২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও ধর্মীয় পরিচয় নতুন করে প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিল। দেশের অলিগলি, গ্রামগঞ্জ, শহর-বন্দর—সবখানে আমি এক ধরনের ইসলামী আবেগের উত্থান অনুভব করেছি।
সেই সময় একটি স্বপ্ন জেগে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিনের বিভক্তি ভুলে ইসলামী সংগঠনগুলো হয়তো এবার এক কাতারে দাঁড়াবে। ইসলামের সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠার জন্য তারা একসাথে কাজ করবে। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে উম্মাহর স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। বহু সাধারণ মানুষও এমনটিই আশা করেছিল।
কিন্তু আজ সেই স্বপ্নের দিকে তাকালে আমার মনে হয়, আমরা একটি ঐতিহাসিক সুযোগের সামনে দাঁড়িয়েও তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়েছে একটি জায়গায়। অনেকে ইসলামের জোয়ারকে নিজেদের দলিয় জোয়ার মনে করেছে।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের মাটিতে যে ধর্মীয় আবেগের উত্থান ঘটেছিল, তা কোনো একক দলের সৃষ্টি নয়। এটি কোনো একটি সংগঠনের সম্পদও নয়। এটি কোটি মানুষের ঈমানের ভালোবাসা, ইসলামকে বাঁচিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং ধর্মীয় পরিচয় রক্ষার সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে সুসংগঠিত ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। তাদের ত্যাগ আছে, ইতিহাস আছে, কর্মীবাহিনী আছে। অসংখ্য মানুষ ইসলামের ভালোবাসা থেকেই এ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে।
মানুষ ইসলামের জন্য জামায়াতকে ভালোবাসে কিন্তু জামায়াতের জন্য ইসলামকে ভালোবাসে না। এই সত্যটি তাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন ছিল। আমি মনে করি,জামায়াতের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল অন্য সব ইসলামী শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে একটি বৃহত্তর ইসলামী ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। নেতৃত্ব মানে সবাইকে নিজের পেছনে দাঁড় করানো নয়; নেতৃত্ব মানে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। বড় হওয়ার অর্থ আধিপত্য নয়, বরং ধারণ করার ক্ষমতা।
দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি রোগ বহু পুরনো। আমরা ঐক্য চাই, কিন্তু নেতৃত্ব ভাগ করতে চাই না। আমরা সহযোগিতা চাই, কিন্তু সমমর্যাদা দিতে চাই না। আমরা ইসলামের কথা বলি, কিন্তু অনেক সময় দলকে ইসলামের চেয়েও বড় করে দেখি।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। ইসলামী শক্তিগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বেড়েছে, দূরত্ব বেড়েছে আর সাধারণ মানুষ এসব দেখেহতাশ হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ছিল ইসলামের বিজয়; কোনো দলের বিজয় নয়।
আরেকটি বাস্তবতা আমি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে মজলুম থাকার কারণে জামায়াতের প্রতি মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল। বহু মানুষ তাদের সমর্থন করেছে শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং অন্যায়ের শিকার হওয়ার কারণে। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস বলে, মজলুমের প্রতি সহানুভূতি চিরস্থায়ী নয়। একসময় মানুষ প্রশ্ন করে—ক্ষমতা পেলে আপনি কেমন হবেন? ভিন্নমতকে কীভাবে দেখবেন? আপনি কি বিনয়ী থাকবেন, নাকি বিজয়ের আগেই বিজয়ীর ভাষায় কথা বলবেন?
মনে রাখতে হবে মানুষ অত্যাচারিতকে ভালোবাসে, কিন্তু অহংকারীকে ভালোবাসে না।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ইসলামবিদ্বেষী নীতি ও আচরণও মানুষের মধ্যে ইসলামী চেতনার উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে। যখন মানুষ দেখে তার ধর্মীয় পরিচয়কে উপহাস করা হচ্ছে, তখন সে আরও শক্তভাবে নিজের পরিচয়ের দিকে ফিরে যায়। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আবেগ যদি সঠিক নেতৃত্ব না পায়, তাহলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
আজ আমি আশঙ্কা করি, ইসলামী শক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, দলীয় অহংকার এবং ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ সেই অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। যে জোয়ারকে আমরা ইসলামের জোয়ার ভেবেছিলাম, তা যদি দলীয় প্রতিযোগিতার স্রোতে হারিয়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে ইসলামী আন্দোলনেরই।
অন্যদিকে বিএনপি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও মিডিয়া ন্যারেটিভের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি নতুন কিছু নয়। ২০০০ সালের পরও আমরা অনুরূপ বাস্তবতা দেখেছি। ইসলামী শক্তিগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ছিল, আর মূলধারার রাজনীতি নিজের গতিতে এগিয়ে গেছে।
ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো—শূন্যস্থান কখনো খালি থাকে না। আপনি যদি মানুষের আশা ধারণ করতে না পারেন, অন্য কেউ তা ধারণ করবে।
আমি নিরাশ নই। আমি এখনও বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মানুষ ইসলামের প্রতি তাদের ভালোবাসা হারায়নি। তারা এখনও মসজিদমুখী, কুরআনমুখী, আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তারা এখনও এমন নেতৃত্বের অপেক্ষায় আছে, যারা ইসলামের নামকে ভোটের সিঁড়ি নয়, আমানত হিসেবে দেখবে।
আজ ইসলামী রাজনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নির্বাচন নয়, আসন বণ্টনও নয়। প্রশ্ন হলো—আমরা কি দলকে বড় করব, নাকি দ্বীনকে?
যেদিন ইসলামী সংগঠনগুলো এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পাবে, সেদিন হয়তো আমরা আবার একটি সত্যিকারের ইসলামী জোয়ার দেখতে পাব। এমন এক জোয়ার, যা কোনো দলের নয়; বরং সমগ্র উম্মাহর।