আজকাল এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যেন দেওবন্দিয়াতের অর্থ হলো মুসলমানদের মধ্যে নতুন নতুন দেয়াল তৈরি করা। যেন দেওবন্দের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ হলো অন্য ইসলামপন্থী ব্যক্তি, আলেম, সংগঠন বা ধারার বিরোধীতা করা। অথচ ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, আকাবিরে দেওবন্দের জীবন ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী এবং তাঁদের সমসাময়িক অনেক আলেম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে এমন লোকদের সাথেও কাঁধ মিলিয়েছেন, যারা মুসলমান ছিলেন না। কারণ তখন প্রশ্ন ছিল—উম্মাহর অস্তিত্ব, স্বাধীনতা এবং দ্বীন রক্ষা।
তাঁরা কি এতে নিজেদের ঈমান হারিয়েছিলেন? তাঁদের আকিদা কি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল? তাঁদের দেওবন্দিয়াত কি শেষ হয়ে গিয়েছিল? না, বরং ইতিহাস তাঁদেরকে উম্মাহর দরদী নেতা হিসেবেই স্মরণ করেছে। কারণ তাঁরা বুঝতেন, সহযোগিতা আর আত্মসমর্পণ এক জিনিস নয়; যৌথ সংগ্রাম আর আকিদাগত আপস এক বিষয় নয়।
আজ বাংলাদেশের বাস্তবতা কী? আজ ইসলামপন্থী শক্তিগুলো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সেকুলারিজমের আগ্রাসন আছে। উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রবাহ আছে। পরিবারব্যবস্থা ধ্বংসের নানা বৈশ্বিক প্রকল্প আছে। ইসলামী মূল্যবোধকে প্রান্তিক করার সাংস্কৃতিক চাপ আছে। বিদেশি প্রভাব, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং নানা ধরনের ইসলামবিরোধী এজেন্ডা সক্রিয়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কী? আরও বিভাজন? আরও দলাদলি? আরও পারস্পরিক ঘৃণা? নাকি উম্মাহর ঐক্য?
আজ যদি কোনো ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা “দেওবন্দ, দেওবন্দ, দেওবন্দিয়াত” বলে চিৎকার করেন, কিন্তু তাঁর কথার ফল হয় মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি, আলেমদের মধ্যে বিদ্বেষ, ইসলামপন্থীদের মধ্যে সংঘাত—তাহলে আমাদের প্রশ্ন করার অধিকার আছে এটি কি সত্যিই আকাবিরে দেওবন্দের পথ? নাকি এটি দেওবন্দের নাম ব্যবহার করে নিজের দলীয় অবস্থানকে বড় করার চেষ্টা? কারণ আকাবিরে দেওবন্দের ইতিহাস বলে— মতভেদ থাকবে। ইজতিহাদি পার্থক্য থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু উম্মাহর বিরুদ্ধে উম্মাহকে দাঁড় করানো যাবে না।
আজ যারা দেওবন্দের নামে বিভাজন সৃষ্টি করছে, তারা হয়তো বুঝতেও পারছে না যে এই বিভাজনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী কারা। যখন ইসলামপন্থীরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, তখন ইসলামবিরোধী শক্তি হাসে। যখন আলেমরা একে অপরকে দুর্বল করে, তখন দ্বীনের শত্রুরা শক্তিশালী হয়।যখন উম্মাহর শক্তি অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ক্ষয় হয়, তখন বাইরের শক্তিগুলো কোনো পরিশ্রম ছাড়াই তাদের লক্ষ্য পূরণ করে।
ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো— উম্মাহকে পরাজিত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো উম্মাহকে নিজের ভেতরেই বিভক্ত করে দেওয়া। দেওবন্দের প্রকৃত শিক্ষা ছিল না বিভাজন। দেওবন্দের শিক্ষা ছিল— ইলম, তাকওয়া, ইখলাস, কুরবানি, এবং উম্মাহর জন্য ব্যথিত হৃদয়।
আকাবিরে দেওবন্দ কারও প্রতি অন্ধ আনুগত্য শেখাননি; তাঁরা শিখিয়েছেন কোরআন ও সুন্নাহর প্রতি আনুগত্য।তাঁরা দলকে বড় করেননি; ইসলামকে বড় করেছেন।তাঁরা নিজেদের নামকে কেন্দ্র বানাননি; উম্মাহকে কেন্দ্র বানিয়েছেন।
আজ সময়ের দাবি হলো—দেওবন্দের নামকে স্লোগান হিসেবে নয়, আকাবিরদের চরিত্রকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা।আমরা মতভেদ করব, কিন্তু শত্রুতা নয়।
আমরা সমালোচনা করব, কিন্তু বিদ্বেষ নয়। আমরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরব, কিন্তু উম্মাহর ঐক্য ভেঙে নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস নাম মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে কারা উম্মাহকে একত্র করেছিল আর কারা উম্মাহকে বিভক্ত করেছিল।
আর আকাবিরে দেওবন্দের উত্তরাধিকার বহন করতে হলে মুখে “দেওবন্দ” বলাই যথেষ্ট নয়; হৃদয়ে উম্মাহর জন্য সেই ব্যথা, সেই উদারতা এবং সেই ঐক্যের চেতনা ধারণ করতে হবে।