দেওবন্দের শিক্ষা: বিভাজন নয়, দ্বীনের স্বার্থে ঐক্য

আকাবিরে দেওবন্দের ইতিহাস গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, তাঁদের মূল সংগ্রাম ছিল ইসলাম, ঈমান, শরিয়ত, ইলম এবং মুসলিম সমাজের দ্বীনি পরিচয় রক্ষা করা। তাঁরা কখনো কোনো ব্যক্তি, দল বা সংগঠনকে ইসলামের সমার্থক বানিয়ে দেননি। বরং তাঁদের কাছে মূল বিষয় ছিল—দ্বীনের স্বার্থ, উম্মাহর স্বার্থ এবং মুসলমানদের ঈমানি অস্তিত্ব।

দারুল উলুম দেওবন্দ-এর প্রতিষ্ঠাতাগণ যখন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তাঁদের সামনে কোনো দলীয় এজেন্ডা ছিল না; ছিল ইসলামী শিক্ষা, ঈমান ও শরিয়তকে সংরক্ষণের লক্ষ্য। পরবর্তীতে আকাবিরে দেওবন্দের বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থাকতে পারে, কিন্তু তাঁদের সকলের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐক্য ছিল—ইসলাম সর্বোচ্চ, দল পরে।

মুসলমানের পরিচয়: দল নয়, ইসলাম

********************************

আকাবিরগণ শিখিয়েছেন, একজন মুসলমানের প্রথম পরিচয় সে মুসলমান। তার পরে আসে ভাষা, জাতি, ভূখণ্ড, সংগঠন বা রাজনৈতিক পরিচয়।

যখন মুসলমানরা নিজেদের পরিচয়কে দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলে, তখন দ্বীনের চেয়ে দলের গুরুত্ব বেড়ে যায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”

মতভেদ থাকবে, ইজতিহাদি পার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক কৌশলে ভিন্নতা থাকবে; কিন্তু ইসলামের মৌলিক স্বার্থে সহযোগিতা ও ঐক্য অক্ষুণ্ণ রাখা মুসলমানদের দায়িত্ব।

আকাবিরদের বাস্তব শিক্ষা

***********************

মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী, মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী মাওলানা আশরাফ আলী থানবী মাওলানা শাব্বির আহমেদ ওসমানী —সবার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এক ছিল না। কিন্তু তাঁরা একে অপরকে দেওবন্দের বাইরে নিক্ষেপ করেননি।

আজ যদি কোনো ব্যক্তি দাবি করে যে তার দলই একমাত্র দেওবন্দের প্রতিনিধি, তাহলে ইতিহাস সেই দাবিকে সমর্থন করে না। দেওবন্দ কোনো দলের নাম নয়; এটি একটি ইলমি মাদরাসা, একটি সংস্কারধর্মী ধারাবাহিকতা এবং একটি তাজদীদী আন্দোলনের নাম।

বর্তমান সময়ের বড় সমস্যা

***********************

আজকাল দেখা যায়, “দেওবন্দিয়াত” শব্দটিকে ব্যবহার করে মুসলমানদের মধ্যে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করা হয়। এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন একটি নির্দিষ্ট দল, সংগঠন বা রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করলেই মানুষ দেওবন্দবিরোধী হয়ে যায়।

এটি বাস্তবতা নয়।

দেওবন্দের নাম ব্যবহার করে যদি মুসলমানদের মধ্যে শত্রুতা বাড়ানো হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—এটি কি আকাবিরদের পথ, নাকি নিজেদের দলীয় স্বার্থের পথ?

আকাবিররা মানুষকে কোরআন ও সুন্নাহর দিকে ডাকতেন। তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিত্বের দিকে নয়, ইসলামের দিকে আহ্বান করতেন।

ইসলামের স্বার্থে ঐক্যের অপরিহার্যতা

********************************”

আজ মুসলিম সমাজের সামনে আকিদাগত চ্যালেঞ্জ আছে, নৈতিক চ্যালেঞ্জ আছে, ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা আছে, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংকট আছে। এই পরিস্থিতিতে মুসলমানদের শক্তি ক্ষয় হচ্ছে নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে।

যদি দুটি ইসলামী দল তাওহীদ, রিসালাত, কোরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহে একমত হয়, তাহলে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক মতভেদের কারণে একে অপরকে শত্রু বানানো উম্মাহর জন্য কল্যাণকর নয়।

ঐক্যের অর্থ মতভেদহীনতা নয়। ঐক্যের অর্থ হলো—

যেখানে সহযোগিতা সম্ভব সেখানে সহযোগিতা করা;

যেখানে মতভেদ আছে সেখানে আদব রক্ষা করা;

যেখানে ইসলামের স্বার্থ জড়িত সেখানে দলীয় স্বার্থকে পেছনে রাখা।

দেওবন্দের প্রকৃত উত্তরাধিকার

****************************

দেওবন্দের প্রকৃত উত্তরাধিকার হলো—ইলম,তাকওয়া, ইখলাস, উম্মাহর দরদ, এবং দ্বীনের জন্য কুরবানি।

দেওবন্দের উত্তরাধিকার দলীয় সংকীর্ণতা নয়। যে ব্যক্তি দেওবন্দের নাম নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ায়, সে দেওবন্দের নাম উচ্চারণ করলেও দেওবন্দের রূহকে ধারণ করছে কি না—সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন।

আজকের প্রয়োজন হলো, আকাবিরদের নামকে দলীয় অস্ত্র না বানিয়ে তাঁদের চরিত্র, ইখলাস, উম্মাহর জন্য দরদ এবং ইসলামের জন্য আত্মত্যাগের চেতনাকে পুনর্জীবিত করা।

দেওবন্দের প্রকৃত শিক্ষা হলো “দল ইসলামের জন্য, ইসলাম দলের জন্য নয়।” আর মুসলমানদের প্রকৃত শক্তি হলো— “ঈমানের ভিত্তিতে ঐক্য, আদবের ভিত্তিতে মতভেদ, এবং ইসলামের স্বার্থে পারস্পরিক সহযোগিতা।

Scroll to Top