“সুবহানাল্লাহ” — ফজিলত, গুরুত্ব ও জীবনের শিক্ষা

সুবহানাল্লাহ একটি ছোট জিকির কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী যিকির। এমন একটি বাক্য, যা উচ্চারণ করতে কয়েক সেকেন্ড লাগে, কিন্তু যার ওজন আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ভারী।

এটি শুধু একটি শব্দ নয়; এটি একজন মুমিনের ঈমান, আকীদা, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির ঘোষণা।

◾ সুবহানাল্লাহ অর্থ কী?

“সুবহানাল্লাহ” অর্থ—আল্লাহ সকল ত্রুটি, দুর্বলতা, অপূর্ণতা ও অযোগ্যতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।

যখন আমরা বলি “সুবহানাল্লাহ”, তখন আমরা ঘোষণা করি—আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। আল্লাহর কোনো দুর্বলতা নেই। আল্লাহ ভুল করেন না। আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না। আল্লাহর কোনো শরীক নেই। আল্লাহর কোনো সন্তান নেই। এটি মূলত আল্লাহর পবিত্রতা ও পরিপূর্ণতার ঘোষণা।

◾কুরআনে সুবহানাল্লাহ

পবিত্র কুরআনে বহু স্থানে আল্লাহ তাআলা নিজের পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন—

سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يَصِفُونَ

“তারা যা বর্ণনা করে, আল্লাহ তা থেকে পবিত্র ও মহান।”

আবার সূরা ইসরার শুরুতেই এসেছে—

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا

“পবিত্র সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিতে ভ্রমণ করিয়েছেন।”

আল্লাহ যেন আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছেন, যখন মানুষ কোনো বিষয় বুঝতে পারে না, তখন মুমিন বলে—

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ সবকিছু করতে সক্ষম।

◾ নবী ﷺ-এর প্রিয় যিকির

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ، ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ، حَبِيبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ، سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ

“দুটি বাক্য জিহ্বায় হালকা, মীযানে ভারী এবং রহমানের নিকট অত্যন্ত প্রিয়।

মানুষ পৃথিবীতে কত কাজ করে, কত পরিশ্রম করে; অথচ কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করে এমন আমল করা যায় যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

◾গুনাহ মাফের যিকির

রাসূল ﷺ বলেছেন—

مَنْ قَالَ: سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ فِي يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ

غُفِرَتْ خَطَايَاهُ

যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” পড়বে, তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে; যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ হয়।

আমরা গুনাহ থেকে মুক্তি চাই, কিন্তু অনেক সময় সহজ আমলগুলো অবহেলা করি।

◾ সমস্ত সৃষ্টি সুবহানাল্লাহ বলে

আল্লাহ বলেন—

وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ

“এমন কোনো বস্তু নেই যা আল্লাহর প্রশংসাসহ তাসবীহ পাঠ করে না।”

সূর্য তাসবীহ পড়ছে। চাঁদ তাসবীহ পড়ছে। পাখি তাসবীহ পড়ছে। গাছপালা তাসবীহ পড়ছে। পাহাড় তাসবীহ পড়ছে। পুরো মহাবিশ্ব “সুবহানাল্লাহ” বলছে।

প্রশ্ন হলো—‌এই বিশাল সৃষ্টিজগতের মাঝে মানুষ কি আল্লাহর তাসবীহ থেকে গাফেল থাকবে?

◾ বিপদে সুবহানাল্লাহ

মুমিন যখন কোনো আশ্চর্য ঘটনা দেখে, তখন বলে—সুবহানাল্লাহ। যখন আল্লাহর কুদরত দেখে, তখন বলে

সুবহানাল্লাহ।‌যখন নিজের ভুল বুঝতে পারে, তখন বলে সুবহানাল্লাহ। অর্থাৎ প্রতিটি অবস্থায় সে আল্লাহর মহত্ব ও পবিত্রতাকে স্মরণ করে।

◾ সুবহানাল্লাহ ও ঈমানের শক্তি

আজকের যুগে মানুষ আল্লাহ সম্পর্কে নানা ভুল ধারণায় আক্রান্ত। কেউ বলে— “আল্লাহ কেন এমন করলেন?” কেউ বলে “আল্লাহর বিধানে কী লাভ?”

কেউ বলে— “এটা কি সম্ভব?”

একজন মুমিনের উত্তর—

সুবহানাল্লাহ। অর্থাৎ— আমার জ্ঞান সীমিত, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অসীম। আমি ভুল করতে পারি, আল্লাহ ভুল করেন না। আমি সব বুঝি না, কিন্তু আল্লাহ সব জানেন।

◾ সাহাবায়ে কেরামের জীবন

সাহাবারা ছোট ছোট যিকিরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন।

তাদের জীবনে যিকির ছিল শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো।

বাজারে, সফরে, যুদ্ধে, মসজিদে, বাড়িতে—সর্বত্র তাদের জিহ্বা আল্লাহর স্মরণে সজীব থাকত। এ কারণেই তাদের হৃদয় ছিল শক্তিশালী, ঈমান ছিল দৃঢ় এবং জীবন ছিল বরকতময়।

◾আমাদের বাস্তবতা

আজ আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার করি।

অপ্রয়োজনীয় কথায় সময় নষ্ট করি। কিন্তু প্রতিদিন ১০০ বার “সুবহানাল্লাহ” বলার সময় পাই না। কিয়ামতের দিন অনেক মানুষ আফসোস করবে এত সহজ আমল কেন করলাম না? কেন আমার জিহ্বা আল্লাহর যিকিরে ব্যস্ত ছিল না?

◾সুবহানাল্লাহ বলার উপযুক্ত সময়

১. ফরজ নামাজের পর।

২. সকাল-সন্ধ্যার যিকিরে।

৩. ঘুমানোর আগে।

৪. সফরে।

৫. অবসর সময়ে।

৬. কোনো সুন্দর দৃশ্য দেখলে।

৭. আল্লাহর কুদরত দেখে।

৮. দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে।

করণীয়

◾আজ থেকে আমরা তিনটি আমল শুরু করতে পারি—

১. প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার

سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ

পড়ব।

২. ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার

سُبْحَانَ اللهِ

পড়ব।

৩. জিহ্বাকে সবসময় যিকিরে অভ্যস্ত করব।

◾ একদিন পৃথিবীর সব শব্দ থেমে যাবে।ক্ষমতা থেমে যাবে। সম্পদ থেমে যাবে। মানুষ থেমে যাবে। কিন্তু যে জিহ্বা আল্লাহর যিকিরে সিক্ত ছিল, সেই যিকির তার জন্য নূর হয়ে থাকবে।

আসুন, আমরা আজ থেকেই নিজেদেরকে তাসবীহর মানুষ বানাই। বারবার বলি—

سُبْحَانَ اللهِ

سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ

سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ

আল্লাহ তাআলা আমাদের জিহ্বাকে তাঁর যিকিরে সজীব রাখুন, আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন এবং যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

Scroll to Top