ইনসাফ প্রতিষ্ঠা

ইনসাফ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ হুকুম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একটি বিশেষ গুণ হলো তিনি ন্যায়পরায়ন। ‌ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার নিজের উপর জুলুমকে হারাম করেছেন। ‌আল্লাহ বলেন।

اني حرمت الظلم علي

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের জন্য ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করেছেন। এই ইসলামের প্রধান বিষয় হল ন্যায়পরায়ণতা ইনসাফ ও সুবিচার। এই সুবিচার শিক্ষা দেয়ার জন্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবীদেরকে প্রেরণ করেছেন। যুগে যুগে নবীদের কাছে বিধি বিধান সম্বলিত কিতাব নাযিল করেছেন। আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান গুলো পৃথিবীতে সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য।

ইসলামে ন্যায়পরায়ণতার গুরুত্ব

*****************************

নবীরা কিতাবের মাধ্যমে সুবিচার শিক্ষা দিয়েছেন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পৃথিবী জুলুম অবিচারের ময়লা আবর্জনা থেকে মুক্ত হবে। সর্বত্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। সুবিচার ও ন্যায়পরায়নার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে কুরআনে।

সূরা আর রহমানে দেখুন-

{ ٱلشَّمۡسُ وَٱلۡقَمَرُ بِحُسۡبَانࣲ (5)

কুরআনে কারীমের এই আয়াতগুলোর আলোচনায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তার সৃষ্টি নিয়ে ভাবার আহবান করেছেন। আমাদের চারপাশের প্রকৃতি আল্লাহর সৃষ্টি। এই প্রকৃতির মাঝে ইনসাফ বিদ্যমান।

আকাশের বিশাল সূর্যটা কত চমৎকার ভাবে প্রতিদিন নিয়ম মেনে উথিত হচ্ছে এবং অস্ত যাচ্ছে। রাতের আকাশে চাঁদ আমাদের আলো দিচ্ছে। এই তাদের জন্যও রয়েছে মঞ্জিল। সে নির্ধারিতের নিয়ম মেনে অধিক হচ্ছে অস্ত যাচ্ছে। কত চমৎকার ভারসাম্য। এই আলোচনা সুরা ইয়াসিনে আরো চমৎকারভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তুলে ধরেছেন।

{ وَٱلشَّمۡسُ تَجۡرِی لِمُسۡتَقَرࣲّ لَّهَاۚ ذَ ٰ⁠لِكَ تَقۡدِیرُ ٱلۡعَزِیزِ ٱلۡعَلِیمِ (38) وَٱلۡقَمَرَ قَدَّرۡنَـٰهُ مَنَازِلَ حَتَّىٰ عَادَ كَٱلۡعُرۡجُونِ ٱلۡقَدِیمِ (39) لَا ٱلشَّمۡسُ یَنۢبَغِی لَهَاۤ أَن تُدۡرِكَ ٱلۡقَمَرَ وَلَا ٱلَّیۡلُ سَابِقُ ٱلنَّهَارِۚ وَكُلࣱّ فِی فَلَكࣲ یَسۡبَحُونَ (40) }

[Surah Yā-Sīn: 38-40]

وَٱلنَّجۡمُ وَٱلشَّجَرُ یَسۡجُدَانِ (6) وَٱلسَّمَاۤءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ ٱلۡمِیزَانَ (7)

রাতের আকাশে হাজারো তারা। পৃথিবী জুড়ে কত ধরনের বৃক্ষরাজি। এই তারকারাজি বৃক্ষরাজি নিয়ম মেনে চলে। আকাশের এই নক্ষত্র গুলো নির্ধারিত সময়ে রাতের আকাশে দেখা দিচ্ছে আবার নির্ধারিত সময় অস্ত যাচ্ছে। পৃথিবী ব্যাপী বৃক্ষরাজি গুলো নির্ধারিত সময়ে ফুল দিচ্ছে ফল দিচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে তার পাতা গুলো ঝরে যাচ্ছে আবার নির্ধারিত সময় নতুন পাতা উঠছে। আল্লাহর সৃষ্টি এ সুবিশাল খুটিহীন আকাশ মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

প্রকৃতির এ ব্যবস্থাপনার মাঝে ইনসাফ সুবিচার বিদ্যমান। কোন অনিয়ম বিশৃঙ্খলা নেই। যদি ইনসাফ না থাকতো তাহলে এই পৃথিবী এলোমেলো হয়ে যেত।

أَلَّا تَطۡغَوۡا۟ فِی ٱلۡمِیزَانِ (😎 وَأَقِیمُوا۟ ٱلۡوَزۡنَ بِٱلۡقِسۡطِ وَلَا تُخۡسِرُوا۟ ٱلۡمِیزَانَ (9) }

তাই আল্লাহ আমাদের আহবান করছেন আমরা যেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করি। এই ভারসাম্যপূর্ণ ইনসাফ পূর্ণ চমৎকার বিশ্ব ব্যবস্থার মাঝে আমরা যেন সীমালংঘন না করি।‌ বেইনসাফি এবং জুলুম এই পূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক।

{ وَلَهُۥۤ أَسۡلَمَ مَن فِی ٱلسَّمَـٰوَ ٰ⁠تِ وَٱلۡأَرۡضِ طَوۡعࣰا وَكَرۡهࣰا وَإِلَیۡهِ یُرۡجَعُونَ }

[Surah Āli-ʿImrān: 83]

ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় হতে হবে আপোষহীন

***********************************

সূরা নিসা আয়াত 135

আল্লাহ রব্বুল আলামীন এরশাদ করেন

{ ۞ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ كُونُوا۟ قَوَّ ٰ⁠مِینَ بِٱلۡقِسۡطِ شُهَدَاۤءَ لِلَّهِ وَلَوۡ عَلَىٰۤ أَنفُسِكُمۡ أَوِ ٱلۡوَ ٰ⁠لِدَیۡنِ وَٱلۡأَقۡرَبِینَۚ إِن یَكُنۡ غَنِیًّا أَوۡ فَقِیرࣰا فَٱللَّهُ أَوۡلَىٰ بِهِمَاۖ فَلَا تَتَّبِعُوا۟ ٱلۡهَوَىٰۤ أَن تَعۡدِلُوا۟ۚ }

[Surah An-Nisāʾ: 135]

কুরআনে কারিমের এই আয়াতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় আপোষহীনতার আহবান করা হয়েছে। বলা হয়েছে তোমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী হও। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে যদি তোমাকে নিজের বিপক্ষে তোমার বাবা মা নিকট আত্মীয়দের বিপক্ষেও ভূমিকা রাখতে হয় তোমাকে ইনসাফের পক্ষে থাকতে হবে। এই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে এটা দেখা যাবে না কে বিত্তবান আর কে দরিদ্র। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হুকুম ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। এ ব্যাপারে ঈমানদারের হতে হবে আপসহীন।

বিজয়ের পর ইনসাফের আহ্বান

*****************************

কুরআনে কারীমের সূরা মায়িদা নাযিল হয়েছে রাসুলুল্লাহর জীবনের শেষ ভাগে। যখন পূর্ণ আরব ভূমিতে ইসলাম বিজয়ী। এক সময় আরব্য ভূমিতে ইসলাম মুসলমান ছিল মাজলুম। শুধুমাত্র কালেমা বলার কারণে বিশ্বাসীরা অবিশ্বাসীদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।‌ আজ ইসলামের জয়জয়কার। অবিশ্বাসীরা আরব্য ভূমিতে পরাজিত। সেই সময় আল্লাহ রব্বুল আলামীন মুসলমানদেরকে লক্ষ্য করে হুকুম দিচ্ছেন তোমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত কর।

یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ كُونُوا۟ قَوَّ ٰ⁠مِینَ لِلَّهِ شُهَدَاۤءَ بِٱلۡقِسۡطِۖ وَلَا یَجۡرِمَنَّكُمۡ شَنَـَٔانُ قَوۡمٍ عَلَىٰۤ أَلَّا تَعۡدِلُوا۟ۚ ٱعۡدِلُوا۟ هُوَ أَقۡرَبُ لِلتَّقۡوَىٰۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِیرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ

[Surah Al-Māʾidah: 8]

প্রিয় রাসুলের নেতৃত্বে মুসলমানদের দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয় এসেছে। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মজলুম থাকা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পরীক্ষা ছিল। এখন বিজয় এসেছে। এর অর্থ এই নয় পরীক্ষা শেষ। বরং এই বিজয়ও আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। কাজেই সাবধান। মজলুম অবস্থায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সহজ। ক্ষমতা আর শক্তিমান অবস্থায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া অনেক কঠিন।

আজ ইসলামের জয়জয়কার। মনে করা যাবে না পরীক্ষা শেষ। বরং এখন আসল পরীক্ষা শুরু। পরীক্ষার ছোট হল থেকে বড় হলে তোমরা প্রবেশ করেছ। এই বড় হলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে তোমাদেরকে ইনসাফ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতীতের শত্রুতাকে কেন্দ্র করে কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করা যাবে না। তোমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কর। ইনসাফ প্রতিষ্ঠা তোমাদের আল্লাহর নৈকট্যশীল করে দেবে।

এই বিষয়ের উপর কুরআনি কারিমের অসংখ্য আয়াত রয়েছে। এই সমস্ত আয়াত দ্বারা এ বিষয়ে পরিষ্কার ইনসাফ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ হুকুম। ইসলামী শরীয়ার লক্ষ্য ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার একটি উদ্দেশ্য ইনসাফ শিক্ষাদান।

ইসলামী শরিয়া কি ইনসাফ বিরোধী

*******************************

আজকে পরিতাপের বিষয় একটি চিহ্নিত পক্ষ ইসলামী শরীয়াকে ইনসাফের প্রতিপক্ষ মনে করে। তারা ইসলামী শরিয়ার ব্যাপারে ভীতি ছড়ায়। তারা ইসলামী শরিয়া বলতে বুঝে চোরের হাত কেটে দেয়া খুনের গর্দান কেটে দেয়া, যেনা করলে পাথর মেরে হত্যা করা, নারীদের বোরকা পড়তে আর পুরুষদের দাড়ি রাখতে বাধ্য করা। ইসলামী শরীয়া প্রতিষ্ঠার কথা বললেই তারা এই বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করে।

তারা ইসলামকে ভুল বুঝেছে। তারা ইসলামী শরীয়া সঠিকভাবে অধ্যায়ন করেনি। কুরআন পড়লে তারা বুঝতে পারত ইসলামী শরিয়ার লক্ষ্য ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়া সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে জুলুম অবিচারের ময়লা আবর্জনা দূর হবে। ইসলামী শরীয়ায় রয়েছে পুরুষ ও নারীদের ন্যায্য অধিকার। শিশুদের অধিকার বৃদ্ধদের অধিকার। স্বামী স্ত্রীর অধিকারের আলোচনা। সমাজের দুর্বল অসহায়দের অধিকার। মুসাফিরের অধিকার। বিধবাদের অধিকার। পরিবার থেকে সমাজ সমাজ থেকে রাষ্ট্র ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্যই ইসলামী শরিয়া। আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান।

আজ একটি পক্ষকে বলতে শোনা যায় তারা বলে আমরা শরিয়া শাসন চাই না। আমাদের প্রশ্ন তাহলে তারা কি চান। ‌ একজন মুসলমান কি কখনো একথা বলতে পারে। শরিয়া শাসন না চাওয়ার অর্থ হল আল্লাহ রব্বুল আলামীন জুলুম ও বিচারের ময়লা আবর্জনা মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার জন্য যে বিধি-বিধান দিয়েছেন তার বিরোধিতা করা।

মানবতা বিরোধী অপরাধে ইসলামী শরিয়া কঠোর

********************************************

ইসলামী শরিয়া মানবতা বিরোধী অপরাধের ব্যাপারে কঠোর। কারণ এখানে কঠোরতাই ইনসাফ। ধরুন আপনার শরীরের কোন অংশে পচন ধরেছে। তখন আপনি যদি বাঁচতে চান ডাক্তারের পরামর্শ এটাকে কেটে ফেলা। আপনি তখন কি সিদ্ধান্ত নিবেন এটাকে কাটবেন না রেখে দিবেন। আপনি যদি এই পথে যাওয়া অংশ রেখে দিতে চান তাহলে এটা আপনার বাকি অংশকেও পচিয়ে ফেলবে। এজন্য ইনসাফ হল এই অংশটি কেটে দেয়া। এজন্য সমাজের পচে যাওয়া অংশের ব্যাপারে ইসলামী শরিয়া কঠোর।

আমরা যদি ইনসাফ চাই তাহলে ইসলামী শরীয়ার কোনো বিকল্প নাই।

{ أَلَیۡسَ ٱللَّهُ بِأَحۡكَمِ ٱلۡحَـٰكِمِینَ }

[Surah At-Tīn: 8]

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চাইতে বড় ইনসাফ আর কার পক্ষ থেকে আসতে পারে। আল্লাহর কাছে ইনসাফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায় পরায়ন ব্যক্তিদের জন্যই আল্লাহ জান্নাতের মেহমানদারীর ব্যবস্থা রেখেছেন।

سبعة يظلهم الله في ظله يوم لا ظل إلا ظله: إمام عادل،

হাশরের ময়দানে সর্বোচ্চ সম্মানিত হবে মানুষের মাঝে তারা যারা ন্যায় পরায়ন।

একটি বিষয় মনে রাখতে হবে বিশ্বাস রাখতে হবে আল্লাহর কোন বিধি-বিধান ভুল হতে পারে না। আল্লাহর কোন বিধান জুলুম হতে পারে না। আমাদের বুঝে আসুক অথবা না আসুক আল্লাহর প্রতিটি বিধান আমাদের জন্য আমাদের সমাজের জন্য আমাদের রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর। এবং আল্লাহর প্রতিটি হুকুম ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলামের সকল বিধি বিধান লক্ষ্য ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত করা। এবং সব ধরনের বৈষম্যকে দূর করা।

ইসলামের সবচাইতে বড় বিষয় হলো ইনসাফ। ইসলামের রয়েছে নামাজের হুকুম রোজার হুকুম। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এ হুকুমগুলো এজন্য দিয়েছেন এ নামাজ রোজা দ্বারা আমাদের মাঝে তাকওয়া সৃষ্টি হবে। আর আমাদের মাঝে যখন তাকওয়া সৃষ্টি হবে তখন ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। এই আমাদেরকে নামাজ রোজা অন্যান্য এবাদতগুলোর মূল লক্ষ বুঝতে হবে। আমার নামাজ রোজা আমাকে যদি জুলুম করার থেকে বিরত না রাখে তাহলে বুঝতে হবে আমি সঠিক পথে নেই।

সবার সাথে ইনসাফ

******************

আমাদেরকে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে আমাদের ঘরে আমাদের স্ত্রীদের সাথে সন্তানদের সাথে বাবা-মায়ের সাথে ভাই বোনের সাথে নিজের পাড়া প্রতিবেশীদের সাথে। মুসলমান অমুসলিম সকলের সাথে। ‌ এটাই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জুলুম কি সহ্য করেন না। তাই জালিম কখনো সফল হতে পারবে না।

Scroll to Top