যাকাত, সদকা ও কোরবানির চামড়া: নববী সমাজব্যবস্থা, কওমি মাদ্রাসা এবং উম্মাহর দায়িত্ব

“যাকাত, সদকা ও কোরবানির চামড়া: সম্মানের ইবাদত নাকি অপমানজনক কাজ”

আজ এই আলোচনাটি হচ্ছে যাকাত সংগ্রহ করা লজ্জার কাজ, চামড়া সংগ্রহ করা নিচু কাজ। কওমি মাদ্রাসা মানুষের দানে চলে—এটা অপমান।

এখানে প্রশ্ন হয় যে ব্যবস্থাকে কুরআন প্রতিষ্ঠা করেছে, যে দায়িত্ব স্বয়ং রাসূল ﷺ পালন করেছেন, যে কাজে সাহাবায়ে কেরাম অংশ নিয়েছেন সেই কাজকে কি অপমানজনক বলা যায়।

বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবী রাখে। আমি আমার জায়গা থেকে কিছু বিষয়ে উপস্থাপন করতে চাই।

◾ কুরআনের দৃষ্টিতে যাকাত ও সদকা সংগ্রহ করা

******************************************

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“خذ من أموالهم صدقة تطهرهم وتزكيهم بها”

“তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন।”

(সূরা আত-তাওবা: ১০৩)

খেয়াল করুন আল্লাহ বলেননি— “তারা নিজেরাই সদকা করে নিক বরং বলেছেন— “আপনি তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন”

অর্থাৎ— সংগ্রহ করা হবে, ব্যবস্থাপনা হবে, সমাজ ভিত্তিক বণ্টন হবে।

◾অন্যত্র এরশাদ হয়েছে –

“নিশ্চয়ই সদকা দরিদ্র, অভাবী ও যাকাত সংগ্রহকারীদের জন্য…” (সূরা আত-তাওবা: ৬০)

এখানে আল্লাহ সরাসরি “عاملين عليها” — অর্থাৎ যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মীদের কথা বলেছেন।

এখানে প্রশ্ন হয় যাকাত সংগ্রহকারী আল্লাহ যাদের আলোচনাকে কুরআনে স্থান দিয়েছেন, তাদের কাজকে কি নিচু বলার সুযোগ আছে।

বরং আমি মনে করি যে কাজকে আল্লাহ ইবাদত বানিয়েছেন, যে দায়িত্ব নবী ﷺ পালন করেছেন, যে কাজে সাহাবারা নিয়োজিত ছিলেন তা অবশ্যই আল্লাহর কাছে সম্মানিত কাজ।

◾আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ফাজরে বলেন—

﴿كَلَّاۖ بَل لَّا تُكۡرِمُونَ ٱلۡیَتِیمَ ۝ وَلَا تَحَـٰضُّونَ عَلَىٰ طَعَامِ ٱلۡمِسۡكِینِ﴾

“কখনো নয়! বরং তোমরা এতিমকে সম্মান কর না এবং মিসকীনকে খাদ্য দানে একে অপরকে উৎসাহিত কর না।”

(সূরা আল-ফাজর: ১৭-১৮)

খেয়াল করুন, এই আয়াতে অর্থাৎ আল্লাহ বলেননি শুধু “তোমরা খাওয়াও না”, বরং বলেছেন—“তোমরা মানুষকে খাওয়ানোর জন্য উদ্বুদ্ধ কর না।” অর্থাৎ মানুষকে দান করতে আহ্বান করা, গরিবের জন্য সহযোগিতা সংগ্রহ করা, যাকাত-সদকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা—এসবও ইসলামের প্রশংসিত কাজ।

তাই যাকাত ও সদকা সংগ্রহ কোনো অপমানজনক বা নিচু কাজ নয়। বরং এটি এমন একটি কাজ, যার মাধ্যমে এতিমের মুখে হাসি ফোটে, মিসকীনের ঘরে খাবার পৌঁছে, অসহায়ের চিকিৎসা হয়, দ্বীনি শিক্ষা ও কওমি মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে, যে ব্যক্তি মানুষকে দান করতে উৎসাহিত করে, যাকাত-সদকা সংগ্রহ করে দরিদ্রের কাছে পৌঁছে দেয়, সে এই আয়াতের দাবিই পূরণ করছে। আর যে ব্যক্তি এই কাজকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, তার চিন্তা করা উচিত—সে কি অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই মানসিকতার কাছাকাছি চলে যাচ্ছে না, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:

﴿وَلَا تَحَاضُّونَ عَلَىٰ طَعَامِ الْمِسْكِينِ﴾

“তোমরা মিসকীনকে খাদ্য দেওয়ার জন্য একে অপরকে উৎসাহিত কর না।”

অতএব, যাকাত-সদকা সংগ্রহ করা লজ্জার নয়; বরং এতিম ও মিসকীনের অধিকার আদায়ের একটি সম্মানিত আমানত। সমাজে যারা এই কাজে অংশগ্রহণ করে, তারা গরিবের হক আদায়ে সহযোগিতা করছে; আর যারা মানুষকে এ কাজে উৎসাহিত করে, তারা কুরআনের এই আহ্বানেরই বাস্তব রূপ দিচ্ছে।

ইসলাম শুধু দান করার শিক্ষা দেয় না। ইসলাম দান করানো, দানের পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং মানুষকে দানে উৎসাহিত করারও শিক্ষা দেয়। ধনীদের কাছ থেকে গরিবের হক আদায় করে হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি দায়িত্ব।

◾সূরা আল-বালাদে আল্লাহ বলেন—

﴿فَلَا اقْتَحَمَ الْعَقَبَةَ﴾

“সে দুর্গম গিরিপথ অতিক্রম করল না।”

আকাবার ব্যাখ্যায় আল্লাহ বলেছেন ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া এতিমের পাশে দাঁড়ানো মিসকীনের সাহায্য করা অর্থাৎ সমাজের দুর্বল মানুষের কল্যাণে কাজ করাই “আকাবা” অতিক্রম করা।

এখন প্রশ্ন হলো কেন এটাকে “আকাবা” বলা হয়েছে?

কারণ— নিজের সম্পদ ব্যয় করা কঠিন নিজের অহংকার ভাঙা কঠিন মানুষের সমালোচনা সহ্য করা কঠিন সমাজের ভুল ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন

তাই এটি সহজ রাস্তা নয়; এটি দুর্গম পাহাড়ি পথ।

এই কাজ সমাজের চোখে ছোট, ইসলামের চোখে বড়

অনেক সময় মানুষের কাছে মনে হতে পারে—

“মানুষের কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়া মর্যাদার কাজ নয়।” কিন্তু ইসলাম বলে নিজের জন্য চাওয়া এক বিষয়। এতিম, মিসকীন ও দ্বীনের জন্য চাওয়া অন্য বিষয়। যে ব্যক্তি দুর্বলের পক্ষে দাঁড়ায়, সে সম্মানিত দায়িত্ব পালন করে।

রাসূল ﷺ-এর যুগে যাকাত ব্যবস্থা

*****************************

রাসূল ﷺ শুধু নামাজ শেখাননি। তিনি শুধু রোযা শেখাননি। তিনি একটি পূর্ণ সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।

প্রিয় নবী ﷺ যাকাত আদায় করতেন যাকাত সংগ্রহের জন্য প্রতিনিধি পাঠাতেন যাকাতের হিসাব নিতেন যাকাত সদকা বণ্টন করতেন সমাজের দরিদ্রদের অধিকার নিশ্চিত করতেন।

মনে রাখুন‌ যাকাত শুধু “দান” নয়, অনুগ্রহ নয়। এটা দরিদ্র সমাজের পাওনা পরিশোধ করা। এটি ইসলামের অর্থনৈতিক বিপ্লব।

◾এই উম্মাহর সবচাইতে সম্মানিত মানুষ সাহাবায়ে কেরামের পবিত্র জামাত জাকাত সংগ্রহকে গুরুত্বের সাথে পালন করেছেন। প্রিয় রসুলের ওফাতের পর যাকাত অস্বীকারের ফেতনা সামনে আসলে ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর জাকাত অস্বীকারকারীদের সাথে যুদ্ধের ঘোষণা দেন।

এবং যাকাত সংগ্রহ কে খেলাফতের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেন।

◾মু’আয ইবন জাবাল (রাঃ) রাসূল ﷺ তাকে ইয়েমেনে পাঠালেন। কেন? তার দায়িত্ব ছিল ‌কুরআন শিক্ষা দেয়া ফিকহ শিক্ষা দেয়া, বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করা।

তিনি শুধু যাকাত সদকা সংগ্রাহক ছিলেন না—তিনি ছিলেন প্রশাসক। রাসূল ﷺ তাকে বলেছিলেন—

“তুমি আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ…”

এরপর তিনি তাকে যাকাত ব্যবস্থার নির্দেশনা দেন।

এখানে প্রশ্ন হয় মু’আয (রাঃ)-এর মতো ফকীহ যদি এই দায়িত্ব পালন করেন— তাহলে এটা নিচু কাজ হয় কীভাবে?

◾ আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ) রাসূল ﷺ তাকে বলেছিলেন “এই উম্মাহর আমীন।”

তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বায়তুল মাল ও আর্থিক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

◾ আবদুল্লাহ ইবন লুতবিয়্যাহ (রাঃ) রাসূল ﷺ তাকে যাকাত সংগ্রাহক নিযুক্ত করেছিলেন। একবার তিনি ফিরে এসে বললেন “এটা আপনাদের, আর এটা আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে।” তখন রাসূল ﷺ কঠোরভাবে জবাব দিলেন— এবং বললেন—

“তুমি তোমার বাবার ঘরে বসে থাকতে, তাহলে দেখতে হাদিয়া আসে কি না!” (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস প্রমাণ করে— যাকাত সংগ্রহ ছিল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা।

◾উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)

তার যুগে— বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠিত হয়, দরিদ্র তালিকা তৈরি হয়, যাকাত প্রশাসন শক্তিশালী হয়, তিনি রাতের আঁধারে মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতেন।

◾ আলী ইবন আবি তালিব (রাঃ) তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন।

তিনি বলতেন “আল্লাহর সম্পদে অন্যায় সহ্য করা যাবে না।”

◾ উসমান ইবন আফফান (রাঃ) তিনি ছিলেন ধনী সাহাবী। কিন্তু তিনি শুধু দানই করেননি। যাকাতভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছেন।

“সমালোচক কারা?”

****************

কুরআনে কারীমের সূরা মুনাফিকুন আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের একটি বিপজ্জনক মানসিকতা তুলে ধরেছেন—

﴿هُمُ الَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنفِقُوا عَلَىٰ مَنْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّىٰ يَنفَضُّوا﴾

“তারা বলে, রাসূলুল্লাহর কাছে যারা আছে, তাদের জন্য ব্যয় করো না, যাতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।”

(সূরা আল-মুনাফিকূন: ৭)

মুনাফিকদের আপত্তি নামাজের বিরুদ্ধে ছিল না, রোযার বিরুদ্ধে ছিল না; তাদের আপত্তি ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও দানের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।

তারা বুঝেছিল, যদি দান-অনুদান বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দ্বীনের কাফেলা দুর্বল হয়ে যাবে, দরিদ্র মুসলমানরা কষ্টে পড়বে এবং ইসলামের শিক্ষা-প্রচার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আজ যখন কেউ অনুদান সংগ্রহ, যাকাত সংগ্রহ, সদকা সংগ্রহ বা কোরবানির চামড়া সংগ্রহকে “নিচু কাজ” বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, তখন তার চিন্তা করা উচিত এই কথার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

কারণ বাস্তবতা হলো—

এতিমের জন্য অর্থ লাগে। মিসকীনের জন্য অর্থ লাগে।দরিদ্র ছাত্রের জন্য অর্থ লাগে। দ্বীনি শিক্ষা ও মাদ্রাসার জন্য অর্থ লাগে। আর সেই অর্থ আকাশ থেকে নেমে আসে না; উম্মাহর দান, যাকাত, সদকা ও অনুদানের মাধ্যমেই আসে।

তাই যে ব্যক্তি অনুদান সংগ্রহকারীদের অপমান করে, সে আসলে একটি মহৎ কাজকে অপমান করছে—যে কাজের উদ্দেশ্য হলো দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দ্বীনের খেদমতকে সচল রাখা।

স্মরণে রাখুন যে ব্যক্তি নিজের জন্য মানুষের কাছে যায়, সে একজন ব্যক্তি। কিন্তু যে ব্যক্তি এতিমের জন্য যায়, মিসকীনের জন্য যায়, দ্বীনের জন্য যায়—সে একটি আমানত বহন করে।

আর আমানত বহনকারীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা মুমিনের চরিত্র নয়; মুমিনের চরিত্র হলো তাদের কাজকে সম্মান করা, সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থার সংস্কার করা, কিন্তু কল্যাণের এই ধারাকে হেয় না করা।

এই আয়াত আমাদের শেখায়‌ দান বন্ধ করার ভাষা মুনাফিকদের ভাষা ছিল; আর দানকে সঠিক পথে প্রবাহিত করার চিন্তা মুমিনদের কাজ।

◾কুরআনে আল্লাহ বলেন—

“তাদের মধ্যে কেউ কেউ সদকার ব্যাপারে তোমাকে দোষারোপ করে।” (তাওবা: ৫৮)

খেয়াল করুন নবী ﷺ-এর যুগেও সমালোচক ছিল। তারা সদকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল

আজও কিছু মানুষ একই কাজ করছে।

এখানে নিজেকে প্রশ্ন করা চাই যে মানসিকতা নবী ﷺ-এর বিরুদ্ধে ছিল— আজ আমরা কি সেই মানসিকতার অনুসারী হব?

কওমি মাদ্রাসা: উম্মাহর শেষ দুর্গ

****************************

দ্বীনি শিক্ষা দ্বারা রক্ষা এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠায় কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান সকলের কাছে পরিষ্কার। আজ হাজারো লক্ষাধিক কওমি মাদ্রাসা সরকারি বিলাসী বাজেটে চলে না।

কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চলে জনসাধারণের অনুদান, যাকাত সদকা ফিতরা কোরবানির চামড়ার অনুদানের অর্থে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে— লাখো গরিব ছাত্র পড়াশোনা করে, হিফজ সম্পন্ন করে, আলেম হয়ঞ দ্বীনের খাদেম তৈরি হয়।

একটি গ্রামের দরিদ্র শিশু—তার বাবার টাকা নেই, তার মা গহনা বিক্রি করতে। পারেনি,কিন্তু একটি মাদ্রাসা তাকে আশ্রয় দিয়েছে। খাবার দিয়েছে কুরআন শিখিয়েছে মানুষ বানিয়েছে এটা কী দিয়ে চলছে? উম্মাহর যাকাত সদকা চামড়ার ‌ অনুদান ‌দিয়ে!

যাকাত কুরবানির চামড়া সংগ্রহ অপমান নয়, ইবাদত

********************************************

আজ কিছু মানুষ বলে “চামড়ার দাম কমে গেছে” “এটা আর লাভজনক না” এখানে প্রশ্ন হয় ইবাদতের মূল্য কি বাজারদর দিয়ে নির্ধারিত হবে? দাম কমেছে কেন? আন্তর্জাতিক বাজার, ট্যানারি সংকট, রপ্তানি সমস্যা, সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।

তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী? ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, সহযোগিতা করা, সংগঠিত হওয়া। সমাধান কখনোই— ইবাদতকে অপমান করা নয়।

সমালোচনারও সমালোচনা আছে

*****************************

আজ যারা বলে “এটা নিচু কাজ”। আমরা মনে করি নিচু কাজ নয়। এই কাকে নিচু মনে করা নিচু মানসিকতা। যে গরিবের জন্য কাজ করে সে নিচু? যে এতিমের পাশে দাঁড়ায় সে নিচু? যে দ্বীন বাঁচায় সে নিচু?

মূলত নিচু হলো— অহংকার, আত্মকেন্দ্রিকতা মানবতাবিহীন চিন্তা।

আজকের প্রজন্মকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—

এই প্রজন্ম কি কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার দর্শক হবে? সোশ্যাল মিডিয়া থেকে উচু কাজে নিচু কাজ জানবে।

নাকি উম্মাহর দায়িত্ব বহন করবে‌ এবং কুরআনের দৃষ্টিতে সম্মানিত হবে।

আমরা যদি গড়ে তুলতে পারি যাকাতের সুষ্টু ব্যবস্থাপনা দরিদ্রের সহায়তার শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম, মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থার শক্তিশালী ভবিষ্যৎ।

আমাদেরকে ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী ভাবে ধরতে হবে। সাহস নিয়ে বলতে হবে যাকাত ব্যবস্থা চলবে সদকা ব্যবস্থা চলবে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ চলবে কওমি মাদ্রাসা চলবে

কারণ— এটা কোনো ভিক্ষাব্যবস্থা নয় এটা উম্মাহর আত্মা। এই উম্মার প্রাণ পারস্পরিক সহযোগিতা।

সহযোগিতার দ্বারা তৈরি হয় ভালবাসা।

কওমি মাদ্রাসা দিচ্ছে না নিচ্ছে

**************************

কওমি মাদ্রাসা উম্মাহকে দিতে চায় এজন্যই কিছু নিতে চায়। “শুধু নেয়ার মানসিকতা নয়, এমন উম্মাহ গড়ে তুলতে হবে যারা উম্মাহর কল্যাণে দেওয়ার মাঝে সফলতা পাবে।” ইসলামের শিক্ষা দিতে পারার মাঝে সফলতা। হাত পেতে নেওয়ার মাঝে সফলতা নেই।

ইসলাম এমন উম্মাহ চায় না, যারা সারাজীবন শুধু গ্রহণ করবে। ইসলাম এমন উম্মাহ চায়। যারা আজ গ্রহণকারী, কাল দানকারী হবে। যারা আজ সাহায্য নিচ্ছে, কাল অন্যের সাহায্যকারী হবে। যারা আজ যাকাতের হকদার, কাল যাকাতদাতা হবে। এটাই ইসলামের স্বপ্ন।

রাষ্ট্র ট্যাক্স নেয়, এটাকে কি ভিক্ষা বলা হয়?

সরকার যখন ট্যাক্স নেয় তখন কেউ বলে না—

“সরকার ভিক্ষা করছে।” কেন? কারণ এটি একটি সামাজিক ব্যবস্থাপনা।

একইভাবে ইসলাম যাকাতকে শুধু ব্যক্তিগত দান হিসেবে রাখেনি। ইসলাম জাকাতকে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বানিয়েছে। রাসূল ﷺ যাকাত সংগ্রহ করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম যাকাত সংগ্রহ করেছেন।খুলাফায়ে রাশেদীন যাকাত আদায় করেছেন। কেউ এটাকে ভিক্ষা বলেনি। কারণ এটি ছিল একটি সামাজিক ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাজের দুর্বলরা ধীরে ধীরে সবলে পরিণত হয়েছে।

যাকাত সদকা সংগ্রহকে কেন নিচু কাজ উপস্থাপন করা হয়। সমস্যা কোথায়? সমস্যা যাকাত সংগ্রহে নয়। সমস্যা তখন হয় যখন একটি জাতি শুধু গ্রহণ করতে শেখে, দিতে শেখে না। যখন একজন ছাত্র, একজন ব্যবসায়ী, একজন আলেম, একজন কর্মজীবী ব্যক্তি সারাজীবন শুধু সাহায্য গ্রহণের মানসিকতা রাখে।

আজ হাজার হাজার ছাত্র যাকাতের টাকায় পড়াশোনা করছে।প্রশ্ন হলো— তারা কি সারাজীবন যাকাতের উপর থাকবে? না। আজ তারা গ্রহণ করছে। আগামীতে তারা ইমাম হবে,শিক্ষক হবে,‌ব্যবসায়ী হবে, দাওয়াতের কর্মী হবে,‌এবং তখন তারাই যাকাতদাতা হবে। কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের দুর্বল অংশ দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তি এবং সামর্থ অর্জন করছে।

আসল সংকট কোথায়?‌আসল সংকট হলো আমরা অনেক সময় এমনভাবে কথা বলি, যেন যাকাত গ্রহণই লজ্জার। কুরআন এটা বলেনি। হাদিস এটা বলেনি। সাহাবায়ে কেরাম এটা বলেননি।‌আমাদের মাঝে যারা এমন কথা বলে তারা পশ্চিমাদের কথা এবং তাদের মিডিয়া দ্বারা প্রভাবিত হয়েই এবং কথা বলে।

যাকাতের উপযুক্ত ব্যক্তির যাকাত গ্রহণ করা লজ্জার নয়। এটা তার পাওনা। যাকাত সংগ্রহ করা লজ্জার নয়। ‌ এটা জানা গ্রহণ করছে তারা দুর্বলের হক আদায় সহযোগিতা করছে। বাস্তবিক অর্থে লজ্জার বিষয় হলো সামর্থ্য থাকার পরও যাকাত না দেওয়া।‌ লজ্জার বিষয় হলো‌ গরিবের হক মেরে খাওয়া। লজ্জার বিষয় হলো‌ উম্মাহর প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উপকার নেওয়া, কিন্তু পরে উম্মাহর জন্য কিছু না করা। সমাজের নির্লজ্জরা এ কাজগুলো করে যাচ্ছে কিন্তু লজ্জাবোধ করছে না।

তাই আমাদের বক্তব্য হবে— যাকাত সংগ্রহ সম্মানজনক কাজ। যাকাত-সদকা ও চামড়ার অনুদান সংগ্রহ নববী সমাজব্যবস্থার অংশ। দরিদ্র, এতিম, মিসকীন ও দ্বীনি শিক্ষার জন্য সহযোগিতা সংগ্রহ কোনো অপমান নয়।

কিন্তু একই সঙ্গে‌ উম্মাহকে দানকারী জাতিতে পরিণত করতে হবে। শুধু গ্রহণকারী নয়, দানকারী প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে। যাকাত নেওয়ার পাশাপাশি যাকাত দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

যাকাত সংগ্রহ করা সমস্যা নয়; সমস্যা হলো যাকাত দেওয়ার মানসিকতা হারিয়ে ফেলা। অনুদান গ্রহণ করা অপমান নয়; অপমান হলো সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উম্মাহর দায়িত্ব থেকে পিছু হটা। আমরা এমন উম্মাহ চাই, যারা প্রয়োজন হলে যাকাত

গ্রহণ করবে, কিন্তু সুযোগ পেলে যাকাতদাতা হওয়ার স্বপ্নও লালন করবে।

হে আল্লাহ—

আমাদের অন্তরকে অহংকার থেকে রক্ষা করুন। গরিবের হক আদায়ের তাওফিক দিন। যাকাত ও সদকার সঠিক ব্যবস্থাপনার তাওফিক দিন।উম্মাহকে ঐক্য দান করুন এবং সমালোচনার ফিতনা থেকে হেফাজত করুন।

آمين يا رب العالمين।

Scroll to Top