একটি বছর শেষ হয়ে নতুন একটি বছর শুরু হতে যাচ্ছে। এই বছর যারা আমাদের সাথে ছিল। কেউ বাবা হারিয়েছে। কেউ মা হারিয়েছে। কেউ সন্তান হারিয়েছে। আর কেউ কেউ এই বছরই কবরের বাসিন্দা হয়ে গেছে। একটি বছরে অনেক কিছুই ঘটেছে। এই সব অতিত। একটি বছর শেষ। ২০২৫ আর ফিরবে না।
আল্লাহ বলেন: كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
“প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে।”
(সূরা আলে ইমরান: 185)
আমরা বেঁচে আছি। কিন্তু আমাদের পালা যে কখন আসবে, আমরা জানি না। তবে আসবে। এটা নিশ্চিত।
আজ ২০২5 সালের শেষ জুমা। 2025 সাল আমাদের জীবনের হায়াতের অংশ ছিল।
সময় কথা বলে, সাক্ষ্য দেয়। সময় কখনো নিরপেক্ষ না। সময়কে আমরা আমাদের মনে করেছি এটা আসলে আমাদের ছিল না। এটা আমাদের কাছে আমানত ছিল। প্রতিটি মুহূর্ত সময় অপচয়ের জবাবদিহিতা আছে।
আল্লাহ বলেন— وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ
“সময়ের কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।”
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন:
“এই একটি সূরাই মানুষের হিদায়াতের জন্য যথেষ্ট।”
কারণ এতে আছে সময়ের মূল্য, মানুষের ক্ষতি এবং ক্ষতি থেকে মুক্তির পথ তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৫ সালের এই ‘আসর’—এই সময়—আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে না তো?
২০২5 সাল আমাদের জীবন থেকে চলে যাচ্ছে—
কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি। এই বছরটা আমাদের থেকে কী নিয়ে গেল?
আমাদের সময়, আমাদের যৌবনের কিছু অংশ, আমাদের সুযোগ, আমাদের কিছু ভাই আপনজন।
আজ তারা কথা বলতে পারত—কিন্তু পারছে না।
আর আমরা কথা বলতে পারছি।
আজ নিজেকে প্রশ্ন করুন—
এই বছরে আমার নামাজ কেমন ছিল। সময়মতো, না কাজ শেষ হলে। কোরআনের সাথে সম্পর্ক কেমন ছিল। উপার্জন কি হালাল ছিল। আমি কি কারো হক নষ্ট করেছি। আমার জিহ্বা কি মানুষকে কাঁদিয়েছে।
রাসুল ﷺ বলেন “বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।” (তিরমিযি)
আমরা হিসাব না নিলে—কবর আমাদের হিসাব নেবে।
২০২৫ বিদায় নিচ্ছে। ২০২৬ আসছে। আমরা কিভাবে 2025 কে বিদায় দিব আর 2026 থেকে কিভাবে স্বাগত জানাব।
ইসলামে একজন মুমিনকে প্রতিটি কাজের শুরু এবং শেষ শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কাজের শুরু কিভাবে হবে। রাসূল ﷺ বলেন:
كُلُّ أَمْرٍ ذِي بَالٍ لَا يُبْدَأُ فِيهِ بِبِسْمِ اللَّهِ فَهُوَ أَبْتَرُ
(البيهقي، 660
প্রিয় রাসুল আরও বলেন— إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
“নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।”
(সহিহ বুখারি: 1, মুসলিম: 1907)
প্রশ্ন:
নতুন বছর শুরু হচ্ছে—
আমাদের নিয়ত কী? আমরা নতুন বছর নতুন জীবন কিভাবে শুরু করতে যাচ্ছি।
আল্লাহকে খুশি করে না আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে।
কাজের শেষ ও হিসাব
আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ
“হে মুমিনগণ! প্রত্যেকে যেন দেখে সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে।” (সূরা আল-হাশর: 18)
রাসূল ﷺ বলেন:
لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ…
“কিয়ামতের দিন বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
(তিরমিজি: 2417)
আমাদের জীবন থেকে একটি বছর শেষ হচ্ছে। আমরা বছরটা কিভাবে শেষ করছি।
আল্লাহ সন্তুষ্টিতে না আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে।
ইসলাম এমন দ্বীন যেখানে কাজ শুরু করাও ইবাদত, কাজ শেষ করাও ইবাদত।
দোয়া ও আল্লাহর দিকে রুজু: মুমিনের অস্ত্র
আল্লাহ বলেন: ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
(সূরা গাফির: 60)
রাসূল ﷺ বলেন: الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ “দোয়াই ইবাদত।” (তিরমিজি: 2969)
আজ প্রশ্ন— আমরা কি নতুন বছর শুরু করছি দোয়া দিয়ে, নাকি ডিজে, গান আর মাদকের আগুন দিয়ে? অপব্যয় আর অপচয়ের উৎসব দিয়ে।
বছর শেষ ও নতুন বছর শুরু: ইসলামী করণীয়
আল্লাহ বলেন: وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ
(সূরা আন-নূর: 31)
রাসূল ﷺ বলেন: التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
“যে তওবা করে, সে এমন যেন তার কোনো গুনাহই নেই।” (ইবনে মাজাহ: 4250)
যৌক্তিক প্রশ্ন:
যে বছর গুনাহ দিয়ে শুরু হয়,
সে বছর থেকে কি কল্যাণ আশা করা যায়?
ইসলাম নামাজ দ্বারা দিন শুরু নামাজ দ্বারা দিন শেষ করা আমাদের উপর ফরজ করেছে। ইসলাম কামনা করে প্রতিটি দিনের শুরুতে এবং শেষে আমরা যেন ইবাদতে থাকি। দিনের ব্যাপারে যখন এই বিধান তাহলে একটি বছর কি গান বাজনা দ্বারা শুরু হবে এবং গান-বাজনা দ্বারা শেষ হবে।
আমাদের সিদ্ধান্ত কি। আমরা কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করব না আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করব। কোন পথে আমাদের কল্যাণ এবং সফলতা।
বর্ষ উদযাপন: আনন্দ না আত্মহনন?
আল্লাহ বলেন: وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ
(সূরা বাকারা: 168)
আজ যা হচ্ছে রাতভর গান, নেশা, অশ্লীলতা, আতশবাজি এগুলো সংস্কৃতি নয়। এগুলো শয়তানের প্রজেক্ট।
মাদক ও অপচয়: ঈমান ধ্বংসের পথ
রাসূল ﷺ বলেন: كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ خَمْرٍ حَرَامٌ
(সহিহ মুসলিম: 2003)
আল্লাহ বলেন: إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
(সূরা ইসরা: 27)
প্রশ্ন:
একদিকে বাবা ঋণে ডুবে আছে, অন্যদিকে ছেলে আতশবাজিতে আগুন পোড়ায়,
এটা কি আনন্দ, না অকৃতজ্ঞতা? এই পরিবার কি বিপদমুক্ত হবে না আরো বিপদগ্রস্ত হবে।
প্রশ্ন: সবাই করছে—তাই কি আমি করব?
উত্তর: وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ
(সূরা আনআম: 116)
সবাই আল্লাহর নাফরমানি করছে। সেই সময় আমি আল্লাহকে সেজদা করে আনুগত্য প্রকাশ করব। আমি তো সবার মত নই। আমি ব্যতিক্রম। কারণ আমি মুসলিম আমি অনুগত।
২০২5 সালের আমাদের সমাজ আমাদের দেশ কেমন ছিল। ২০২৬ আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।
একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হত্যা নৈরাজ্য, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে অর্থনৈতিক চাপ, তরুণ সমাজের মাঝে অস্থিরতা, পরিবারে অশান্তি
আমাদের প্রয়োজন সমাধান। আমরা স্বস্থি ও শান্তি চাই।
কিন্তু আমাদের সমস্যা হল আমরা সবকিছুর সমাধান খুঁজছি আল্লাহকে বাদ দিয়ে। আর এটাই চূড়ান্ত আল্লাহকে বাদ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
আল্লাহ বলেন—
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا
“যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবন সংকীর্ণ হয়ে যায়।”
আজ অশান্ত সমাজের মূল কারণ—
নামাজ ছাড়া জীবন, কুরআন ছাড়া সিদ্ধান্ত, তাকওয়া ছাড়া রাজনীতি, আখিরাত ছাড়া পরিকল্পনা।
আজকের খুতবা হতাশার জন্য নয়।
আল্লাহ বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ
“হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ—আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
আজ শেষ জুমা—
কিন্তু আল্লাহর দরজা শেষ নয়। হয়তো এই জুমাই কারো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। কারো শেষ সতর্কবার্তা হবে।
নতুন বছর আসছে কিন্তু নতুন বছর নিজে থেকে ভালো হয় না। ভালো মানুষই ভালো বছর বানায়।
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ—জীবনের মেরুদণ্ড। দৈনিক কুরআনের সাথে সম্পর্ক। তওবা ও ইস্তিগফার
নিজের চরিত্র। মিথ্যা পরিহার। জিহ্বার সংযম। আমানতদারি। রাসুল ﷺ বলেন—
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।”
পরিবার ও সমাজ
পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ। সন্তানদের সময় দেওয়া। সমাজে ফেতনা নয়—ফায়দা হওয়া।
হয়তো আরেকটি বছর আমরা পাবো না।
হয়তো আরেকটি শেষ জুমা আমাদের নসিবে নেই।
আজ সিদ্ধান্ত নিন— আমি বদলাবো।
আসুন নতুন বছরে সুন্দর একটি ঘর বানাই। সেই ঘর হল কবর। মৃত্যুর পরের প্রথম ঘর। আসুন নিজের কবরটাকে সুন্দর করি।
এই কবরই সেই ঘর যেখানে নেই কোনো জানালা, নেই কোনো দরজা। শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথও নেই। এই মুহূর্তেই আমরা দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে পারি।আমার সবকিছু—সম্পদ, পরিবার, পরিচয়—সবই থেকে যাবে।
কবরের সেই ঘরে থাকবে না ফোন, থাকবে না আলো,
থাকবে না কোনো শব্দ, কোনো কণ্ঠস্বর। সঙ্গী হবে শুধু আমল।
আসুন একটু কল্পনা করি আজই আমাকে দাফন করা হলো। ঠিকানা হয়ে গেল—কবর। যতক্ষণ না আল্লাহ কিয়ামতের অনুমতি দেন…হয়তো এক লক্ষ বছর,
হয়তো তারও বেশি— কে জানে এই অপেক্ষা কত দীর্ঘ হবে?
এই কবরকে সাজাতে হবে আমল দিয়ে। প্রতিটি ইস্তিগফার—এক একটি জ্বলে ওঠা বাতি,
প্রতিটি তাসবিহ—আমার পাশে ফুটে থাকা একটি ফুল,
প্রতিটি রাকাআত সালাত—মাটির নিচে রাখা একটি নরম বালিশ, আর নিজের জন্য করা কুরআন খতম—নূরের একটি ছাদ, যা আমাকে ঢেকে রাখবে।
প্রতিটি সদকা = একটি খেজুরগাছ , প্রতিটি জিকির = প্রবাহমান পানির ঝর্ণা, নবী ﷺ–এর ওপর প্রতিটি দরূদ = নিঃসঙ্গতার মাঝে সান্ত্বনার নূর।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “তাদের কোনো ভয় নেই, তারা দুঃখিতও হবে না।”তুমি কি জানো—এই ঘোষণা শহীদদের ও দানশীলদের ব্যাপারে এসেছে?
শুধু তারা মারা গেছে বলে নয়—বরং তারা মৃত্যুর আগে উত্তম বীজ বপন করেছিল বলেই।
কিন্তু কল্পনা করো আরেকটি দৃশ্য…
মৃত্যুর পর তোমার জন্য অপেক্ষা করছে শুধু
গিবত, পরনিন্দা আর জুলুমের বোঝা! তুমি কবরের ভেতর ঢুকলে—আর সেখানে নেই কিছুই…
অন্যায়ের বোঝা নিয়ে কবরের অন্ধকারে পড়ে থাকা,
জাহান্নামে যাওয়ার আগেই জাহান্নামের ছোঁয়া অনুভব করা—কেমন হবে সেই সময়টা?
দুনিয়ার কয়েকটি ক্ষণিক মুহূর্তের জন্য
আখিরাত ধ্বংস করা এটাই কি বুদ্ধিমানের কাজ ছিল?
আসুন দোয়া করি। হে আল্লাহ!
২০২5 সালের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিন
আমাদের তওবা কবুল করুন। ২০২6 সালকে আমাদের জন্য ঈমান, আমল, নিরাপত্তা ও বরকতের বছর বানিয়ে দিন।