মানুষকে খুঁজে নেয়। একটি ভিডিওর পর আরেকটি ভিডিও। একটি ছবির পর আরেকটি ছবি।

শয়তান কখন যে মানুষের ঈমানের চারপাশে জাল বুনে ফেলে, সে নিজেও বুঝতে পারে না।

চোখ কখনো শুধু দেখে না। চোখ হৃদয়ের জন্য বীজ সংগ্রহ করে। যা দেখবে, হৃদয় তা-ই ধারণ করবে। যা বারবার দেখবে, হৃদয় তাকে ভালোবাসতে শুরু করবে। আর যা ভালোবাসবে, মানুষ একদিন তার দাসে পরিণত হবে।

এই কারণেই অনেক আলেম বলেছেন চোখ হলো হৃদয়ের জানালা। জানালা দিয়ে যদি আলো প্রবেশ করে, ঘর আলোকিত হয়। আর যদি ধোঁয়া প্রবেশ করে, ঘর অন্ধকার হয়ে যায়।

কিয়ামতের দিন এই চোখই সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। আজ আমরা চোখকে ব্যবহার করছি। কিন্তু সেদিন চোখ আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

﴿الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ﴾

“আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা সাক্ষ্য দেবে তারা কী অর্জন করত।”

যেদিন মুখ বন্ধ হয়ে যাবে, সেদিন চোখ কথা বলবে। চোখ বলবে হে আল্লাহ! আমি তো নিজে কোথাও যাইনি। আমি তো নিজে কোনো হারাম দৃশ্য খুঁজিনি। আমাকে সে মোবাইলের পর্দার সামনে নিয়ে গিয়েছিল। আমাকে সে রাতের অন্ধকারে স্ক্রিনের দিকে তাক করেছিল। আমাকে সে নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখতে বাধ্য করেছিল। আমাকে সে এমন জিনিস দেখিয়েছিল, যা আপনি অপছন্দ করেন।

সেদিন কোনো অজুহাত কাজ করবে না। কোনো “ডিলিট” বাটন থাকবে না।‌ কোনো “হিস্টোরি ক্লিয়ার” করার সুযোগ থাকবে না। কোনো “প্রাইভেট মোড” থাকবে না।

আজ মানুষ ব্রাউজিং হিস্টোরি মুছে ফেলতে পারে। কিন্তু আমলনামার হিস্টোরি মুছে ফেলতে পারে না। আজ মানুষ মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টি ফাঁকি দিতে পারে না।

আজ পর্দা বন্ধ করা যায়। ফোন বন্ধ করা যায়। অ্যাকাউন্ট ডিলিট করা যায়। কিন্তু সেদিন চোখের সাক্ষ্য বন্ধ করা যাবে না। অতএব যে চোখ দিয়ে আমরা মোবাইলের পর্দা দেখি, সেই চোখকে কুরআনের আলোয় অভ্যস্ত করুন।

হারাম দৃশ্য থেকে ফিরিয়ে আনুন। কারণ যে চোখ আজ আল্লাহর ভয়ে হারাম থেকে ফিরে আসবে, সেই চোখই কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়া লাভের সৌভাগ্য অর্জন করবে।

🔳দ্বিতীয় হবে কানের হিসাব। আখিরাতের ময়দানে শুধু চোখের হিসাব হবে না, কানের হিসাবও হবে।

আমরা সাধারণত গুনাহ বলতে যা দেখি, সেটাকেই বেশি ভয় করি। কিন্তু অনেক সময় চোখের চেয়ে কান মানুষের ঈমানকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

﴿إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾

“নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং হৃদয়—প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।”

লক্ষ করুন, আল্লাহ প্রথমে কানের কথা উল্লেখ করেছেন।

কারণ কান এমন একটি দরজা, যা ঘুমের মধ্যেও কাজ করে। চোখ বন্ধ করা যায়, কিন্তু কান বন্ধ করা কঠিন। আর তাই শয়তানও এই পথটি খুব বেশি ব্যবহার করে।

আল্লাহ আমাদের কান দিয়েছেন কুরআন শোনার জন্য।আজান শোনার জন্য। হক কথা শোনার জন্য। উপদেশ গ্রহণের জন্য। সত্যকে হৃদয়ে স্থান দেওয়ার জন্য।

কিন্তু প্রশ্ন হলো আজ আমরা দিনে কতক্ষণ কুরআন শুনি।

কতক্ষণ হাদীস শুনি। কতক্ষণ আল্লাহর স্মরণ শুনি। আর কত ঘণ্টা শুনি গান। কত ঘণ্টা শুনি অশ্লীল কথা।

কত ঘণ্টা শুনি গীবত। কত ঘণ্টা শুনি অপবাদ। কত ঘণ্টা শুনি রাজনৈতিক বিদ্বেষ। কত ঘণ্টা শুনি মানুষের চরিত্রহনন। কত ঘণ্টা শুনি অর্থহীন হাসি-তামাশা।

আমাদের অনেকেই মনে করি আমি তো হারাম কিছু দেখি না। কিন্তু কখনো কি হিসাব করেছি, সারাদিন কানে কী প্রবেশ করছে। অনেক মানুষ চোখকে হারাম থেকে বাঁচায়, কিন্তু কানকে বাঁচায় না। অথচ কান দিয়েও হৃদয় কলুষিত হয়। কারণ মোবাইলের স্পিকার দিয়ে যা প্রবেশ করে, তা সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে যায়।

একটি গান শেষ হয়ে যায় তিন মিনিটে। কিন্তু তার সুর অনেক সময় নামাজের মধ্যেও মাথায় ঘুরতে থাকে। একটি অপবাদ কয়েক সেকেন্ডে শোনা হয়। কিন্তু সেই বিষ মানুষের হৃদয়ে বহুদিন বেঁচে থাকে।‌একটি গীবত কয়েক মিনিটের আলোচনা।‌কিন্তু তার কারণে দুই মুসলমানের সম্পর্ক চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

শয়তান জানে মানুষ যা বারবার শোনে, একসময় তা বিশ্বাস করতে শুরু করে। এই কারণেই মিথ্যাবাদীরা সব যুগে প্রচারণাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। আজ সেই প্রচারণার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে গেছে মোবাইল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন “মানুষকে মুখের ফসলই উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।”

এক সময় একজন মানুষের মিথ্যা কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। আজ একটি মিথ্যা লক্ষ মানুষের কানে পৌঁছে যায়। এক সময় একজনের গীবত একটি ঘরে সীমাবদ্ধ থাকত। আজ একটি ভিডিও, একটি অডিও, একটি লাইভ, একটি পোস্ট—মুহূর্তেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

এক সময় একজন ফাসিকের কণ্ঠস্বর কয়েকজন শুনত।

আজ সে মোবাইলের মাধ্যমে পুরো পৃথিবীকে শুনাতে পারে।‌ ভাবুন, একজন ব্যক্তি একটি অপবাদমূলক বক্তব্য দিল। একটি ইউটিউব ভিডিও বানাল।‌একটি মিথ্যা অডিও ছড়াল। একটি চরিত্রহননমূলক বক্তৃতা প্রচার করল।‌মৃত্যুর পরও মানুষ তা শুনছে।‌ মৃত্যুর পরও তার গুনাহ থামছে না।

যতদিন মানুষ শুনবে, ততদিন সেই গুনাহের ধারা চলতেই থাকবে। এটি গুনাহের এক ভয়াবহ “সদকায়ে জারিয়া”।

যেমন নেক আমল মৃত্যুর পরও চলতে পারে, তেমনি গুনাহও চলতে পারে। আজ আমরা কত গীবত শুনেছি!

কত অপবাদ শুনেছি! কত মিথ্যা প্রচারণা শুনেছি! কত ফিতনা শুনেছি! কত মানুষের মানহানি শুনেছি! কত অশ্লীল গান শুনেছি! কত কুফরি ও বিভ্রান্তিকর কথা শুনেছি!

হয়তো আমরা নিজেরা বলিনি। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। উপভোগ করেছি। শেয়ার করেছি। অন্যদেরও শুনিয়েছি।‌ কিয়ামতের দিন তখন শুধু বক্তা নয়, শ্রোতারও হিসাব হবে। কারণ গীবত বলা যেমন হারাম, গীবতের মজলিসে বসে শোনাও গুরুতর অপরাধ।

যে কান দিয়ে আমরা আজ যা খুশি শুনছি, সেই কানই কিয়ামতের দিন আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। সেদিন কান বলবে হে আল্লাহ! আমি তো কুরআন শুনতে চেয়েছিলাম।

সে আমাকে গীবত শুনিয়েছে। আমি হক কথা শুনতে চেয়েছিলাম। সে আমাকে মিথ্যা শুনিয়েছে। আমি আপনার স্মরণ শুনতে চেয়েছিলাম।‌সে আমাকে ফিতনা শুনিয়েছে।

আজ মানুষ ইয়ারফোন খুলে ফেলতে পারে। অডিও ডিলিট করতে পারে। হিস্টোরি মুছে ফেলতে পারে। কিন্তু কানের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারবে না। কারণ আল্লাহ সব শুনেছেন।

ফেরেশতারা সব লিখেছেন। আর কান নিজেও সব সংরক্ষণ করে রেখেছে।

আজ মোবাইলের ভলিউম বন্ধ করা যায়। কিন্তু কিয়ামতের দিন কানের সাক্ষ্য বন্ধ করা যাবে না। তাই যে কান দিয়ে আমরা মোবাইলের শব্দ শুনি, সেই কানকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যেন আখিরাতে তা আমাদের বিরুদ্ধে নয়, আমাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।

যে কান আজ কুরআনের সুরে অভ্যস্ত হবে, হকের কথায় অভ্যস্ত হবে, আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত হবে—সেই কানই ইনশাআল্লাহ কিয়ামতের দিন রহমতের সুসংবাদ শুনবে।

আর যে কান সারাজীবন ফিতনা, গীবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতায় ভরে রাখবে, তার জন্য সেই দিনটি হবে অত্যন্ত কঠিন হিসাবের দিন।

🔳তৃতীয় হবে হৃদয়ের হিসাব। চোখের হিসাব হবে। কানের হিসাব হবে। কিন্তু এই দুই হিসাবের চেয়েও ভয়ঙ্কর একটি হিসাব আছে। সেটি হলো—হৃদয়ের হিসাব। কারণ চোখ দেখে, কান শোনে; কিন্তু হৃদয়ই সিদ্ধান্ত নেয়।

চোখ একটি দৃশ্য দেখল। কান একটি কথা শুনল। কিন্তু সেই দৃশ্য ও সেই কথাকে আশ্রয় দেয় হৃদয়। এই কারণে আল্লাহ তাআলা শুধু চোখ ও কানের কথা বলেননি; বরং বলেছেন

﴿إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا﴾

নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং হৃদয়—প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।

হৃদয় মানুষের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«”জেনে রেখো, শরীরে একটি গোশতের টুকরা আছে। তা ভালো হলে পুরো শরীর ভালো হয়, আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখো, সেটি হলো হৃদয়।”»

আজ শয়তান জানে, মানুষের হৃদয়কে ধ্বংস করতে পারলে সবকিছু ধ্বংস করা যাবে। আর আধুনিক যুগে হৃদয়ে পৌঁছার সবচেয়ে সহজ রাস্তা হয়ে গেছে মোবাইল।

মোবাইল শুধু তথ্য দেয় না, চিন্তা তৈরি করে।‌ অনেক মানুষ মনে করে আমি তো শুধু ভিডিও দেখি। আমি তো শুধু একটু সময় কাটাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো মোবাইল শুধু আপনার সময় নেয় না, আপনার চিন্তাও গঠন করে।

আপনি যা বারবার দেখেন, ধীরে ধীরে তা-ই ভাবতে শুরু করেন। আপনি যা বারবার শোনেন, ধীরে ধীরে তা-ই বিশ্বাস করতে শুরু করেন।‌আপনি যাদের অনুসরণ করেন, ধীরে ধীরে তাদের মতো হতে শুরু করেন।

তাই প্রশ্ন হলো‌ আপনার হৃদয় কাকে ভালবাসে। হৃদয় যাকে বেশি দেখে, তাকেই ভালোবাসে। মানুষের হৃদয়ের একটি স্বভাব আছে। সে যাকে বেশি স্মরণ করে, তাকে ভালোবাসে।‌যাকে বেশি দেখে, তার প্রতি আকৃষ্ট হয়।

যার কথা বেশি শোনে, তার অনুসারী হয়ে যায়।

এই কারণে অনেক যুবকের হৃদয়ে আজ সাহাবীদের নাম নেই, কিন্তু সেলিব্রিটিদের নাম আছে। কুরআনের সূরাগুলো মুখস্থ নেই, কিন্তু অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জীবনী মুখস্থ।

উমর (রা.)-এর জীবন জানে না, কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের প্রতিটি রেকর্ড জানে। ইমাম বুখারীকে চেনে না, কিন্তু একজন ইউটিউবারের প্রতিটি ভিডিও চেনে।

কারণ হৃদয় যাকে বেশি পায়, তাকে বেশি ভালোবাসে।মোবাইল ধীরে ধীরে মানুষের ভালোবাসার কেন্দ্র পরিবর্তন করে দেয়। আল্লাহ থেকে দুনিয়ার দিকে। আখিরাত থেকে বিনোদনের দিকে। কুরআন থেকে পর্দার দিকে।

মোবাইল ঈমানকে শক্তিশালীও করতে পারে, দুর্বলও করতে পারে। একই মোবাইল। একজনের হাতে জান্নাতের সিঁড়ি। আরেকজনের হাতে জাহান্নামের সিঁড়ি। কেউ প্রতিদিন কুরআন শোনে। তাফসীর শেখে। দাওয়াত দেয়।ইসলাম প্রচার করে। তার হৃদয় নরম হয়। চোখে অশ্রু আসে। আল্লাহর ভয় বাড়ে।‌আখিরাতের চিন্তা বাড়ে।

আবার কেউ একই মোবাইলে দিন-রাত অশ্লীলতা দেখে।

ফিতনা দেখে। হারাম সম্পর্কের গল্প দেখে।‌বিদআত, নাস্তিকতা ও বিভ্রান্তি দেখে। তার হৃদয় ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। নামাজে স্বাদ পায় না। দোয়ায় কান্না আসে না।কুরআন শুনে প্রভাবিত হয় না। গুনাহকে গুনাহ মনে হয় না।

এটাই হৃদয়ের মৃত্যু।

সবচেয়ে ভয়াবহ রোগ হৃদয়ের কঠিন হয়ে যাওয়া। পাথরকে আঘাত করলে শব্দ হয়। কিন্তু মৃত হৃদয়কে হাজার নসীহত করলেও প্রভাব পড়ে না। কুরআন তিলাওয়াত হয়।

চোখে পানি আসে না। জান্নাতের কথা বলা হয়। আকাঙ্ক্ষা জাগে না। জাহান্নামের কথা বলা হয়। ভয় সৃষ্টি হয় না। মৃত্যুর সংবাদ আসে।‌শিক্ষা গ্রহণ করে না।

কারণ হৃদয় মোবাইলের অবিরাম বিনোদনে এমনভাবে ব্যস্ত হয়ে গেছে যে, আল্লাহর স্মরণ তার কাছে ভারী মনে হয়।আজ অনেকের কাছে এক ঘণ্টা ভিডিও দেখা সহজ। কিন্তু দশ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত কঠিন। তিন ঘণ্টা লাইভ দেখা সহজ। কিন্তু বিশ মিনিট ইসলামী আলোচনা শুনতে কষ্ট হয়। এটি শুধু অভ্যাসের সমস্যা নয়। এটি হৃদয়ের সমস্যাও।

কিয়ামতের দিন হৃদয়ের গোপন বিষয় প্রকাশিত হবে। দুনিয়ায় মানুষ অনেক কিছু লুকাতে পারে। মোবাইলের পাসওয়ার্ড লুকাতে পারে। হিস্টোরি মুছে ফেলতে পারে।

চ্যাট ডিলিট করতে পারে। ফাইল গোপন করতে পারে। কিন্তু হৃদয়ের ভেতরের ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা, নিয়ত ও গোপন চিন্তা লুকাতে পারবে না। আল্লাহ বলেন—

﴿يَوْمَ تُبْلَى السَّرَائِرُ﴾

“যেদিন গোপন বিষয়গুলো প্রকাশ করে দেওয়া হবে।”

(সূরা আত-তারিক: ৯)

সেদিন প্রকাশ পাবে কার হৃদয়ে আল্লাহ বড় ছিলেন। আর কার হৃদয়ে দুনিয়া বড় ছিল। কার হৃদয়ে কুরআনের স্থান ছিল।‌আর কার হৃদয়ে মোবাইলের পর্দা রাজত্ব করত।

কিয়ামতের দিন হয়তো আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন না তুমি কত জিবির ফোন ব্যবহার করেছিলে? কত ফলোয়ার ছিল?

কত লাইক পেয়েছিলে? কত ভিউ হয়েছিল?

প্রশ্ন হবে—তোমার হৃদয় কার জন্য স্পন্দিত হতো? তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে। তোমার অবসর সময় কার জন্য ব্যয় হতো? তোমার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু কী ছিল?

তোমার হৃদয়ের সিংহাসনে কে বসেছিল?‌আল্লাহ‌ নাকি দুনিয়া?

মোবাইলের সবচেয়ে বড় বিপদ চোখে নয়, কানে নয়, হৃদয়ে। কারণ চোখের গুনাহ তওবা করলে ক্ষমা হতে পারে।

কানের গুনাহও ক্ষমা হতে পারে। কিন্তু যদি হৃদয়ই অসুস্থ হয়ে যায়, তাহলে পুরো জীবন অসুস্থ হয়ে যায়।

তাই মোবাইল ব্যবহার করার আগে শুধু জিজ্ঞাসা করবেন না এটা দেখা কি জায়েজ।‌এটা শোনা কি জায়েজ?

বরং আরও বড় প্রশ্ন করুন এটা আমার হৃদয়কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? এটা কি আমাকে আল্লাহর কাছে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের মুক্তি নির্ভর করবে তার ফোনের উপর নয়, তার হৃদয়ের উপর। আর যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে, সেই হৃদয়ই কিয়ামতের দিন সফল হবে।

﴿إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ﴾

“সফল হবে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর কাছে সুস্থ হৃদয় নিয়ে উপস্থিত হবে।

🔳মোবাইল কাউকে জান্নাতি বানাচ্ছে কাউকে জাহান্নামি বানাচ্ছে। এটি একটি মাধ্যম। কিন্তু এই মাধ্যমের মাধ্যমে প্রতিদিন আমাদের চোখ, কান ও হৃদয় পরীক্ষা দিচ্ছে। আজ আমরা মোবাইল হাতে নিয়ে ঘুমাই। মোবাইল হাতে নিয়ে জাগি। মোবাইল হাতে নিয়ে চলি।

কিন্তু একদিন এমন সকাল আসবে, যেদিন মোবাইল থাকবে না।‌ চার্জার থাকবে না।‌ইন্টারনেট থাকবে না।অ্যাকাউন্ট থাকবে না। থাকবে শুধু আমলনামা। সেদিন আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন‌ তোমার চোখ কোথায় ছিল?

তোমার কান কী শুনেছিল? তোমার হৃদয় কিসে মগ্ন ছিল?

আর তখন আমরা বুঝব মোবাইলের আসল হিসাব মোবাইলের নয় মোবাইলের মাধ্যমে ব্যবহার করা চোখের হিসাব‌মোবাইলের মাধ্যমে ব্যবহার করা কানের হিসাব মোবাইলের মাধ্যমে প্রভাবিত হৃদয়ের হিসাব।

দুনিয়ায় মোবাইলের ওজন কয়েকশ গ্রাম।‌কিন্তু আখিরাতে এর দায়ভার পাহাড়সম ভারীও হয়ে যেতে পারে। আখেরাতে এ মোবাইলের ওজন বহন করা অনেক কঠিন হবে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।

Scroll to Top