নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা নিয়ে জরুরী পর্যালোচনা

বিগত ১৯ এপ্রিল নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন 318 পৃষ্ঠা ব্যাপী একটি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করে। প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় এই প্রস্তাবনা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন এবং এই প্রস্তাবনাকে ব্যাপকভাবে পাঠ্যপুস্তক এর মত প্রচারের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

এ কমিশনের সুপারিশ গুলো ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে চরম আপত্তিকর। এই সুপারিশগুলোর মাঝে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় আইনগুলোকে বৈষম্যমূলক এবং তা বিলুপ্ত করার আহ্বান করা হয়েছে। এই প্রস্তাবনায় বিয়ে তালাক অভিভাবক ও উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রে এ দেশের জনগণের উপর জাতিসংঘ প্রণীত পশ্চিমা আইন বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। ‌ এটা বাস্তবায়ন হলে আইনি দিক দিয়ে আমাদের হতে হবে ধর্মত্যাগী, পশ্চিমাদের অনুসারী। এদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় আইন অনেক আগেই বিলুপ্ত করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দ্বারা আইনগতভাবে আমাদের পারিবারিক সামাজিক জীবন থেকেও ধর্ম বিলুপ্ত হবে। বিয়ে-শাদী পারিবারিক জীবন থেকেও ধর্ম বিদায় হয়ে যাবে।

একজন মুসলিম হিসাবে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দেয়া বিধি-বিধানগুলো কোনভাবেই বৈষম্যমূলক নয় বরং ন্যায্য।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধি-বিধান গুলোর উদ্দেশ্য জুলুম ও অবিচারের ময়লা আবর্জনা মুক্ত একটি চমৎকার পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আইনের মাঝে কোন পক্ষপাতিত্ব নেই। তিনি শ্রেষ্ঠতম বিচারক এবং হাকিম। কুরআনে কারিমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্য আলোচনা করতে যেয়ে এরশাদ করেন।

{ إِنَّمَا یُرِیدُ ٱللَّهُ لِیُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَیۡتِ وَیُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِیرࣰا }

[Surah Al-Aḥzāb: 33]

{ وَیُرِیدُ ٱللَّهُ أَن یُحِقَّ ٱلۡحَقَّ بِكَلِمَـٰتِهِۦ }

[Surah Al-Anfāl: 7]

مَا یُرِیدُ ٱللَّهُ لِیَجۡعَلَ عَلَیۡكُم مِّنۡ حَرَجࣲ وَلَـٰكِن یُرِیدُ لِیُطَهِّرَكُمۡ وَلِیُتِمَّ نِعۡمَتَهُۥ عَلَیۡكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ

[Surah Al-Māʾidah: 6]

একজন মুসলিম হিসেবে আল্লাহর সাথে আমাদের একটি অঙ্গীকার আছে। আর সে অঙ্গীকার হলো আমরা আল্লাহর দেয়া বিধি বিধান মেনে চলবো। আর সে অঙ্গীকার হলো-

{ إِیَّاكَ نَعۡبُدُ وَإِیَّاكَ نَسۡتَعِینُ }

[Surah Al-Fātihah: 5]

একজন মুসলিম হিসেবে ঈমান গ্রহণের মাধ্যমে আমরা আল্লাহকে কথা দিয়েছি হে আল্লাহ আমরা একমাত্র তোমারই এবাদত করি। অন্য কারো এবাদত করিনা।

আল্লাহর এবাদতের অর্থ হলো আমরা একমাত্র আল্লাহকেই আদেশ-নিষেধ করার উপযুক্ত মনে করি অন্য কাউকে না। আমরা একমাত্র আল্লাহর দেয়া বিধি-বিধানকেই মান্য করি আল্লাহর বিপরীতে অন্য কারো তৈরি করা বিধি-বিধান গ্রহণ করি না।

কাজেই একজন মুমিন আল্লাহর যে বিধি-বিধানগুলো অমান্য করে মুমিন থাকতে পারে না। এই অবস্থায় তার ঈমানের দাবী হয়ে যায় মিথ্যা আর ভন্ডামী। আল্লাহর বিধি-বিধান গুলো ন্যায্য। এর মাঝে আমাদের কোন ধরনের সন্দেহ নেই। ‌ আল্লাহর বিধি-বিধান গুলোকে অন্যায় এবং জুলুম বৈষম্যমূলক বলা আল্লাহর সাথে সরাসরি বিদ্রোহ করা। এটা বিশ্বাসীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা।

একজন মুসলিম হিসেবে আমরা মনে করি আইন প্রনেতা একমাত্র আল্লাহ। মানুষ আইন প্রণতা হতে পারে না। আর মানুষের তৈরি করা আইন জুলুম ও অবিচারের ময়লা আবর্জনা মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারে না।

নারী বিষয়ক সংস্থার কমিশনের প্রতিবেদনে অনেকগুলো আপত্তিকর বিষয় একত্রিত হয়েছে। প্রথমত পূর্ণ প্রতিবেদনে নারী উন্নয়নের পথে ধর্মীয় বিধি বিধানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অধিকাংশ প্রস্তাবনা দ্বারা ধর্মীয় বিধি-বিধান বিলুপ্ত করে জাতিসংঘ প্রণীত পশ্চিমা রীতিনীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

লম্বা প্রতিবেদনের ৩৩ তম পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইনে নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান। যেমন বিয়ে তালাক অভিভাবকত্ব ও উত্তরাধিকার।

প্রতিবেদনটির ৩৭ তম পৃষ্ঠায় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে নারীর যৌন পেশাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত না করা এবং শ্রম আইনে একটি স্বীকৃতি দেয়া। অন্যদিকে প্রতিবেদনটির ৩৯ তম পৃষ্ঠায় প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে আইন সংশোধন করা।

এই প্রস্তাবনা চরম আপত্তিকর। এই প্রস্তাবনা এ দেশের সভ্যতা সংস্কৃতি কালচারের সাথে সাংঘর্ষিক। এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে পারিবারিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই প্রস্তাবনায় নিকৃষ্ট হারাম সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে আর আল্লাহ যা হালাল করেছেন এটাকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এখানে জিনাকে দেওয়া হচ্ছে বৈধতা আর বৈবাহিক সম্পর্ক কি কঠিন করে তোলা হচ্ছে। কোন অবস্থাতেই এই ভূমিতে এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হতে দেয়া যাবে না।

নারী ও পুরুষের জৈবিক চাহিদা পূরণের বৈধ পদ্ধতি হলো বিবাহ। বিবাহের মাধ্যমে তারা পরস্পর পরস্পরের জন্য হালাল হয়ে যায়। স্বামী এবং স্ত্রী পরিচয়ে তারা একটি নতুন পরিবার গড়ে তোলে। এখানে উভয়ের উভয়ের প্রতি দায়িত্ব এবং কর্তব্য রয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনের মাঝে স্ত্রীর অধিকার এবং স্বামীর দায়িত্বের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিবাহের মাধ্যমে একজন পুরুষ তার স্ত্রীর অভিভাবকত্ব তার ভরণপোষণ তার হেফাজতের জিম্মাদারী গ্রহণ করে।‌ স্বামীকে তুলনা করা হয়েছে দুর্গের সাথে। দুর্গ যেমন সৈনিকদের হেফাজত করে দুর্গের মাঝে সৈনিক যেমন নিরাপদ ঠিক তেমনি একজন স্বামী স্ত্রীকে হেফাজত করে স্বামীর অভিভাবকত্বে একজন স্ত্রী নিরাপদ।

কোরআনে কারীমের মাঝে স্বামীর জন্য স্ত্রীকে তুলনা করা হয়েছে শস্যক্ষেত্রের সাথে। একজন কৃষক তার জমিতে চাষাবাদ করে। জীবন দিয়ে জমিকে হেফাজত করে। জমির কোন অংশ সে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেয় না। ঠিক তেমনি একজন স্বামী স্ত্রোকের মত তার পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে স্ত্রীর নিরাপত্তার জিম্মাদারি পালন করবে। স্ত্রী নিরাপত্তা পাবে স্বামীর অভিভাবকত্বে।

আল্লাহ কুরআনে কারিমে স্পষ্ট করেছেন স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের জন্য আবরণ আর স্বামীরা তাদের স্ত্রীদের জন্য আবরণ। তারা একে অন্যের পরিপূরক। পরস্পর পরস্পরের হক আদায় কারী। তারা একে অন্যের চাহিদা পূরণকারী।

কাজেই বৈবাহিক সম্পর্কের মাঝে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের কথা কেন আসবে। আর এটাকে ধর্ষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আইন কেন হবে। ‌ এখানে বৈধ সম্পর্কে একে অন্যের চাহিদা পূরণে সম্মত থাকবে এবং এটা তাদের এবাদতের অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম জিনাকে হারাম করেছে তার বিবাহকে করেছে এবাদত।

নারী অধিকার সংস্কার কমিশনের এ প্রস্তাব বৈবাহিক সম্পর্কের মাঝে জটিলতা সৃষ্টি করবে। পরিবারগুলোকে জাহান্নামে পরিণত করবে। পশ্চিমা সভ্যতা আমাদের অর্থ দিবে অগ্রগতি দিবে কিন্তু আমাদের থেকে শান্তি স্বস্তি নিরাপত্তা কেড়ে নিবে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ পারিবারিক ব্যবস্থাপনাকে বিলুপ্ত করে দিবে।

আমাদের সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে মতামত দিতে হবে নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা পরিবার আমাদের সমাজবদ্ধ জীবন নিয়ে বাঁচতে চাই।

বাংলাদেশ এ মুহূর্তে বিপজ্জনক একটি সময় অতিবাহিত করছে। বৈশ্বিক পরাশক্তি গুলো বাংলাদেশ নিয়ে খেলতে চাচ্ছে। দ্বীন ঈমান পরিবার সমাজ হেফাজতে আমাদেরকে হতে হবে সতর্ক।

Scroll to Top