প্রিয় নবীজির জীবনের দুটি দিক। এক হলো তার মর্যাদা নিয়ে আলোচনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে যে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছিলেন এটা তার নবুয়তের দলিল। এর অনুসরণ অনুকরণ সম্ভব নয়। তবে তার মর্যাদার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং মর্যাদার আলোচনার মাধ্যমে তার প্রতি ভক্তি এবং ভালোবাসা তৈরি করা আমাদের কর্তব্য।
দ্বিতীয় বিষয় হলো তার সিরাত নিয়ে আলোচনা। তার সিরাতের আলোচনা আমরা করব তার অনুসরণ এবং অনুকরণের জন্য।
কুরআনে প্রিয় নবীর মর্যাদার আলোচনা
********************************
সূরা হুজুরাত আয়াত -১
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন-
{ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ لَا تُقَدِّمُوا۟ بَیۡنَ یَدَیِ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۖ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِیعٌ عَلِیمࣱ (1)
হে মুমিনগণ! (কোনও বিষয়ে) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের থেকে আগ বেড়ে যেও না। ১ আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন।
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রিয় নবীজির হক আলোচনা করে আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন অগ্রগামী না হই। আমাদের উচিত জীবনের সকল বিভাগে নবীর পিছনে থেকে তার অনুসরণ করা। আমরা যখন নবীর পিছনে থাকবো আর অনুসরণ করে চলবো আমরা সফল হবো। দুনিয়া ও আখেরাতে বিজয়ী হবো
আর যদি আমরা এই শ্রেষ্ঠতম নবীকে পাওয়ার পর অন্য কোন ব্যক্তির চিন্তাধারা তার দর্শনকে অনুসরণ করি এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য আর আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
সূরা হুজুরাত আয়াত ২
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন-
یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ لَا تَرۡفَعُوۤا۟ أَصۡوَ ٰتَكُمۡ فَوۡقَ صَوۡتِ ٱلنَّبِیِّ وَلَا تَجۡهَرُوا۟ لَهُۥ بِٱلۡقَوۡلِ كَجَهۡرِ بَعۡضِكُمۡ لِبَعۡضٍ أَن تَحۡبَطَ أَعۡمَـٰلُكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تَشۡعُرُونَ (2) }
[Surah Al-Ḥujurāt: 1-2]
হে মুমিনগণ! নিজের আওয়াজকে নবীর আওয়াজ থেকে উঁচু করো না এবং তার সাথে কথা বলতে গিয়ে এমন জোরে বলো না, যেমন তোমরা একে অন্যের সাথে জোরে বলে থাক, পাছে তোমাদের কর্ম বাতিল হয়ে যায়, তোমাদের অজ্ঞাতসারে।
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সাবধান করেছেন আমরা যেন নবীর আওয়াজের উপর নিজেদের আওয়াজকে উচ্চকিত না করি। এ ক্ষেত্রে নবীর মতামত আছে হাদিস আছে নবীর মতামত হাদিসের উপর নিজ মতামত পেশ না করি। আমরা যেন আমাদের দর্শনকে উচ্চকিত না করি তার ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। নবীর প্রতি অশ্রদ্ধ প্রদর্শনে জীবনের সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যায়।
আমাদের নিজেদের ব্যাপারে আমাদের মতামত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। সমাজের মতামত রাষ্ট্রের মতামত পার্লামেন্টের মতামত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু নবী যে মতামত পেশ করেন এটা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ নবী যা বলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বলেন। এই নবীর মতামত সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে।
সূরা নূর আয়াত ৬৩
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন-
{ لَّا تَجۡعَلُوا۟ دُعَاۤءَ ٱلرَّسُولِ بَیۡنَكُمۡ كَدُعَاۤءِ بَعۡضِكُم بَعۡضࣰاۚ }
[Surah An-Nūr: 63]
(হে মানুষ!) তোমরা নিজেদের মধ্যে রাসূলের ডাককে তোমাদের পারস্পরিক ডাকের মত (মামুলি) মনে করো না।
এই আয়াতেও নবীর দর্শণকে নবীর দাওয়াতকে নিজেদের মতো মনে করতে বারণ করা হয়েছে।
সূরা আহযাব আয়াত ৫৬
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন-
{ إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَـٰۤىِٕكَتَهُۥ یُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِیِّۚ یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ صَلُّوا۟ عَلَیۡهِ وَسَلِّمُوا۟ تَسۡلِیمًا }
[Surah Al-Aḥzāb: 56]
নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ পাঠান। ৪৯ হে মুমিনগণ! তোমরাও তার প্রতি দরূদ পাঠাও এবং অধিক পরিমাণে সালাম পাঠাও।
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবীর উচ্চ মর্যাদা কে তুলে ধরেছেন। নবীর মর্যাদা হল এই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রতি সার্বক্ষণিক রহমত প্রেরণ করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একদল ফেরেশতা তার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সর্বদা প্রার্থনা করতে থাকে। এই হলো নবীর মর্যাদা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মর্যাদার আলোচনা করে মুমিনদের আদেশ করেছেন তোমরা নবীর প্রতি দরুদ সালাম ভক্তি ও ভালোবাসা প্রেরণ করো।
নবীর প্রতি সর্বোচ্চ ভক্তি ও ভালোবাসা রাখা আমাদের কর্তব্য। যত বেশি ভালোবাসা তত বেশি ঈমান। ভালোবাসার প্রতি ঈমানের সম্পর্ক। নবীর প্রতি সর্বোচ্চ ভালবাসা আমাদেরকে ঈমানের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দিবে।
শ্রেষ্ঠতম যুগে এ পৃথিবীতে তার আগমন
*********************************
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় নবীকে পৃথিবীর সর্বকালের সেরা মানুষদের মাঝে সেরা যুগে প্রেরণ করেছেন।
হাদিসের মধ্যে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
روى البخاري (2652) ، ومسلم (2533) عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بن مسعود رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ( خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ،
সেরা মানুষ হলো আমার যুগের মানুষ। এই আয়াতে সাহাবায়ে কেরামদের মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। নবীদের পর তারা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন। নবীর আনুগত্যে তারা যে আত্মত্যাগ অ কোরবানির দৃষ্টান্ত পেশ করেছিলেন এই দৃষ্টান্ত আর অন্য কোন উম্মার মাঝে পাওয়া যায় না।
সাহাবীদের মর্যাদা আলোচনা করে রাসূলুল্লাহ বলেন-
فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا، وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ،
তোমাদের কর্তব্য আমার সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা। এবং আমার খলিফাদের সুন্নত আঁকড়ে ধরা তারা ছিলেন হেদায়েতের পথের পথিক।
শ্রেষ্ঠতম নগরীতে প্রিয় নবীর আগমন
***************************
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রিয় নবীকে পৃথিবীর সবচাইতে মর্যাদা পূর্ণ শহরে প্রেরণ করেছেন। এই শহরের আলোচনা আল্লাহ কুরআনের মাঝে করেছেন।
সুরা শুরা আয়াত-৭
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন-
{ وَكَذَ ٰلِكَ أَوۡحَیۡنَاۤ إِلَیۡكَ قُرۡءَانًا عَرَبِیࣰّا لِّتُنذِرَ أُمَّ ٱلۡقُرَىٰ وَمَنۡ حَوۡلَهَا
[Surah Ash-Shūrā: 7]
আয়াতে প্রিয় নবীর শহর মক্কাকে উম্মুল কুরা বলা হয়েছে। উম্মুল কুরা অর্থ হল জনপথ সমূহের মা বা কেন্দ্র।
সূরা তীন আয়াত ৩
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন-
{ وَهَـٰذَا ٱلۡبَلَدِ ٱلۡأَمِینِ }
[Surah At-Tīn: 3]
এই আয়াতে মক্কাকে নিরাপদ শহর বলা হয়েছে। এবং আল্লাহ রব্বুল আলামীন এর শহরের কসম খেয়েছেন।
সূরা আলে ইমরান আয়াত ৯৭
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন
{ وَمَن دَخَلَهُۥ كَانَ ءَامِنࣰاۗ }
[Surah Āli-ʿImrān: 97]
এই আয়াতে প্রিয় নবীর শহরের মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে।
সূরা আল ইমরান আয়াত ৯৬
রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেন-
{ إِنَّ أَوَّلَ بَیۡتࣲ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِی بِبَكَّةَ مُبَارَكࣰا وَهُدࣰى لِّلۡعَـٰلَمِینَ (96)
[Surah Āli-ʿImrān: 96]
এই আয়াতে মক্কার ব্যাপারে বলা হয়েছে এই ঘর প্রথম ঘর যা মানুষের কল্যাণে তৈরি করা হয়েছে।
সূরা বাকারা আয়াত ১২৭
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন-
{ وَإِذۡ یَرۡفَعُ إِبۡرَ ٰهِـۧمُ ٱلۡقَوَاعِدَ مِنَ ٱلۡبَیۡتِ وَإِسۡمَـٰعِیلُ رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّاۤۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلسَّمِیعُ ٱلۡعَلِیمُ (127)
এই আয়াতে বাইতুল্লা নির্মাণের পর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দোয়াকে তুলে ধরা হয়েছে।
সূরা বাকারা আয়াত ১২৯
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন
رَبَّنَا وَٱبۡعَثۡ فِیهِمۡ رَسُولࣰا مِّنۡهُمۡ یَتۡلُوا۟ عَلَیۡهِمۡ ءَایَـٰتِكَ وَیُعَلِّمُهُمُ ٱلۡكِتَـٰبَ وَٱلۡحِكۡمَةَ وَیُزَكِّیهِمۡۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِیزُ ٱلۡحَكِیمُ (129) }
[Surah Al-Baqarah:129]
এই আয়াতে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ার বাকি অংশের মাঝে এই শহরে একজন মর্যাদাবান নবী পাঠানোর আবদার উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সেই দোয়ার ফসল আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবকে প্রাণের জন্য মক্কাকে বাছাই করেছেন। তিনি ছিলেন আল্লাহর জন্য সৃষ্টির মাঝে সবচাইতে নিবেদিত প্রাণ। তার মাঝে ছিল দাসত্বের সীমাহীন অনুভূতি। মানুষের প্রতি তার ছিল গভীর ভালোবাসা।
সৃষ্টি কুলের সেরা তিনি
*******************
সূরা আম্বিয়া 107 নম্বর আয়াত
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইরশাদ করেন-
{ وَمَاۤ أَرۡسَلۡنَـٰكَ إِلَّا رَحۡمَةࣰ لِّلۡعَـٰلَمِینَ }
[Surah Al-Anbiyāʾ: 107]
আমাদের সবচাইতে বড় পরিচয় আমরা এই সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত। তার নেতৃত্বে তার আদর্শে আমরা উজ্জীবিত। আজকে তার জীবনকে না জানার কারণে আমরা বিভক্ত। সেই সাথে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত।
প্রিয় নবীর আনুগত্যের গুরুত্ব
*************************
সূরা নিসা ৬৪ নম্বর আয়াত
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী পাঠানোর লক্ষ্য আলোচনা করেছেন-
{ وَمَاۤ أَرۡسَلۡنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِیُطَاعَ بِإِذۡنِ ٱللَّهِۚ }
[Surah An-Nisāʾ: 64]
আল্লাহ রব্বুল আলামীন এজন্যই প্রেরণ করেছেন জীবন পরিচালনার যে আইন আল্লাহ থেকে রাসুল নিয়ে আসবেন আমাদেরকে দুনিয়ার সকল মতাদর্শ থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র তারই অনুসরণ করতে হবে।
আমরা যারা এভাবে রসুলের অনুসরণ করতে পারব তারাই সফল হবো আর যারা এভাবে রসুলের অনুসরণ করতে ব্যর্থ হবো তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবো।
আসুন তার পতাকা তলে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। তাহলে আমরাই গড়ে তুলতে পারবো পৃথিবীতে সুন্দর সোনালী সমাজ। দুনিয়া ও আখেরাতে আমরা হবো মর্যাদাবান।