হাফেজ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে আমার শ্বশুর। গত বছর ডিসেম্বরের ১২ তারিখ তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। তিনি আজ নেই কিন্তু তার স্মৃতি গুলো বেঁচে আছে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ময়মনসিংহ ফুলপুর কাজিয়াকান্দা কামিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। বিভিন্ন মাদ্রাসায় হাদিসের দরস দিতেন। ফুলপুর বালিয়া মাদ্রাসার দীর্ঘদিন সভাপতির জিম্মাদারী পালন করেছেন। আল হুমায়রা মহিলা মাদ্রাসা ও গোদারিয়া মাদ্রাসা তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাকে নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ
অভিভাবক হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি
**********************************
অভিভাবক হিসেবে পরিবারের জন্য তিনি ছিলেন একজন তুলনাহীন ব্যক্তি। তার একটি গুণ ছিল ইনসাফ। প্রতিটি সন্তানকে তিনি সমান দৃষ্টিতে দেখতেন। সন্তানদের সকলেই মনে করত তিনি হয়তো আমাকে নিয়েই সবচাইতে বেশি ভাবেন। সন্তানদের মাঝে তিনি ইনসাফ রক্ষা করে চলতেন।
একটি দৃষ্টান্ত আলোচনা করি। এটা ছিল তার জীবনের সর্বশেষ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ঢাকা সফর। তিনি চিকিৎসা গ্রহণ করছিলেন মিরপুর বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে। হার্ট ফাউন্ডেশনের কাছেই তার তৃতীয় কন্যার বাসা অর্থাৎ আমার বাসা। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তিনি যখন ঢাকায় আসলেন তার সিদ্ধান্ত ছিল কন্যাদের সকলের সাথে দেখা করবেন।
সফরসঙ্গী হিসেবে সাথে ছিল আমার ছোট শ্যালক জুনাইদ। জুনায়েদের পরিকল্পনা ছিল এই বৃদ্ধ বয়সে বাবার সকলের বাসায় গিয়ে দেখা করার প্রয়োজন নেই। সকলেই যদি মিরপুর চলে আসে এখানে একসাথে দেখা হয়ে যাবে। সেভাবে সমস্ত বোনদেরকে সে মেসেজ দিয়ে দিল। বোনেরাও সকলের সম্মত। বৃদ্ধ বাবাকে কেউ কষ্ট দিতে রাজি না।
আমার শ্বশুরের শরীরের অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল ডাক্তার আশ্চর্য হচ্ছিল এই শরীর নিয়ে আপনি ঢাকা এসেছেন। সফর করাটাই তার জন্য ছিল বিপদজনক। এই অবস্থায় তাকে জানানো হলো আপনার এই শরীর নিয়ে সকলের বাসায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনার সাথে সকলে দেখা করতে চলে আসুক। এবং সবাই এত সম্মত।
কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড়। তিনি দৃঢ়তার সাথে বললেন আমি আমার মেয়েদের সকলের বাসায় গিয়ে তাদের সাথে দেখা করব। একজনের বাসায় যাব অন্যজনের বাসায় যাব না এতে অন্যরা কষ্ট পাবে।
তিনি তার অসুস্থতা নিয়েই ঢাকা শহরের এ কঠিন জ্যাম পেরিয়ে সকলের বাসায় উপস্থিত হলেন এবং সকলের সাথে ভালোবাসা বিনিময় করলেন। সকলকে সমানভাবে সময় দিলেন।
এটা তার সারা জীবনের নীতি ছিল। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও বার্ধক্য অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি তার নীতির মাঝে ইনসাফের মাঝে কোন পরিবর্তন আনেননি।
জামাইদের সকলকেও তিনি এক দৃষ্টিতে দেখতেন। যখন কাউকে কিছু উপহার দিতেন। পরিকল্পনা করে সবার কাছেই সে উপহার তিনি পৌঁছাতেন। পরিবারের সকলের সাথে তার এই ইনসাফ করাকে সন্তানরা পরিবারের সকলেই খুব উপভোগ করত।
তার আরেকটি গুণ ছিল এহসান। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সন্তানদের থেকে পরিবারের সদস্যদের থেকে তার মাঝে কোন চাওয়া পাওয়ার প্রবণতা ছিল না। বৃদ্ধ বয়সে তার মাঝে সকলকে যার যার অঙ্গনে সহযোগিতা করার ফিকির ছিল।
প্রতিদিন সময় করে তিনি নিজে মেয়েদের খবর নিতেন। সারাদিনের কারগুজারী শুনতেন সকলকে উত্তম উপদেশ দিতেন। নাতিনদের লেখাপড়া এবং তাদের তরবিয়তের বিষয় নিয়ে ফিকির করতেন। যেকোনো সংকটে সহযোগিতা পৌঁছে দিতেন। ঈদ ও অন্যান্য আনন্দের দিনে সকলকে বকশিশ দিতেন। সকলকে দেখতেন এক দৃষ্টিতে। আরো কিছু নেওয়া পছন্দ করতেন না। কাউকে কিছু দিতে পারার মাঝেই ছিল তার আনন্দ।
শ্বশুরালয়ে বেড়াতে গিয়ে দেখতাম প্রতিদিন রাতে ছেলেদের নিয়ে বসতেন। সারাদিনের কারগুজারী তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব গ্রহণ করতেন। নিজের অসুস্থতা পেরেশানির জন্য অন্য কাউকে পেরেশান করতেন না। কিন্তু অন্যদের পেরেশানিতে নিজে ঠিকই পেরেশান হতেন। কারো অসুস্থতা জানলে বারবার খবর নিতেন পরামর্শ দিতেন।
সর্বাবস্থায় স্বাভাবিক থাকতেন। আমরা তাকে কখনোও অধিক রাগান্বিত হতে দেখিনি। সর্বাবস্থায় ঠান্ডা মাথায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। সর্ব বিষয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করতেন। সবাইকে আখেরাতের ব্যাপারে সচেতন করতেন।
আমরা কখনো তাকে কারো গীবত শেকায়াত কটু কথা পরনিন্দা করতে দেখিনি। পরিবারের সকলের জন্য তিনি ছিলেন উত্তম নমুনা এবং আদর্শ। তার সাথে আলোচনায় বসলে দেশ সমাজ পরিবার নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বিভিন্ন আলোচনা শোনা যেত। অযথা মূল্যহীন কথা থেকে তিনি বিরত থাকতেন। আমরা কখনো তাকে অযথা কথা বলতে দেখিনি।
শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মসজিদ পরিচালনা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। সর্ব অঙ্গনেই নিজ সঙ্গী সাথী অধীনস্থদের জন্য তার সাথে কাটানো সময় ছিল উপভোগ্য।
তার অভিভাবকত্ব সকলেই গ্রহণ করত আনন্দের সাথে। কারণ তার মাঝে ছিল ইনসাফ এবং এহসান। আমি সকলকে মূল্যায়ন করতেন আন্তরিকতার সাথে। সকলের পরামর্শ গুরুত্ব দিতেন। সময়ের সঠিক এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা ছিল তার মাঝে। তিনি ছিলেন সকলের জন্যই উত্তম অভিভাবক।