আজকের বাংলাদেশ বিভক্ত। নানা মতভেদে বিভক্ত, নানা দলে বিভক্ত,মসজিদে বিভক্ত,মিম্বরে বিভক্ত,এমনকি একই কিবলার মুসলমান—একে অপরের বিরুদ্ধে বিভক্ত। আজকের বাংলাদেশ শুধু রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত নয়। মানসিকভাবে বিভক্ত, চিন্তাগতভাবে বিভক্ত, দাওয়াত ও সংগ্রামের কৌশলগতভাবে বিভক্ত।
অথচ ইতিহাস আমাদের এক কঠিন সত্য শেখায়—
আধিপত্যবাদ মোকাবেলা বক্তৃতা দিয়ে নয়, ঐক্য দিয়ে করতে হয়। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। কারণ একতা মানে শক্তি।শক্তি আছে তো ধর্ম আছে।শক্তি নেই তো ধর্ম নেই।ইতিহাস এই কথার সাক্ষী।
আজকের বিশ্বব্যবস্থা কার হাতে?
আধিপত্যবাদীদের হাতে। রাজনৈতিক আধিপত্য, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক আধিপত্য। এই আধিপত্য ভাঙতে হলে—
একটি পূর্ণ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কিন্তু ঐক্যের পথ কী? সর্বপ্রথম ইসলামপন্থীদের সমস্ত মতভেদ ভুলে এক পতাকার নিচে দাঁড়াতে হবে। তারপর—দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এটাই নববী পদ্ধতি। এটাই রাসূল ﷺ এর কৌশল।
ইসলাম পূর্ব আরব: বিভক্ত, তুচ্ছ, অপমানিত
ইসলাম আসার আগে আরব কেমন ছিল? গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ। ৪০ বছর যুদ্ধ, যুদ্ধের কারণ একটি উট। মেয়ে সন্তান তারা জীবন্ত কবর দিত। কি ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা। তাদের ছিলনা কোন রাষ্ট্র ছিল না কোন সম্মান। পৃথিবীতে তাদের কোন মূল্য ছিল না।
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন—
وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا
“তোমরা আগুনের গর্তের কিনারায় ছিলে, আল্লাহ তোমাদের সেখান থেকে উদ্ধার করেছেন।” (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)
বিভক্ত এ সমাজকে প্রিয় রাসূল ﷺ কী করলেন? তিনি সর্বপ্রথম তাদের এক করলেন। মদিনায় পৌঁছে তিনি—মুহাজিরদের এক করলেন।আনসারদের এক করলেন ইসলামপন্থীদের এক পতাকার নিচে আনলেন। তারপর ধাপে ধাপে— পুরো সমাজকে ঐক্যের বন্ধনে আনলেন।
আল্লাহ বলেন— وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ ۚ لَوْ أَنفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مَّا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ
“তুমি যদি পৃথিবীর সব সম্পদ ব্যয় করতে, তবুও তাদের অন্তরগুলোকে এক করতে পারতে না; আল্লাহই তাদের এক করেছেন।” (সূরা আনফাল: ৬৩)
একজন বললেন: “এ আমার বাড়ি, অর্ধেক তোমার।”
এই ঐক্যই তাদেরকে কোথায় নিয়ে গেল? পৃথিবীর নেতৃত্বে।
ঐক্য = বিজয়, বিভক্তি = ধ্বংস
আল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা—
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ “তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; করলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি লোপ পাবে।”(সূরা আনফাল: ৪৬)
আজ আমাদের শক্তি গেল কেন? কারণ আমরা—ভাইকে ভাই মনে করি না। একে অপরকে কাফের বানাই। শত্রুর আগে নিজের ভাইকে আঘাত করি।
রাসূল ﷺ বলেছেন—الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ। “এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই।” (বুখারি, মুসলিম)
কিন্তু আজ এই ভাইকে আমরা—ফেসবুকে হত্যা করি। মুসলমানকে কাফের বলি। মিম্বরে হত্যা করি। মুসলমানকে প্রতিপক্ষ করি। রাজনীতিতে হত্যা করি, দ্বীন প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে হারাম বলি। অথচ কুফর প্রতিষ্ঠার রাজনীতির ব্যাপারে কোন ফতোয়া নেই।
আধিপত্যবাদ মোকাবেলায় নববী অগ্রাধিকার।
এখানে একটি গভীর নববী শিক্ষা আছে— রাসূল ﷺ জানতেন—একসাথে দুই শত্রুর সাথে যুদ্ধ করা যাবে না।
একদিকে—কুরাইশ, ইহুদি আধিপত্য, বহিরাগত শক্তি
আরেকদিকে মদিনায় মুনাফিকদের অপতৎপরতা।
তিনি কী করলেন? প্রথমে আধিপত্যবাদীদের মোকাবেলা করলেন। ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখতে মুনাফিকদের ব্যাপারে দীর্ঘ সময় নীরব থাকলেন।
কেন? কারণ—ঐক্য ভাঙলে যুদ্ধ জেতা যায় না।
হাদিসে এসেছে—
لَا يَتَحَدَّثُ النَّاسُ أَنَّ مُحَمَّدًا يَقْتُلُ أَصْحَابَهُ “মানুষ যেন না বলে—মুহাম্মদ নিজের লোকদের হত্যা করে।”(বুখারি)
এই এক বাক্যে প্রিয় রাসূলের বিশ্বজয়ের পুরো কৌশল লুকিয়ে আছে।
মুনাফিকদের ব্যাপারে কঠোরতা তিনি করেছেন কিন্তু তা কখন?
মদিনার সমাজে মুনাফিকরা ছিল। তারা নানারকম ষড়যন্ত্র করত। প্রিয় রাসূলকে ও সাহাবীদের অপমান করত।
তবুও রাসূল ﷺ— যতক্ষণ পর্যন্ত আধিপত্যবাদীরা সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত না হয়েছে, ততক্ষণ ঐক্য ভাঙে—এমন কোনো পদক্ষেপ নেননি। ধৈর্য ধারণ করেছেন।
কিন্তু যখন—মক্কা বিজয় হলো, আধিপত্যবাদ ভেঙে পড়ল, ইসলাম রাষ্ট্রীয় শক্তি পেল।
তখন? তখন মুনাফিকদের মুখোশ খুলে গেল। তখন প্রিয় রাসুল কঠোর হলেন। কঠোর নীতি দেখা গেল। তখন সূরা মুনাফিকুন নাজিল হলো। সূরা তওবা নাযিল হলো। আল্লাহ প্রিয় রাসূলকে কঠোরতা শিখালেন। এটাই টাইমিং।
আফগানিস্তান: ঐক্যের জীবন্ত উদাহরণ
একবার আফগানিস্তানের দিকে তাকান।
১. রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
বিশ্ব পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন। ট্যাংক, বিমান, পরমাণু শক্তি—আর আফগানদের হাতে কী ছিল?
ঈমান আর ঐক্য। ১০ বছর যুদ্ধ করে রাশিয়া মাথা নিচু করে ফিরেছে।
২. আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি। ২০ বছর যুদ্ধ। ট্রিলিয়ন ডলার খরচ
কিন্তু শেষ দৃশ্য কী? আফগানরা কাবুলে, আমেরিকা বিমানবন্দরে।
কেন? কারণ তারা এক ছিল।
রাসূল ﷺ বলেছেন— يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ
“আল্লাহর সাহায্য জামাআতের সাথে।” (তিরমিজি)
আজকের আফগানিস্তান: ধ্বংস থেকে ঘুরে দাঁড়ানো।
আজ আফগানিস্তান—নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই রক্ষা করছে, বিদেশি সেনা নেই, সুদ বন্ধ, অশ্লীলতা বন্ধ, ইসলামি পরিচয় দৃঢ়
সব নিখুঁত নয়—কিন্তু একটা জিনিস আছে— ঐক্য।
আর ঐক্য থাকলে— আজ না হোক কাল— উন্নতি আসবেই।
আফগানিস্তান যদি তখন—নিজেদের ভেতরে যুদ্ধ করত
একে অপরকে শত্রু বানাতৌ, নেতৃত্ব নিয়ে লড়াই করত
তাহলে কি রাশিয়া হারত? আমেরিকা হারত?না।
তারা জিতেছে কারণ— তারা আগে এক হয়েছে তারপর শত্রুর মোকাবেলা করেছে।
বাংলাদেশ ও আমাদের দায়িত্ব
আমরা সংখ্যায় কত? ১৬–১৭ কোটি।
যদি আমরা—এক কিবলার হই, এক উম্মাহ হই, মতভেদে শত্রু না হই
পৃথিবীর কোনো পরাশক্তি আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।
যুদ্ধ হবে,লড়াই হবে—কিন্তু জিতবে কারা? যারা ঐক্যবদ্ধ।
আজ আমাদের সামনে প্রশ্ন— আমরা কি আগে নিজেদের মধ্যে লড়ব? নাকি আগে আধিপত্যবাদ মোকাবেলা করব?
নববী উত্তর স্পষ্ট— আগে ইসলামপন্থীদের ঐক্য তারপর জাতীয় ঐক্য তারপর আধিপত্যবাদ মোকাবেলা তারপর ভেতরের ফিতনা সংস্কার
এর উল্টো করলে— আমরা হারব।