কোরআনে কারীমের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হলো তৌহিদ। একক ইলাহ হিসেবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে মেনে নেয়ার যৌক্তিক দাওয়াত কুরআনে কারিমে তুলে ধরা হয়েছে।
কোরআনে কারিমের তৌহিদের আলোচনাকে বোঝার জন্য তৎকালীন আরব্য মুশরিক সমাজের আকিদা বিশ্বাস আমাদের সামনে থাকলে ভালো হয়।
তাদের আকিদার ব্যাপারে প্রথম কথা হলো
আরবের মুশরিক সমাজ আল্লাহকে স্বীকার করত আল্লাহর অস্তিত্বের তারা অস্বীকারকারী ছিল না।
দ্বিতীয় কথা হলো
তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কিছু গুনাবলীতে অন্য কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক করত না।
যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আসমান জমিনের সৃষ্টি কর্তা মানুষের সৃষ্টিকর্তা, সূর্য এবং চাঁদ তার নিয়ন্ত্রণে চলে সব কিছুর উপর তার প্রভাব, সর্ববিষয়ে তিনি জ্ঞাত, তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তিনি মৃত জমিনকে সজীব করেন, জমিন এবং জমিনের সবকিছুর ওপর তার একক কর্তৃত্ব, তিনি সকলের আশ্রয়দাতা, তিনি সমস্ত প্রাণীর রিজিকদাতা, তিনি পৃথিবীর ব্যবস্থাপক এই সমস্ত গুণাবলীতে তারা আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে শরিক করত না।
তৃতীয় কথা হলো-
মক্কার মুশরিক সমাজ আল্লাহর একক সত্তায় বিশ্বাসী ছিল। এখানেও সমস্যা ছিল না।
চতুর্থ কথা হলো-
মক্কার মুশরিক সমাজ বহু ইলাহে বিশ্বাসী ছিল। আল্লাহকে এক ইলাহ হিসেবে তারা স্বীকার করত না।
পঞ্চম কথা হলো-
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত ছিল আল্লাহ ছাড়া আর অন্য কোন ইলাহ নেই। এখানেই প্রিয় নবীর সাথে তাদের কঠিন মত বিরোধ হয়।
ষষ্ঠ কথা হলো
এই বিষয়ে মতানৈক্যের কারণেই প্রিয় নবীকে তারা বিভিন্ন অপবাদ দ্বারা ঘায়েল করতে চেয়েছিল। যেমন তারা তাকে কবি পাগল জাদুকর মিথ্যাবাদী গণক এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্যদের গালিদাতা এসব অপবাদ গুলো দিয়েছিল।
কোরআনে করিমে মুশরিকদের আকিদার আলোচনা
********************************************
মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্ব বিশ্বাসী ছিল। কিছু গুণাবলীতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করত না। এক সত্তাকেই তারা আল্লাহ বলতো। এই বিষয়গুলোতে বিরোধ নেই।
এ ব্যাপারে কুরআনে কারীমের কিছু আয়াত-
{ وَلَىِٕن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَ ٱلسَّمَـٰوَ ٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ لَیَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ فَأَنَّىٰ یُؤۡفَكُونَ }
[Surah Al-ʿAnkabūt: 61]
{ وَلَىِٕن سَأَلۡتَهُم مَّن نَّزَّلَ مِنَ ٱلسَّمَاۤءِ مَاۤءࣰ فَأَحۡیَا بِهِ ٱلۡأَرۡضَ مِنۢ بَعۡدِ مَوۡتِهَا لَیَقُولُنَّ ٱللَّهُۚ قُلِ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِۚ بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا یَعۡقِلُونَ }
[Surah Al-ʿAnkabūt: 63]
{ قُلۡ مَنۢ بِیَدِهِۦ مَلَكُوتُ كُلِّ شَیۡءࣲ وَهُوَ یُجِیرُ وَلَا یُجَارُ عَلَیۡهِ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ }
[Surah Al-Muʾminūn: 88]
{ قُل لِّمَنِ ٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِیهَاۤ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ }
[Surah Al-Muʾminūn: 84]
{ قُلۡ مَن یَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَاۤءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن یَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَـٰرَ وَمَن یُخۡرِجُ ٱلۡحَیَّ مِنَ ٱلۡمَیِّتِ وَیُخۡرِجُ ٱلۡمَیِّتَ مِنَ ٱلۡحَیِّ وَمَن یُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَیَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ }
[Surah Yūnus: 31]
মক্কার মুশরেকদের সাথে প্রিয় নবীর বিরোধ কোথায়
*****************************************
মক্কার মুশরিকরা বহু ইলাহে বিশ্বাসী ছিল আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য ছিল আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এ বিষয়টি কেন্দ্র করে ছিল বিরোধ।
এ ব্যাপারে কিছু আয়াত-
{ وَعَجِبُوۤا۟ أَن جَاۤءَهُم مُّنذِرࣱ مِّنۡهُمۡۖ وَقَالَ ٱلۡكَـٰفِرُونَ هَـٰذَا سَـٰحِرࣱ كَذَّابٌ (4) أَجَعَلَ ٱلۡـَٔالِهَةَ إِلَـٰهࣰا وَ ٰحِدًاۖ إِنَّ هَـٰذَا لَشَیۡءٌ عُجَابࣱ (5) وَٱنطَلَقَ ٱلۡمَلَأُ مِنۡهُمۡ أَنِ ٱمۡشُوا۟ وَٱصۡبِرُوا۟ عَلَىٰۤ ءَالِهَتِكُمۡۖ إِنَّ هَـٰذَا لَشَیۡءࣱ یُرَادُ (6) مَا سَمِعۡنَا بِهَـٰذَا فِی ٱلۡمِلَّةِ ٱلۡـَٔاخِرَةِ إِنۡ هَـٰذَاۤ إِلَّا ٱخۡتِلَـٰقٌ (7) }
[Surah Ṣād: 4-7]
{ إِنَّهُمۡ كَانُوۤا۟ إِذَا قِیلَ لَهُمۡ لَاۤ إِلَـٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ یَسۡتَكۡبِرُونَ (35) وَیَقُولُونَ أَىِٕنَّا لَتَارِكُوۤا۟ ءَالِهَتِنَا لِشَاعِرࣲ مَّجۡنُونِۭ (36) }
[Surah Aṣ-Ṣāffāt: 35-36]
মুশরিক সমাজের দাবি কি ছিল?
**************************************
মুশরিক সমাজের দাবি ছিল আল্লাহ ছাড়া আরও বহু ইলাহ আছে। তাদের মাঝে কেহ ফেরেশতাদের ইলাহ মনে করত। অনেকে পূর্ব নবী এবং ধর্মীয় সাধকদের এলাহ মনে করত। অনেকে সূর্য নক্ষত্র জিনদের ইলাহ মনে করত। তারা বহু এলাহে বিশ্বাসী ছিল। কুরআনে তাদের এই ভ্রান্ত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে।
কোরআনে কারীম যুক্তির সাথে এই দাবি তুলে ধরেছে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই।
{ أَمَّنۡ خَلَقَ ٱلسَّمَـٰوَ ٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَأَنزَلَ لَكُم مِّنَ ٱلسَّمَاۤءِ مَاۤءࣰ فَأَنۢبَتۡنَا بِهِۦ حَدَاۤىِٕقَ ذَاتَ بَهۡجَةࣲ مَّا كَانَ لَكُمۡ أَن تُنۢبِتُوا۟ شَجَرَهَاۤۗ أَءِلَـٰهࣱ مَّعَ ٱللَّهِۚ بَلۡ هُمۡ قَوۡمࣱ یَعۡدِلُونَ (60)
এই আয়াতে ইলাহ হওয়ার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত তুলে ধরা হয়েছে। এবং দেখানো হয়েছে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া এই গুণাবলী গুলো আর কারো মাঝে পাওয়া যায় না। কাজী আল্লাহর সাথে আর কোন ইলাহ নেই।
أَمَّن جَعَلَ ٱلۡأَرۡضَ قَرَارࣰا وَجَعَلَ خِلَـٰلَهَاۤ أَنۡهَـٰرࣰا وَجَعَلَ لَهَا رَوَ ٰسِیَ وَجَعَلَ بَیۡنَ ٱلۡبَحۡرَیۡنِ حَاجِزًاۗ أَءِلَـٰهࣱ مَّعَ ٱللَّهِۚ بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا یَعۡلَمُونَ (61)
এই আয়াতে ইলাহ হওয়ার জন্য আরও তিনটি শর্ত তুলে ধরা হয়েছে। আর দেখানো হয়েছে এ গুণাবলী গুলো শুধুমাত্র এক আল্লাহর মাঝে পাওয়া যায়। আর কারো মাঝে পাওয়া যায় না।
أَمَّن یُجِیبُ ٱلۡمُضۡطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَیَكۡشِفُ ٱلسُّوۤءَ وَیَجۡعَلُكُمۡ خُلَفَاۤءَ ٱلۡأَرۡضِۗ أَءِلَـٰهࣱ مَّعَ ٱللَّهِۚ قَلِیلࣰا مَّا تَذَكَّرُونَ (62)
এই আয়াতটি ইলাহ হওয়ার জন্য চারটি বিশেষ গুণাবলীর অপরিহার্যতা তুলে ধরা হয়েছে। এবং দেখানো হয়েছে এইগুলা বলি আল্লাহ ছাড়া আর কারো মাঝে পাওয়া যায় না।
أَمَّن یَهۡدِیكُمۡ فِی ظُلُمَـٰتِ ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ وَمَن یُرۡسِلُ ٱلرِّیَـٰحَ بُشۡرَۢا بَیۡنَ یَدَیۡ رَحۡمَتِهِۦۤۗ أَءِلَـٰهࣱ مَّعَ ٱللَّهِۚ تَعَـٰلَى ٱللَّهُ عَمَّا یُشۡرِكُونَ (63) }
এই আয়াতে দুইটি বিষয়ের আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এবং দেখানো হয়েছে এই গুণাবলী গুলো শুধুমাত্র আল্লাহর মাঝে রয়েছে। কাজী ইলাহ হিসেবে শুধুমাত্র আল্লাহকে স্বীকৃতি দিতে হবে অন্য কাউকে নয়।
সত্যকে তাদের কাছে সুস্পষ্ট করার পরও তারা সত্যকে গ্রহণ করেনি। তারা ভ্রান্ত পথিক চলা কি প্রাধান্য দিয়েছে। এবং তারা শির্কের উপর অটল থেকেছে। সত্য তাদের কাছে অজানা ছিল না। তারা এখতেলাফ করেছে সত্যকে জানার পর। সত্য তাদের কাছে সুস্পষ্ট হওয়ার পর। আলো আসার পরও তারা অন্ধকারে থাকাকে প্রাধান্য দিয়েছে। তারা নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করেছে।
কোরআনে কারিম অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে তৌহিদের দাওয়াতকে উপস্থাপন করেছে। এবং তাদের সমস্ত সন্দেহের জবাব পেশ করেছে। তারা সত্যকে গ্রহণ করেনি।
কোরআন কারীমের যৌক্তিক দাওয়াতের মোকাবেলায় মক্কার তৎকালীন মুশরিক সমাজ টিকতে পারেনি। তাদের কাছে তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের কোন যুক্তি ছিল না। যুক্তিতে হেরে গিয়ে তারা প্রিয় রাসুলের ব্যাপারে নানা অপবাদ আরোপ করে। এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কালাম কোরআনে কারীমের ব্যাপারে ধরনের বিভ্রান্তি সমাজের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা করে।
তিরস্কার কটুক্তি আক্রমণ বেশি শক্তির ব্যবহার দ্বারা তারা বিজয় লাভ করতে চেয়েছিল। শক্তি দিয়ে সত্যকে পরাজিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সত্যকে বিজয়ী করেছেন। আর তাদেরকে পরাজিত করেছেন।
আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে আমাদের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করা দলিল প্রমাণ নির্ভর। আমাদের বিশ্বাস অন্ধ বিশ্বাস নয়। কোরআন আমাদের অন্ধকারের দিকে আহবান করেনা। কোরআন আমাদের কি শিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত করে।
আমাদের উচিত কোরআন পড়া কোরআনকে বোঝার চেষ্টা করা কোরআনের শিক্ষা দ্বারা আলোকিত হওয়া।