মুসলমানের ঘর। আমাদের ঘরগুলো যেন হয় জান্নাতের বাহন

একজন মুসলমান তার ঘর কিভাবে সামলাবে। একজন মুসলমানের পারিবারিক জীবন কেমন হবে। তার ঘরের সাজসজ্জা কেমন হবে। এ ব্যাপারে ইসলামের কিছু নির্দেশনা রয়েছে।

মুসলমানের ঘর হতে পারে জান্নাতের বাহন অথবা হতে পারে জাহান্নামের বাহন। আমাদের ঘরকে জান্নাতের বাহন করা চাই।‌ এজন্য প্রয়োজন আমাদের আল্লাহর নির্দেশনা কে সামনে রেখে পরিকল্পনা করা। ঘরের দায়িত্ব কর্তব্য পালনের সাথেই সফলতা ও ব্যর্থতার সম্পর্ক।

ঘরে পারস্পরিক সম্পর্ক

*********************

ঘরে স্ত্রী সন্তান বাবা-মা ভাই-বোন নিয়ে আমাদের পরিবার। এখানে স্ত্রীর সন্তানের উপর কর্তব্য রয়েছে। বাবা-মা ভাই বোনের দায়িত্ব আছে। ঘরে আমাদেরকে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য গুলো পালন করতে হবে। এটা ঘরের আমল।

আমাদের জন্য জরুরী এ সম্পর্ক গুলোর দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং এই হকগুলোকে যথাযথভাবে আদায় করা। মুসলমান হিসেবে এটা ঈমানী দায়িত্ব। এবং এ দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। এ দায়িত্ব গুলো যথাযথ পালন করলে এ ঘর আমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন হবে। অন্যথায় এই ঘর জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে।

ঘরকে জান্নাতের বাহন রুপে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্ত্রী সন্তানের সাথে বাবা-মা ভাই-বোনদের সাথে বোঝাপড়া হতে হবে ভালো। ঘরের সাজসজ্জা হতে হবে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায়। ঘরে সন্তানদের সাথে আচার ব্যবহার হতে হবে ন্যায্য। ঘরের আমল গুরুত্বপূর্ণ।

এ ব্যাপারে কোরআনে কারীমে চমৎকার দিকনির্দেশনা রয়েছে। দিকনির্দেশনা রয়েছে হাদিসে। কোরআন হাদিস থেকে এ জ্ঞানগুলো আমাদেরকে অর্জন করতে হবে।

বাবা মার সাথে সন্তান

*******************

বাবা মার সাথে সন্তানের আচরণ কেমন হবে কোরআনে তার আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে।

সুরা বনী ইসরাইল আয়াত ২৩- ২৪

{ ۞ وَبِٱلۡوَ ٰ⁠لِدَیۡنِ إِحۡسَـٰنًاۚ إِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِندَكَ ٱلۡكِبَرَ أَحَدُهُمَاۤ أَوۡ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَاۤ أُفࣲّ وَلَا تَنۡهَرۡهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوۡلࣰا كَرِیمࣰا (23)

তোমরা পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।

وَٱخۡفِضۡ لَهُمَا جَنَاحَ ٱلذُّلِّ مِنَ ٱلرَّحۡمَةِ وَقُل رَّبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّیَانِی صَغِیرࣰا (24)

আর তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন’।

পিতা মাতা যদি অমুসলিম হয় আর তারা যদি সন্তানকে শিরক করতে বাধ্য করে তখন করণীয় কি।

{ وَإِن جَـٰهَدَاكَ عَلَىٰۤ أَن تُشۡرِكَ بِی مَا لَیۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمࣱ فَلَا تُطِعۡهُمَاۖ وَصَاحِبۡهُمَا فِی ٱلدُّنۡیَا مَعۡرُوفࣰاۖ }

[Surah Luqmān: 15]

ভাই বোন সম্পর্ক

**************

এ ব্যাপারে কোরআনের নির্দেশনা হল তাদের হক আদায় করা। আমাদের পরিকল্পনা হলো বাবা-মা ভাই-বোন স্ত্রী সন্তান তাদের থেকে আমরা কি নিতে পারি। আর কোরআন আমাদেরকে আহ্বান করে আমরা যেন তাদের পাওনা গুলো পরিশোধ করি।

আমরা যখন ভাই বোন পিতা-মাতা তাদের হকগুলোকে আদায় করব আল্লাহর কাছে আমাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে। মর্যাদার সম্পর্ক দেয়ার মাঝে নেয়ার মাঝে নয়।

কোরআনে করিম এরশাদ হয়েছে।

সুরা বনী ইসরাইল আয়াত ২৬

{ وَءَاتِ ذَا ٱلۡقُرۡبَىٰ حَقَّهُۥ }

[Surah Al-Isrāʾ: 26]

স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক

**************

পরিবার গঠনে স্ত্রী হল স্বামীর সহযোগী। স্বামী স্ত্রী মিলেই পরিবার। পরিবার পরিচালনায় স্ত্রীর সাথে বুঝা পড়া কেমন হবে আচরন কেমন হবে তার বিস্তারিত আলোচনা এসেছে কুরআনে। কোরআনে কারীমে স্ত্রীদের সাথে আচরণ সংক্রান্ত যে পরিমাণ আয়াত এসেছে অন্য কারো হকের ব্যাপারে এত আয়াত নাজিল হয়নি।

হাদিসের মাঝে আল্লাহর রাসূল বলেছেন তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠতম তারা যারা স্ত্রীদের কাছে শ্রেষ্ঠ। আমরা আমাদের চরিত্রের সার্টিফিকেটের জন্য চেয়ারম্যান মেম্বার এবং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের দ্বারস্থ হই। তারা আমাদের ব্যাপারে সার্টিফিকেট দেন আমরা ভালো।

আর প্রিয় রসূল আমাদেরকে নির্দেশনা দিচ্ছেন আমাদের ব্যাপারে স্ত্রীদের স্বাক্ষ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একমাত্র তারাই বলতে পারে মানুষ হিসেবে আমরা কেমন। কাজেই স্ত্রীদের সাথে আচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রী হতে পারে আমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন। আর স্ত্রীদের সাথে আচরণ হতে পারে আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ।

জীবন পরিচালনায় স্বামী স্ত্রী উভয়ের লক্ষ্য এক হওয়া চাই। এ ব্যাপারে কোরআনের আলোচনা উঠে এসেছে।

সূরা আহযাব আয়াত ২৮-২৯

{ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلنَّبِیُّ قُل لِّأَزۡوَ ٰ⁠جِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدۡنَ ٱلۡحَیَوٰةَ ٱلدُّنۡیَا وَزِینَتَهَا فَتَعَالَیۡنَ أُمَتِّعۡكُنَّ وَأُسَرِّحۡكُنَّ سَرَاحࣰا جَمِیلࣰا (28)

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই’।

وَإِن كُنتُنَّ تُرِدۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلدَّارَ ٱلۡـَٔاخِرَةَ فَإِنَّ ٱللَّهَ أَعَدَّ لِلۡمُحۡسِنَـٰتِ مِنكُنَّ أَجۡرًا عَظِیمࣰا (29)

‘আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন’।

এই আয়াতে দুটিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রিয় নবীকে স্ত্রীদের সাথে একটি বুঝা পড়া করার প্রতি আহ্বান করেছেন।

সেই বোঝাপড়া হলো স্বামী স্ত্রীর লক্ষ্য দুনিয়ার সাজসজ্জা নয়। তাদের লক্ষ্য হবে আখেরাত আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল। স্বামী স্ত্রী উভয়ের এজেন্ডা যেন হয় এক এবং অভিন্ন। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পরবর্তী দুই আয়াতে আল্লাহর আনুগত্যে পুরস্কারের আলোচনা এবং আল্লাহর অবাধ্যতায় শাস্তির ব্যাপারে হুঁশিয়ার করা হয়েছে।

یَـٰنِسَاۤءَ ٱلنَّبِیِّ مَن یَأۡتِ مِنكُنَّ بِفَـٰحِشَةࣲ مُّبَیِّنَةࣲ یُضَـٰعَفۡ لَهَا ٱلۡعَذَابُ ضِعۡفَیۡنِۚ وَكَانَ ذَ ٰ⁠لِكَ عَلَى ٱللَّهِ یَسِیرࣰا (30)

হে নবী-পত্নীগণ, তোমাদের মধ্যে যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করবে, তার জন্য আযাব দ্বিগুণ করা হবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।

۞ وَمَن یَقۡنُتۡ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتَعۡمَلۡ صَـٰلِحࣰا نُّؤۡتِهَاۤ أَجۡرَهَا مَرَّتَیۡنِ وَأَعۡتَدۡنَا لَهَا رِزۡقࣰا كَرِیمࣰا (31) }

আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে এবং নেক আমল করবে আমি তাকে দু’বার তার প্রতিদান দেব এবং আমি তার জন্য প্রস্তুত রেখেছি সম্মানজনক রিয্ক

এই আয়াতে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় যেমন মর্যাদার আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। ঠিক তেমনি দ্বীনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহ শাস্তি তুলে ধরা হয়েছে।

পারিবারিক লক্ষ্য দ্বীন প্রতিষ্ঠা

************************

মুসলিম প্রতিটি পরিবারে দ্বীন চর্চা গুরুত্ব পাবে। এবং দিনের প্রাসার নিয়ে তারা ফিকির করবে।

{ وَٱذۡكُرۡنَ مَا یُتۡلَىٰ فِی بُیُوتِكُنَّ مِنۡ ءَایَـٰتِ ٱللَّهِ وَٱلۡحِكۡمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ لَطِیفًا خَبِیرًا }

[Surah Al-Aḥzāb: 34]

তোমাদের গৃহে আল্লাহর আয়াত ও হিকমত থেকে যা পাঠ করা হয় তার চর্চা কর। আল্লাহ অতি সূক্ষ্ণদর্শী, সর্ববিষয়ে খবর রাখেন।

এই আয়াতে দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে তোমরা মনে রেখো এটা ভুলে যেও না তোমাদের ঘরগুলো সেই ঘর যেখান থেকে সারা দুনিয়াতে আল্লাহর আয়াত এবং প্রজ্ঞার শিক্ষা প্রদান করা হবে। কাজেই তোমাদের দায়িত্ব বড় কঠিন।

কোরআন চর্চার মাধ্যমে মুসলমানের ঘরগুলো হবে পূর্ণ সমাজের আলোকিত ঘর। এই ঘর গুলোর দ্বারা পূর্ণ সমাজে আলো ছড়াবে। কোরআনের আলো হাদিসের আলো ইসলামের আলো চতুর্দিকে ছড়িয়ে যাবে।

এই আয়াতে আমাদের সাবধান করা হচ্ছে সমাজের লোকেরা তোমাদের ঘর থেকে জাহিলিয়াতের আদর্শ দেখবে এমন যেন না হয়।

ঘরে‌ কোরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব

*******************************

মুসলমানের ঘরের অন্যতম আমল হলো কুরআনে কারীমের তেলাওয়াত। কোরআনে কারীমের চর্চা। কোরআনের শিক্ষায় গড়ে উঠবে পরিবার।

: “مَثَلُ الْبَيْتِ الَّذِي يُذْكَرُ اللَّهُ فِيهِ وَالْبَيْتِ الَّذِي لَا يُذْكَرُ اللَّهُ فِيهِ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ” (رواه مسلم).

এ হাদিস আমাদেরকে আহ্বান করে আমাদের ঘরগুলোতে যেন আল্লাহর স্মরণকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়। তাহলে আমাদের ঘরগুলো হবে জীবন্ত। যেই ঘরে কোরআনে কারীমের তেলাওয়াত নেই সেই ঘরগুলো মৃত কবরের মতো।

কবরস্থান থেকে যেমন কোন আমল হয় না। সেথাকার মৃত ব্যক্তির এখন আমল করতে পারে না। ঠিক এই ঘরগুলো থেকেও কোন আমল হয় না। দরুদ পড়া হয় না কোরআন পড়া হয়না। আল্লার রহমতের ফেরেশতারা এই ঘরগুলোতে প্রবেশ করে না।

মুসলমানের ঘরে কোরআনে কারীমের তেলাওয়াত হবে। এর মাধ্যমে ঘরে পারিবারিক জীবনে স্বস্থির শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। দুষ্টু শয়তান ও জিন্নাতদের ক্ষতি থেকে ঘর হেফাজত হবে। হাদিসের মাঝে বিশেষ করে সূরা বাকারা তেলাওয়াতের কথা এসেছে। এর মাধ্যমে দুষ্ট শয়তান থেকে ঘরগুলো নিরাপদ থাকে।

روى أبو هُرَيْرَةَ –رضي الله عنه- أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ –صلى الله عليه وسلم- قَالَ: “لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنْ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ” (رواه مسلم).

ঘরে অন্তত সূরা বাকারার আয়াত নিয়মিত আমলের মাঝে থাকা চাই।

روى النعمان بن بشير –رضي الله عنهما- أن النبي –صلى الله عليه وسلم- قال: “إن الله -تعالى- كتب كتابًا قبل أن يخلق السموات والأرض بألفي عام وهو عند العرش، وإنه أنزل منه آيتين ختم بهما سورة البقرة، ولا يُقرَآن في دار ثلاث ليال فيقربها الشيطان” (رواه الترمذي).

مَنْ قَرَأَ بِالْآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ البَقَرَةِ فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ”

(رواه البخاري ومسلم)، أي: كفتاه قيام الليل، وقيل كفتاه الشيطان.

ঘরে প্রবেশে দোয়ার গুরুত্ব

***********************

দুষ্টু শয়তান থেকে আমাদের ঘরগুলোর সুরক্ষায় ঘরে প্রবেশে এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এবং খাবার দাবার গ্রহণ করার সময় দোয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।

وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِذَا دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَذَكَرَ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طَعَامِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ: لَا مَبِيتَ لَكُمْ وَلَا عَشَاءَ وَإِذَا دَخَلَ فَلَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ: أَدْرَكْتُمُ الْمَبِيتَ وَإِذَا لَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ عِنْدَ طَعَامِهِ قَالَ: أَدْرَكْتُمُ الْمَبِيتَ وَالْعَشَاءَ . رَوَاهُ مُسلم

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন কোন ব্যক্তি গৃহে প্রবেশ করে এবং প্রবেশকালে ও খাওয়ার সময় আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন শয়তান (তার অনুসারীদেরকে) বলে, এ ঘরে তোমাদের জন্য রাত্রি যাপনের সুযোগ নেই এবং রাতে খাবারও নেই।

আর যখন সে (ঘরে) প্রবেশ করে এবং প্রবেশকালে আল্লাহর নাম নেয় না, তখন শয়তান বলে, তোমরা রাত্রি যাপনের স্থান পেয়েছ। আর যখন সে খাওয়ার সময়ও আল্লাহর নাম নেয় না, তখন সে বলে, তোমরা রাত্রি যাপন ও রাতের খাওয়া উভয়টির সুযোগ লাভ করেছ। (মুসলিম)[

ঘরে প্রবেশের দোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কি চাই আমরা ঘরে প্রবেশ করব সাথে আমাদের সাথে শয়তানও প্রবেশ করবে। দোয়া পড়ার ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া চাই। দোয়ায় অবহেলার কারণে ঘরে আমাদের সাথে শয়তান প্রবেশ করে। আর শয়তানের কাজ হল অশান্তি তৈরি করা। শয়তান স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিভেদ তৈরি করে।

ঘরের পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতা

************************

মুসলমানের ঘরগুলো থাকবে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার আলো দ্বারা আলোকিত। নূরানী পরিবেশের ছোঁয়া থাকবে সর্বত্র। ঘরগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে। এটা ইসলামের শিক্ষা। ঘরে কোন বেশ তো এলোমেলো ভাবে পড়ে থাকবে না। প্রতিটি বস্তু তার উপযুক্ত স্থানে রাখাই ঘরের সৌন্দর্য।

ঘরে প্রবেশ করার আগেই জুতা খোলা এবং দরজার নিকটে জুতার বাক্সে জুতা রাখা। ঘরের পবিত্রতা রক্ষায় বাহিরে চলাচলের জুতা আর ঘরের ভিতরে চলাচলের জন্য জুতা ভিন্ন হওয়া চাই। আবার বাসার ভিতরে টয়লেটের জন্য আলাদা জুতা ব্যবহার করা উচিত যা শুধু টয়লেটে ব্যবহৃত হবে। এতে করে অপবিত্রতা ছড়িয়ে পড়বে না।

لا يُنقَعُ بولٌ في طست في البيت فإن الملائكة لا تدخل بيتا فيه بول مُنتَقعٌ،

বাড়িতে কোন পাত্রে প্রস্রাব ভিজিয়ে রাখবে না, কারণ ফেরেশতারা এমন বাড়িতে প্রবেশ করে না যেখানে প্রস্রাব ভিজানো থাকে

ঘরের পবিত্রতার দিকে আমাদের লক্ষ্য করা চাই। অপবিত্র ঘরে পবিত্র ফেরেশতারা প্রবেশ করে না। এ সমস্ত ঘরগুলোতে দুষ্টু শয়তান এবং জিন্নাত প্রবেশ করে অনিষ্ট সাধন করে। তখন এ ঘরগুলো জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়।

ঘরের সাজসজ্জা ডেকোরেশন

**************************

কোন প্রাণী বা মানুষের ছবি দ্বারা ঘরে সাজানো অথবা মূর্তি প্রাণীর ভাস্কর্য ঘর সাজানো যাবে না। ইসলামে এটি নিষিদ্ধ।

হাদিসের মাঝে বিশেষ করে ছবি এবং মূর্তি থেকে ঘরগুলো পবিত্র থাকার কথা এসেছে।

দুষ্ট শয়তান থেকে ঘরগুলোকে সুরক্ষায় এমন সমস্ত ডেকোরেশন থেকে ঘরগুলোকে পবিত্র করতে হবে যে সমস্ত বিষয় ঘরে থাকলে ফেরেশতারা ঘরে প্রবেশ করে না।

وَعَنْ أبي طَلْحَةَ : أنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَال: لا تَدْخُلُ المَلائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلا صُورَةٌ متفقٌ عليه.

এই ঘরগুলোতে দুষ্টু জিন এবং শয়তান অবাধে চলাচল করে। রহমতের ফেরেশতারা প্রবেশ করে না। এই ঘরগুলো জাহান্নামে যাওয়ার বাহন। আমাদের সামনে সুযোগ ছিল এই ঘরগুলোকে জান্নাতে যাওয়ার বাহনে পরিণত করা। কিন্তু আমরা তা করিনি।

ঘরে নামাজ আদায় যত্নবান হওয়া

*****************************

হাদিসের মাঝে ঘরে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। নামাজ হলো নূর আপনার ঘরে নামাজ নেই মানে সেখানে নূর নেই। এই ঘরের শয়তান জায়গা করে নেয়। এই ঘর অশান্তিতে ভরপুর থাকে।

روى عبد الله بن عمر -رضي الله عنهما- عن النبي –صلى الله عليه وسلم- قال: “اجعلوا من صلاتكم في بيوتكم ولا تتخذوها قبورًا” (رواه مسلم).

মুসলমানের ঘরে নামাজ আদায়ের জন্য নির্ধারিত স্থান থাকা চাই। আমাদের থাকার জন্য আলাদা রুম আছে। পড়ার জন্য আলাদা রুম আছে। গল্প করার জন্য আলাদা রুম আছে। খাবারের জন্য আলাদা রুম আছে। কিন্তু নামাজের জন্য নির্ধারিত কোন জায়গা নেই। এটা ঠিক নয়।

আমাদের মা আমাদের স্ত্রী আমাদের মেয়ে মহিলারা পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ঘরে পড়ে থাকে। তাদের এ নামাজ পড়ার জন্য ঘরে নির্ধারিত কোন জায়গা নেই। এটা নামাজের মত গুরুত্বপূর্ণ এবাদতকে গুরুত্বহীন দৃষ্টিতে দেখা। এটা ঠিক নয়।

হাদিসের মাঝে আমাদের পুরুষদেরকেও ফরজ নামাজ ছাড়া অন্য নামাজ গুলো ঘরে নামাজ আদায়ের যত্নবান হতে বলা হয়েছে।

روى زَيْد بْن ثَابِتٍ –رضي الله عنه- أن النبي –صلى الله عليه وسلم-: “قَالَ َعَلَيْكُمْ بِالصَّلَاةِ فِي بُيُوتِكُمْ؛ فَإِنَّ خَيْرَ صَلَاةِ الْمَرْءِ فِي بَيْتِهِ إِلَّا الصَّلَاةَ الْمَكْتُوبَةَ” (رواه البخاري).

وروى جَابِرٍ –رضي الله عنه- قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ –صلى الله عليه وسلم-: “إِذَا قَضَى أَحَدُكُمْ الصَّلَاةَ فِي مَسْجِدِهِ، فَلْيَجْعَلْ لِبَيْتِهِ نَصِيبًا مِنْ صَلَاتِهِ؛ فَإِنَّ اللَّهَ جَاعِلٌ فِي بَيْتِهِ مِنْ صَلَاتِهِ خَيْرًا” (رواه مسلم).

قال –صلى الله عليه وسلم-: “تَطَوُّعُ الرَّجُلِ فِي بَيْتِهِ يَزِيدُ عَلَى تَطَوُّعِهِ عِنْدَ النَّاسِ، كَفَضْلِ صَلاَةِ الرَّجُلِ فِي الْجَمَاعَةِ عَلَى صَلاَتِهِ وَحْدَهُ

যে ঘরে নামাজ হয় আর যে ঘরে নামাজ হয় না এ ঘরগুলো এক নয়। যে ঘরগুলোতে নামাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহর হুকুমগুলো পালন হয় এই ঘরগুলো জাহান্নামে যাওয়ার বাহন। আর যে ঘরগুলোতে নামাজ গুরুত্বহীন আল্লাহর হুকুমগুলো পালন করা হয় না এই ঘরগুলো জাহান্নামে যাওয়ার কারণ।

আমাদের প্রতিটি ঘর এক একটি প্রতিষ্ঠান। এই ঘরে আমরা বসবাস করি। এ ঘরে আমাদের সন্তানরা বড় হয়। জীবনের একটি দীর্ঘ সময় এই ঘরে আমাদের থাকা হয়।

কাজেই আমাদের ঘর এমন হওয়া চাই যেখানে ঈমানের চর্চা হবে। সিরাতের চর্চা হবে। এ ঘর থেকে আমাদের সুসন্তান তৈরি হবে। আমাদের ঘরগুলো হতে হবে অবশ্যই আমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন। আমাদের সচেতন থাকতে হবে আমাদের ঘরগুলো যেন আমাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ না হয়।

আমরা এমন ঘর রেখে যাব আমরা পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর আমাদের সন্তানরা সেই ঘরে বসবাস করবে আর তারা আমাদের সম্পদ হিসেবে পৃথিবী আলোকিত করবে। আমরা দুনিয়াতে না থেকেঔ নেকির সুফল পেতে থাকবো।

Scroll to Top