রাসূলুল্লাহ ﷺ এক গভীর বাস্তবতার ব্যাপারে বহু আগেই আমাদের সতর্ক করে গিয়েছেন—
«وَنَشْوٌ يَتَّخِذُونَ الْقُرْآنَ مَزَامِيرَ، يُقَدِّمُونَ الرَّجُلَ لَيْسَ بِأَفْقَهِهِمْ وَلَا بِأَعْلَمِهِمْ، مَا يُقَدِّمُونَهُ إِلَّا لِيُغَنِّيَهُمْ»
“একদল লোক হবে যারা কুরআনকে সুর-লহরীর বস্তু বানাবে। তারা এমন ব্যক্তিকে সামনে আনবে, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে ফকীহ নয়, সবচেয়ে জ্ঞানীও নয়; তাকে তারা শুধু এজন্যই সামনে আনবে যে সে তাদেরকে সুন্দর সুরে শুনাতে পারে।”
আজ চারপাশের বাস্তবতা দেখলে হাদিসটির প্রাসঙ্গিকতা বিস্ময়করভাবে অনুভূত হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ইমাম নির্বাচন, তারাবীর হাফেজ নির্বাচন কিংবা কুরআন তিলাওয়াতের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় প্রথম প্রশ্ন হয়—“কণ্ঠ কেমন?”
কিন্তু খুব কমই প্রশ্ন করা হয়—
তিনি কতটুকু ফকীহ?
নামাজের মাসআলা জানেন কি?
কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান কতটুকু?
দ্বীনি প্রজ্ঞা ও তাকওয়া কেমন?
ফলে এমন দৃশ্য দেখা যায় যে, ফিকহে গভীর, ইলমে সমৃদ্ধ, মাসআলায় পারদর্শী আলেম সমাজে উপেক্ষিত হয়ে পড়েন। আর কেবল সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী ব্যক্তি, যদিও ইলম ও ফিকহে দুর্বল, অনেক সময় সম্মান ও নেতৃত্বের আসনে বসে যান।
নিশ্চয়ই সুন্দর কণ্ঠ আল্লাহর একটি বড় নিয়ামত। ইসলাম কখনো সুন্দর তিলাওয়াতকে নিরুৎসাহিত করেনি। কিন্তু সুন্দর কণ্ঠ কখনো ইলম, ফিকহ, তাকওয়া ও প্রজ্ঞার বিকল্প হতে পারে না।
নবী ﷺ ইমামতির ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম “أقرؤهم لكتاب الله” এবং এরপর “أعلمهم بالسنة”-এর কথা বলেছেন। অর্থাৎ নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো যোগ্যতা, জ্ঞান ও দ্বীনি প্রজ্ঞা।
যখন সমাজ এই মানদণ্ড উল্টে দেয়, তখন যোগ্য ব্যক্তিরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন এবং অযোগ্য ব্যক্তিরা সামনে চলে আসেন। তখন শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজই সঠিক দিকনির্দেশনা হারাতে শুরু করে।
আজ আমাদের অন্যতম বড় সংকট হলো—যোগ্য মানুষকে তুচ্ছ করা এবং অযোগ্য মানুষকে অতিরিক্ত সম্মানিত করা। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিবর্তে কণ্ঠ, জনপ্রিয়তা, বাহ্যিক চাকচিক্য কিংবা আবেগকে নেতৃত্বের মাপকাঠি বানিয়ে ফেলা।
সময় এসেছে নববী মানদণ্ডে ফিরে যাওয়ার।
ইমাম, খতিব, শিক্ষক ও দ্বীনি নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে—ইলম, ফিকহ, আমল ও তাকওয়া; এরপর সুন্দর কণ্ঠ ও অন্যান্য গুণাবলী।
অন্যথায় অজান্তেই আমরা সেই সময়ের অংশ হয়ে যাব, যে সময় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করে গিয়েছেন।