﴿وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ﴾
“আর তোমার প্রতিপালকের নিয়ামতের কথা প্রকাশ কর।”
— সূরা আদ-দুহা: ১১
আল্লাহ তাআলা মানুষকে অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন। আজকের যুগে আল্লাহর দেওয়া এমন একটি শক্তিশালী নিয়ামত হলো— মোবাইল ফোন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা অনেকেই মোবাইলকে শুধু বিনোদনের যন্ত্র হিসেবে দেখি। কেউ এটাকে ফিতনা বলে, কেউ অভিশাপ বলে, কেউ আবার তরুণ সমাজের ধ্বংসের মূল কারণ বলে মনে করে।
কিন্তু একটু থেমে চিন্তা করুন মোবাইল কি সত্যিই খারাপ?নাকি খারাপ আমাদের ব্যবহার? একটি ধারালো ছুরির কথা ভাবুন। একই ছুরি দিয়ে একজন দক্ষ সার্জন জটিল অপারেশন করে মানুষের জীবন বাঁচান। আবার সেই একই ছুরি একজন অপরাধীর হাতে পড়ে নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।
তাহলে দোষ কি ছুরির। দোষ বা গুণ নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উপর। মোবাইলও ঠিক তেমন। একই মোবাইল দিয়ে একজন তরুণ প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করছে, হাদিস অধ্যয়ন করছে, আরবি ভাষা শিখছে, নতুন দক্ষতা অর্জন করছে, হালাল উপার্জনের পথ খুঁজছে, সমাজকে আলোর দিকে ডাকছে।
আবার একই মোবাইল দিয়ে আরেকজন যুবক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন ভিডিও দেখছে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ছে, নিজের সময়, মেধা, যৌবন ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করছে।
যন্ত্র এক। স্ক্রিন এক। ইন্টারনেট এক। পার্থক্য শুধু মানুষের পার্থক্যটা মোবাইলের মধ্যে নয়; পার্থক্যটা মানুষের চিন্তায়, লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে এবং ব্যবহারে।
আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা জমি নিয়ে নয়, অস্ত্র নিয়ে নয়, সম্পদ নিয়েও নয়; বরং মানুষের মনোযোগ নিয়ে। যে আপনার মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে আপনার সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর যে আপনার সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে আপনার ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই আজ সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ টাকা নয়, জমি নয়, বরং আপনার মনোযোগ। একবার ভেবে দেখুন আপনার সময় কে নিয়ে যাচ্ছে? আপনার যৌবন কোথায় ব্যয় হচ্ছে?
আপনার স্বপ্নগুলোকে কে ধীরে ধীরে নিভিয়ে দিচ্ছে?
আপনার ভবিষ্যৎ কে গড়ছে, আর কে ভেঙে দিচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। অনেক ক্ষেত্রে উত্তরটি লুকিয়ে আছে আপনার হাতের ছোট্ট মোবাইল ফোনটির ভেতরেই।
এই মোবাইল ব্যবহারে রক্ষণশীলতা একজন মানুষকে আল্লাহর ওলী বানাতে পারে, আবার এই মোবাইলের প্রতি ব্যবহার একজন ব্যক্তিকে গাফেলও বানাতে পারে।
এই মোবাইলই একজন মানুষকে জ্ঞানী, দক্ষ ও সফল করতে পারে, আবার উদ্দেশ্যহীন ও ব্যর্থও করতে পারে। এই মোবাইলই কারও জন্য জান্নাতের পথে পাথেয় হতে পারে, আবার কারও জন্য আফসোসের কারণও হতে পারে।
তাই আজ আমাদের আলোচনার বিষয় কীভাবে মোবাইলকে ধ্বংসের অস্ত্র থেকে সম্ভাবনার দরজায় পরিণত করা যায়। কীভাবে আমরা এই মোবাইলকে এমনভাবে ব্যবহার করতে পারি, যাতে এটি আমাদের দুনিয়ার সফলতা, আখিরাতের নাজাত, ইলম অর্জন, আত্মগঠন, দাওয়াত, নেতৃত্ব এবং উম্মাহর কল্যাণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুণী এবং মোবাইলমুখী নতুন প্রজন্মের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা আজ সময়ের অন্যতম বড় প্রয়োজন।
কারণ মোবাইল আমাদের হাতে আছেই। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা মোবাইলকে ব্যবহার করব, নাকি মোবাইল আমাদের ব্যবহার করবে?
আমরা কি মোবাইলের মালিক হব, নাকি মোবাইলের দাস হয়ে যাব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের আগামী দিনের জীবন, আমাদের স্বপ্ন এবং আমাদের পরিণতি।
মোবাইল—আল্লাহর একটি নিয়ামত
********************************
আল্লাহ তাআলা বলেন—
«وَسَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِّنْهُ
আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন।(সূরা জাসিয়া: ১৩)
মানুষের ইতিহাসে প্রতিটি যুগে আল্লাহ তাআলা কিছু বিশেষ নিয়ামত দান করেছেন। কোনো যুগে ছিল জাহাজ, কোনো যুগে ছিল মুদ্রণযন্ত্র, কোনো যুগে ছিল বিদ্যুৎ। আর আমাদের যুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর নিয়ামতগুলোর একটি হলো—মোবাইল ফোন ও তথ্যপ্রযুক্তি।
কিছু মানুষ শুধু এর ক্ষতিকর দিক দেখে হতাশ হয়। কিন্তু একজন মুমিনের দৃষ্টি ভিন্ন। সে প্রতিটি নিয়ামতের ভেতরে আল্লাহর হিকমত ও সম্ভাবনা খুঁজে বের করে।
ভাবুন, মাত্র বিশ বছর আগেও একটি হাদিস খুঁজে বের করার জন্য বড় বড় লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসতে হতো। একটি মাসআলা জানার জন্য আলেমদের দরজায় যেতে হতো। একটি বিরল কিতাব পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো।
কিন্তু আজ একটি মোবাইল হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার হাদিস, শত শত তাফসির, অসংখ্য ফিকহের কিতাব এবং বিশ্বের বড় বড় আলেমদের বক্তব্য আমাদের সামনে চলে আসে।
একসময় একজন তালিবুল ইলমকে জ্ঞান অর্জনের জন্য বুখারা, বাগদাদ, দামেস্ক, মক্কা ও মদিনার পথে জীবন কাটিয়ে দিতে হতো। আজ সেই জ্ঞান আপনার পকেটে।
একটু চিন্তা করে দেখুন মোবাইল শুধু একটি যন্ত্র নয়; এটি পারস্পরিক দূরত্বকে কমিয়ে আনার একটি আশ্চর্য মাধ্যম।
একসময় একজন মানুষ বিদেশে গেলে মাসের পর মাস পরিবারের কোনো খবর পাওয়া যেত না। একটি চিঠি পৌঁছাতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ লেগে যেত। মা অপেক্ষা করতেন, বাবা অপেক্ষা করতেন, কিন্তু সন্তানের কোনো খবর সহজে পাওয়া যেত না।
আজ পৃথিবীর এক প্রান্তে বসেও আপনি মুহূর্তের মধ্যে মায়ের কণ্ঠ শুনতে পারেন। বাবার খোঁজ নিতে পারেন।তাদের জন্য দোয়া চাইতে পারেন। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সালাম দিতে পারেন। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এটি কত বড় একটি নিয়ামত?
হয়তো আপনার বৃদ্ধ মা সারাদিন আপনার ফোনের অপেক্ষায় আছেন। আপনার ব্যস্ত জীবনের মাত্র দুই মিনিটের একটি ফোন কল তার পুরো দিনের ক্লান্তি দূর করে দিতে পারে।
হয়তো আপনার বাবা মুখে কিছু বলেন না, কিন্তু সন্তানের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে থাকে। আপনার একটি ফোন কল, একটি খোঁজখবর, একটি “আম্মা, কেমন আছেন?”—হয়তো তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার।
আজ মোবাইল আমাদের সেই সুযোগ দিয়েছে। যে সন্তান হাজার মাইল দূরে থাকে, সেও প্রতিদিন মা-বাবার খোঁজ নিতে পারে। তাদের দোয়া নিতে পারে। তাদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে পারে। আর আমরা জানি, মা-বাবার দোয়ার মতো সম্পদ পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
মোবাইলের মাধ্যমে শুধু মা-বাবাই নয়, আত্মীয়-স্বজনের সাথেও সম্পর্ক অটুট রাখা যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখাকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারীর জন্য বিশেষ সুসংবাদ দিয়েছেন।
আজ আমরা যদি চাই, একটি ফোন কলের মাধ্যমে কোনো অসুস্থ আত্মীয়ের খোঁজ নিতে পারি। কোনো বিপদগ্রস্ত মানুষকে সান্ত্বনা দিতে পারি। কোনো কষ্টে থাকা বন্ধুর পাশে দাঁড়াতে পারি। কোনো শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে পারি। কোনো একাকী মানুষকে অনুভব করাতে পারি—“তুমি একা নও, আমরা তোমার পাশে আছি।”
ভাবুন তো, কত মানুষ আছে যারা অর্থের অভাবে নয়, বরং খোঁজ নেওয়ার মানুষের অভাবে কষ্ট পায়। কত মানুষ আছে, যারা সাহায্যের আগে একটি আন্তরিক কথা শুনতে চায়।কত মানুষ আছে, যারা শুধু চায় কেউ তাকে জিজ্ঞেস করুক—“ভাই, কেমন আছেন?”
মোবাইল আমাদের সেই সুযোগ দিয়েছে। অনেক দূরে থেকেও কাছে থাকার সুযোগ দিয়েছে। শত শত কিলোমিটার দূরে থেকেও সম্পর্ককে জীবন্ত রাখার সুযোগ দিয়েছে।ভৌগোলিক দূরত্বকে কমানোর সুযোগ দিয়েছে।
পরিবারকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ দিয়েছে।ভাইকে ভাইয়ের সাথে, সন্তানকে মায়ের সাথে, বন্ধুকে বন্ধুর সাথে, আত্মীয়কে আত্মীয়ের সাথে যুক্ত রাখার সুযোগ দিয়েছে।
দুঃখের বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় এই নিয়ামতকে উল্টো কাজে ব্যবহার করি। মাইলের পর মাইল দূরের মানুষের খবর রাখি, অথচ নিজের মা-বাবার খবর রাখি না।
অচেনা মানুষের পোস্টে সময় দিই, অথচ নিজের আত্মীয়ের খোঁজ নিতে সময় পাই না। পৃথিবীর খবর জানি, কিন্তু নিজের পরিবারের খবর জানি না। এটি প্রযুক্তির সমস্যা নয়; এটি অগ্রাধিকারের সমস্যা।
যদি মোবাইল আমাদের আল্লাহর সন্তুষ্টি, মা-বাবার দোয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং মানুষের হৃদয় জয়ের মাধ্যম হয়ে যায়, তাহলে এই মোবাইল শুধু একটি যন্ত্র থাকবে না; এটি আমাদের জন্য নেকির একটি অবিরাম উৎসে পরিণত হবে।
আমাদের উচিত এ নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করা। আল্লাহ যদি চাইতেন, তাহলে আমাদের এমন যুগে জন্ম দিতে পারতেন যেখানে জ্ঞান অর্জনের সম্পর্ক মজবুত করার এই সুযোগগুলো থাকত না। কিন্তু তিনি আমাদের এমন এক সময়ে রেখেছেন, যেখানে সঠিক ব্যবহার করলে মোবাইল একটি চলমান মাদ্রাসা, একটি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি এবং একটি বিশ্বব্যাপী দাওয়াতি মঞ্চে পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি এই নিয়ামতের শোকর আদায় করছি, নাকি এর অপব্যবহার করে অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিচ্ছি?
কারণ নিয়ামতের শোকর শুধু “আলহামদুলিল্লাহ” বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিয়ামতকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাই প্রকৃত শোকর।
আপনার আলোচনার এই অংশটি আরও সহজ, প্রভাবশালী, আবেগপূর্ণ এবং শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছানোর মতো করে এভাবে বলা যেতে পারে—
মোবাইল দিয়ে দ্বীনের খেদমত
****************************
মোবাইল শুধু বিনোদনের যন্ত্র নয়। একজন মুমিনের হাতে মোবাইল হতে পারে ইলমের মাধ্যম, দাওয়াতের মাধ্যম এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি শক্তিশালী উপায়।
আজকের একজন মাদ্রাসা ছাত্র যদি মোবাইলকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে সে এমন কিছু সুযোগ পেতে পারে, যা অতীতের অনেক মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি।
১. কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করা
অনেক যুবক বলে, সময় পাই না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সময় নেই এমন নয় সময় নষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন আমরা মোবাইলের পেছনে কত সময় ব্যয় করি? এক ঘণ্টা? দুই ঘণ্টা? কখনো তারও বেশি।
এই সময়ের মাত্র এক ঘণ্টা যদি কুরআনের জন্য বরাদ্দ করা যায়, তাহলে জীবনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
মোবাইলের মাধ্যমে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি। তাজবিদ শিখতে পারি। হিফজের মুরাজাআত করতে পারি।তাফসির পড়তে পারি। বিশ্বখ্যাত ক্বারীদের তিলাওয়াত শুনতে পারি।
একই মোবাইল, একই স্ক্রিন। কিন্তু একজন সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন ভিডিও দেখে, আর আরেকজন সেখানে কুরআনের আলো খোঁজে। পার্থক্যটা মোবাইলে নয়, পার্থক্যটা মানুষের পছন্দে। কেয়ামতের দিন এই মোবাইলই হয়তো সাক্ষ্য দেবে—এই মানুষটি কুরআনের জন্য সময় ব্যয় করেছিল, নাকি গাফেলতিতে ডুবে ছিল।
২. ইলম অর্জনের এক নতুন সুযোগ। ইমাম বুখারী (রহ.) একটি হাদিসের জন্য দীর্ঘ সফর করেছেন। ইমাম আহমদ (রহ.) জ্ঞান অর্জনের জন্য অসংখ্য কষ্ট সহ্য করেছেন।কারণ তখন জ্ঞান মানুষের কাছে আসত না; মানুষকে জ্ঞানের কাছে যেতে হতো। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন।
আজ জ্ঞান আপনার কাছে চলে এসেছে। পৃথিবীর বড় বড় আলেমদের দরস, তাফসির, হাদিসের আলোচনা, আরবি ভাষার পাঠ—সব আপনার হাতের মুঠোয়।
এখন প্রশ্ন হলো আপনি মোবাইল খুললে কী খোঁজেন?একটি নতুন জ্ঞান? নাকি নতুন বিনোদন?একটি হাদিস?
নাকি একটি রিলস?
মনে রাখবেন, প্রতিদিন আপনি যা দেখছেন, ধীরে ধীরে আপনি তাই হয়ে উঠছেন। যদি জ্ঞান শুনেন, জ্ঞানী হবেন।
যদি অর্থহীনতায় ডুবে থাকেন, তাহলে মনও অর্থহীন হয়ে যাবে। তাই সমস্যাটা মোবাইল নয়। সমস্যাটা হলো—আমি আমার মোবাইলকে কোন পথে ব্যবহার করছি।
৩. ইসলামের দাওয়াত ও খেদমত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
«بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও। এক সময় একজন বক্তার কথা কয়েকশ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। আজ একটি ভালো কথা, একটি হাদিস, একটি আয়াতের ব্যাখ্যা, একটি উপকারী লেখা মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
আপনি হয়তো মাত্র এক মিনিট সময় নিয়ে একটি হাদিস শেয়ার করলেন। কেউ সেটি পড়ে নামাজ শুরু করল। কেউ গুনাহ ছেড়ে দিল। কেউ কুরআনের পথে ফিরে এল। হয়তো আপনি তাকে কখনো চিনবেন না, সেও আপনাকে চিনবে না।কিন্তু আল্লাহ জানেন। আর আল্লাহর কাছে কোনো ভালো কাজ হারিয়ে যায় না।
মনে রাখবেন, আজ মোবাইলের মাধ্যমে শুধু ভিডিও ছড়ানো যায় না; হেদায়েতও ছড়ানো যায়। শুধু বিনোদন ছড়ানো যায় না; ইলমও ছড়ানো যায়। শুধু সময় নষ্ট করা যায় না; সওয়াবও অর্জন করা যায়।
তাই প্রশ্ন হলো আমার মোবাইল কি মানুষের ঈমান বাড়াচ্ছে, নাকি কমাচ্ছে? আমার মোবাইল কি আমাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, মোবাইল আমার জন্য নিয়ামত হবে, নাকি আফসোসের কারণ হবে।
মোবাইল নিজেকে গড়ে তোলার কারখানা
***************************************
আজকের যুবকদের একটি বড় সমস্যা হলো, তারা মোবাইল ব্যবহার করে; কিন্তু মোবাইলকে কাজে লাগায় না।
হাতে মোবাইল নেয়। এক ঘণ্টা যায়। দুই ঘণ্টা যায়। দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। কিন্তু জীবন এগোয় না।
কারণ যে মানুষের লক্ষ্য নেই, তার সময়ও মূল্যহীন হয়ে যায়। একটি জাহাজের যদি গন্তব্য না থাকে, তাহলে কোনো বাতাসই তাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। মানুষের জীবনও তেমন।
প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাওয়া। বড় মানুষরা একদিনে বড় হননি। ইমাম বুখারী (রহ.) একদিনে মুহাদ্দিস হননি। ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.) একদিনে আলেম হননি।আল্লামা ইকবাল একদিনে চিন্তাবিদ হননি। প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টা তাদেরকে বড় করেছে।
আপনি যদি প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট নতুন কিছু শেখেন, তাহলে এক বছর পরে আপনি আগের সেই মানুষটি থাকবেন না। আজ একটি নতুন শব্দ শিখলেন। আগামীকাল একটি নতুন ধারণা শিখলেন। পরশু একটি নতুন দক্ষতা শিখলেন। এভাবেই মানুষ গড়ে ওঠে।
ভাষা শেখা মানে নতুন পৃথিবীর দরজা খোলা
একজন আলেম যত ভাষা জানেন, তত মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারেন।আজ মোবাইলের মাধ্যমে ঘরে বসেই আরবি শেখা যায়, ইংরেজি শেখা যায়, উর্দু শেখা যায়।
এক সময় ভাষা শেখার জন্য দেশ ছাড়তে হতো। আজ একটি মোবাইলই শিক্ষক হয়ে গেছে। ভাবুন, আপনি যদি আরবি ভালো জানেন, তাহলে সরাসরি কুরআন ও হাদিসের ভাণ্ডারে প্রবেশ করতে পারবেন।
ইংরেজি জানলে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে ইসলামের কথা পৌঁছাতে পারবেন। ভাষা শুধু শব্দ শেখায় না; ভাষা নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
লেখালেখি: নীরব দাওয়াত
অনেক মানুষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে না। কিন্তু লিখতে পারে। ইতিহাসে এমন বহু মানুষ আছেন, যাদের কণ্ঠ থেমে গেছে; কিন্তু তাদের লেখা আজও মানুষ পড়ছে।
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) নেই, কিন্তু তাঁর লেখা আছে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তা আজও বেঁচে আছে। কারণ কলম মানুষের জীবনকে তার মৃত্যুর পরও দীর্ঘ করে দেয়।
আজ আপনার হাতে থাকা মোবাইলটি শুধু একটি ফোন নয়। এটি একটি কলম। একটি বই। একটি লাইব্রেরি। একটি প্রকাশনা কেন্দ্র। একটি দাওয়াতি মঞ্চ।
প্রতিদিন যদি কয়েক লাইনও লিখেন, তাহলে একদিন দেখবেন আপনার চিন্তাগুলো পরিপক্ক হয়ে উঠেছে। আপনি শুধু অন্যের কথা শুনছেন না; নিজের কথাও বলতে শিখেছেন।
নেতা ও দর্শকের পার্থক্য
পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল শুধু দেখে।আরেকদল চিন্তা করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং পথ দেখায়।
প্রথম দল ইতিহাস পড়ে। দ্বিতীয় দল ইতিহাস তৈরি করে।
প্রথম দল শুধু অন্যের কনটেন্ট দেখে। দ্বিতীয় দল উপকারী কনটেন্ট তৈরি করে। প্রথম দল সময় কাটায়। দ্বিতীয় দল সময়কে কাজে লাগায়।
প্রশ্ন হলো আপনার মোবাইল কি আপনাকে শুধু একজন দর্শক বানাচ্ছে নাকি একজন চিন্তাশীল মানুষ, একজন লেখক, একজন গবেষক, একজন দাঈ এবং আগামী দিনের একজন নেতা হিসেবে গড়ে তুলছে?
মনে রাখবেন, আজ যে যুবক মোবাইলে সময় নষ্ট করছে, আর আজ যে যুবক মোবাইলে নিজেকে গড়ছে—দশ বছর পর তাদের অবস্থান কখনো এক হবে না। কারণ মোবাইলের স্ক্রিন ছোট হতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে গড়ে ওঠা ভবিষ্যৎ অনেক বড়।
মোবাইল—হালাল রিযিকের নতুন দিগন্ত
**************************************
অনেক যুবক মনে করে ফেসবুক, ইউটিউব, ভিডিও, গেমস—এগুলোই যেন মোবাইলের একমাত্র কাজ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকের পৃথিবীতে মোবাইল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম, দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম এবং হালাল রিযিকেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
একজন যুবক মোবাইলের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করছে।এক বছর পরে তার হাতে একটি যোগ্যতা তৈরি হবে। দুই বছর পরে তার একটি পেশা তৈরি হবে। পাঁচ বছর পরে হয়তো সে অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।
আজ পৃথিবীর অর্থনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। অনেক কাজ এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান দূরের মানুষদের দিয়েও কাজ করিয়ে নিচ্ছে। ফলে একজন তরুণের জন্য সুযোগের ক্ষেত্র আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বড় হয়েছে।
মোবাইলের মাধ্যমে একজন যুবক অনলাইন শিক্ষা দিতে পারে। গ্রাফিক ডিজাইন শিখতে পারে ভিডিও সম্পাদনা শিখতে পারে। লেখালেখি ও কনটেন্ট তৈরি করতে পারে।
অনুবাদের কাজ করতে পারে। ডিজিটাল মার্কেটিং শিখতে পারে। অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। ইসলামি শিক্ষা ও আরবি ভাষা শিক্ষা দিয়েও উপার্জনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এগুলোর কোনোটিই রাতারাতি হয় না। প্রথমে শিখতে হয়।
তারপর অনুশীলন করতে হয়। তারপর অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। অবশেষে রিযিকের দরজা খুলে যায়।
যে যুবক প্রতিদিন তিন ঘণ্টা বিনোদনে ব্যয় করে, সে পাঁচ বছর পরও একই জায়গায় থাকে। আর যে যুবক প্রতিদিন তিন ঘণ্টা দক্ষতা অর্জনে ব্যয় করে, পাঁচ বছর পর সে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে পৌঁছে যায়। এ কারণেই সফল মানুষরা সময় ব্যয় করেন না; সময় বিনিয়োগ করেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ»
মানুষ তার নিজের শ্রমে অর্জিত উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো খায়নি। (সহীহ বুখারী)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, সম্মানজনক জীবন গড়তে হলে পরিশ্রম করতে হবে, দক্ষতা অর্জন করতে হবে এবং নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে হবে।
বিশেষ করে মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ছাত্র মনে করে, দ্বীনি ইলম অর্জন করলেই দায়িত্ব শেষ। বুঝতে হবে আজ উম্মাহর প্রয়োজন এমন আলেম, যারা ইলমের পাশাপাশি দক্ষও হবেন, আত্মনির্ভর হবেন, সমাজের জন্য সম্পদে পরিণত হবেন।
আজ একজন ছাত্র মোবাইলের মাধ্যমে আরবি, ইংরেজি, কম্পিউটার, গবেষণা, লেখালেখি, ডিজাইন, সম্পাদনা—বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এর ফলে সে শুধু নিজের উপকার করবে না; দ্বীনের খেদমতও আরও বিস্তৃতভাবে করতে পারবে।
মনে রাখবেন মোবাইল আপনাকে ধনী বানাবে না।মোবাইলের ভেতরের দক্ষতা আপনাকে সফল করবে।রিযিক শুধু স্বপ্ন দেখে আসে না। রিযিক আসে শিক্ষা, দক্ষতা, পরিশ্রম এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে।
তাই মোবাইল হাতে নেওয়ার আগে সিদ্ধান্ত নিন আজ আমি এমন কী শিখব, যা আগামী পাঁচ বছর পরে আমার জীবনকে বদলে দিতে পারে? এই সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে, মোবাইল আপনার হাতে খেলনা হবে, নাকি ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হবে।
মেয়েদের মোবাইল ব্যবহার একটি প্রজন্ম গড়ার মাধ্যম
**************************************************
আজ আমাদের মা-বোনেরাও মোবাইল ব্যবহার করছেন। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো মোবাইল ব্যবহার করবেন কি করবেন না, সেটি আজ আর বড় প্রশ্ন নয়।
বড় প্রশ্ন হলো কেন ব্যবহার করবেন? কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবেন? একই মোবাইল একজন মানুষকে আল্লাহর কাছেও নিতে পারে, আবার আল্লাহ থেকে দূরেও সরিয়ে দিতে পারে।
তাই একজন মুসলিম বোনের হাতে মোবাইল একটি আমানত। এই আমানতকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।
একজন মেয়ের শিক্ষা মানে একটি পরিবারের শিক্ষা। সমাজে একজন পুরুষ যতই বড় হোক, তার প্রথম শিক্ষক সাধারণত তার মা। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না; তিনি একটি চিন্তা, একটি চরিত্র এবং একটি ভবিষ্যৎ গড়ে দেন।
একটি শিশুর জীবনের প্রথম মাদ্রাসা হলো তার মায়ের কোল। অনেকে মনে করেন, নারীর কাজ শুধু ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে।
উম্মুল মুমিনীন ছিলেন ইসলামের অন্যতম বড় আলিমা। বহু সাহাবি তাঁর কাছে হাদিস, ফিকহ ও বিভিন্ন মাসআলা শিখতে আসতেন। তিনি দুই হাজারেরও বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন। আজ যদি আয়িশা (রা.)-এর যুগে মোবাইল থাকত, তাহলে তিনি হয়তো লক্ষ লক্ষ নারীকে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেতেন। তাঁরা জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও দ্বীনি সচেতনতার মাধ্যমে সমাজকে প্রভাবিত করেছেন।
তাঁরা যদি জ্ঞান অর্জনকে গুরুত্ব না দিতেন, তাহলে ইসলামের ইতিহাসের একটি বড় অংশ আমাদের কাছে পৌঁছাত না।
মোবাইল হতে পারে একটি চলমান মাদ্রাসা। আজ একজন মুসলিম বোন মোবাইলের মাধ্যমে কুরআন শিখতে পারেন। তাজবিদ শিখতে পারেন। তাফসির পড়তে পারেন। হাদিস অধ্যয়ন করতে পারেন। ইসলামি বই পড়তে পারেন। আরবি ভাষা শিখতে পারেন। সন্তান প্রতিপালনের আধুনিক ও ইসলামি পদ্ধতি জানতে পারেন। স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শিখতে পারেন।অর্থাৎ মোবাইল চাইলে একটি চলমান মাদ্রাসায় পরিণত হতে পারে।
একজন মা একটি প্রজন্ম গড়েন।
ইতিহাসে যত বড় মানুষ এসেছে, তাদের পেছনে সাধারণত একজন অসাধারণ মা ছিলেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর পিতা ছোটবেলায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর মা কষ্ট করে তাঁকে মানুষ করেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.)-এর জ্ঞান অর্জনের পেছনেও তাঁর মায়ের ত্যাগ ছিল অসাধারণ।
সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহের পেছনে তাঁর মায়ের তারবিয়াত ও শিক্ষা ছিল একটি বড় কারণ। তাই আজকের একটি মেয়ে শুধু একজন ব্যক্তি নয়; তিনি আগামী দিনের একজন মা। আর আগামী দিনের মা মানেই আগামী দিনের একটি প্রজন্ম।
আজ অনেক মা সন্তানের হাতে মোবাইল দেন, কিন্তু কী দেখছে তা জানেন না। অনেক সন্তান ইন্টারনেট থেকে শিক্ষা নিচ্ছে, কিন্তু সেই শিক্ষার দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি পরিবারের নেই। তাই একজন মায়ের নিজের শিক্ষিত হওয়া এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
কারণ আগামী দিনের সন্তানদের শুধু খাবার দিলেই হবে না; তাদের চিন্তা, ঈমান, চরিত্র ও মানসিক জগতও গড়তে হবে।
মোবাইল দাওয়াতের একটি নীরব মাধ্যম।
******************************************
প্রত্যেক মানুষ মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিতে পারে না। কিন্তু একজন মুসলিম বোন একটি ভালো লেখা শেয়ার করতে পারেন। একটি আয়াত প্রচার করতে পারেন।একটি হাদিস পৌঁছে দিতে পারেন। একজন হতাশ মানুষকে সাহস দিতে পারেন। একজন মায়ের কাছে একটি উপকারী শিক্ষা পৌঁছে দিতে পারেন।
অনেক সময় একটি ভালো পোস্ট, একটি ভালো পরামর্শ বা একটি ভালো ভিডিও একটি মানুষের জীবন বদলে দেয়।
মোবাইল একজন মুসলিম বোনের জন্য ফিতনার দরজাও হতে পারে, আবার ইলম, তারবিয়াত, দাওয়াত এবং একটি প্রজন্ম গড়ার মাধ্যমও হতে পারে।
সিদ্ধান্তটা মোবাইলের নয়। সিদ্ধান্তটা ব্যবহারকারীর। মনে রাখবেন একজন শিক্ষক কয়েকজন মানুষকে গড়েন।একজন নেতা একটি সমাজকে গড়েন। কিন্তু একজন আদর্শ মা একটি পুরো প্রজন্মকে গড়ে দেন।
তাই একজন মুসলিম বোনের হাতে থাকা মোবাইল শুধু একটি যন্ত্র নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
মোবাইল—সদকায়ে জারিয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ
*******************************************
আমরা সাধারণত মনে করি, সদকায়ে জারিয়া মানে মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, কূপ খনন বা কোনো স্থায়ী কল্যাণমূলক কাজ। এসব অবশ্যই সদকায়ে জারিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কিন্তু আজকের যুগে আরেকটি বড় মাধ্যম তৈরি হয়েছে, যার কথা অনেকেই গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন না। সেটি হলো—উপকারী জ্ঞান প্রচার।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«إِذَا مَاتَ ابْنُ آدَمَ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ
“মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল চলমান থাকে। এর একটি হলো—
عِلْمٌ يُنْتَفَعُ بِهِ
এমন জ্ঞান, যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়।(সহীহ মুসলিম)»
একটু চিন্তা করুন। আপনি একটি হাদিস শেয়ার করলেন।
কেউ তা পড়ল। সে আমল শুরু করল। তার সন্তান সেই আমল শিখল। তার পরিবার সেই আমল গ্রহণ করল।
তার বন্ধুদের মাঝেও তা ছড়িয়ে পড়ল।
আপনি হয়তো কখনো তাদের চিনবেন না। তারা হয়তো কখনো আপনার নামও জানবে না। কিন্তু আল্লাহ জানেন।
আর আল্লাহর কাছে কোনো ভালো কাজ হারিয়ে যায় না।
আজকের পৃথিবীতে একটি উপকারী লেখা, একটি কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা, একটি হাদিস, একটি নসীহত বা একটি শিক্ষণীয় আলোচনা কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
অতীতের যুগে একজন আলেমের বই ছড়াতে বছর লেগে যেত। একটি বক্তব্য পৌঁছাতে মাসের পর মাস সময় লাগত।
আজ একটি মোবাইলের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।এটি শুধু প্রযুক্তির শক্তি নয়; এটি নেকি ছড়িয়ে দেওয়ারও এক অসাধারণ সুযোগ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। সবকিছু শেয়ার করলেই সদকায়ে জারিয়া হয় না। উপকারী জ্ঞান হতে হবে সহীহ, সত্য ও কল্যাণকর। অনেক সময় মানুষ যাচাই না করে হাদিস, ঘটনা বা বিভিন্ন তথ্য প্রচার করে। এতে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতিও হতে পারে।
তাই একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো প্রথমে জানবে। তারপর যাচাই করবে। এরপর প্রচার করবে। মনে রাখবেন, মোবাইল শুধু গুনাহ ছড়ানোর মাধ্যম নয়; এটি নেকি ছড়ানোরও মাধ্যম।
একটি গানের ভিডিও যেমন হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, তেমনি একটি হাদিসও পৌঁছতে পারে।
একটি অর্থহীন পোস্ট যেমন মানুষের সময় নষ্ট করতে পারে, তেমনি একটি উপকারী পোস্ট মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
প্রশ্ন হলো আমি কী ছড়িয়ে দিচ্ছি?
*******************************
আমার মৃত্যুর পর আমার মোবাইলের মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়া জিনিসগুলো কি আমার জন্য সওয়াবের কারণ হবে, নাকি আফসোসের কারণ হবে?
কেয়ামতের দিন হয়তো আমরা দেখব, একটি ছোট্ট পোস্ট, একটি সংক্ষিপ্ত নসীহত, একটি হাদিসের অনুবাদ বা একটি কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা আমাদের আমলনামায় পাহাড়সম নেকি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কারণ আমরা নিজেরা হয়তো বেশি কিছু করতে পারিনি, কিন্তু অন্যদেরকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করেছিলাম।
তাই মোবাইল হাতে নেওয়ার সময় শুধু এই চিন্তা করবেন না আজ আমি কী দেখব? বরং এই চিন্তাও করুন আজ আমি এমন কী প্রচার করতে পারি, যা আমার মৃত্যুর পরও আমার জন্য নেকির ধারা প্রবাহিত রাখবে?
হয়তো আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সদকায়ে জারিয়া একটি মসজিদ নয়, একটি কূপ নয়, বরং একটি সত্য কথা, একটি সহীহ হাদিস, একটি উপকারী শিক্ষা—যা আপনি মোবাইলের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
তোমার হাতে থাকা মোবাইলটি হয় তোমাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে, নয়তো জাহান্নামের দিকে। একই যন্ত্র।
একই স্ক্রিন। একই ইন্টারনেট। পার্থক্য শুধু ব্যবহারে।
আজ সিদ্ধান্ত নাও আমি মোবাইলের দাস হব না। আমি মোবাইলকে আমার দাস বানাব। আমি মোবাইল দিয়ে গুনাহ নয়, ইলম অর্জন করব। আমি মোবাইল দিয়ে সময় নষ্ট নয়, জীবন গড়ব।
আমি মোবাইল দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত নয়, হেদায়েতের পথে ডাকব। এবং আমি এমনভাবে মোবাইল ব্যবহার করব, যেন এটি আমার দুনিয়াকে সুন্দর করে, আর আখিরাতের জন্যও পুঁজি হয়ে যায়।
মোবাইল তোমার হাতে একটি যন্ত্র। কিন্তু সেই যন্ত্রের মাধ্যমে তুমি নিজের ভাগ্য লিখছ। আজ তুমি যা দেখছ, কাল তুমি তাই হবে। আজ তুমি যা শিখছ, আগামীকাল তুমি তাই শেখাবে। আজ তুমি মোবাইলকে যেদিকে চালাবে, তোমার জীবনও সেদিকেই চলবে।