কুরআনে কারীমের অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ সূরা কাহাফে হযরত মুসা আলাইহিস সালাম ও হযরত খিজির আঃ এর ঘটনায় একজন তালিবুল ইলমের জন্য উস্তাদের আদব, বিনয় ও সম্মানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে।
এই সুরায় চমৎকার কিছু দৃষ্টান্ত আছে। যদিও মূসা (আ.) নিজেই ছিলেন মহান রাসূল ও উলুল আযম নবীগণের অন্যতম, তবুও জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি এমন আদব ও নম্রতার পরিচয় দিয়েছেন, যা সকল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য শিক্ষণীয়।
১. জ্ঞান অর্জনের জন্য দীর্ঘ সফর
আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَوَجَدَا عَبْدًا مِنْ عِبَادِنَا
“অতঃপর তারা আমার বান্দাদের একজন বান্দাকে পেল।” (সূরা কাহাফ: ৬৫) মূসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশে বহু কষ্ট ও দীর্ঘ সফর করে খিজির (আ.)-এর কাছে গিয়েছিলেন।
এখান থেকে শিক্ষা:
যে ব্যক্তি ইলমের মর্যাদা বোঝে, সে ইলমের জন্য কষ্টকে তুচ্ছ মনে করে।
২. একজন মহান নবীর বিনয়
মূসা (আ.) বলেন—
هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَىٰ أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا
“আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে আপনি আমাকে সেই হিদায়াতপূর্ণ জ্ঞান শিক্ষা দেন, যা আপনাকে শেখানো হয়েছে?” (সূরা কাহাফ: ৬৬)
লক্ষ করুন—
তিনি বলেননি, “আমি আল্লাহর নবী, আমাকে শিক্ষা দিন।” বরং অত্যন্ত বিনয়ের সাথে অনুমতি চেয়েছেন।
এখানে কয়েকটি আদব রয়েছে: প্রথমে অনুমতি চাওয়া। নিজেকে শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থাপন করা।উস্তাদের জ্ঞানের স্বীকৃতি দেওয়া। শেখার আগ্রহ প্রকাশ করা।
৩. উস্তাদের শর্ত মেনে নেওয়া
খিজির (আ.) বললেন—
فَإِنِ اتَّبَعْتَنِي فَلَا تَسْأَلْنِي عَنْ شَيْءٍ
“তুমি যদি আমার অনুসরণ কর, তবে আমি নিজে না বলা পর্যন্ত কোনো বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবে না।” (সূরা কাহাফ: ৭০) মূসা (আ.) উত্তর দিলেন—
سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ صَابِرًا وَلَا أَعْصِي لَكَ أَمْرًا
“ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো নির্দেশ অমান্য করব না।” (সূরা কাহাফ: ৬৯)
এখানে একজন ছাত্রের আদব:
উস্তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে সম্মান করা। ধৈর্য ধারণ করা। তাড়াহুড়া না করা।
৪. ভুল হলে ক্ষমা প্রার্থনা
প্রথমবার শর্ত ভঙ্গ করার পর মূসা (আ.) বললেন—
لَا تُؤَاخِذْنِي بِمَا نَسِيتُ
“আমার ভুলের কারণে আমাকে পাকড়াও করবেন না।” (সূরা কাহাফ: ৭৩) দ্বিতীয়বার বললেন—
إِنْ سَأَلْتُكَ عَنْ شَيْءٍ بَعْدَهَا فَلَا تُصَاحِبْنِي
“এরপর যদি আমি আর কোনো প্রশ্ন করি, তবে আপনি আমাকে আপনার সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবেন।” (সূরা কাহাফ: ৭৬) এখানে দেখা যায়—
ভুল হলে তিনি তর্ক করেননি; বরং দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
৫. মর্যাদা ও ভদ্র ভাষার ব্যবহার
পুরো ঘটনায় মূসা (আ.) কখনো খিজির (আ.)-এর সাথে রূঢ় বা অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলেননি।
যদিও তিনি নিজেও একজন মহান নবী ছিলেন, তবুও শেখার সময় তিনি একজন বিনয়ী ছাত্রের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।
আজকের ছাত্রদের জন্য সূরা কাহাফের এই ঘটনা একটি জীবন্ত শিক্ষা: ইলমের জন্য সফর করতে হবে।
উস্তাদের কাছে বিনয়ী হতে হবে। অনুমতি ছাড়া কথা বলা যাবে না। উস্তাদের সময় ও পদ্ধতির সম্মান করতে হবে। ভুল হলে ক্ষমা চাইতে হবে।অহংকার নিয়ে ইলম অর্জন করা যায় না। মূসা (আ.)-এর মর্যাদা তাঁকে বড় করেনি; বরং তাঁর বিনয় তাঁকে আরও বড় করেছে।
যে নবী আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন, তিনিও জ্ঞান অর্জনের জন্য একজন শিক্ষার্থীর আদব অবলম্বন করেছেন।
অতএব, একজন তালিবুল ইলম যত বড়ই হোক, উস্তাদের সামনে তার পরিচয় একটাই—সে একজন শিক্ষার্থী।