কুরআনের সর্বশেষ দুটি সূরাকে বলা হয় মুয়াওওয়াজাতাইন। অর্থাৎ আশ্রয়ে নেওয়া সুরা। এ দুটি সুরার মাধ্যমেই কোরআনে কারিম শেষ হয়েছে।
কোরআন নাজিলের উদ্দেশ্য
************************
কোরআনে কারিম নাযিল হয়েছে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক স্থাপনের জন্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলকে পাঠিয়েছেন এই দাওয়াত দিয়ে আমরা যেন সবসময় আল্লাহর মুখাপেক্ষী থাকি আর আমরা যেন সবকিছু আল্লাহর কাছে চাই। এটাই কুরআনে কারিমের দাওয়াত।
কুরআনের প্রথম সুরা ও শেষ দুই সুরার যোগ সূত্র
*******************************************
কুরআনে কারিমের প্রথম সুরা সুরায়ে ফাতেহায় আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি তিনি যেন আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে সরল পথের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন। পুর্ন কুরআনে কারিম সিরাতে মুস্তাকিমের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা।
কুরআনে কারীমের শেষ এই দুই সূরার বিষয়বস্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সুরার আলোচনা হল আল্লাহর দেখানো পথে চলতে গিয়ে নানাহ ধরনের বাধা আসতে পারে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হতে পারে সে কঠিন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার তদবীর হিসেবে এই শেষ দুটি সূরা আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহর পথে চলতে প্রয়োজন আল্লাহর সাহায্য
******************************************
এই শেষ দুই সূরার শিক্ষা আল্লাহর দেখানো সরল পথে চলতে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। প্রকৃতপক্ষে মানুষের জন্য এই সরল পথে চলা বড় বিপজ্জনক। কারণ বাধা দেওয়ার জন্য কঠিন সত্য পথের মাঝে বসে আছে। এ শত্রুর মোকাবেলা করে সরল পথের শিখর পর্যন্ত পৌঁছতে হবে। এখানেই মানুষের জন্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় মানুষকে আল্লাহই ফেলেছেন। এ পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ তারা সফল। এ পরীক্ষায় যারা ব্যর্থ তারা চিরব্যর্থ।
প্রথম আয়াতের অর্থ
******************
প্রথম শব্দ হলো কুল। এখানে আমাদের সবাইকে সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ আমাদেরকে দোয়া শিক্ষা দিচ্ছেন। তোমরা বলো আমি আশ্রয় চাই।
আমি আশ্রয় চাই
**************
মানুষ আশ্রয় চায় তখন যখন সে আশঙ্কা করে। যখন সে নিজের উপর বিপদ দেখে। যখন সে বুঝতে পারে সে দুঃখ এবং কষ্টের সম্মুখীন হবে। তখন মানুষ আশ্রয় চায় তার কাছে যাকে সে বিশ্বাস করে।
দুনিয়ার নিয়ম হল বিপদ আপদ দেখলে আমরা ঘরে প্রবেশ করি রোগের আক্রমণ হলে ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই। গোলাগুলি চলতে থাকলে মহল্লায় চোর ডাকাতের উপদ্রব দেখা দিলে ঘরের দরজায় তালা লাগাই। নানাভাবে বিপদ থেকে মুক্তির জন্য চেষ্টা করি। আমরা নিজেরাই আত্মরক্ষার চেষ্টা করি এবং আমরা বিপদ থেকে মুক্ত হই।
কখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা
******************************
আমরা যখন নিজে নিজের আত্মরক্ষায় ব্যর্থ হই তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। তখন আমরা বলি এখন আল্লাহ ব্যতীত কোন ভরসা নাই। ঔষধ খেয়ে যদি উপকার না হয় তখন আমরা বলি এখন আল্লাহ ব্যতীত কোন আশা নাই।
আসলে এই কথাটা একটি ভুল কথা। মূলত বিষয় হল আগেও আল্লাহ ব্যতীত কোন আশা ছিল না। ঔষধ আল্লাহর ইচ্ছাতেই উপকারী হত। আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া ঔষধও কিছু করতে পারে না।
কাজেই আমাদের প্রথম প্রয়োজন এই শিক্ষা অর্জন করা আমরা প্রথম শেষ সর্বাবস্থায় আমরা আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী। প্রথমেও আল্লাহর ক্ষমতা শেষেও আল্লাহর ক্ষমতা।
আশ্রয় প্রার্থনার পদ্ধতি
*******************
{ وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَاۤءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ }
[Surah Al-Aʿrāf: 180]
আমরা যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করব প্রার্থনার শুরুতে আল্লাহর গুণাবলী গুলোকে তুলে ধরব। কোরআনে কারীমের সূরার মাঝেও আমাদেরকে আশ্রয় প্রার্থনা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
{ قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلۡفَلَقِ }
[Surah Al-Falaq: 1]
আমি আশ্রয় চাচ্ছি সকালের স্রষ্টার কাছে। অর্থাৎ সেই রব্বুল আলামিনের কাছে তিনি অন্ধকারকে দূর করে আলোর ব্যবস্থা করেছেন।
فَالِقُ ٱلۡإِصۡبَاحِ
এর অর্থ হচ্ছে রাতের অন্ধকার চিঁড়ে তিনি সকাল বের করে আনেন। একটি সকাল একটি নতুন জীবন। সকাল আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ক্ষমতা ও শক্তির এক বিশাল দৃষ্টান্ত।
দ্বিতীয় আয়াতের অর্থ
*******************
{ مِن شَرِّ مَا خَلَقَ }
[Surah Al-Falaq: 2]
এই দ্বিতীয় আয়াতটি প্রথম আয়াতের সাথে মিলিয়ে পাঠ করা চাই। আমি সকালের স্রষ্টার কাছে আশ্রয় চাই তিনি যে সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে।
এই দোয়া একটি ব্যাপক দোয়া। এ পৃথিবীতে আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা। তার কোন অংশীদার নাই। সার্বভৌম নিরঙ্কুশ ক্ষমতার তিনি অধিকারী। আমরা যা কিছু দেখি এবং যা কিছু অদৃশ্য আমরা দেখি না সব আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ এই পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার মাঝে আমার জন্য মন্দ যা যা আছে সবকিছু থেকে আমি মুক্তি চাচ্ছি। এটা এমন এক দোয়া এই একটি দোয়াই যথেষ্ট। এই দোয়ার মাঝে সবকিছু আছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই দোয়া আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।
এর পরবর্তী তিন আয়াতে তিনটি বিশেষ প্রকার অনিষ্ঠ থেকে প্রার্থনা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় আয়াতের অর্থ
*******************
{ وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ }
[Surah Al-Falaq: 3]
অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে যখন সে অন্ধকার গভীর হয়। এখানে অন্ধকার শব্দটির মাঝে ব্যাপকতা রয়েছে। রাতের অন্ধকার হতে পারে। রাতের অন্ধকারে চুরি ডাকাতি হয়। অন্ধকার হলো অকল্যাণের প্রতীক। অপরাধীরা অপরাধের জন্য রাতকে বেঁচে নেই। এই আয়াতে রাতের বেলায় মানুষ যেসব বিপদের সম্মুখীন হতে পারে সেইসব বিপদ থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
রাতে কোন হিংস্র পশু আক্রমণ করতে পারে কোন বিষাক্ত সাপ দংশন করতে পারে কেউ লুটতরাজ করতে পারে চুরি ডাকাতি হতে পারে।
এখানে অন্ধকার পথভ্রষ্টতার অন্ধকার হতে পারে। পাপ ও গুনাহের অন্ধকার হতে পারে। মানুষ যখন গুনাহ করে তার মনের উপর কালো দাগ পড়ে যায়। অন্তর শক্ত হয়ে যায়। হেদায়েত কঠিন হয়ে যায়। তাই এই অবস্থায় আল্লাহর সাহায্যের প্রয়োজন। আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য প্রার্থনা শিক্ষা দিয়েছেন।
চতুর্থ আয়াতের অর্থ
******************
{ وَمِن شَرِّ ٱلنَّفَّـٰثَـٰتِ فِی ٱلۡعُقَدِ }
[Surah Al-Falaq: 4]
ঐ সমস্ত নারীদের অনিষ্ট থেকে যারা গীরার মাঝে ফু দেয়। এই আয়াতে বিশেষ করে জাদু-টোনার অনিষ্ঠতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এখানে গিরা দিয়ে ফু দেওয়ার পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। কারো ক্ষতি করার জন্য এ পদ্ধতি বহু আগেও প্রচলিত ছিল এখনও প্রচলিত আছে।
জাদু সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য
******************************
জাদু সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য হলো জাদু মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কারো ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখেনা উপকারও করতে পারে না। কিন্তু জাদু মানুষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে। জাদুর কারণে মানুষ প্রভাবিত হয়।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে জাদুকরদের ঘটনা কোরআনে আলোচনা করা হয়েছে। জাদুকররা যখন রশি নিক্ষেপ করলেন হযরত মুসা আলাইহিস সালাম সাপ ভেবে ভয় পেয়েছিলেন অথচ তা সাপ ছিল না। তখন আল্লাহ তাকে বললেন তুমি ভয় পেয়ো না তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর। আর লাঠি নিক্ষেপ করার পর সে লাঠি অজ করে পরিণত হলো এবং সে অজগর জাদুকরদের রশি দিয়ে বানানো সাপ গিলে খেতে লাগলো।
ইহুদি সম্প্রদায়ের কয়েকজন আমাদের প্রিয় রাসুলের উপর জাদু করেছিল। তারা রশ্মিতে এবং চুলে গিরা দিয়ে ফু দিয়ে সেসব কুয়ায় নিক্ষেপ করেছিল। এ জাদুর প্রভাব রাসূলুল্লাহর ওপর পড়েছিল। জাদুর প্রভাবে রাসুলুল্লাহ কোন কাজ না করেও মনে করতেন সে কাজে তিনি করেছেন আবার কোন কাজ করেও মনে করতেন সে কাজ তিনি করেননি। এমন কঠিন অবস্থা তৈরি হয়েছিল। রাসূলুল্লাহর কষ্ট হচ্ছিল। কোরআনে কারীমের সূরা জাদুর অনিষ্ঠতা থেকে মুক্তির জন্য আমরা যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই সেই শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
পঞ্চম আয়াতের অর্থ
*******************
{ وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ }
[Surah Al-Falaq: 5]
হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।
হিংসা হলো শয়তানের অস্ত্র। হিংসার ভিত্তি শয়তান শুরু করেছে। আল্লাহ যখন তাকে বললেন যে আদমকে সেজদা কর সে জবাব দিয়েছিল তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ আর মানুষকে সৃষ্টি করেছ মাটি থেকে। আমি মানুষের চেয়ে উত্তম আমি তাকে সেজদা করতে পারি না। এখান থেকেই হিংসার শুরু হয়েছে। কোরআনে কারীমের বহু জায়গায় শয়তানের এই হিংসার আলোচনা আল্লাহ করেছেন।
মক্কায় আবু জেহেলদের প্রিয় রাসুলের বিরোধিতার কারণ ছিল হিংসা। প্রিয় রাসূল ছিলেন বন হাশেম গোত্রের। আর আবু জেহেল ছিল বনু উমাইয়া গোত্রের। আবু জেহেলের ইসলাম বিরোধীতার কারণ ছিল হিংসা। নবী কেন বল হাশেমের মধ্যে আসলো। বন উমাইয়াতে কেন আসলো না।
ইহুদিদের ঈমান না আনার কারণ ছিল হিংসা। তাদের আশা ছিল আল্লাহর নবী পাঠাবেন বনী ইসরাইল গোত্রে। কিন্তু আল্লাহ যখন নবী পাঠালেন ইসমাইল গোত্রে তারা হিংসায় জ্বলে পুড়ে উঠলো। হিংসা মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কোরআনে কারীমের এই সূরায় হিংসুকদের থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যখন তারা হিংসা করে।
কোরআন সিরাতে মুস্তাকিম
*************************
কোরআন আমাদের জন্য আল্লাহর পথকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। আমাদেরকে আল্লাহর প্রভাব ও ক্ষমতার সাথে পরিচিত করেছে। আমাদেরকে আল্লাহ থেকে সাহায্য গ্রহণ করা শিখিয়েছে। আমাদেরকে সফলতার জন্য কোরআনের দেখানো পথ আঁকড়ে ধরতে হবে। আমরা যদি আমাদের 50-60 বছরের এ জীবন কোরআনকে আকড়ে ধরে কাটিয়ে দিতে পারি তাহলে অনন্তকালের পুরস্কার জান্নাত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
আর আমরা যদি কোরআনকে ছেড়ে দেই তাহলে অনন্তকালের জন্য জাহান্নাম অপেক্ষা করছে। দুষ্ট শয়তান তার সমস্ত শক্তি নিয়ে নানাভাবে আমাদেরকে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য তৎপর। আর এ শয়তানের মোকাবেলার জন্য আমাদের প্রয়োজন আল্লাহর সাহায্য। আল্লাহর সাহায্যই পারে আমাদেরকে মুক্তি দিতে। আসুন আমরা আল্লাহ থেকে সাহায্য গ্রহণ করি।