মুফতি শহিদুল ইসলাম। শুধু এক নাম নয় বরং এক ইতিহাস। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন সেরা মানুষ। দ্বীন ও মানবতার সেবায় তার পথচলা অনুকরণীয় অনুসরণীয়।
অনেকদিন পর সেদিন দেখা হল টঙ্গীর ইজতেমাস্থলে। দেখার সাথে সাথে কাছে ডেকে বললেন তুমি আমাকে ভুলে গেলে। প্রশ্নটির কোন উত্তর ছিল না। আসলে এমন মানুষকে কখনোই ভোলা যায় না। দীর্ঘ সময় তার সাথে থাকার সুযোগ হয়েছে সেদিন। ইচ্ছে করেছিলাম কথা দিয়েছিলাম তার সাথে সাক্ষাৎ করব কেরানীগঞ্জে যাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিলেন। জানা ছিল না এটাই তার সাথে আমার ইহজীবনে শেষ সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে।
আমি শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রাহিমাহুল্লাহকে দেখেছি তার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল বর্ণনাতীত। ১৯৯৯ সালে যখন জালেম সরকার তাকে কারারুদ্ধ করল শাইখুল হাদিসের জবান থেকে তখন শুনেছি মুফতি শহিদ ইসলামের জন্য আমাদের জন্য এ পর্যন্ত যা করেছে সে কারাগারে থাকবে আর আমরা কিছু করবো না তা হতে পারে না। তার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ কিছু করতেই হবে।
শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের প্রতি তার ভালোবাসাও ছিল সীমাহীন। জেলখানা থেকে বের হয়ে সেই ১৯৯৯ সালে তিনিই উদ্যোগি হয়ে শাইখুল হাদিসকে রহমানিয়া ভবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন। শাইখুল হাদিসকে রহমানিয়া ফিরিয়ে আনার সে ইতিহাস আজ মনে হচ্ছে বারবার।
রহমানিয়ার চারতলায় শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক কে সামনে রেখে শাইখুল হাদিসের প্রিয় দুই ছাত্র প্রিয় দুই সহকর্মী মুফতি মনসুরুল হক ও মাওলানা হিফজুর রহমানকে লক্ষ্য করে তিনি বিনয়ের সাথে রহমানিয়ার সমস্ত তুলাবাদের সামনে আবেদন করেছিলেন হুজুর ইখতেলাফ হয়েছিল সাহেবাইনের ইমাম আবু হানিফার সাথে অনেক মাসায়েলে এখতেলাফ হয়েছে। কিন্তু সাহেবাইন তো উস্তাদ ইমাম আবু হানিফার মাযহাবকে ত্যাগ করেননি। আমরা শাইখুল হাদিসের সাথে আপনাদেরকে একসাথে দেখতে চাই। তার সে আলোচনা উপস্থিত সকলের অশ্রু ঝরিয়েছিল। তিনি কেঁদেছিলেন এবং কাঁদিয়ে ছিলেন।
আজ ফজরের নামাজ পড়ে বাসায় এসে মোবাইল হাতে নিয়ে সংবাদটা পাওয়ার সাথে সাথে পূর্ণ শরীর মোচর দিয়ে উঠল। দ্রুত সময়ের মাঝে ছুটে গেলাম মারকাজুল ইসলামী কার্যালয়ে। তার হাস্যজ্জল লাশের পাশে দাঁড়িয়ে মনের অজান্তেই মনের সমস্ত ব্যথাগুলো দূর হয়ে গেল।
এমন কর্মমুখর জীবন কাটিয়ে হাসিমুখে আল্লাহর কাছে যাওয়া কত বড় সৌভাগ্য। জীবনের শেষ সময়গুলো তাকে ফেরারী অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। কখনো দেশে কখনো দেশের বাইরে। এখন তিনি মুক্ত স্বাধীন বাধা বন্ধনহীন।
রব্বুল আলামিনের কাছে আমরা আশাবাদী তিনি তার প্রিয় বান্দাকে আর উপযুক্ত মর্যাদার আসনে স্থান দিবেন। তার জীবনের ভুল গুলোকে ক্ষমা করে তার খেদমত গুলোকে আমলের পাল্লায় ভারী করে দিবেন।
আমরা তার কাছ থেকে নিয়েছি কিন্তু তাকে দিতে পারিনি কিছুই। পবিত্র ভূমি মক্কায় তিনি আমাকে ডেকে তার মেহমান বানিয়ে ধন্য করেছিলেন। নড়াইলে তৈরি করা নরাইলের পথশিশু আর এতিম সন্তানদের গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠানে দুইদিন থেকে ছোট ছোট বাচ্চাদের আন্তর্জাতিক ইসলামী মহাসম্মেলন উপলক্ষে সংগীত শিখিয়েছিলাম-
একটি সংগীতের শিরোনাম ছিল-
নড়াইলের উন্নয়নে যোগ্য নেতা পাইছি ভাই
শহিদ ভাইয়ের নাই তুলনা নাই
আরেকটা সংগীত ছিল-
নড়াইল বাসীর প্রাণের নেতা মুফতি শহিদ ভাই
উন্নয়ন আর মানবসেবায় তুলনা যার নাই
নড়াইলে সেই দুইদিন আমার অবস্থান আমার জীবনের সবচাইতে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি যা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা কখনও সম্ভব না।
তাকে প্রিয় মানুষ হিসেবে পেয়েছি। যত কাছে গিয়েছি তত ভালোবাসা পেয়েছি তত তার ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছি।
তাকে নিয়ে লেখা শুরু করা যায় শেষ করা যায় না। কিন্তু আমরা বড় অকৃতজ্ঞ। জীবন সায়াহ্নে সামান্য একটু দেখা করে তার প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের সামান্য কাজটুকুও আমাদের মত অকৃতজ্ঞদের দ্বারা হয়নি।
এখন তিনি চলে গেছেন তার প্রিয় রবের দরবারে। আমরা রব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করি তিনি তাকে উত্তম যা সবকিছু দান করুন। তার রেখে যাওয়া দুই সম্পদ Hamza Shahidul Islam ও তালহা তার কাজগুলোকে নিয়ে সামনের দিনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে পথ চলুক সেই কামনা করি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের ক্ষমা করুন।