সূরা নাসরের সারসংক্ষেপ আলোচনা

নাসর শব্দের অর্থ সাহায্য করা। ‌ সূরা নাসর কুরআনে কারীমের ছোট একটি সূরা। এই সূরায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহকে এবং মুসলমানদেরকে বিজয়ের সুসংবাদ দান করেছেন। এবং রাসূলুল্লাহকে বিজয়ের এ সাফল্য টিকিয়ে রাখার পদ্ধতি বলে দিয়েছেন।

এই সূরা গভীরভাবে পাঠ করলে বুঝা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় রাসূলকে দাওয়াতের যে মিশন এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে জিম্মাদারী দিয়ে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তা সফল হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে রাসুলুল্লাহর বিজয় হবে। তিনি চোখের সামনে দেখতে পাবেন আরবের লোকেরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করছে।

এই সূরা কখন নাযিল হয়েছিল সে সম্পর্কে দুটি বর্ণনা আছে। একটি বর্ণনা হল এই সূরা আরাফা অথবা মিনা ময়দানে বিদায় হজের সময় নাজিল হয়েছিল। এটি কোরআনে কারীমের সর্বশেষ অবতীর্ণ পূর্ণাঙ্গ সূরা। ‌ এ সুরা যখন নাযিল হয় তখন রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বে সমগ্র আরব আনুগত্য স্বীকার করেছিল এবং রাসূলুল্লাহর জীবদ্দশায় দুনিয়ার সর্বত্র ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছিল। প্রিয় রাসূলের রেখে যাওয়া খেলাফাহ ১০০ বছর পর্যন্ত পৃথিবীতে স্থায়ী ছিল। এই সুরার বিজয় দ্বারা এই বিজয়ই উদ্দেশ্য।

দ্বিতীয় আরেকটি বর্ণনায় আছে হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে এ সুরা নাজিল হয়েছে। এ সূরায় যে বিজয়ের কথা বলা হয়েছে তা হলো মক্কা বিজয়। অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয় হয়। ৬ হিজরীতে প্রিয় রাসুল স্বপ্নে দেখেন তিনি সাহাবীদের সহ মক্কায় প্রবেশ করেছেন এবং ওমরা পালন করছেন। নবীদের স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ হয়ে থাকে তিনি তার স্বপ্নের কথা মদিনায় প্রকাশ করলেন। আর এ স্বপ্নের কথা প্রকাশ করার সাথে সাথে ১৪০০ সাহাবী ওমরা করার জন্য মক্কা যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

এটা ছিল একটা কঠিন সময়। পূর্ণ আরবে একটি থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। কারণ প্রিয় রাসূল মদিনায় হিজরত করে আসার পর এই ৬ বছরে মদিনা থেকে কেউ মক্কায় ওমরা করার সুযোগ পায়নি। কুরাইশেরা চির শত্রু মুসলমানদের নিরাপদে ওমরা করতে দিবে এটা ছিল এক অসম্ভব বিষয়। আরবের একটি ছোট শিশুও এই অবস্থাকে জানত। আর অন্যদিকে এটাও প্রশ্ন ছিল কোরাইশরা কোন যুক্তিতে মুসলমানদের ওমরা পালনে বাধা দিবে। যতই শত্রুতা থাকুক ওমরা পালনে কাউকে বাধা দেওয়ার অধিকার তো কারো নেই। কুরাইশরা বায়তুল্লাহর খাদেম। তারা বায়তুল্লাহর মালিক না। মুসলমানদের বাধা প্রদানের বিষয়টি কেহই সহজ ভাবে নিবে না।

শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা সিদ্ধান্ত নিল ওমরা পালনে মুসলমানদের তারা বাধা দিবে। এবং পূর্ণ আরবে এ কথা প্রচার করে দিবে প্রিয় রাসূলের নেতৃত্বে মুসলমানরা ওমরার জন্য না বরং নাশকতার জন্য বের হয়ে এসেছিল। আল্লাহর রাসূল ছিলেন সতর্ক ভিন্ন পথে তিনি মক্কার কাছাকাছি হুদাইবিদায় পৌঁছলেন। কোরাইশদের সব ধরনের অপতৎপরতা ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলো। আরবের অন্যান্য গোত্র মুসলমানদের ওমরা পালনে বাধা দেয়ার বিরোধিতা করলো। পরিস্থিতি এমন হলো যুদ্ধ করলে কুরাইশরা পরাজিত হবে এবং মুসলমানরা মক্কায় প্রবেশ করবে। এই পরিস্থিতিতে তারা সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে আসলো।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সমস্ত শর্তগুলোকে মেনে নিলেন। হুদাইবিয়াতে ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন হল। এ চুক্তির একটি বিশেষ দিক হল যদিও এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এ বছর ফিরে যেতে হবে ওমরা করা যাবে না।সম্পূর্ণ অন্যায় শর্ত দ্বারা মক্কার কাফেররা মুসলমানদেরকে ওমরা করতে দিল না। এটা ছিল তাদের জাহিলিয়াতের অহমিকা। কিন্তু এই চুক্তির ভিন্ন একটি দিক হলো মুসলমানরা আগামী বছর ওমরা করার সুযোগ পাবে। শর্ত অনুযায়ী মক্কার মুশরিকরা তিন দিনের জন্য মক্কা খালি করে দিবে। হুদাই বিয়ার এ চুক্তিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিজয় ঘোষনা করলেন। হুদাইবিয়া চুক্তির দুই বছর পর মক্কা বিজয় হলো। এই দুই বছরে মক্কার বহু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। আর বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় হল।

কোরআনে কারীমের সূরা নাসের এ বিজয়ের সুসংবাদ।

{ إِذَا جَاۤءَ نَصۡرُ ٱللَّهِ وَٱلۡفَتۡحُ }

[Surah An-Naṣr: 1]

এই আয়াতে বলা হয়েছে যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বিজয় আসেনা। এটাই মুসলমানদের আকিদা বিশ্বাস। আমরা বিশ্বাস করি দুনিয়ার সবকিছু আল্লাহর সিদ্ধান্তেই বাস্তবায়িত হয়। আল্লাহর হুকুমেই হয়ে থাকে। এজন্য বিজয় আর সাহায্য দুটি বিষয়কে একসাথে বলা হয়েছে।

এ বিজয় আল্লাহর দেয়া বিজয়। কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত এ আরবের ভূমি মুসলমানদের জন্য ছিল খুবই সংকীর্ণ। কতটা অসহায় ভাবে প্রিয় রাসূলকে মক্কা থেকে হিজরত করতে হয়েছিল। ছওর পর্বতের চূড়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু বকর কে নিয়ে অবস্থান করছিলেন। শত্রুরা আল্লাহর রাসূলের অবস্থান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আল্লাহর রাসূল সেই অবস্থায় আবু বকরকে সান্ত্বনা সাহস দিয়েছিলেন চিন্তা করো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।

চতুর্থ হিজরীতে খন্দকের যুদ্ধ হয়। চতুর্দিক দিয়ে মুসলমানদের কাফেররা ঘেরাও করে ফেলেছিল। পরিস্থিতি ছিল অত্যান্ত নাজুক ‌। সেই অবস্থায় আল্লাহর সাহায্য আসে।

আল্লাহর হুকুমে প্রিয় রাসূল ওমরা করার জন্য মক্কায় রওনা হয়ে হুদাইবিয়ায় বাধাপ্রাপ্ত হন। তাকে ওমরা না করেই ফিরে আসতে হয়। এর দুই বছর পর বিজয়ীর বেশে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেন। এত বড় ঘটনা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সম্ভব ছিল না।

{ وَرَأَیۡتَ ٱلنَّاسَ یَدۡخُلُونَ فِی دِینِ ٱللَّهِ أَفۡوَاجࣰا (2) فَسَبِّحۡ بِحَمۡدِ رَبِّكَ وَٱسۡتَغۡفِرۡهُۚ إِنَّهُۥ كَانَ تَوَّابَۢا (3) }

[Surah An-Naṣr: 2-3]

২ এবং ৩ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে হে নবী যখন আপনি দেখবেন মানুষ দলে দলে দ্বীনে প্রবেশ করবে তখন সেটা হবে আপনার জন্য সুসংবাদ। কাজেই তখন আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা করবেন এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিজয়ের সুসংবাদের সাথে সাথে আল্লাহর প্রশংসা এবং তাসবীহ পড়ার আহ্বান করছেন। তাসবিহ পড়ার অর্থ হলো আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। বিজয়ের যে নেয়ামত আল্লাহ দিয়েছেন সেই নেয়ামত টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হল এই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন শুকরিয়া আদায়ে দ্বারা আল্লাহ নেয়ামতকে বাড়িয়ে দেন। আর অকৃতজ্ঞতা করা হলে আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন আজাব আসে। শেষ আয়াতে বলা হয়েছে ইস্তেগফার করতে।

ইস্তেগফার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। বিজয়ের সাথে এর একটি সম্পর্ক আছে। বিজয়ীদের প্রতি আল্লাহর আহ্বান বিজয়ের পর তারা যেন বিজিত অঞ্চলে প্রভুক্ত প্রতিষ্ঠা না করে বরং আল্লাহর গোলাম হয়ে মানুষের সেবা করে।

{ وَإِذۡ قُلۡنَا ٱدۡخُلُوا۟ هَـٰذِهِ ٱلۡقَرۡیَةَ فَكُلُوا۟ مِنۡهَا حَیۡثُ شِئۡتُمۡ رَغَدࣰا وَٱدۡخُلُوا۟ ٱلۡبَابَ سُجَّدࣰا وَقُولُوا۟ حِطَّةࣱ نَّغۡفِرۡ لَكُمۡ خَطَـٰیَـٰكُمۡۚ وَسَنَزِیدُ ٱلۡمُحۡسِنِینَ }

[Surah Al-Baqarah: 58]

এই আয়াতটি বনী ইসরাইলের প্রতি নাযিল হয়েছিল। বনি ইসরাইলকে হুকুম দেওয়া হয়েছিল তোমরা বিজয়ের পর ইস্তেগফার করে প্রবেশ কর। তোমরা বিনয় ও নম্রতার পরিচয় দাও। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। বিজয়ের পর ঘোষণা দাও আমরা অন্যায় ভাবে কারো ক্ষতি করব না।

প্রিয় রাসুল যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন কোন রক্তপাত হয়নি তিনি মক্কার সাধারণ নাগরিকদের শান্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। আবু সুফিয়ান সারা জীবন রসুলের বিরোধিতা করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের সময় রসূল বললেন যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে তাদের নিরাপদ। রাসুল বলেছিলেন যারা মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে তারা নিরাপদ, যারা অস্ত্র রেখে দিবে তারা নিরাপদ। যারা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রাখবে তারাও নিরাপদ। এভাবে মক্কা বিজয় হয়েছিল কোন রক্তপাত ছাড়া। মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহর রাসূল মক্কার অধিবাসীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।

এটাই রাসূলুল্লাহর শিক্ষা। ইতিহাস সাক্ষী রসুলের সাহাবারা, পরবর্তী জামানার মুসলমানরা প্রিয় রাসূলের এই নীতি কে ধরে রেখেছে যুগের পর যুগ । তারা বিজয়ের পর প্রতিপক্ষ থেকে কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেনা। বরং প্রতিপক্ষকে ক্ষমা করে দেয়। এটা ইসলামের এমন একটি নীতি তার মাধ্যমে সমাজের মাঝে ঐক্য তৈরি হয়। ইসলাম বিজয়ের পর সব ধরনের বিভক্তি থেকে মুক্ত করে অন্য সমাজকে একটি দেহে পরিণত করে। কারণ একতাই শক্তি। একটা সমাজ যখন ঐক্যবদ্ধ হয় সেই সমাজে ধর্ম ধার্মিকতা শক্তিশালী হয়। আর একটি সময় যখন বিভক্ত হয় সেই সমাজে ধর্ম ধার্মিকতা দুর্বল হয়।

সূরা নাসরের শেষ আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একটি বিশেষ গুন তিনি তওবা কবুলকারী। অর্থাৎ যারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর কাজ করবে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিবেন।

সূরা নাসরে প্রিয় রাসুলের জন্য এবং পূর্ণ উম্মতের জন্য সুসংবাদ রয়েছে। হেদায়েত রয়েছে। এই সুরায় বিজয়ের সুসংবাদের সাথে সাথে বিজয় ধরে রাখার পদ্ধতি বলে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ আমাদের আমল করার তৌফিক দান করুন।

Scroll to Top