কুরআনে কারীমের আলোচ্য বিষয় হলো তাওহিদ আল্লাহর একত্ববাদ। তাওহিদের কালিমা হল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।
ইলাহ শব্দের অর্থ হলো মাবুদ। মাবুদ বলা হয় যার এবাদত করা হয়, যার দাসত্ব করা হয়। যার আদেশ মানা হয়। মানুষের উপর একমাত্র আল্লাহর প্রভুক্ত। আর কারো প্রভুক্ত নেই।
কুরআনের দাওয়াত হলো আল্লাহ ছাড়া এবাদতের উপযুক্ত, ইলাহ আর কেউ নেই। কাজেই একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করো। একমাত্র তারই আদেশ পালন করো। একমাত্র তার প্রতি ভক্তি ভালোবাসা প্রেরণ কর। তারই কাছে প্রার্থনা করো। তার কাছেই নত হও, একমাত্র তাকেই সেজদা কর।
কুরআনে কারীমে আল্লাহ রব্বুল আলামীন তার পরিচিতি তুলে ধরেছেন। আসমান এবং জমিনের সমস্ত ক্ষমতা তারই কাছে। উপকার এবং অপকার করার ক্ষমতাটা একমাত্র তারই। অন্য কারো নয়। তিনি সব দেখেন সব শুনেন সব জানেন। মানুষের অন্তরের গোপন ইচ্ছা পরিকল্পনা গুলোও তিনি জানেন। তার রয়েছে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং অদৃশ্যের সকল জ্ঞান। এই ক্ষমতা অন্য কারো কাছে নেই। কাজেই এবাদতের তিনি উপযুক্ত। অন্য কেহ নয়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনের মাঝে নবীদের গল্প ইতিহাস আলোচনা করেছেন। নবীদের দাওয়াত তুলে ধরেছেন। সকল নবীদের দাওয়াত ছিল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রতি যুগেই মানুষ একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করত। সৃষ্টিকর্তা এক আল্লাহর অস্তিত্ব তাদের ধারণায় ছিল। কিন্তু আল্লাহর একত্ববাদ ও ইলাহ হিসেবে আল্লাহকে স্বীকার করতে তারা সম্মত ছিল না। তারা আল্লাহ ছাড়া অন্য সৃষ্টিকে মাবুদ বিশ্বাস করত।
মানুষ আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা বিশ্বাস করলেও তারা এবাদত করতো অন্য সৃষ্টির। আল্লাহর আদেশ নিষেধ মানার কোন ধারণা তাদের মাঝে ছিল না। তাদের এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্ত করার জন্যই নবীদেরকে পাঠানো হয়েছিল। নবীরা এক আল্লাহর এবাদতের আহ্বান তুলে ধরেছেন। আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য ইলাহ দের অক্ষমতাকে তুলে ধরেছেন।
নবীদের দাওয়াতের আলোচনা কুরআনে
***********************************
সূরা আম্বিয়া আয়াত
وَمَاۤ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِیۤ إِلَیۡهِ أَنَّهُۥ لَاۤ إِلَـٰهَ إِلَّاۤ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ (25)
Surah Al-Anbiyāʾ: 25
আর আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে আমি এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর।
এই আয়াতে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট সমস্ত নবীরা এই দাওয়াতের জন্য প্রেরিত হয়েছেন আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। ইলাহ নেই।
হযরত নূহ আলাইহিস সালামের দাওয়াত
**********************************
সুরা আরাফ আয়াত ৫৯-৬০
{ لَقَدۡ أَرۡسَلۡنَا نُوحًا إِلَىٰ قَوۡمِهِۦ فَقَالَ یَـٰقَوۡمِ ٱعۡبُدُوا۟ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَـٰهٍ غَیۡرُهُۥۤ (59)
অবশ্যই আমি নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের কাছে। অতঃপর তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্র ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নেই।
নূহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতের জবাবে তার জাতির প্রধান ব্যক্তিরা গোত্রবাসীকে নির্দেশ দিল
{ وَقَالُوا۟ لَا تَذَرُنَّ ءَالِهَتَكُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدࣰّا وَلَا سُوَاعࣰا وَلَا یَغُوثَ وَیَعُوقَ وَنَسۡرࣰا }
[Surah Nūḥ: 23]
এবং তারা বলেছে, তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে; তোমরা পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সুওয়া’আ, ইয়াগূছ, ইয়াউক ও নাসরকে।
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম এর দাওয়াতের মোকাবেলায় তার সম্প্রদায়ের লোকেরা পরস্পর এই চুক্তিতে উপনীত হয়েছিল যে, তারা তাদের দেব-দেবীর বিশেষত: এই পাঁচ জনের উপাসনা পরিত্যাগ করবে না। আয়াতে উল্লেখিত শব্দগুলো পাঁচটি মূর্তির নাম।
হাদীসে এসেছে, এই পাঁচ জন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ তা’আলার নেক ও সৎকর্মপরায়ণ বান্দা ছিলেন। তাদের সময়কালে ছিল আদম ও নূহ আলাইহিস সালাম এর আমলের মাঝামাঝি। তাদের নেক ভক্ত ও অনুসারী ছিল। তাদের মৃত্যুর পর ভক্তরা একপর্যায়ে শয়তানের প্ররোচনায় তাদের মূর্তি ভাস্কর্য তৈরি করে বিভ্রান্ত জাতিতে পরিণত হয়।
নুহ আলাইহিস সালাম তাদেরকে এই সমস্ত ব্যক্তিদের উপাসনা পূজা এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন থেকে বিরত হওয়ার দাওয়াত দিলেন। এই দাওয়াতের জবাবে তার সম্প্রদায় উত্তর দিল।
قَالَ ٱلۡمَلَأُ مِن قَوۡمِهِۦۤ إِنَّا لَنَرَىٰكَ فِی ضَلَـٰلࣲ مُّبِینࣲ (60)
তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা বলেছিল, আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে নিপতিত দেখছি।
তারা হযরত নূহ আলাইহিস সালাম এর দাওয়াতে ফিরল না। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ এবং তাদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শনী অটলবিচল থাকলো।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সৃষ্টি করতে বিশ্বাস করলেও তাদের এবাদত ছিল এই সমস্ত মূর্তির এই সমস্ত ভাস্কর্যের। তাদের শ্রদ্ধা ভালোবাসা ছিল তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি। নদীর মাধ্যমে সত্য প্রকাশের পরও তাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি।
হযরত হুদ আলাইহিস সালামের দাওয়াত
************************************
{ ۞ وَإِلَىٰ عَادٍ أَخَاهُمۡ هُودࣰاۚ قَالَ یَـٰقَوۡمِ ٱعۡبُدُوا۟ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَـٰهٍ غَیۡرُهُۥۤۚ }
[Surah Al-Aʿrāf: 65]
আর আমি আদ জাতির নিকট তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন ইলাহ নেই।
হুদ আলাইহিস সালামের সুস্পষ্ট দাওয়াতের জবাবে তার জাতী উত্তর দিল।
{ قَالُوۤا۟ أَجِئۡتَنَا لِتَأۡفِكَنَا عَنۡ ءَالِهَتِنَا فَأۡتِنَا بِمَا تَعِدُنَاۤ إِن كُنتَ مِنَ ٱلصَّـٰدِقِینَ }
[Surah Al-Aḥqāf: 22]
লোকেরা বলেছিল- ‘তুমি কি আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগুলো হতে সরিয়ে নেয়ার জন্য আমাদের কাছে এসেছ। কাজেই তুমি আমাদেরকে যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো আমাদের কাছে যদি তুমি সত্যবাদী হও।
’
তারা আরো জবাব দিল।
{ قَالُوۤا۟ أَجِئۡتَنَا لِنَعۡبُدَ ٱللَّهَ وَحۡدَهُۥ وَنَذَرَ مَا كَانَ یَعۡبُدُ ءَابَاۤؤُنَا فَأۡتِنَا بِمَا تَعِدُنَاۤ إِن كُنتَ مِنَ ٱلصَّـٰدِقِینَ }
[Surah Al-Aʿrāf: 70]
তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদের নিকট এজন্য এসেছ যে, আমরা এক আল্লাহর ইবাদাত করি এবং ত্যাগ করি আমাদের পিতৃপুরুষগণ যার ইবাদাত করত? সুতরাং তুমি আমাদেরকে যে ওয়াদা দিচ্ছ, তা আমাদের কাছে নিয়ে এসো, যদি তুমি সত্যবাদী হও’।
হযরত হুদ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় আজাবের জন্য প্রস্তুত ছিল কিন্তু পূর্ব পুরুষদের অন্ধ অনুকরণ থেকে ফিরে আসতে প্রস্তুত ছিল না।
হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম এর দাওয়াত
****************************************
{ وَإِلَىٰ ثَمُودَ أَخَاهُمۡ صَـٰلِحࣰاۚ قَالَ یَـٰقَوۡمِ ٱعۡبُدُوا۟ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَـٰهٍ غَیۡرُهُۥۖ
[Surah Al-Aʿrāf: 73]
আর আমি সামূদের নিকট (প্রেরণ করেছি) তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ নেই।
হযরত সালেহ আলাইহিস সালামের দাওয়াতের জবাবে তার জাতীয় উত্তর দিল
{ قَالُوا۟ یَـٰصَـٰلِحُ قَدۡ كُنتَ فِینَا مَرۡجُوࣰّا قَبۡلَ هَـٰذَاۤۖ أَتَنۡهَىٰنَاۤ أَن نَّعۡبُدَ مَا یَعۡبُدُ ءَابَاۤؤُنَا }
[Surah Hūd: 62]
তারা বলল, ‘‘হে সালিহ! এর পূর্বে তুমি তো আমাদের মাঝে ছিলে আশা-আকাঙ্ক্ষার পাত্র, তুমি কি আমাদেরকে সেই মা‘বূদদের ‘ইবাদাত করতে নিষেধ করছ আমাদের পিতৃ পুরুষরা যার ‘ইবাদাত করত?
সামুদ সম্প্রদায় পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ থেকে ফিরতে রাজি ছিল না। হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম সত্য তাদের কাছে তুলে ধরলেন। কিন্তু তারা সত্য গ্রহণে প্রস্তুত ছিল না।
হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর দাওয়াত
****************************************
হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার বাবাকে দাওয়াত দিলেন। তুমি কি মূর্তির উপাসনা করছো সে তোমার কথা শুনতে পারে না তোমার কোন উপকার ক্ষতি করারও ক্ষমতা রাখে না।
{ وَٱذۡكُرۡ فِی ٱلۡكِتَـٰبِ إِبۡرَ ٰهِیمَۚ إِنَّهُۥ كَانَ صِدِّیقࣰا نَّبِیًّا (41) إِذۡ قَالَ لِأَبِیهِ یَـٰۤأَبَتِ لِمَ تَعۡبُدُ مَا لَا یَسۡمَعُ وَلَا یُبۡصِرُ وَلَا یُغۡنِی عَنكَ شَیۡـࣰٔا (42) }
[Surah Maryam: 41-42]
আর স্মরণ কর এই কিতাবে ইবরাহীমকে। নিশ্চয় সে ছিল পরম সত্যবাদী, নবী।যখন সে তার পিতাকে বলল, ‘হে আমার পিতা, তুমি কেন তার ইবাদাত কর যে না শুনতে পায়, না দেখতে পায় এবং না তোমার কোন উপকারে আসতে পারে’?
জবাবে বাবা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে সাবধান করলেন। কঠোর শাস্তির ভয় দেখালেন।
{ قَالَ أَرَاغِبٌ أَنتَ عَنۡ ءَالِهَتِی یَـٰۤإِبۡرَ ٰهِیمُۖ لَىِٕن لَّمۡ تَنتَهِ لَأَرۡجُمَنَّكَۖ }
[Surah Maryam: 46]
সে বলল, ‘হে ইবরাহীম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে বিমুখ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে অবশ্যই আমি তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করব।
প্রিয় বাবা এবং নিজ গোত্রকে মূর্তির অক্ষমতা বুঝাতে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। উৎসবের দিন সবাই মেলায় চলে গেলে মূর্তিগুলোকে তিনি ভেঙে ফেলেন।
{ وَتَٱللَّهِ لَأَكِیدَنَّ أَصۡنَـٰمَكُم بَعۡدَ أَن تُوَلُّوا۟ مُدۡبِرِینَ (57)
আর আল্লাহর কসম, তোমরা চলে যাওয়ার পর আমি তোমাদের মূর্তিগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করব’।
فَجَعَلَهُمۡ جُذَ ٰذًا إِلَّا كَبِیرࣰا لَّهُمۡ لَعَلَّهُمۡ إِلَیۡهِ یَرۡجِعُونَ (58) }
অতঃপর সে মূর্তিগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল তাদের বড়টি ছাড়া, যাতে তারা তাঁর দিকে ফিরে আসে।
{ قَالُوا۟ مَن فَعَلَ هَـٰذَا بِـَٔالِهَتِنَاۤ إِنَّهُۥ لَمِنَ ٱلظَّـٰلِمِینَ (59)
তারা বলল, ‘আমাদের দেবদেবীগুলোর সাথে কে এমনটি করল? নিশ্চয় সে যালিম’।
قَالُوا۟ سَمِعۡنَا فَتࣰى یَذۡكُرُهُمۡ یُقَالُ لَهُۥۤ إِبۡرَ ٰهِیمُ (60)
তাদের কেউ কেউ বলল, ‘আমরা শুনেছি এক যুবক এই মূর্তিগুলোর সমালোচনা করে। তাকে বলা হয় ইবরাহীম’।
قَالُوا۟ فَأۡتُوا۟ بِهِۦ عَلَىٰۤ أَعۡیُنِ ٱلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ یَشۡهَدُونَ (61)
তারা বললঃ তাকে উপস্থিত কর লোক সম্মুখে, যাতে তারা সাক্ষ্য দিতে পারে।
قَالُوۤا۟ ءَأَنتَ فَعَلۡتَ هَـٰذَا بِـَٔالِهَتِنَا یَـٰۤإِبۡرَ ٰهِیمُ (62)
তারা বলল, ‘হে ইবরাহীম, তুমিই কি আমাদের দেবদেবীগুলোর সাথে এরূপ করেছ’?
قَالَ بَلۡ فَعَلَهُۥ كَبِیرُهُمۡ هَـٰذَا فَسۡـَٔلُوهُمۡ إِن كَانُوا۟ یَنطِقُونَ (63)
সে বলল, ‘বরং তাদের এ বড়টিই একাজ করেছে। তাই এদেরকেই জিজ্ঞাসা কর, যদি এরা কথা বলতে পারে’।
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এই কৌশলের মাধ্যমে তার জাতির কাছে সত্য সুস্পষ্ট হলো। মূর্তির অক্ষমতা প্রকাশ পেল। কিন্তু তারা সত্যকে গ্রহণ করলো না। তারা সত্যের মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন করল। তারা মূর্তি ভাঙার অপরাধে ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘৃণ চক্রান্ত করল।
{ قَالُوا۟ حَرِّقُوهُ وَٱنصُرُوۤا۟ ءَالِهَتَكُمۡ إِن كُنتُمۡ فَـٰعِلِینَ (68)
তারা বলল, ‘তাকে ( ইব্রাহিমকে ) আগুনে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের দেবদেবীদেরকে সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও’।
এভাবে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় সত্যের মোকাবেলা করল। পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণে যুক্তিহীন ভাবে মূর্তি পর্যায়ে অটল অবিচল থাকলো। ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর দাওয়াত কে গ্রহণ করে আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করলো না।
হযরত সোয়াইব আলাইহিস সালাম এর দাওয়াত
****************************************
وَإِلَىٰ مَدۡیَنَ أَخَاهُمۡ شُعَیۡبࣰاۚ قَالَ یَـٰقَوۡمِ ٱعۡبُدُوا۟ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنۡ إِلَـٰهٍ غَیۡرُهُۥۖ
[Surah Al-Aʿrāf: 85]
আর আমি মাদইয়ানে (প্রেরণ করেছিলাম) তাদের ভাই শু‘আইবকে। সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ নেই।
শোয়াইব আলাইহিস সালামের দাওয়াতের জবাবে তার সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত ছিল কঠোর। তারা বলল।
قَالَ ٱلۡمَلَأُ ٱلَّذِینَ ٱسۡتَكۡبَرُوا۟ مِن قَوۡمِهِۦ لَنُخۡرِجَنَّكَ یَـٰشُعَیۡبُ وَٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ مَعَكَ مِن قَرۡیَتِنَاۤ أَوۡ لَتَعُودُنَّ فِی مِلَّتِنَاۚ
[Surah Al-Aʿrāf: 88]
তার কওম থেকে যে নেতৃবৃন্দ অহঙ্কার করেছিল তারা বলল, ‘হে শু‘আইব, আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে অবশ্যই আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে।’
এই দাওয়াতের কারণে হযরত শোয়াইব কে তারা গ্রাম থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত জানালো। সত্য সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তারা শক্তি প্রদর্শন করলো। আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করলো না।
হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত
************************************
হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ হুকুম পাঠালেন।
{ فَأۡتِیَا فِرۡعَوۡنَ فَقُولَاۤ إِنَّا رَسُولُ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِینَ }
[Surah Ash-Shuʿarāʾ: 16]
সুতরাং তোমরা ফির‘আউনের কাছে যাও এবং বল, আমরা রাব্বুল আলামীনের রাসূল।
হযরত মুসা দাওয়াত নিয়ে উপস্থিত হলে ফেরাউন জবাব দিল।
{ قَالَ فِرۡعَوۡنُ وَمَا رَبُّ ٱلۡعَـٰلَمِینَ (23)
ফেরাউন বলল : ‘বিশ্বজগতের প্রতিপালক আবার কী?’
قَالَ رَبُّ ٱلسَّمَـٰوَ ٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَمَا بَیۡنَهُمَاۤۖ إ (24)
মূসা বলল, তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক।
قَالَ لِمَنۡ حَوۡلَهُۥۤ أَلَا تَسۡتَمِعُونَ (25)
ফেরাউন তার আশপাশের লোকদেরকে বলল, তোমরা শুনছ কি না?
এখানে ফেরাউনের প্রশ্ন ছিল ‘রাব্বুল আলামীন’ এর স্বরূপ কী, তা ব্যাখ্যা কর। আর হযরত মূসা আলাইহিস সালামের দেওয়া উত্তরের সারমর্ম হল, আল্লাহ তাআলার সত্তা কেমন, তাঁর স্বরূপ কী, তা জানা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। হাঁ, তাঁকে চেনা যায় তাঁর সিফাত বা গুণাবলীর দ্বারা। তাই হযরত মূসা আলাইহিস সালাম উত্তরে আল্লাহ তাআলার সিফাতই উল্লেখ করেছেন। তিনি আকাশমণ্ডলী জমিন এবং এ দুইয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক।
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম আরো বললেন।
قَالَ رَبُّكُمۡ وَرَبُّ ءَابَاۤىِٕكُمُ ٱلۡأَوَّلِینَ(26) قَالَ إِنَّ رَسُولَكُمُ ٱلَّذِیۤ أُرۡسِلَ إِلَیۡكُمۡ لَمَجۡنُونࣱ (27)
মূসা বলল, তিনি তোমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও প্রতিপালক। ফেরাউন বলল, তোমাদের এই রাসূল, যাকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে, একেবারেই উন্মাদ!
তা শুনে ফির‘আউন মন্তব্য করল, এ লোকটা বদ্ধ পাগল। প্রশ্ন করেছি কী, আর উত্তর দেয় কী! দেখ তার ধৃষ্টতা! কেবল আসমান-যমীনের রব বলেই ক্ষান্ত হচ্ছে না। তাকে আমার ও আমাদের বাপ-দাদাদেরও রব বলছে। পাগল না হলে কেউ আমার মুখের উপর এমন ভয়ংকর কথা বলতে পারে?
قَالَ رَبُّ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَمَا بَیۡنَهُمَاۤۖ إِن كُنتُمۡ تَعۡقِلُونَ (28)
মূসা বলল, তিনি উদাচল এবং অস্তাচলের প্রতিপালক এবং এ দুয়ের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছুরও যদি তোমরা বুদ্ধির সদ্ব্যবহার কর।
অর্থাৎ তোমরা আমাকে উন্মাদ বলছ কি,তোমরা নিজেদের আকলের খবর নাও। উম্মাদ আমি নই বরং তোমরাই উম্মাদ।
তোমাদের বুদ্ধি সুস্থ থাকলে সৃষ্টিকে স্রষ্টা বানাতে না।
এই যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শুনে ফিরআউন সম্পূর্ণ নিরুত্তর হয়ে গেল। যুক্তিতে হেরে গিয়ে শক্তি প্রদর্শন করলো। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম কে ভয় দেখালো।
قَالَ لَىِٕنِ ٱتَّخَذۡتَ إِلَـٰهًا غَیۡرِی لَأَجۡعَلَنَّكَ مِنَ ٱلۡمَسۡجُونِینَ (29)
সে বলল, (মনে রেখ) তুমি যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে মাবুদ বলে গ্রহণ কর, তবে আমি তোমাকে অবশ্যই যারা জেলে পড়ে আছে, তাদের অন্তর্ভুক্ত করব।
এই হল ফেরাউনের ইতিহাস। ফেরাউন ফেরাউনের সম্প্রদায় আল্লাহকে এরা হিসেবে গ্রহণ করলো না। অথচ সত্য তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়েছিল।
হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের দাওয়াত
***********************************
وَجِئۡتُكُم بِـَٔایَةࣲ مِّن رَّبِّكُمۡ فَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَأَطِیعُونِ (50) إِنَّ ٱللَّهَ رَبِّی وَرَبُّكُمۡ فَٱعۡبُدُوهُۚ هَـٰذَا صِرَ ٰطࣱ مُّسۡتَقِیمࣱ (51) }
[Surah Āli-ʿImrān: 50-51]
আমি তোমাদের নিকট এসেছি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নিদর্শন নিয়ে। অতএব, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আমার আনুগত্য কর’। নিশ্চয় আল্লাহ আমার রব ও তোমাদের রব। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদাত কর। এটি সরল পথ’।
নবীদের দাওয়াত ছিল সুস্পষ্ট। সকল নবীদের দাওয়াত ছিল এক ও অভিন্ন। তারা এ পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন আলো নিয়ে। তাদের দাওয়াত ছিল যুক্তিপূর্ণ। তারা মানুষের কাছে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পরিচিতি তুলে ধরেছিলেন। তাদের দেয়া যুক্তির মাধ্যমে মানুষের কাছে সত্য সুস্পষ্ট হয়েছিল। আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া এবাদত এর উপযুক্ত কেউ নেই। মানুষদেরকে দাওয়াত দিয়েছিলেন মানুষের উপর মানুষের কোন প্রভুক্ত নেই। মানুষের উপর অন্য কোন সৃষ্টির প্রভুক্ত নেই। প্রভুক্ত একমাত্র আল্লাহর।
মানুষের কোন চাহিদা পূরণ করার ক্ষমতা কোন ফেরেশতার কাছে নেই। কোন নবীর কাছে কোন ওলীর কাছে নেই। মানুষের উপকার অপকার করার ক্ষমতা কারো নেই। সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এক আল্লাহ। তিনি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। কাজেই মানুষ এবাদত করবে শুধুমাত্র আল্লাহর। মানুষ নত হবে শুধু আল্লাহর কাছে অন্য কারো কাছে নয়।
আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ হলো নিজেকে আল্লাহর গোলাম হিসেবে সঁপে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া।
{ إِیَّاكَ نَعۡبُدُ وَإِیَّاكَ نَسۡتَعِینُ }
[Surah Al-Fātihah: 5]
আমরা শুধু তোমারই গোলামী করি আর আমরা শুধু তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি।
আমাদের এবাদত আমাদের আত্মত্যাগ আমাদের বেঁচে থাকা আল্লাহর জন্য। আমরা মৃত্যুকে বরণ করে নিব কিন্তু কোন অবস্থাতেই কোন পরিস্থিতিতে আল্লাহর অবাধ্যতায় যাবো না। এই হওয়া চাই আমাদের সিদ্ধান্ত।
{ قُلۡ إِنَّ صَلَاتِی وَنُسُكِی وَمَحۡیَایَ وَمَمَاتِی لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِینَ (162)
বল, আমার নামায, আমার যাবতীয় ‘ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ (সব কিছুই) বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই (নিবেদিত)।
আসুন আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করি। আজ থেকে আমরা শুধুই আল্লাহর গোলাম। অন্য কারো নয়। আল্লাহর হুকুমে জীবনকে গড়ে তুলি। দুনিয়া এবং আখেরাতে সফলতা অর্জন করি।