মা বাবা পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য

মাদরাসাতুল কুরআন লিলবানাত ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে তরবিয়তি আলোচনা—–

🔶 তোমরা যারা আজ মাদরাসায় বসে কুরআন শিখছ, হাদিস শিখছ, দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করছ, তোমাদের প্রত্যেকের জীবনে একটি বড় পরিচয় আছে। তোমরা শুধু শিক্ষার্থী নও, তোমরা কারো আদরের সন্তান, কলিজার টুকরা। আজ আমরা কথা বলব পরিবারের প্রতি তোমাদের দায়িত্ব নিয়ে। মা বাবার সাথে তোমাদের আচরণ নিয়ে।

🔶 পরিবার আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামত। আজ তোমার বয়স দশ, বারো, পনেরো কিংবা বিশ বছর। তোমার চারপাশে কত মানুষ! শিক্ষক আছেন, সহপাঠী আছে, আত্মীয়-স্বজন আছে, বন্ধু আছে। কিন্তু এদের মধ্যে যারা তোমাকে পৃথিবীতে আসার আগে থেকেই ভালোবেসেছিলেন তারা হলেন তোমার বাবা-মা।

পৃথিবীতে আসার পর প্রথম যে মুখটি আমরা দেখি, তা হলো মায়ের মুখ। প্রথম যে হাতটি আমাদের ধরে, তা হলো বাবার হাত। প্রথম যে মানুষগুলো আমাদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে, তারা হলো আমাদের বাবা মা আমাদের পরিবার।

🔶 এ পৃথিবীতে মানুষ অনেক সম্পর্ক গড়ে তোলে। বন্ধুত্ব হয়, পরিচয় হয়, কর্মক্ষেত্রের সম্পর্ক হয়। কিন্তু পরিবারের সম্পর্ক আলাদা। অন্যদের সাথে পরিচয় হয় তারপর বন্ধুত্ব হয়। এই বন্ধুত্ব তৈরি হয় কোন না কোন স্বার্থকে কেন্দ্র করে। কিন্তু পরিবারের ভালোবাসা স্বার্থহীন। এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি বিশেষ নিয়ামত।

এ কারণেই কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা মানবজাতির সূচনার আলোচনা করতে গিয়ে পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।‌আল্লাহ বলেন—

﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ﴾

“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন। (সূরা নিসা: ১)

আয়াতটি আমাদের শেখায়, আমরা সবাই এক পরিবারের সন্তান। মানবজাতির শুরুই হয়েছে পরিবার দিয়ে।

🔶 আল্লাহ চাইলে প্রত্যেক মানুষকে আলাদা আলাদা সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনের বন্ধনে মানুষকে আবদ্ধ করেছেন। কারণ মানুষ একা বাঁচার জন্য সৃষ্টি হয়নি। মানুষ ভালোবাসার জন্য সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ পরিবার গড়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে।

একটি ছোট শিশুর দিকে তাকাও। সে কিছুই জানে না। কীভাবে খেতে হয় জানে না, কীভাবে চলতে হয় জানে না, কীভাবে কথা বলতে হয় জানে না। কিন্তু আল্লাহ তার জন্য একটি পরিবার তৈরি করে রেখেছেন। একজন মা আছেন, যিনি তাকে বুকে আগলে রাখবেন। একজন বাবা আছেন, যিনি তার জন্য পরিশ্রম করবেন। ভাই-বোন আছে, যারা তার সঙ্গী হবে।

এটাই পরিবার। এটাই আল্লাহর রহমত। এটাই আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি। দুঃখজনকভাবে মানুষ অনেক সময় এই নিয়ামতের মূল্য বুঝতে পারে না। যখন মা জীবিত থাকেন, তখন তার কথায় বিরক্ত হয়। যখন বাবা পাশে থাকেন, তখন তার উপদেশকে বোঝা মনে হয়। যখন ভাই-বোন কাছে থাকে, তখন তাদের সাথে ঝগড়া করে।

🔶 আমাদের মাদ্রাসায় লেখাপড়ার উদ্দেশ্য শুধু ভালো হাফেজা আলেমা হওয়া না। ভালো মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা। মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া। তাদের অনুগত তাদের হৃদয়ের মনি হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা।

একজন মুমিনের দৃষ্টিতে পরিবার শুধু একসাথে বসবাস করার নাম নয় পরিবার হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া একটি আমানত, একটি নিয়ামত, একটি জান্নাতের টুকরো। পরিবার হলো দুনিয়ার জান্নাত।

যে এই নিয়ামতের কদর করতে পারে, সে জীবনের অনেক বড় সৌভাগ্য লাভ করে। আর যে এই নিয়ামতের মূল্য বুঝতে পারে না, সে অনেক সময় সবকিছু পেয়েও অন্তরে শান্তি খুঁজে পায় না।‌পরিবার শুধু পরিচয় নয়, পরিবার আমার জান্নাতের পথে প্রথম সোপান।

মায়ের মর্যাদা: পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঋণ

*************************************

মা হলো আল্লাহর সেই শ্রেষ্ঠতম নেয়ামত, যার ঋণ কোনো সন্তান জীবনে কখনো পরিশোধ করতে পারে না। মায়ের কষ্টের প্রতিদান দেয়া কোনো সন্তানের জন্য কখনোই সম্ভব না।

পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা তোমাকে ভালোবাসে। শিক্ষক ভালোবাসেন, আত্মীয়-স্বজন ভালোবাসেন, বন্ধুরা ভালোবাসে। কিন্তু একজন মানুষের ভালোবাসা সব ভালোবাসাকে ছাড়িয়ে যায়। তিনি তোমার মা।

🔶 একটু চোখ বন্ধ করে চিন্তা করো। আজ তুমি সুস্থভাবে হাঁটছ, কথা বলছ, পড়াশোনা করছ, কুরআন শিখছ। কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন তুমি কিছুই করতে পারতে না। তুমি ছেলে শিশু। তোমার আজকের এই জ্ঞান এই প্রভাব এই ক্ষমতা এই পরিচয় ছিল না। তুমি ছিলে অসহায়, দুর্বল, অক্ষম। তখন তোমাকে বহন করেছে তোমার মা। তোমাকে তিলে তিলে তিনি গড়ে তুলেছেন।

সর্বপ্রথম এ মায়ের গর্ভে তোমার ঠিকানা ছিল। একদিন নয়। এক সপ্তাহ নয়। এক মাস নয়। নয় মাস এই মা তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছে।‌ আল্লাহ তাআলা সেই ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন—

﴿حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ﴾

“তার মা তাকে দুর্বলতার পর দুর্বলতা সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে। (সূরা লুকমান: ১৪)

কত সুন্দর ভাষা! দুর্বলতার পর দুর্বলতা। অর্থাৎ প্রতিটি দিন, প্রতিটি সপ্তাহ, প্রতিটি মাস ছিল কষ্টের উপর কষ্ট, ত্যাগের উপর ত্যাগ।তোমার শরীর বড় হয়েছে, কিন্তু তার শরীর দুর্বল হয়েছে।

🔶 একটু চিন্তা করে দেখো তোমার পেটে যদি একটি পাথর বেঁধে দেয়া হয় আর ঘন্টার পর ঘন্টা তা নিয়ে তোমাকে যদি চলতে হয় এটা কত কষ্টকর হবে। তোমার মা তোমার বুঝা গর্ভে ধারণ করেছে দিনের পর দিন মাসের পর মাস, নয় মাস। এই কষ্টের কি তুলনা হয়। তারপর এই মা তোমাকে প্রসব করেছে। এখানে কষ্ট শেষ হয়নি।

জন্মের পর তোমাকে গড়ে তোলার পর্ব। রাতের উপর রাত দিনের পর দিন প্রতি মুহূর্ত সময় তোমাকে পাহাড়া দেয়া। তোমাকে হেফাজত করা। কল্পনা কর। একটি ছোট শিশু অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। শিশুটি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে।‌ বাবা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। পুরো পৃথিবী যেন ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু একজন মানুষ জেগে আছেন। তিনি মা।

তিনি বারবার সন্তানের কপালে হাত রাখছেন।‌ জ্বর কমেছে কি না দেখছেন। কখনো পানি খাওয়াচ্ছেন। কখনো দোয়া পড়ে ফুঁ দিচ্ছেন।‌কখনো সিজদায় গিয়ে কাঁদছেন। কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছেন হে আল্লাহ! আমার সন্তানকে সুস্থ করে দিন। তার কষ্ট আমাকে দিন।সন্তান তখন ঘুমিয়ে থাকে। সে জানেও না, তার জন্য একজন মানুষ সারা রাত চোখের পানি ফেলছে। এভাবেই কাটে একজন মায়ের রাত।

🔶 অনেক মা আছেন সন্তান যেন ভালো খাবার খেতে পারে, তাই নিজের অংশটুকু সন্তানের প্লেটে তুলে দিয়েছেন। সন্তানের জন্য নতুন পোশাক কিনেছেন, কিন্তু নিজের জন্য কিছু কেনেননি। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। কত মা আছেন, যাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ইচ্ছাগুলো সন্তানের সুখের জন্য কবর হয়ে গেছে। কিন্তু তারা অভিযোগ করেননি। বরং হাসিমুখে বলেছেন আমার সন্তানের ভালো থাকাই আমার সুখ।

মায়ের হৃদয় পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর জিনিসগুলোর একটি। তুমি তাকে কষ্ট দিলে তিনি কাঁদবেন। কিন্তু তোমার ক্ষতি চাইবেন না। তুমি ভুল করলে তিনি রাগ করবেন। কিন্তু তোমার ধ্বংস চাইবেন না। তুমি দূরে চলে গেলে তিনি কষ্ট পাবেন। কিন্তু তোমার জন্য দোয়া করা বন্ধ করবেন না। এমন ভালোবাসা কোথায় পাবে।

🔶 তোমার বন্ধুরা তোমার সহপাঠীরা তোমাকে ভালবাসে। সেখানে তোমাকেও ভালোবাসা দিতে হয়। সহকর্মীরা ভালোবাসে তোমাকেও ভালোবাসা দিতে হয়। তাদের সাথে তোমার আচরণ যদি মন্দ হয় তোমার জীবন হুমকির মুখে পড়ে যায়। একমাত্র নির্ভেজাল ভালোবাসা পরিবারের ভালোবাসা। ইসলামে পরিবারকে ভালোবাসা এবাদত। আমরা এ ভালোবাসা তোমাদের মাঝে জাগিয়ে তুলতে চাই।

অনেক সময় সন্তান মায়ের বকাঝকা মনে রাখে, কিন্তু মায়ের কান্না দেখে না। মায়ের শাসন দেখে, কিন্তু মায়ের দোয়া দেখে না। মায়ের রাগ দেখে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসার গভীরতা বুঝতে পারে না।

🔶 আমাদের প্রিয় নবী মায়ের মর্যাদার আলোচনা করেছেন অসংখ্য হাদিসে। এক সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?‌রাসূল ﷺ বললেন তোমার মা।

তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন তারপর কে? তিনি বললে‌ন তোমার মা। আবার জিজ্ঞেস করলেন তারপর কে? তিনি বললেন তোমার মা। চতুর্থবার বললেন তোমার বাবা। (বুখারি, মুসলিম)

আরেক হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন জান্নাত মায়ের পদতলে। অর্থাৎ মায়ের সন্তুষ্টি, মায়ের খিদমত, মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান জান্নাতের পথকে সহজ করে দেয়।

যে সন্তান মায়ের হৃদয় জয় করতে পারে, সে আল্লাহর রহমতের একটি বিশাল দরজা খুলে ফেলে।

বাবার মর্যাদার আলোচনা

*************************

যে মানুষটি কাঁদেন কম, কিন্তু ভালোবাসেন সবচেয়ে বেশি।

যখন আমরা মা সম্পর্কে কথা বলি, তখন আমাদের চোখ ভিজে যায়। কারণ মায়ের ভালোবাসা আমরা দেখতে পাই, অনুভব করতে পারি। মা আদর করেন, বুকে জড়িয়ে ধরেন, কাঁদেন, দোয়া করেন।

কিন্তু পরিবারের আরেকজন মানুষ আছেন, যার ভালোবাসা অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।

তিনি হলেন—বাবা। মা তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করেন। আর বাবা তাঁর ভালোবাসা লুকিয়ে রাখেন। মা কাঁদেন। বাবা নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। মা বুকে জড়িয়ে ধরেন। বাবা দূর থেকে পাহারা দেন। মা সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের কাঁধে পৃথিবীর বোঝা তুলে নেন।

🔶 বাবার ভালোবাসার ভাষা আলাদা। একজন বাবা হয়তো কখনো মুখে বলেন না, মা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু তার প্রতিটি ঘামের ফোঁটা বলে আমি তোমার জন্য বেঁচে আছি। তিনি হয়তো কখনো কান্না দেখান না।‌কিন্তু সন্তানের বিপদে তার বুকের ভেতর যে ঝড় ওঠে, তা একমাত্র আল্লাহ জানেন।

অনেক সময় সন্তান ভাবে আব্বু আমাকে বেশি আদর করেন না।‌ কিন্তু সেই সন্তান জানে না, তার বাবা হয়তো তাহাজ্জুদের সিজদায় তার জন্য কান্না করেছেন।

একটু চিন্তা করো। অনেক বাবা আছেন নিজের জন্য ভালো জুতা কিনেন না। কিন্তু সন্তানের জন্য কিনে দেন। নিজে পুরোনো কাপড় পরেন। কিন্তু সন্তানের জন্য ঈদের নতুন পোশাক নিয়ে আসেন। নিজে ভালো খাবার খান না। কিন্তু সন্তানের পছন্দের খাবার কিনে আনেন। নিজের শখ ত্যাগ করেন।‌ নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দেন। নিজের স্বপ্নগুলো বুকের ভেতর চাপা দিয়ে রাখেন।

কার জন্য, সন্তানের জন্য। একজন বাবা যখন প্রথমবার তার নবজাতক সন্তানকে কোলে নেন, তখন তার নিজের জীবনের চেয়েও বড় একটি স্বপ্ন জন্ম নেয়। সে স্বপ্ন হলো আমার সন্তান যেন আমার চেয়ে ভালো থাকে। এই স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি জীবনভর সংগ্রাম করেন।

🔶 একজন বাবা হয়তো সারাদিন দিনমজুরি করে উপার্জন করেছেন। প্রখর রোদে ঘাম ঝরিয়েছেন। মানুষের তিরস্কার সহ্য করেছেন। অথবা দোকানে দাঁড়িয়ে বারো ঘণ্টা কাজ করেছেন।‌অথবা অফিসে বসের কঠিন কথা শুনেছেন।

অথবা শ্রমিকের কাজ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরেছেন।

সন্ধ্যায় যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন তার শরীর ক্লান্ত।

সেই ক্লান্ত মানুষঘরে এসে মেয়েকে কোলে নেন।‌ কথা বলেন।‌ আনন্দ করেন গল্প করেন কারণ সন্তানের হাসি তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

🔶 এই বাবা-মা কখনো সন্তানের সাথে রাগান্বিত হন তাদের বকা দেন তাদেরকে শাস্তি দেন শাসন করেন। বাবা-মা কেন রাগ করেন?

সন্তানের চোখে রাগ, কিন্তু এই রাগটাই বাবা-মায়ের হৃদয়ের ভালোবাসা। একটি কথা চিন্তা কর। যে মা তোমাকে জন্ম দিয়েছেন, তোমার অসুস্থতার রাতে ঘুমাননি, তোমার জন্য দোয়া করতে করতে চোখের পানি ফেলেছেন—তিনি কি তোমার শত্রু হতে পারেন?

যে বাবা নিজের যৌবন, শক্তি, স্বপ্ন, আরাম সবকিছু তোমার ভবিষ্যতের জন্য ব্যয় করেছেন—তিনি কি তোমার ক্ষতি চাইতে পারেন?

তাহলে কেন তারা রাগ করেন? কেন বকাঝকা করেন?

কেন কখনো কঠিন কথা বলেন?এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে পারলে জীবনের অনেক অভিমান দূর হয়ে যাবে।

রাগের পেছনে কী থাকে?

*************************

অনেক সন্তান শুধু রাগটা দেখে। কিন্তু রাগের পেছনের হৃদয়টা দেখে না। বেশিরভাগ বাবা-মায়ের রাগের পেছনে থাকে ভালোবাসা। উদ্বেগ। ভয়। দুশ্চিন্তা।

তারা ভয় পান‌ আমার সন্তান ভুল পথে চলে না যায়। নামাজ ছেড়ে না দেয়। খারাপ বন্ধুর পাল্লায় না পড়ে। চরিত্র নষ্ট না হয়ে যায়। ভবিষ্যৎ অন্ধকার না হয়ে যায়। তারা যখন আতঙ্কিত হন তখন তারা তোমাকে বকেন, তখন অনেক সময় তোমার বর্তমান নয়, তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন। তুমি আজকে কষ্ট পাও, কিন্তু তারা আগামী দশ বছর পরের বিপদ দেখতে পান।

🔶 সন্তান দেখে আজ, বাবা-মা দেখেন আগামী। সন্তান দেখে আম্মু আমাকে মোবাইল ব্যবহার করতে দিচ্ছেন না। কিন্তু মা দেখেন আমার মেয়ের ঈমান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কি না। চরিত্র নষ্ট হচ্ছে কিনা।

সন্তান দেখে আব্বু আমাকে বকেছেন। কিন্তু বাবা দেখেন—

আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপদ আছে কি না। সন্তান দেখে শাসন। বাবা-মা দেখেন দায়িত্ব। সন্তান দেখে বাধা। বাবা-মা দেখেন নিরাপত্তা।

ধরো, একটি ছোট শিশু আগুনের দিকে হাত বাড়াচ্ছে।

মা দৌড়ে এসে তার হাত টেনে সরিয়ে দিলেন। শিশুটি কাঁদতে শুরু করল। সে ভাবল মা আমাকে কষ্ট দিলেন। কিন্তু বাস্তবে কি মা তাকে কষ্ট দিলেন?

বরং মা তাকে আগুন থেকে বাঁচালেন। অনেক সময় বাবা-মায়ের শাসনও ঠিক এমন। আজ তোমার কাছে কষ্টকর মনে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারা তোমাকে এমন আগুন থেকে বাঁচাতে চাইছেন, যার ক্ষতি তুমি এখনো বুঝতে পারছ না।

🔶 অনেক সময় মা রাগ করেন। বকাঝকা করেন। কঠিন কথা বলেন। কিন্তু তারপর কী হয় জানো? অনেক মা একা একা কাঁদেন। নামাজে দাঁড়িয়ে দোয়া করেন। সন্তান ঘুমিয়ে গেলে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তার জন্য আল্লাহর কাছে কল্যাণ চান। সন্তান এসব দেখে না। সন্তান শুধু পাঁচ মিনিটের বকাঝকা মনে রাখে। পনেরো বছরের ভালোবাসা মনে রাখে না। একটি কঠিন কথা মনে রাখে। হাজারো দোয়া ভুলে যায়।এটাই মানুষের দুর্বলতা।

আজ যদি তোমার মা তোমাকে বকা দেন, আর আগামীকাল তিনি পৃথিবীতে না থাকেন তাহলে তুমি কী চাইবে? মায়ের বকাঝকা থেকে মুক্তি? নাকি আরেকবার সেই বকাঝকা শুনতে?

বিশ্বাস করো,যারা মা হারিয়েছে, তারা জানে মায়ের বকাঝকাও এক ধরনের নিয়ামত। কারণ সেই বকাঝকার মধ্যেও ভালোবাসা ছিল। সেই বকাঝকার মধ্যেও মমতা ছিল।

🔶 বাবা-মা যদি ভুল করেন? এখন একটি বাস্তব প্রশ্ন। সব বাবা-মা কি সবসময় সঠিক? তারা ফেরেশতা নন। তারা মানুষ।‌ তাদেরও ক্লান্তি আছে।‌ দুশ্চিন্তা আছে। অর্থনৈতিক চাপ আছে। শারীরিক অসুস্থতা আছে। কখনো রাগের মাথায় কঠিন কথা বলে ফেলতে পারেন। কখনো তোমার কথা বুঝতে নাও পারেন। কখনো বিচার করতে ভুল করতে পারেন। তখন সন্তানের করণীয় কী? এখানেই প্রকৃত আদবের পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা সূরা লুকমানে বলেন—

যদি বাবা-মা শিরকের মতো ভয়ংকর বিষয়ে চাপও দেন, তবুও তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করতে হবে।

ভাবো! শিরক—যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুনাহ। সন্তান মা বাবার আনুগত্য করবে না কিন্তু সেই ক্ষেত্রেও অসদাচরণের অনুমতি নেই।

🔶 মোবাইল বনাম পরিবার

**********************

আজকের যুগের সবচেয়ে বড় ফিতনাগুলোর একটি হলো মোবাইল ফোন।‌‌ একসময় মানুষ পরিবারের সাথে বসে গল্প করত।‌ মায়ের পাশে বসত। বাবার কথা শুনত। দাদী-নানীর গল্প শুনত। ভাই-বোন মিলে হাসত।‌ একই দস্তরখানে বসে খাওয়া হতো।

আজ সবকিছু আছে, কিন্তু যেন কিছুই নেই। ঘরে মানুষ আছে। কিন্তু সম্পর্ক নেই। এক ছাদের নিচে সবাই আছে।

কিন্তু সবার হৃদয় যেন আলাদা আলাদা জগতে হারিয়ে গেছে। একজন ফেসবুকে। একজন ইউটিউবে। একজন গেমে।‌একজন মেসেঞ্জারে।‌কিন্তু কেউ কারো কাছে নেই।

নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করো। আজ তুমি কয় ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার করো?‌এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা তিন ঘণ্টা? হয়তো তারও বেশি। কিন্তু মায়ের পাশে কতক্ষণ বসো?‌দশ মিনিট পাঁচ মিনিট‌‌ নাকি তারও কম?

একটু চিন্তা করো বাবার সাথে শেষ কবে মন খুলে কথা বলেছ?‌ শেষ কবে তার পাশে বসে জিজ্ঞেস করেছ “আব্বু, আপনি কেমন আছেন? শেষ কবে মায়ের মাথায় হাত রেখে বলেছ আম্মু, আপনি অনেক কষ্ট করেন।

🔶 আমরা পৃথিবীর মানুষের পোস্ট দেখি।‌অপরিচিত মানুষের ভিডিও দেখি।‌ কিন্তু ঘরের সবচেয়ে আপন মানুষগুলোর দিকে তাকানোর সময় পাই না। এটাই আজকের সবচেয়ে বড় বেদনা।

আমি তোমাদের কাছে একটি প্রশ্ন করতে চাই। মন দিয়ে উত্তর দিও। যদি আজ তোমার মা পৃথিবী থেকে চলে যান।‌তখন পৃথিবীর কোনো ভিডিও তোমাকে শান্তি দিতে পারবে না। কোনো বিনোদন তখন তোমার হৃদয়ের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না।

তাহলে প্রতিদিন তোমার মায়ের জন্য অন্তত পাঁচ মিনিট সময় দাও। মা বেঁচে থাকতে দাও। বাবা বেঁচে থাকতে দাও। কারণ মৃত্যুর পরে ভালোবাসা প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু তার কোনো মূল্য আর তাদের কাছে পৌঁছায় না।

🔶 মোবাইল তোমার সময় নিচ্ছে, না তোমার জীবন? একটি বিষয় মনে রেখো।‌মোবাইল শুধু তোমার সময় নিচ্ছে না। অনেক সময় তোমার সম্পর্কও নিয়ে যাচ্ছে। তোমার মা কথা বলতে চেয়েছিলেন। তুমি বললে পরে বলব।

তোমার বাবা ডাক দিয়েছিলেন। তুমি বললে‌ একটু পরে আসছি। তোমার ছোট ভাই কিছু বলতে চেয়েছিল। তুমি বললে বিরক্ত করো না। আর এভাবেই ধীরে ধীরে হৃদয়ের দূরত্ব তৈরি হয়।

শয়তান সবসময় বড় গুনাহ দিয়ে শুরু করে না। সে অনেক সময় পরিবারের মানুষের মাঝে ভালোবাসা কমিয়ে দেয়।

একসাথে থাকা মানুষদেরকে মানসিকভাবে দূরে সরিয়ে দেয়।

🔶 যে দিন মা থাকবে না

***********ৎ**********

একটি দিন আসবে। হয়তো আজ নয়। হয়তো কাল নয়।

কিন্তু একদিন আসবে। সেদিন মা আর ডাকবেন না।

মা, খেয়ে নাও এই কথাটি আর শোনা যাবে না। মা, পড়তে বসো এই কথাটি আর শোনা যাবে না। মা, সাবধানে যেও‌ এই কথাটি আর শোনা যাবে না।

সেদিন পৃথিবী থাকবে।‌ বাড়ি থাকবে। ঘর থাকবে। কিন্তু মায়ের কণ্ঠ থাকবে না। যে দিন বাবা অপেক্ষা করবেন না

তুমি কখন বাড়ি ফিরবে—এই চিন্তা করবেন না। তোমার জন্য বাজার থেকে কিছু কিনে আনার কথা ভাববেন না।

তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে রাত জেগে হিসাব করবেন না।

সেদিন হয়তো তোমার কাছে টাকা থাকবে। সময় থাকবে।

সামর্থ্য থাকবে। কিন্তু যাকে খুশি করতে চাইবে, তিনি আর থাকবেন না। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ একত্র করলেও এক মুহূর্ত অতীত ফিরিয়ে আনা যাবে না।

মৃত্যুর পরে কান্না করা সহজ। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আফসোস করা সহজ। কিন্তু প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো—

মানুষ বেঁচে থাকতে তার মূল্য বুঝা। মা বেঁচে থাকতে তার হাত চুমু খাও। বাবা বেঁচে থাকতে তার জন্য দোয়া করো।তাদের পাশে বসো। তাদের কথা শোনো। তাদের হাসাও।

তাদের জন্য সময় বের করো। কারণ একদিন তুমি তাদের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকবে। কিন্তু আজ তারা তোমার পাশে বেঁচে আছেন।

🔶 আজকের অঙ্গীকার। আসো, আমরা সবাই অন্তর থেকে একটি অঙ্গীকার করি আমি মোবাইলকে আমার পরিবারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বানাব না। আমি প্রতিদিন মায়ের সাথে কথা বলব। আমি বাবার পাশে বসব। আমি তাদের রাগকে শত্রুতা মনে করব না।‌আমি তাদের কষ্ট বোঝার চেষ্টা করব।আমি ভাই-বোনের প্রতি দয়ালু হব।‌আমি পরিবারের শান্তির কারণ হব।

আমি এমন কন্যা হব, যাকে দেখে আমার মা-বাবার চোখ শীতল হবে। আমি এমন সন্তান হব, যার জন্য বাবা-মা দোয়া করতে গর্ববোধ করবেন। তাহলেই আমাদের মাদ্রাসায় পড়া সফল হবে।

Scroll to Top