ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজব্যবস্থা, যেখানে ধনী-গরিবের ভারসাম্য, মানবিক সহমর্মিতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি একসাথে যুক্ত।
আজ আমাদের আলোচনার মূল বিষয় হলো মক্কী জীবনে দান-সদকার শিক্ষা, যাকাতের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, যাকাত সংগ্রহকারীদের মর্যাদা, খেলাফতের ব্যবস্থায় যাকাত, খেলাফতহীন সমাজে মাদরাসার ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় অনুদান বনাম দ্বীনি স্বাধীনতা, যাকাত সংগ্রহ নিয়ে সমালোচনার জবাব এবং যাকাত-সদকার সামাজিক গুরুত্ব।
মক্কী যুগে দান-সদকার মৌলিক শিক্ষা
*********************************
মক্কায় তখন ইসলামী রাষ্ট্র ছিল না, বায়তুল মাল ছিল না, যাকাত অফিস ছিল না। কিন্তু ইসলাম তখনই গরিবের হক, এতিমের অধিকার এবং সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা দিয়েছে।
সূরা আল-মাউনে আল্লাহ বলেন—
أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ
فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُّ الْيَتِيمَ
وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এখানে ঈমান ও সামাজিক দায়িত্বকে একসাথে যুক্ত করেছেন। যে এতিমকে অবহেলা করে এবং গরিবকে খাওয়াতে উৎসাহ দেয় না, তাকে দ্বীন অস্বীকারকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম শুধু ইবাদত নয়; মানবিক দায়িত্বও ঈমানের অংশ।
সূরা আল-ফজর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন
كَلَّا بَل لَّا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ
وَلَا تَحَاضُّونَ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ
এখানে “তাহাযযুন” শব্দ গুরুত্বপূর্ণ—অর্থাৎ সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ একে অপরকে দান করতে উদ্বুদ্ধ করে। অতএব যাকাতের আলোচনা করা বা মানুষকে দানের জন্য উৎসাহিত করা কুরআনেরই শিক্ষা। এ সংক্রান্ত আয়াত মক্কি সুরা গুলোতেই নাযিল হয়েছে।
সূরা আল-বালাদ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন
أَوْ إِطْعَامٌ فِي يَوْمٍ ذِي مَسْغَبَةٍ
يَتِيمًا ذَا مَقْرَبَةٍ
أَوْ مِسْكِينًا ذَا مَتْرَبَةٍ
এই আয়াতে কঠিন দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যদানকে জান্নাতের পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম দানকে শুধু নৈতিক কাজ নয়, মুক্তির মাধ্যম হিসেবে দেখেছে।
সূরা আয-যারিয়াত
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
এখানে “হক” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ গরিবের অংশ শুধু অনুগ্রহ নয়; বরং অধিকার।
সূরা আদ্-দুহা
فَأَمَّا الْيَتِيمَ فَلَا تَقْهَرْ
وَأَمَّا السَّائِلَ فَلَا تَنْهَرْ
এতিম ও প্রার্থনাকারীকে তিরস্কার না করার নির্দেশ—এটি সমাজের নৈতিক ভিত্তি।
সূরা আল-মুদ্দাসসির ও আল-হাক্কাহ
وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ
وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ
গরিবকে না খাওয়ানোকে জাহান্নামের অপরাধের তালিকায় রাখা হয়েছে। এখানে যে আয়াতগুলো আমরা আলোচনা করলাম সবগুলো মক্কায় অবতীর্ন।
মদীনায় যাকাতের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
******************************”
মদীনায় ইসলাম পূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিণত হয়।
আল্লাহ বলেন—
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً
“তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন।”
এটি একটি রাষ্ট্রীয় নির্দেশ। এখানে ব্যক্তিগত দান নয়, বরং সংগঠিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যাকাত সংগ্রহকারীদের মর্যাদার আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে কুরআনে সূরা তাওবা (৬০):
وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا
এই আয়াতে বলা হয়েছে যাকাত সংগ্রহকারীও যাকাতের অংশ পাওয়ার অধিকারী। অর্থাৎ এটি একটি সম্মানিত পেশা ও দায়িত্ব।
রাসূল ﷺ-এর যাকাত সংগ্রহের ব্যবস্থা
*********************************
রাসূল ﷺ বিভিন্ন অঞ্চলে সাহাবীদের পাঠাতেন—
তাদের দায়িত্ব ছিল সম্পদ গণনা করা, যাকাত সংগ্রহ করা এবং কেন্দ্রে জমা দেয়া তারপর দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা। এটাই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রশাসনের দায়িত্ব।
হযরত আবু বকর (রা.) ও যাকাতের গুরুত্ব
*************************************
প্রিয় রাসূলের ওফাতের পর মুসলিম বিশ্বের একটি অংশ যাকাত প্রদানে অস্বীকার করে। যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিল, আবু বকর (রা.) তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
তিনি বলেন “যারা নামাজ ও যাকাতকে আলাদা করবে, আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” এ থেকে বোঝা যায় যাকাত ইসলামের মূল ভিত্তির অংশ।
ইসলামী খেলাফতের অধীনে যাকাত ব্যবস্থা
************************************
আদর্শ ইসলামি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রিয় জিম্মাদারীতে যাকাত সংগ্রহ করে, বণ্টন করে, হিসাব রাখে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। এখন যেহেতু খেলাফত ব্যবস্থা বিদ্যমান নেই এজন্য রাষ্ট্রীয় জিম্মাদারীতে এ কাজগুলো হচ্ছে না।
খেলাফতহীন বাস্তবতা ও উম্মাহর দায়িত্ব
**********************************
আজ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পূর্ণ ইসলামী যাকাত ব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হয় তাহলে গরিবদের দেখবে কে? কারা ধনীদের থেকে যাকাত সংগ্রহ করে গরিব পর্যন্ত পৌঁছাবে। দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদরাসা চলবে কীভাবে? দরিদ্র শিক্ষার্থীরা স্কলারশিপ পাবে কিভাবে?হাফেজ-আলেম তৈরি হবে কীভাবে? এক উত্তর হল উম্মাহর সহযোগিতায়। উম্মাহ নিজ দায়িত্বে এ বিষয়গুলো বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।
কওমি মাদরাসার অর্থনৈতিক ভিত্তি
******************************
আমাদের এদেশের কওমি মাদরাসা রাষ্ট্র থেকে বাজেট পায় না, কর আদায় করে না কিন্তু শিক্ষা চালু রাখে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ভরতা আল্লাহর উপর ভরসা এবং মুসলিম জনসাধারণের যাকাত, সদকা ও উম্মাহর দান। সারা পৃথিবীব্যাপী দ্বীনি এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জনসাধারণের স্বেচ্ছাদানে পরিচালিত হচ্ছে। এবং তারা স্বাধীনভাবে দ্বীনি শিক্ষাদানের এবং দ্বীন প্রচারে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় অনুদান বনাম দ্বীনি স্বাধীনতা
******************************”
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন আসে।
রাষ্ট্রীয় সাহায্যে যে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয় সেখানে রাষ্ট্রের একটি নিয়ন্ত্রণ থাকে। অনুদান সাধারণত শর্তযুক্ত হয়, রাষ্ট্র তখন নীতিমালা আরোপ করতে পারে, পাঠ্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে
ফলে দ্বীনি স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আর কুরআনের চিরন্তন নীতি
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ
“আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না।”
দাওয়াতের শক্তি হলো—স্বাধীনতা।
জনগণের দানভিত্তিক মডেল কেন শক্তিশালী?
কারণ— এখানে কোনো একক নিয়ন্ত্রণ নেই, জনগণের অংশগ্রহণ থাকে, স্বাধীনতা বজায় থাকে।
যাকাত সংগ্রহ নিয়ে সমালোচনার জবাব
*********************************”
অভিযোগ ১: একটি পক্ষ যাকাত সংগ্রহের এ কাজকে ভিক্ষা এবং নিচু কাজ মনে করে থাকে।
ভিক্ষা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে চাওয়া হয় আর যাকাত সংগ্রহের মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ব পালন করা হয়। দুটি বিষয় কখনো এক নয়।
অভিযোগ ২: মাদরাসা টাকা তোলে।
এর জবাব হলো মাদরাসা দ্বীন রক্ষা করে; না হলে দ্বীনি নেতৃত্ব ধ্বংস হবে।
অভিযোগ ৩: দানের জন্য প্রচারণা কেন
এর জবাব হলো কুরআন ও রাসূল ﷺ নিজেই দানের আহ্বান করেছেন।
যাকাত ও সদকার পরিবেশ সৃষ্টি
***************************
মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় যাকাত ও সদকার একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী জিম্মাদারী।
আল্লাহ বলেন—
وَلَا تَحَاضُّونَ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ
এই আয়াতের আহ্বান সমাজে দানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। না হলে— গরিব আরও গরিব হবে, শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হবে, দ্বীন দুর্বল হবে। প্রিয় রসুল যে সমাজ ব্যবস্থা করে তুলেছিলেন তার অন্যতম একটি গুণ ছিল পারস্পরিক সহযোগিতায় ও ভালোবাসা।
এদেশের হাজারো কওমি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনগণের সহযোগিতায় একটি স্বনির্ভর প্রজন্ম গড়ে তোলার ভূমিকা পালন করছে। আগে যারা যাকাত নিচ্ছে শিক্ষা অর্জন করে একটি সময় তারা যাকাত দিচ্ছে। এর দ্বারা সমাজ দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
আজ আমরা যে দ্বীনি জ্ঞান শিখি, তার পেছনে কারো না কারো দান রয়েছে। যে মাদরাসায় হাফেজ তৈরি হয়, তা কারো যাকাতের ও অনুদানের ফল। যে মসজিদে আমরা নামাজ পড়ি, তা কারো সদকার ফল।
অতএব যাকাত সংগ্রহকারীকে অবজ্ঞা নয়, সম্মান করতে হবে। যাকাতকে ভিক্ষা নয়, ইবাদত হিসেবে বুঝতে হবে। মাদরাসাকে দয়া নয়, দ্বীনের দুর্গ হিসেবে দেখতে হবে।
আসুন, আমরা এমন সমাজ গড়ি—
যেখানে ধনী দায়িত্ব পালন করবে, গরিব অধিকার পাবে, এবং দ্বীন শক্তিশালী হবে।